স্বাধীনতা আন্দোলনে যত সংখ্যক বাঙালি এবং শিখ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, ভারতের অন্য কোনো সম্প্রদায় থেকে যে অত সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন নি, সেটা কোনো সম্প্রদায়কে খাটো না করেও বুক ঠুকে দাবি করা যায়।
এর মধ্যে অনেক বিপ্লবী সম্পর্কে আমরা জানি, কিন্তু অনেকেই আবার বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে গেছেন। সেরকম বেশ কয়েকজন না শোনা বিপ্লবীর নাম সম্প্রতি 'কেশরী চ্যাপ্টার ২' দেখে জানতে পারলাম। জিওহটস্টার (JioHotstar)-এ মুভিটি দেখার পর নিজেকে আর আটকাতে পারলাম না। খুঁড়তে শুরু করলাম ইতিহাসের কবর, খুঁজতে শুরু করলাম অমৃতসরের সেইসব বিল্পবীদের যাঁদের নাম ওই চলচিত্রটি দেখার আগে কখনো শুনি নি — ক্ষুদিরাম সিং, বারিন্দর কুমার, এবং কৃপাল সিং।
আপনারা আর্টিকেলটি পড়তে শুরু করার আগে যাঁদের ছবি লক্ষ্য করলেন, তাঁরা ক্ষুদিরাম সিং ও বারিন্দর কুমার। এনাদের কোনো বাঙালি এতদিন চিনতেন না, কোনো শিখও চিনতেন না। কিন্তু ধর্মা প্রোডাকশন, কেপ অফ গুড ফিল্মস, এবং লিও মিডিয়া কালেকটিভ-এর কালেকটিভ উদ্যোগে আজ সারা ভারত এই বিপ্লবীদের নাম জানে।
নকল ফটোগ্ৰাফদুটি দেখে যদি কারোর মনে হয় যে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু, বারীন ঘোষ বা শিখ সম্প্রদায়ের অবমাননা করা হচ্ছে, আমি ক্ষমা চাইছি। তবে অবমাননা আমি নই, চলচিত্র নির্মাতারা করেছেন। আমি শুধু পরিষ্কার ভাবে দেখাতে চাইছি যে সেই অবমাননার রূপটি কিরকম। কারোর ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার উদ্দেশ্য আমার নয়।
শিখ, না ওরা বাঙালি, এই জিজ্ঞাসে কোন জন হে?
ত্যাগিজি বলো লিখিতেছি স্ক্রিপ্ট অসত্য সিনেমার।
করণ সিং ত্যাগী, এই মুভির পরিচালক এবং অন্যতম লেখক, একজন হার্ভার্ড ল স্কুল গ্রাজুয়েট। এবং হার্ভার্ড ফেরত বলেই মনে সন্দেহ আসে যে, তিনি কি আইনের ফাঁক ফোকর খুঁজে সস্তা পাবলিসিটির জন্য জেনেবুঝেই ক্ষুদিরাম সিংকে সৃষ্টি করেছেন?
কিন্তু দেশের শীর্ষ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সেরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন বা রুচি কেন হবে?
মুভির শুরুতেই ডিসক্লেইমার দেওয়া আছে —
"Though this Film is inspired by true events, it is pure work of fiction created by the filmamker taking creative liberty with all events projected in this Film". ডিসক্লেইমারে এটাও উল্লেখ করা আছে যে কোনো সম্প্রদায়কে কোনোভাবে অবমাননা করার উদ্যেশ্য এই ছবির প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী বা ছবির সঙ্গে যুক্ত অন্যান্যদের নেই।
কিন্তু ডিসক্লেইমার যাই বলুক, আমরা সবাই জানি যে মুভিটিকে ইতিহাসের দলিল হিসাবেই প্রচার করা হয়েছে। মুভির পুরো নাম 'কেশরী চ্যাপ্টার ২: দ্য আনটোল্ড স্টোরি অফ জালিয়ানওয়ালাবাগ', এবং মুভির উইকিপিডিয়া পেজ অনুযায়ী এটি একটি 'historical courtroom drama'। প্রেস কনফারেন্সেও একই দাবি করা হয়েছে। ধর্মা প্রোডাকশন তাদের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট-এ এই মুভি সংক্রান্ত প্রত্যেকটি পোস্ট-এ এটিকে একটি ঐতিহাসিক সত্য, যা নির্মাতারা ইতিহাসের লুকিয়ে রাখা পাতা থেকে খুঁজে এনেছেন, এরকম দাবি করেছে।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির ৪ দিনের মাথায় একদিন এই মুভির টিকিট ₹৯৯ তে বিক্রি করা হয়েছিল, সেই সময় ইনস্টাগ্রাম একাউন্ট-এ দাবি করা হয়েছিল — "The truth finally gets its voice. And it's only ₹99 away"। এর ৩ দিন পরে একটি টিকিট কিনলে আর একটি টিকিট ফ্রি-এর অফার দেওয়া শুরু হয়েছিল। তখন ঘোষণা করা হয়েছিল — "This deal is as powerful as the truth"। এবং OTT মুক্তির আগেও ঘোষণা করা হয়েছে — "Dekhiye itihas ki woh kahani, jo aap tak kabhi pahunchi nahi"! অবশেষে মুভির শুরুতে খুদে খুদে অক্ষরে মুভিটি সত্য ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও সম্পূর্ণ কাল্পনিক, এবং মুভিতে প্রদর্শিত সমস্ত ঘটনা সৃষ্টিতে সৃজনশীল স্বাধীনতা নিয়েছেন ডিসক্লেইমার দিয়ে, ছবির নির্মাতারা আইনগতভাবে হাত পরিষ্কার করে নিয়েছেন।
