প্রতিটি প্রজন্মই তার পূর্ববর্তী প্রজন্মের চেয়ে আলাদা। এই আলাদা হওয়ার পেছনে রয়েছে সময়, প্রযুক্তি, সমাজ ও সংস্কৃতির পরিবর্তন। আমরা প্রায়শই বলি, "এখনকার ছেলেরা আর মানুষ হলো না।" এই কথার পেছনে লুকিয়ে আছে এক ধরনের হতাশা, আক্ষেপ এবং অতীতের প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী কে? আসলে এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সমাজ, পরিবার এবং প্রযুক্তির সম্মিলিত প্রভাব।
আগের দিনে শিশুরা বড় হতো কঠোর অনুশাসনে। মা-বাবা তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিতেন, কিন্তু তা হতো প্রয়োজন অনুযায়ী এবং দীর্ঘ অপেক্ষার পর। আজকের শিশুরা কিছু চাইতে না চাইতেই তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় নিত্যনতুন জিনিস। শুধু পোশাক-পরিচ্ছদ বা খাবার নয়, মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপের মতো ইলেকট্রনিক গ্যাজেটও। এই অতিদ্রুত আবদার পূরণের সংস্কৃতি শিশুদের মধ্যে ধৈর্য, কষ্ট স্বীকার করার মানসিকতা এবং মূল্যবোধের অভাব তৈরি করছে।
বর্তমান সমাজে সন্তানদের শাসন ও স্বাধীনতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আমরা প্রায়ই তাদের স্বাধীনতাকে প্রাধান্য দিয়ে শাসনের প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করি। স্কুলে শিক্ষকরা শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গেলে আমরা প্রতিবাদ করি, আবার বাড়িতেও মানসিক বা শারীরিক শাসনের বিরোধিতা করি। এই অতিরিক্ত সুরক্ষা ও শাসনহীনতা সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শিক্ষার পাশাপাশি কায়িক পরিশ্রম ও শৃঙ্খলার অভাব তাদেরকে জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপ্রস্তুত করে তুলছে। আমরা যদি আজকের করুণা ও অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করি, তবে তা আমাদেরই ভুল সিদ্ধান্ত বলে প্রমাণিত হবে।
আগের দিনের মায়েরা সংসারের সকল কাজ করার পাশাপাশি সংসারে আর্থিক সাহায্যের জন্য বিভিন্ন কাজ করতেন। বিড়ি বাঁধা, কাপড় সেলাই করা, হাঁস-মুরগি পালন করা, এমনকি চাষাবাদের কাজেও তারা অংশ নিতেন। কিন্তু আজকের মায়েরা সেই পরিশ্রম করতে চান না, বা সমাজও তাদের সেই চাপ দেয় না। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থায় নারীরা এখন শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বেশি সক্রিয়, যা অবশ্যই ভালো। কিন্তু এই পরিবর্তনের সাথে সাথে সংসারের ঐতিহ্যবাহী দায়িত্বগুলোও পাল্টে গেছে।
আগের তুলনায় আমরা এখন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। সকালে ঘুম থেকে উঠে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রতিটি কাজে প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়। আগে পানির জন্য কলতলায় যেতে হতো, এখন ঘরের ভেতরেই ট্যাপ। আগে গল্প করতে বা বেড়াতে যেতে হতো, এখন হাতের মুঠোফোনেই গোটা পৃথিবী। এই সুবিধাগুলো আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের শারীরিক সক্ষমতা, মানবিকতা এবং সামাজিক বন্ধনও দুর্বল করেছে।
এই পরিবর্তনের জন্য দায়ী কাউকে এককভাবে চিহ্নিত করা যায় না। সমাজ, পরিবার, শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির সম্মিলিত প্রভাবেই এই পরিবর্তন এসেছে। আমরা যারা অতীতের দিনগুলোর কথা বলি, তারা নিজেরাও এই পরিবর্তনের অংশ। আমরা আমাদের সন্তানদের অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে তাদের মধ্যে ধৈর্য এবং কষ্ট স্বীকার করার মানসিকতা গড়ে তুলতে পারিনি। আবার প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারও তাদের মানবিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে।
প্রজন্মের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক বন্ধন এবং শারীরিক সক্ষমতা যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে একসাথে কাজ করতে হবে যেন নতুন প্রজন্ম শুধু প্রযুক্তিনির্ভর না হয়ে মানবিক মূল্যবোধেও সমৃদ্ধ হয়। অতীতের দিনগুলোর কথা বলার পাশাপাশি আমাদের এও ভাবতে হবে যে, আমরা কীভাবে বর্তমানকে আরও ভালোভাবে গড়ে তুলতে পারি।
প্রতিটি প্রজন্মই তার সময়ের প্রতিফলন। আমাদের দায়িত্ব হলো, নতুন প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তোলা যেন তারা প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ থেকেও দূরে সরে না যায়।