আমার দেশের মা-বোনেরা যুগযুগ ধরে ঠাকুরঘরে আল্পনা দিয়েছেন, রঙ্গোলি বানিয়েছেন, মধুবনীর ঐতিহ্য গড়েছেন। কিন্তু ইতিহাস চিত্রকর হিসাবে আলাদা করে তাঁদের কাউকে সম্মান দেওয়া দূরে থাকুক, সামান্য উল্লেখ করার প্রয়োজনটুকুও বহুকাল বোধ করে নি। আসলে ইতিহাসও তো যুগের পরে যুগ পুরুষতন্ত্রের অধীনেই ছিল!
ঘাবড়াবেন না, এই রচনা গলার শিরা ফুলিয়ে পুরুষজাতির বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে লেখা নয়। ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের দেশে নারীমুক্তি আন্দোলনের পথিকৃত কিন্তু রাজা রামমোহন রায় বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো পুরুষেরাই। তাই সব পুরুষকেই খারাপ প্রতিপন্ন করার ভিত্তিহীন প্রচেষ্টার আমি সমর্থন করি না।
এটি ঐতিহ্যের মিথ্যা দোহাই দিয়ে কূপমণ্ডুক হতে বাধ্য করে রাখা নারীজাতির, শৈল্পিক অভিযানে মুক্ত যাত্রা শুরুর একটি আখ্যান। আবার এই আখ্যানের অন্যতম প্রধান চরিত্র একজন পুরুষও বটে।
এই নিবন্ধতে স্মরণ করবো সেই ভারতীয় নারীকে, যাঁকে অবিভক্ত ভারতের প্রথম মহিলা চিত্রশিল্পী হিসাবে গণ্য করা হয়। কারণ তিনিই প্রথম ভারতীয় মহিলা চিত্রশিল্পী যাঁর একক চিত্র প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছে, এবং তিনিই ভারতের প্রথম মহিলা চিত্রশিল্পী যিনি তাঁর ছবিতে সাক্ষর করার কর্তৃত্ব দেখিয়েছেন। পাঠক তাঁর দুই বড়ো ভাইয়ের নাম নিঃসন্দেহে শুনে থাকবেন — কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। আসুন, আজ তাঁদের একমাত্র ছোটো বোন সুনয়নী দেবীর সম্পর্কেও জানা যাক।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বাঙালির নবজাগরণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার। সেই পরিবারে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই জুন জন্মগ্রহণ করেন সুনয়নী দেবী। পিতা শ্রী গুনেন্দ্রনাথ ঠাকুর; মাতা শ্রীমতি সৌদামিনী দেবী। গুনেন্দ্রনাথ ছিলেন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের খুড়তুতো ভাই।
সেটা বাংলার নবজাগরণের যুগ। তার উপর তিনি ঠাকুর পরিবারের সদস্যা, যে পরিবার বৌদ্ধিক সাধনা, সামাজিক সংস্কার এবং শৈল্পিক অবদানের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক রূপে গণ্য হতো। মনে হতেই পারে যে ছোটবেলায় তাঁর শৈল্পিক কার্যকলাপে উৎসাহ দেওয়ার মতো মহামানবের অভাব ছিল না। কিন্তু আদতে চিত্রশিল্পের প্রথাগত কোনো প্রশিক্ষণ তিনি পাননি, এবং মাত্র ১২ বছর বয়সেই তাঁর বিবাহ সম্পন্ন করে দেওয়া হয়।
সুনয়নী অল্প বয়েস থেকেই তাঁর বড়ো দুই দাদার শিল্পকর্ম সৃষ্টির বিভিন্ন কৌশল নীরবে পর্যবেক্ষণ করতেন, এবং পরে নিজেই নিজেকে প্রশিক্ষণ দিতেন। প্রথাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ তাঁর বরাতে জোটে নি। অবশ্য এর অন্যতম কারণ ছিল তাঁর অত্যাধিক অন্তর্মুখী হওয়া। কারণ ঠাকুর পরিবারের মেয়ে-বৌদের রীতি রেওয়াজের শিকলে বেঁধে রাখার চল ছিল না। সেই সময়ের অনুপাতে ঠাকুরবাড়ির নারীরা খুবই আধুনিকা ছিলেন। বাংলার নারীমুক্তি আন্দোলনে তাঁদের বিশেষ অবদান আছে।