এই তথাকথিত 'ঐতিহাসিক' কোর্টরুম ড্রামাতে প্রধান চরিত্র বিখ্যাত ভারতীয় আইনবিদ, রাজনীতিবিদ এবং সমাজ সংস্কারক স্যার চেট্টুর শঙ্করন নায়ার-এর সম্পর্কেও কিন্তু বিকৃত তথ্যই দর্শানো হয়েছে। মুভিতে যেরকম দেখিয়েছে, সেরকম তিনি জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার জন্য দায়ী করে, কোনোদিনই জেনারেল ডায়ার-এর বিরুদ্ধে মামলা করেন নি।
১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর শঙ্করণ নায়ার ভাইসরয়ের কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করে দ্য ওয়েস্টমিনস্টার গেজেটের সম্পাদকের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, যার ফলে ওই সংবাদপত্রে 'Amritsar Massacre' শিরোনামে একটি আর্টিকেল প্রকাশিত হয়। দ্য টাইমস সহ অন্যান্য সংবাদপত্রেও অনুরূপ আর্টিকেল প্রকাশিত হয়।
১৯২২ সালে স্যার নায়ার 'Gandhi and Anarchy' নামে একটি বই লেখেন। সেই বইতে তিনি তৎকালীন পাঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার মাইকেল ও'ডোয়ায়ারকে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করেন, এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ও'ডোয়ায়ার তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন।
দুজনেই জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মূলে থাকলেও, জেনারেল ডায়ার এবং লেফটেন্যান্ট গভর্নর ও'ডোয়ায়ার দুজন সম্পূর্ণ পৃথক ব্যক্তি। ডায়ার, একজন ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল, সৈন্যদের গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। ও'ডোয়ায়ার, পাঞ্জাবের লেফটেন্যান্ট গভর্নর, ডায়ারকে সেই নির্দেশ জারি করার অনুমোদন দিয়েছিলেন।
স্যার নায়ার সেই মানহানির মামলায় নিজেকে ডিফেন্ড করেন, কিন্তু হেরে যান। আদালত তাঁকে ও'ডোয়ায়ারকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে ৫০০ পাউন্ড এবং মামলার খরচ হিসাবে ৭০০০ পাউন্ড জরিমানা হিসাবে দিতে নির্দেশ দেয়। ও'ডোয়ায়ার ক্ষমা চাওয়ার বিনিময়ে নায়ারকে সেই জরিমানা হতে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব দেন। নায়ার ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন এবং জরিমানা দিয়ে দেন।
নায়ারের আইনি পরাজয় সত্ত্বেও, সেই মামলা জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় নিয়ে এসে সারা পৃথিবীর সামনে 'জেন্টলম্যান' ব্রিটিশদের মুখোশ খুলে দিয়েছিলো, যার ফলে ব্রিটিশরাজ পাঞ্জাব থেকে প্রেস সেন্সরশিপ এবং সামরিক আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়।
শঙ্করণ নায়ার সত্যিই যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, বা স্বাধীনতার ইতিহাসে শিখ সম্প্রদায়ের সত্যিই যে অবদান ছিল, তার সম্মানে ১টি কেন বরং ১০০টি চলচ্চিত্র তৈরী করা সম্ভব, এবং সেটাও ঐতিহাসিক তথ্যকে বিকৃত না করেই, এবং অন্য কোনো সম্প্রদায়ের অবদানকে অবমানিত না করেই। সেলুলার জেলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ২৬৪৬ জন বিপ্লবীর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল শিখ। তাই স্বাধীনতা সংগ্রামে শিখদের অবদানকে ইতিবাচক করে দেখানোর জন্য, 'ক্রিয়েটিভ লিবার্টি' ট্যাগের পেছনে লুকিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার কোনো প্রয়োজনই ছিল না।
ইতিহাসের ইচ্ছাকৃত বিকৃতিকে উপেক্ষা করলে, শুধু কোর্টরুম ড্রামার মাপকাঠিতে কিন্তু মুভিটি চিত্রনাট্য, সংলাপ, সম্পাদনা ও পরিচালনার একটি উৎকৃষ্টমানের নিদর্শন। কাজেই, ক্ষুদিরাম বসু ও ভগত সিং-এর নামের বিকৃত সন্ধি করে দেওয়া, বারীন্দ্র ঘোষকে বারিন্দর কুমার বানিয়ে দেওয়া, হেমচন্দ্র দাস ও যতীন দাস-এর অবদানকে উপেক্ষা করতে কৃপাল সিং নামের একটি কল্পিত চরিত্রের উদ্ভাবন করা, এমনকি কাহিনীর নায়ক স্যার শঙ্করন নায়ারকে সম্মান দেওয়ার নামে তাঁর ইতিহাসকেই অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিকৃত করে ফেলা, আর তারপর মুভিটিকে ঐতিহাসিক সত্য বলে বারংবার প্রচার করার পেছনের কারণটা, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের একটি বিকৃত ইচ্ছা ছাড়া আর কি হতে পারে?
