উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের কথা। অবিভক্ত বাংলার (বর্তমানে বাংলাদেশের) ফরিদপুরে চার বছরের একটা ছেলে পাঠশালা থেকে বাড়ি ফিরছে। সঙ্গে তার আরও কয়েকজন সহপাঠী। সারাবেলার পড়াশোনার ধকল। তার ওপর সকলেই চার-পাঁচ বছরের শিশু। সবারই খুব ক্ষিধে পেয়ে গেছে। ছোট ছোট পা যতটা সম্ভব দ্রুত চালিয়ে তারা চলেছে ছেলেটার বাড়ির উদ্দেশ্যে।
সবাইকে নিয়ে হই হই করতে করতে ছেলেটা তার বাড়িতে ঢুকলো। মা বামাসুন্দরী দেবী গরম গরম জলখাবার বানিয়ে তৈরিই ছিলেন। সবাই হাত পা মুখ ধুয়ে খেতে বসে গেলো। বামাসুন্দরী দেবী সবাইকেই মাতৃস্নেহে খাবার পরিবেশন করলেন।
ওই ছেলেটার সাথে তার সহপাঠীদের সামাজিক পটভূমির অনেকটা পার্থক্য আছে। ওই ছেলেটার বাবা সেই পার্থক্যটা ছেলেকে বুঝতে দিতে চান না। তিনি চাইলেই ছেলেকে কলকাতার কোনো নামি ইংরেজি মাধ্যম সাহেবি স্কুলে পাঠাতে পারতেন। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিল যে ইংরেজি এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার সাথে জড়িত হওয়ার আগে তাঁর ছেলের জন্য তার মাতৃভাষা এবং নিজের সংস্কৃতি শেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের ওই পাঠশালাটি তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে তাঁর ছেলের সহপাঠীদের মধ্যে কারোর বাবা ছিলেন কৃষক, কারোর বাবা জেলে, কারোর বা শ্রমিক। একটি ছাত্রের বাবা ছিলেন তাঁরই পরিচারক। আর তিনি নিজে ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের একজন বিশিষ্ট নেতা, এবং ব্রিটিশ ভারতীয় প্রশাসনের একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট।
এগারো বছর বয়েসে ছেলেটা কলকাতায় হেয়ার স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। পরবর্তীকালে সেন্ট জেভিয়ার্স, কেমব্রিজ, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করে ছেলেটা একাধারে বহুবিদ্যাবিৎ, পদার্থবিদ, জীববিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিদ, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং বিজ্ঞানকাহিনী লেখক হিসাবে পৃথিবী বিখ্যাত হয়। ১৯১৭ সালে নাইট উপাধি পায়। ১৯২০ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হওয়া প্রথম ভারতীয় বিজ্ঞানী হয়।
ছেলেটা প্রমাণ করেছিল যে উদ্ভিদের প্রাণ আছে, তাপ, আলো এবং রাসায়নিকের মতো উদ্দীপনার প্রতি সাড়া দিতে সক্ষম। রেডিও তরঙ্গ, ওয়্যারলেস ট্রান্সমিশন, মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির গবেষণার ক্ষেত্রেও সে অগ্রণী হয়। ক্রেস্কোগ্রাফ, ওয়েভগাইড, হর্ন অ্যান্টেনা, পোলারাইজার প্রভৃতি নানা বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামের উদ্ভাবন করে। কিন্তু কোনো আবিষ্কারের পেটেণ্ট নেয় না কারণ সে বিশ্বাস করতো যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সকলের কাছে অবাধে এবং নির্বিবাদে পৌঁছনোর জন্য, ব্যক্তিগত মালিকানাধীন হয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য নয়। সে তার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার থেকে ব্যক্তিগত আর্থিক লাভ করতে চায় নি। বিজ্ঞান তার জন্য ছিল মানব সাধনা, ব্যবসা নয়।
গ্রামের পাঠশালায় জীবনের প্রথম শিক্ষা ছেলেটার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি যে গভীর ভালোবাসা এবং প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করার যে অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি জাগিয়ে তোলে, পরবর্তীকালে তার যুগান্তকারী আবিষ্কারগুলির সমূলে রয়েছে সেই মূল্যবান সংযোগ। তাছাড়া পাঠশালায় তথাকথিত নিম্নবর্ণ, পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায় ও নিম্ন আর্থিক পটভূমির শিশুদের পাশে বসে একসাথে পড়াশোনার মাধ্যমে ছেলেটা সব মানুষকে সমান চোখে দেখার শিক্ষালাভ করে এবং তার মনে মানবপ্রেমের উন্মেষ ঘটে। অল্পবয়সেই ছেলেটা সততা এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শে দীক্ষিত হয়। ছেলেটাকে তার বাবা যে নীতিগত শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন, ছেলেটা তা জীবনেও ভোলে নি।
ছেলেটা যখন বাবার ইচ্ছা অনুসারে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা দেওয়ার পরিবর্তে গবেষক হতে চাইলো, ছেলেটার বাবা বলেছিলেন — "এমন একজন পণ্ডিত হও যে নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে শাসন করবে না" — "Be a scholar who would rule nobody but himself".
এতক্ষনে পাঠকেরা নিশ্চই বুঝে গেছেন যে ছেলেটা আর কেউ নয়, স্বয়ং আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না যে বহুমুখী প্রতিভাধারী এই মানুষটির বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অজস্র অবদানের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর পিতার। জগদীশ চন্দ্রর বৈজ্ঞানিক নীতিশাস্ত্র নিহিত ছিল তাঁর পিতার দেওয়া প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে।
তাঁর পেটেন্ট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত অন্যান্য বৈজ্ঞানিকদের তাঁর আবিষ্কারগুলি নির্দিদ্ধায় ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে গবেষণা করার উন্মুক্ত সুযোগ করে দেয় যা বিজ্ঞানের অগ্রগতির সহায়ক। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ওয়্যারলেস কম্যুনিকেশনের উপর করা তাঁর কাজ ও আবিষ্কার, যার পেটেণ্ট না নেওয়া রেডিও এবং মাইক্রোওয়েভ যোগাযোগের মতো প্রযুক্তির বিকাশের ভিত্তি হয়ে ওঠে। কোনোরকম পেটেণ্ট না নিলেও, তিনিই আসলে রেডিও সায়েন্সের জনক।
এবং তাঁর জনক, অর্থাৎ পিতার নাম, শ্রী ভগবান চন্দ্র বসু।
ফিউচার ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে লেখক এখন কগনিজেন্টের একজন সিনিয়র টেস্ট লিড। প্রযুক্তিবিদ্যায় দূরদর্শীতা রাখেন, বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। এআই-চালিত উন্নয়ন এবং স্ট্রাটেজিক প্রব্লেম সলভিং-এ বিশাল আগ্রহ। একজন ভ্রমণপ্রেমী, ভালোবাসেন ফুটবল, পছন্দ করেন এক্সপ্লোর করতে — সে প্রযুক্তি হোক বা জীবন। সৃজনশীলতার সাথে প্রযুক্তিকে মিশিয়ে অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ ব্লগ লেখা তাঁর প্যাশন।