সুনয়নীর বিবাহ হয় রাজা রাম মোহন রায়ের নাতি রজনীমোহন চট্টোপাধ্যায়ের সাথে। রজনীমোহনই সুনয়নীর প্রতিভাকে যথার্থভাবে আবিষ্কার করেন এবং তাঁকে চিত্রশিল্পকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে উৎসাহ দেন। সুনয়নীর শৈল্পিক সত্ত্বার প্রতি রজনীমোহনের অবিচল সমর্থন এবং তাঁর দক্ষতার উপর দৃঢ় বিশ্বাস দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সুনয়নী দেবীর চিত্রাঙ্কন যাত্রা অবশেষে যখন শুরু হয়, তখন তাঁর বয়েস ৩০ পেরিয়ে গেছে। পরবর্তী ১৫ বছরে তিনি শিল্পের জগতে নিজের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য স্থান তৈরি করেছিলেন, এবং সেই স্থান সম্পূর্ণ তাঁর নিজের কৃতিত্বে, ঠাকুর পরিবার বা (রায়) চট্টোপাধ্যায় পরিবারের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। জীবনসঙ্গী রজনীমোহন ছিলেন এই ১৫ বছর তাঁর সবচেয়ে বড়ো প্রশংসক, সমালোচক, এবং সমর্থক।
বৃহৎ একটি ধনী পরিবারের কর্ত্রী সুনয়নী দেবী গৃহস্থালি সামলানোর ফাঁকে চিত্রাঙ্কনের জন্য দুটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত করেছিলেন। প্রথমে সকাল ৮ টা থেকে দুপুর ১২ টা, তারপর বিকেল ৩ টে থেকে ৪:৩০ টে — এই দুটি নির্দিষ্ট অধিবেশনে তিনি নিয়মিত ছবি আঁকতেন। পরবর্তী কালে তাঁর নাতি ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, "তিনি একটি তক্তপোশের উপর পাশবালিশে হেলান দিয়ে বসে ছবি আঁকতেন, আর মাঝে মাঝে সবজি ধোয়ার জলের পাত্রের মধ্যে ছবিগুলি ডুবিয়ে রেখে, তিনি তাঁর পুত্রবধূদের রান্নার প্রস্তুতির তত্ত্বাবধান করতে উঠে যেতেন।"
এই জলে ধুয়ে চিত্রকলা সৃষ্টির প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ওয়াশ টেকনিক, যেটি সুনায়নি দেবী ছোটবেলায় তাঁর দুই বড়ো দাদাকে দেখে শিখেছিলেন। শিল্প ইতিহাসবিদ স্টেলা ক্রাম্রিশ এই সম্পর্কে লিখেছেন —
তিনি প্রথমে তুলি দিয়ে কাগজে একটি লাল বা কালো আউটলাইন আঁকতেন, তারপর একটি পাতলা পেইন্টব্রাশ দিয়ে সেই আউটলাইনটির ভিতরের ক্ষেত্র তিনি তাঁর তৈরি জলরঙ দিয়ে পূর্ণ করতেন। এর পরে কাগজটি একটি বৃত্তাকার জলের পাত্রে ডুবিয়ে রাখা হতো, যাতে কাগজ সেই রঙ শুষে নেয়। এই ধোয়ার প্রক্রিয়ার বারংবার পুনরাবৃত্তি করা হত, এবং এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে কাগজের উপর রঙের একটি আভা সৃষ্টি হয়ে চিত্রের মূল রূপটি বেরিয়ে আসত। ঝাপসা আকারগুলি ক্রমশ পরিস্ফুট হতে শুরু করলে সুনায়িনী চিত্রের আউটলাইনগুলি আরও স্পষ্ট করে আঁকতেন।
সুনয়নী দেবীর শিল্পকর্মের অনুপ্রেরণা ছিল বিবিধ ও বৈচিত্রময়। ছোটবেলায় মাসির ঘরের দেওয়ালে টাঙানো যুগান্তকারী শিল্পী রাজা রবি বর্মার আঁকা বিভিন্ন দেবদেবির ছবির প্রিন্টগুলি দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর দুই বড় দাদার, বিশেষত অবনীন্দ্রনাথের জলরঙের কাজ বা ওয়াশ টেকনিকও তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। রাজপুত অনুচিত্র বা মিনিয়েচার পেইন্টিং, গ্রাম্য মাটির পুতুল, কালীঘাটের পট প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প তাঁর শৈল্পিক সত্ত্বাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল।
তিনি তাঁর চিত্রকলায় ওয়াশ টেকনিকের মতো সূক্ষ্ম জাপানি কৌশলের সাথে ভারতীয় লোকশিল্প শৈলীর মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। আবার তাঁর শিল্পকলার শৈলীর সাথে পিকাসো বা গগাঁর মতো ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গির বৌদ্ধিক মিল রয়েছে। মনে করা হয় তাঁর এই শৈলী বা স্টাইল পরবর্তীকালে বিখ্যাত শিল্পী যামিনী রায়কে প্রভাবিত করেছিল। দি ইংলিশমান সংবাদপত্র, যা পরবর্তীকালে দ্য স্টেটসম্যানের সাথে মিশে যায়, একটি কলামে সুনয়নী দেবীর চিত্রকলাকে শ্রেণিবিন্যাসিক মানের দিক থেকে প্রাচীন জৈন চিত্রকলার সাথে তুলনা করে, এবং তাঁর সাহসী মৌলিকত্বর বিশেষ প্রশংসা করে।
