মুর্শিদাবাদি সিল্কের শাড়ি খুব প্রিমিয়াম কোয়ালিটির সুক্ষ, হালকা তুঁত সিল্ক ব্যবহার করে বোনা হয়। তুঁত সিল্ক হল সর্বোচ্চ মানের প্রোটিন সমৃদ্ধ সিল্ক। বোমবিক্স মোরি নামের যে মনোফেগাস মথের কোকুন থেকে এই সিল্ক তৈরী হয়, তারা শুধুমাত্র মালবেরি বা তুঁত উদ্ভিদের পাতা খায়, তাই এই নামকরণ। ৫০০০ বছর আগে চীন প্রথম এই সিল্ক উৎপাদন করার পদ্ধতি আবিষ্কার করে, তারপর সেই পদ্ধতি চৈনিক পর্যটকদের হাতধরে ছড়িয়ে পরে ভারত, নেপাল, জাপান, কোরিয়াতে। সিন্ধু সভ্যতায় ২৪৫০-২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও সিল্ক ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
মুর্শিদাবাদে রেশমশিল্প আসে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মুঘলদের হাত ধরে। মুর্শিদাবাদের মাটি তুঁতগাছ চাষের জন্য উপযুক্ত ছিল। আর ভাগীরথী নদীর তীরের অবস্থান ছিল বাণিজ্যের অনুকূল। মুঘল আমলে বাংলার রাজধানীও ছিল মুর্শিদাবাদ। ফলে বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং রেশম উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠতে মুর্শিদাবাদের সময় লাগে নি। এর জোরে বাংলা অনেক শতাব্দী ধরে ভারতের প্রধান রেশম-বয়ন কেন্দ্রও ছিল।
১৬৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুর্শিদাবাদের কাশিম বাজারে একটি রেশমকুঠি তৈরী করে। এরপর ডাচ, পর্তুগিজ এবং ফরাসি ব্যবসায়ীরাও সেই পদক্ষেপ অনুসরণ করে। একের পর এক রেশমকুঠি তৈরী হয় মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং রাজশাহীতে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই - ইউরোপে বেঙ্গল সিল্ক রপ্তানি। স্থান এবং কারিগরির পার্থক্যের কারণে বেঙ্গল সিল্ক পরে মুর্শিদাবাদ সিল্ক, রাজশাহী সিল্ক এবং মালদা সিল্ক নামের পৃথক পরিচিতি লাভ করে।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাবের হারের পরে রেশম তাঁতিদের ডাচ এবং ফরাসি কোম্পানির পরিবর্তে শুধুমাত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া কোম্পানির নামমাত্র বেতন দেওয়া, ইচ্ছামতো জরিমানা, কারাদণ্ড, বেত্রাঘাত এবং অন্যান্য অত্যাচারের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। ভারতীয় মাত্রেই ব্রিটিশদের ১৯০ বছরের সেই শোষণের ইতিহাস জানেন।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (দ্য গ্রেট বেঙ্গল ফ্যামিন অফ ১৭৭০) বাংলার রেশমশিল্পর অপূরণীয় ক্ষতি করে দিয়ে যায়। তার সাথে কোম্পানি বাংলার রেশম ব্যবসা নিজেদের একচেটিয়া করার জন্য যে অমানবিক নির্যাতন শুরু করে, তা সহ্য করতে না পেরে অনেক তাঁতিই তাঁদের ভিটে এবং পেশা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়েও অনেক তাঁতি তাঁদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পেশা ত্যাগ করেন নি। দক্ষিণ-কেনসিংটন জাদুঘরের ভারতীয় বিভাগের আর্ট রেফারি জর্জ সি. এম. বার্ডউড ১৮০০ সালে তাঁর 'দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টস অফ ইন্ডিয়া' বইতে লিখেছিলেন যে মুর্শিদাবাদ শহর তখনও 'সোনা'র কিংখাব বানানোর জন্য বিশ্ববিখ্যাত ছিল।
বাংলার নবাবরা উন্নতমানের রেশম শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। সমাজে রেশম তাঁতিদের বিশেষ স্থান ছিল শিল্পীদের মতো। কিন্তু ব্রিটিশদের উপনিবেশের আয়তনেই সাথে সাথে যখন তাদের অত্যাচারের পরিমানও বৃদ্ধি পেতে থাকলো, হ্রাস পেলো দেশে রেশমের চাহিদা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন রেশম তাঁতিদের অপেক্ষাকৃত সস্তার কাপড় তৈরির তুলো চাষ করার জন্য চাপ দেওয়া শুরু করলো। পাশাপাশি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রকোপ মুর্শিদাবাদের রেশমশিল্পকে প্রায় ধ্বংস করতে বসলো।