এবং যেহেতু ছবির প্রযোজক, পরিচালক, মুখ্যাভিনেতারা সকলেই খুব সফল ও বিখ্যাত, ধরে নেওয়া যায় তাঁদের সস্তা পাবলিসিটির কোনো প্রয়োজনই নেই। সেক্ষেত্রে একটাই প্রশ্ন চিন্তায় আসে, বাঙালির ভাবাবেগে আঘাত দেওয়ার এই ইচ্ছার কারণ কি?
ইতিহাসে কি আছে?
▪ ১৯০৭ সালে, বাঙালি বিপ্লবী হেমচন্দ্র দাস কানুনগো প্যারিসে গিয়ে নির্বাসিত রাশিয়ান বিপ্লবীদের কাছ থেকে পিক্রিক অ্যাসিড বোমা তৈরির কৌশল শিখেছিলেন, এবং সেই জ্ঞান তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলির তরুণ ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
▪ ১৯০৮ সালে, বাঙালি বিপ্লবীদ্বয় ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী মুজাফফরপুরে কিংসফোর্ডকে হত্যার চেষ্টা করতে গিয়ে ভুলবশত অন্য একজন ব্রিটিশ অফিসারের গাড়িতে বোমা ছোঁড়েন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই সময় গাড়িতে শুধুমাত্র সেই অফিসারের স্ত্রী এবং কন্যা ছিলেন। তাঁদের মৃত্যু হয়, এবং সেই অপরাধে ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী যাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুর সময় তার বয়েস ছিল ১৮ বছর, ৮ মাস, ৮ দিন, ১০ ঘন্টা। প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়ার আগেই নিজের রিভলবার দিয়ে নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। শনাক্তকরণের জন্য তাঁর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ক্ষুদিরামের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সঙ্গের ছবিটি ১৯ বছরের সেই বীর
শহীদের সমাধি অনুষ্ঠানের।
▪ ১৯২৯ সালে, শিখ বিপ্লবী ভগত সিং ও বাঙালি বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত দিল্লিতে কেন্দ্রীয় আইনসভায় বোমা নিক্ষেপ করেন। তাঁরা আর এক বাঙালি বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ দাস-এর কাছে বোমা বাঁধা শিখেছিলেন। ওই বছরই যতীন্দ্রনাথ লাহোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ৬৩ দিন অনশন ধর্মঘটের পর মারা যান। বটুকেশ্বর দত্তর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় এবং তাঁকে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সেলুলার জেলে নির্বাসিত করা হয়।
▪ ১৯৩১ সালে, ভগৎ সিং এবং তাঁর দুই বিপ্লবী সহযোদ্ধা শিবরাম রাজগুরু ও সুখদেব থাপারকে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
কেশরী চ্যাপ্টার ২ -এ কি আছে?
▪ অমৃতসরের দুই ছাত্র ক্ষুদিরাম সিং ও বারিন্দর কুমার ব্রিটিশ অফিসার কিংসফোর্ডের গাড়ির উদ্যেশ্যে বোমা ছুঁড়েছিলেন। গাড়িটি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিলো, এবং অফিসার কিংসফোর্ডের মৃত্যু হয়েছিল। এর ফলে ক্ষুদিরাম সিং ও বারিন্দর কুমার-এর জেল হয়, এবং তরুণ ছাত্রদের বোমা বাঁধতে শেখানোর জন্য তাঁদের গুরু কবি কৃপাল সিং-এরও জেল হয়।
কেশরী চ্যাপ্টার ২ ইতি আর হাঁসে গুলিয়ে ফেলেছে, এই আর কি! শিখ-বাঙালিতে গুলিয়ে ফেলেছে, ব্রিটিশ-ব্রিটিশেও গুলিয়ে ফেলেছে। আমি সাম্প্রদায়িক নই। তবু এই গুলিয়ে ফেলার গুলতানির সাক্ষী হয়ে মনে প্রশ্ন আসেই, গুজরাটি, মারাঠি বা কন্নড় সম্প্রদায়ের কোনো স্বাধীনতা সংগ্রামীর ইতিহাস এরকম দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে বিকৃত করে অবমাননা করার দুঃসাহস কি বলিউডের কোনোদিন হতো?
আপডেট : কেশরী চ্যাপ্টার ২-এর সাত প্রযোজকের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এর একাধিক ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। বিধাননগর নিবাসী রণজিৎ বিশ্বাস মহাশয়কে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই এই পদক্ষেপে নেওয়ার জন্য।