সুনয়িনী দেবী তাঁর শিল্পের মধ্য দিয়ে প্রধানত ভারতীয় নারীর গৃহস্থালি, তাঁদের একাকীত্ব, চিন্তাভাবনা ইত্যাদি ফুটিয়ে তুলতেন। ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে সম্ভবত প্রথমবার, নারীকে বিষয় করে চিত্রকর্ম সৃষ্টি হয়েছিল, একজন নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে। তাঁর তুলিতে ভারতীয় নারীর জীবনকে যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল। এছাড়াও, তাঁর বেশ কিছু চিত্রের বিষয় হিসাবে হিন্দু দেবদেবীদের দেখা যায়।
নাতিকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন যে তাঁর সৃষ্টি বেশিরভাগ চিত্রের বিষয় ও রূপই তিনি স্বপ্নে দেখেছেন, এবং তারপর সেই স্বপ্নে দেখা চিত্রকে তিনি বাস্তব রূপ দিয়েছেন।
১৯০৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে, প্রথম ভারতীয় মহিলা চিত্রশিল্পী হিসাবে, কলকাতা, এলাহাবাদ, লন্ডন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানা শহরে বিভিন্ন সফল চিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে, তিনি জনসাধারণের স্বীকৃতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত 'সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট' প্রদর্শনীতে তাঁর আঁকা ছবি প্রদর্শিত হয় ওয়াসিলি ক্যান্ডিনস্কি ও পল ক্লি-এর মতো বিখ্যাত বাউহাউস শিল্পীদের কাজের সাথে। পল ক্লি ছিলেন অভিব্যক্তিবাদ, কিউবিজম এবং পরাবাস্তববাদের কিংবদন্তি শিল্পী। ওয়াসিলি ক্যান্ডিনস্কিকে বিমূর্তশিল্পের পথিকৃৎ হিসেবে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে ওমেন’স ইন্টারন্যাশনাল আর্ট ক্লাব কর্তৃক আয়োজিত প্রদর্শনীতে সুনয়িনী দেবীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। সেই সময় দেশে বিদেশে তাঁর কাজের অনেক অনুরাগী ছিল।
১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে এমনই কিছু অনুরাগী তাঁর বাড়িতে একটি চিত্রশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এখানেই সুনয়িনী দেবী শেষবারের মতো জনসমক্ষে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত করেন। স্বামীর অনুপ্রেরণায় ৩০ বছর বয়েসে শুরু হয়েছিল তাঁর শিল্পীজীবন, মাত্র ৪৫ বছর বয়েসে স্বামীকে হারানোর পর তিনি সেই জীবন থেকে স্বেচ্ছাবসর নিয়ে নেন। এরপর '৪০-এর দশকে তাঁর পরিবার একাধিক দুর্ভাগ্যের সম্মুখীন হওয়ার ফলে তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, এবং শিল্পের জগৎ থেকে পাকাপাকি ভাবে বিদায় নেন।
ভারতের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় আজও শোভা পায় সুনয়িনী দেবীর শিল্পকর্ম —
▪ ভারতীয় জাদুঘর, কলকাতা
▪ চারুকলা একাডেমী, কলকাতা
▪ রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর, কলকাতা
▪ জাতীয় আধুনিক শিল্প গ্যালারি, নয়াদিল্লি
▪ জাতীয় আধুনিক শিল্প গ্যালারি, বেঙ্গালুরু
▪ জাতীয় শিল্প গ্যালারি, চেন্নাই
▪ শ্রী চিত্রা আর্ট গ্যালারি, তিরুবনন্তপুরম
▪ জগনমোহন প্রাসাদ, মহীশূর
▪ লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়
সুযোগ ও সময় পেলে একবার দেখে আসাই যায়, কি বলেন? বিশেষত যদি আপনি এই শহরগুলির মধ্যে কোনো একটিতে বসবাস করেন।
২০২৫ খ্রিস্টাব্দ হলো ভারতীয় মহিলা শিল্পীদের স্পটলাইটে আনার পথিকৃত এই বাঙালিনীর জন্ম স্বার্ধশতবার্ষিকী (sesquicentenary)। দুঃখের বিষয়, কোনো গণমাধ্যমে এই দিনটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। কোনো নারীবাদী সংস্থা এই দিনটিকে উদযাপন করছে না। সকল ভারতবাসীকে ছেড়ে দিন, এমনকি বাঙালিরাই তাঁকে মনে রেখেছেন কিনা, তাতেও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে!