অমর, আকবর, অ্যান্থনি মুভির সেই বিখ্যাত দৃশ্যটি মনে আছে? যেখানে হাসপাতালে নিরূপা রয়কে রক্ত দিচ্ছেন অমিতাভ বচ্চন, বিনোদ খান্না এবং ঋষি কাপুর। তিনজনের শরীর থেকে বেরোনো রক্ত অভিকর্ষকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে প্লাষ্টিক টিউব বেয়ে উঠে যাচ্ছে উপরে, জমা হচ্ছে একটি বোতলে। আর সেই বোতল থেকে রক্ত আর একটি প্লাষ্টিক টিউব বেয়ে ঢুকে যাচ্ছে নিরূপা রয়ের শরীরে। রক্তে উপস্থিত সংক্রামক রোগ জীবাণুর পরীক্ষা দূরে থাকে, রক্তের গ্রুপও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে না। ডাক্তার চরিত্রের অভিনেত্রী নিতু সিং, ঋষি কাপুরের চরিত্রকে খালি একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, "তুমহারা খুনভি তো Rh কা হ্যায় না?"
১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় বক্স অফিস কাঁপানো এই কাল্ট ক্লাসিক মুভি। অথচ তার ১০০ বছর আগেই ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ান-আমেরিকান জীববিজ্ঞানী এবং চিকিৎসক কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন যে, যেকোনো মানুষের রক্ত, অন্য যেকোনো মানুষের শরীরে সবসময় সফলভাবে সঞ্চালিত করা যায় না। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে কিছু ব্যক্তির লোহিত রক্তকণিকা অন্য ব্যক্তিদের শরীর থেকে সংগ্রহ করা সিরামের সাথে মেশালে জমাট বেঁধে যায়। তাঁর গবেষণায় লোহিত রক্তকণিকাতে অ্যান্টিজেন এবং সিরামে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি প্রকাশ পায়, যা রক্ত কণিকা জমাট বাঁধার কারণ ব্যাখ্যা করে। এর ভিত্তিতে আরও গবেষণা চালিয়ে অবশেষে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে তিনি রক্তের তিনটি গ্রুপ, A, B এবং O, সনাক্ত করতে সক্ষম হন।
১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ল্যান্ডস্টেইনার তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরষ্কার পান। ওই বছরই স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় বিশ্বের প্রথম 'মোবাইল ব্লাড ব্যাংক' স্থাপিত হয়েছিল। এরপর ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর কুক কাউন্টি হাসপাতালে বিশ্বের প্রথম 'হসপিটাল ব্লাড ব্যাংক' প্রতিষ্ঠিত হয়। তার ঠিক দু বছর পর এশিয়ার প্রথম, বিশ্বের দ্বিতীয় ব্লাড ব্যাঙ্কটি প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতবর্ষে, এই বাংলায়, যার উদ্যোগী ছিলেন এক বিখ্যাত বাঙালি চিকিৎসক বিজ্ঞানী — রায় বাহাদুর স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী।
বিশ্ব জুড়ে ব্লাড ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা ও রক্তদানের উদ্যোগের ক্ষেত্রে রেড ক্রস সোসাইটির অবদান অপরিসীম। ব্রিটিশ রেড ক্রসের সচিব পার্সি লেন অলিভার ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বের প্রথম রক্তদানের পরিষেবাটি প্রতিষ্ঠিত করেন। আবার কলকাতার স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে এশিয়ার প্রথম ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগী স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীও ছিলেন বেঙ্গল রেড ক্রস সোসাইটির প্রথম ভারতীয় চেয়ারম্যান।
১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ল্যান্ডস্টেইনার অপর একজন জীববিজ্ঞানী এবং চিকিৎসক আলেকজান্ডার এস. ওয়েনার-এর সাথে যুগ্মভাবে Rh ফ্যাক্টর আবিষ্কার করেন, যার থেকে পসিটিভ ও নেগেটিভ ব্লাড বিভাজন সক্ষম হয়। ABO ব্লাড গ্রুপ এবং Rh ফ্যাক্টরের আবিষ্কার নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই রক্তদানের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এবং রক্তদাতাদের অবদানকে ধন্যবাদ জানাতে ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে যখন ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) বিশ্ব রক্তদাতা দিবস-এর সূচনা করে, যুক্তিসঙ্গত ভাবেই ল্যান্ডস্টেইনারের জন্মদিনটিকে সেই বিশেষ দিন পালনের জন্য বেছে নেওয়া হয়। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন অস্ট্রিয়ার একটি বিখ্যাত ইহুদি পরিবারে তাঁর জন্ম হয়েছিল।
ইতিহাস তো অনেক ঘাঁটা হলো, এবার রক্তদানের হাল হাকিকত নিয়েও একটু আলোচনা করা যাক।
একজন সুস্থ, সাবালক মানুষের জন্য রক্তদান সম্পূর্ণ নিরাপদ একটি পদ্ধতি। ৬৫ থেকে ৮০ কেজি ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ ব্যক্তির শরীরে প্রায় ৪.৫ থেকে ৫.৭ লিটার রক্ত থাকে। রক্তদান করলে এর মধ্যে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪৫০ মিলি রক্ত সংগ্রহ করা হয়। রক্তদানের ৩০ মিনিট পরই সম্পূর্ণ নিরাপদে স্বাভাবিক কাজকর্মের মধ্যে ফিরে যাওয়া যায়। প্লাজমা অর্থাৎ শরীরে রক্তের মোট পরিমাণ মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যেই আবার পূরণ হয়ে যায়, এবং লোহিত রক্তকণিকা পূরণ হতে লাগে ৪-৬ সপ্তাহ।
ভারতে প্রতি ২ সেকেন্ডে ১ ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। কাজেই আপনি যদি একজন শারীরিক ভাবে সুস্থ মানুষ হন, এবং আপনার বয়েস যদি ১৮ থেকে ৬০ বছরের ম্যধ্যে হয়, তবে বছরে ২-৩ বার নির্দ্বিধায় আপনার নিকটতম ব্লাড ব্যাংক বা রক্তদান শিবিরে যান, এবং একটি উন্নত ভারত গঠনে অবদান রাখুন।
আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও, রক্তদান মানুষের একটি অন্যতম সহানুভূতিশীল আচরণ এবং নাগরিক কর্তব্য হিসাবে বিবেচিত হয়।চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগতভাবে যতই উন্নতি হোক, রক্তের আজও কোন বিকল্প নেই। কেবল মানুষই এটি দান করতে পারে। এক ইউনিট দান করা রক্ত থেকে তিনটি জীবন বাঁচানো সম্ভব। দুঃখের বিষয়, প্রতি বছর যেখানে দেশে গড়ে ১৪.৬ মিলিয়ন ইউনিট রক্তের দরকার পড়ে, সেখানে জোগাড় হয় কমবেশি ১৩.৬ মিলিয়ন ইউনিট।
অর্থাৎ যে দেশে বিশ্বের দ্বিতীয় ব্লাড ব্যাঙ্কটি স্থাপিত হয়েছিল, সেই দেশ প্রতি বছর ১ মিলিয়ন ইউনিট রক্তের ঘাটতির সম্মুখীন
হচ্ছে!