রবি ঠাকুর সশরীরে কখনও আমাদের বাড়ি আসেননি। পটুয়াপাড়া থেকে রবি ঠাকুরের মূর্তি গড়িয়ে এনে বাড়ির বড় আলমারির মাথায় রেখেছিলেন বাবা। ছোটবেলায় ভাবতাম এই বুঝি কথা বলে উঠবেন রবি ঠাকুর! আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড়, সেই দিদি রোজ সন্ধেবেলায় হারমোনিয়াম নিয়ে রেওয়াজ করত। প্রথমে সারেগামাপা, তারপর ধীরে ধীরে গোটা গান তোলার চেষ্টায় ছিল। গানের মাস্টারমশাই দিদিকে প্রথম যে গানটা তুলিয়েছিলেন, সেটি আর কারওর নয়, রবি ঠাকুরের।
মাঝে মাঝে আত্মীয়স্বজন বাড়ি আসবার আগে আমরা ভাই-বোনেরা মায়ের ছেঁড়া শাড়ির অংশ নিয়ে রবি ঠাকুরকে পরিষ্কার করতাম। আত্মীয়রা রবি ঠাকুরকে দেখে বাবার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠতেন। আমি তখন সবথেকে ছোট, আমি অবশ্য সেসব বুঝতে পারতাম না। শুধুমাত্র রবি ঠাকুরের দাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। বাড়িতে নতুন কাচ লাগানো আলমারি এল। সেই আলমারি ভরাট করতে রবি ঠাকুরের রচনাবলী আর নানান বইয়ের খণ্ড যত্ন সহকারে সাজিয়ে রাখা হল।
কৃষ্ণচূড়া গাছটা যখন লাল হয়ে উঠত। সেই সময় একটা দিনে আলমারির মাথা থেকে নামিয়ে রবি ঠাকুরকে মালা পরিয়ে চেয়ারে বসানো হত। প্রথমে বড়দি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান ধরতেন, সেই গান রবি ঠাকুরের। ছোড়দি সালোয়ার কামিজ পরে ওড়না জড়িয়ে 'আগুনের পরশমণি' গানে নাচতেন। পাড়ার দু-একজন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে যারা আমাদের আপন হয়ে উঠেছিল, তারাও গান, নাচ, আবৃত্তি করত।
আমরা সবাই এদিক-সেদিক হাঁটাচলা করতাম, একমাত্র রবি ঠাকুর ছাড়া। মা অবশ্য ব্যস্ত থাকতেন অভ্যাগতদের জন্য খাবার বানানোতে। সেদিন বাড়িতে বয়ে যেত আনন্দের বন্যা!
বাবা এককোণে বসে সব শুনতেন। যতক্ষণ অনুষ্ঠান শেষ না হত, ততক্ষণ বাবাকে কেউ একচুলও সরাতে পারত না। অনুষ্ঠান শেষ হতেই বাবা উঠোনের ওপর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে রবি ঠাকুরের মূর্তিটা কোলে তুলে নিতেন। যেভাবে আমাদের ছোটবেলায় কোলে নিতেন।
সারারাত মনের মধ্যে রবি ঠাকুরের গানের অনুরণন চলত। দিদিদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায়, রবি ঠাকুরের কোনও গান, নাচ, আবৃত্তি, ছড়া শোনা যায়নি। একভাবে একদিকে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতেন রবি ঠাকুর। শ্রাবণের ঝরঝর বর্ষার দিনে রবি ঠাকুরকে ফেলে রেখে বাবা পাড়ি জমালেন। নিস্পন্দ বাবার শরীরের ছৌঁয়া পেতে তৎপর হয়ে উঠেছিলাম আমরা। এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে গুনগুন করছিলেন মা। সেটাও ছিল রবি ঠাকুরের গান। ধুলোর আস্তরণ পড়লেও সাফসুতরো করার কারওর সময় হয়নি রবি ঠাকুরকে। আমরা ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম নিজেরটা বুঝে নিতে। একমাত্র মা বেশ কয়েকবছর আগলে রেখেছিলেন রবি ঠাকুরকে। রবি ঠাকুরের মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে তাঁরই লেখা একেকটা গান এক-একদিন করতেন। তারপর মায়েরও অভিমান হয়েছিল বোধহয়। রুগ্ন শরীরে মায়ের বেশিদিন গলায় আসেনি সেই কথা, সেই সুর। একদিন ভোররাতে তাল, লয় হারিয়ে নিশ্চুপ হয় পড়েছিলেন মা।
ক্রমশ জীর্ণ হয়ে ওঠা বাড়িতে তেমন কেউ না-এলেও, রবি ঠাকুর কিন্তু সেখানেই ছিলেন। সমাজের বাহ্যিক খোলনলচে বদলে গিয়ে রবি ঠাকুরের মূর্তিটা এখন দাঁড়িয়ে আছে ঝা-চকচকে বহুতলে। আমাদের কখনও ছেড়ে যাননি রবি ঠাকুর, আবার সশরীরে কখনও আমাদের বাড়িতে আসেনওনি।
১৯৬৯ সালে ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সদর বারাসাতে জন্ম। আদি বাড়ি বাংলাদেশের ফরিদপুরে। পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা ওই মফস্সল শহরকে কেন্দ্র করে। বাবা ছিলেন সাংবাদিক-সম্পাদক-সাহিত্যিক। সাহিত্যের পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা। বর্তমানে কলকাতার দমদমের বাসিন্দা। বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন ও প্রকাশনায় কাজ করার ফলে নামী-আনামী বহু লেখকের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে মনন। সময়ই তো চিনিয়েছে মানুষ, তাই সময়কে সঙ্গী করে মানুষের কথা বার বার উঠে আসে লেখকের কলমে।