এর মধ্যে পুরো দমে শুরু হয়ে গেলো অসহযোগ আন্দোলন। মহাত্মা গান্ধী তখন ভারতের গ্রামীণ শিল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। রেশম সেই সময় ছিল মুর্শিদাবাদের একমাত্র প্রধান আদিবাসী গ্রাম শিল্প। কিন্তু গান্ধীজি রেশম শিল্পকে খাদি আন্দোলনের আওতায় নিতে রাজি হলেন না, কারণ ছিল দুটি —
১) রেশমকীট হত্যা করে সিল্ক তৈরী করা হয়, যা গান্ধীজির অহিংসা নীতির বিরুদ্ধে।
২) রেশমবস্ত্র কেবলমাত্র ধনীরা কিনতে পারে, এর মূল্য জনসাধারণের সামর্থ্যের বাইরে।
সেই সময় সর্বভারতীয় স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সচিব শঙ্করলাল ঘেলাভাই ব্যাঙ্কার, আচার্য জে. বি. কৃপালিনী, অভয় আশ্রমের অনিল চন্দ্র মুখার্জি, সোদপুর আশ্রমের সতীশ চন্দ্র দাশগুপ্ত ও তাঁর স্ত্রী হেমপ্রভা দাশগুপ্ত এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মিলিত অনুরোধে গান্ধীজি একটি অনুসন্ধাকারী দলকে তদন্ত করতে পাঠান। সেই তদন্তের রিপোর্ট পড়ে গান্ধীজি বুঝতে পারেন —
১) কোকুনে জীবনচক্র সম্পন্ন করে বেরোনোর কয়েকদিনের মধ্যেই রেশম মথ স্বাভাবিক মৃত্যুলাভ করে, তাই সুতো বের করার সময় তার মৃত্যু ন্যূনতম সহিংসতা।
২) বিপুল সংখ্যক তুঁতচাষী, রেশমপোকা পালনকারী, সুতো বের করার কারিগর, তাঁতি ইত্যাদি গরীব মানুষের ভাগ্য রেশমশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এরপর তিনি রেশম শিল্পকে খাদির মর্যাদা দিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রায় ধ্বংস হতে যাওয়া রেশম শিল্প স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্যোগে আরও একবার ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু পরবর্তীকালে সিন্থেটিক কাপড় এবং পাওয়ার লুমের প্রতিযোগিতা রেশমশিল্পীদের জন্য ক্রমশ বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
গত কয়েক দশকে বিপুল সংখ্যক চাষী এবং তাঁতি মুর্শিদাবাদি রেশমশিল্প ছেড়ে চলে গেছেন। ২০১৯-এ প্রকাশিত একটি রিসার্চ পেপার অনুযায়ী শুধু ২০০২ থেকে ২০১২-র মধ্যেই ২৩ হাজারেরও বেশি রেশম চাষী এবং ১০ হাজারের বেশি রেশম তাঁতি এই পেশা ত্যাগ করেছিলেন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ মুর্শিদাবাদী রেশমশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁতিদের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন এনজিও এবং ফ্যাশন ডিজাইনারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মুর্শিদাবাদী সিল্ক সমসাময়িক ফ্যাশনে স্থান পেয়েছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হচ্ছে।
পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে রেশম শিল্পের প্রচার, গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য ১৯৪৩ সালের গোড়ার দিকে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় সেন্ট্রাল সেরিকালচারাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ভারত সরকারের বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কেন্দ্রীয় রেশম বোর্ডের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন। এখানে রেশমশিল্পে গবেষণার পাশাপাশি স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা ও অন্যান্য নানা প্রশিক্ষণমূলক কোর্স করানো হয়। সংস্থার পক্ষ থেকে সম্প্রতি 'ল্যাব টু ল্যান্ড' নামে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে গবেষণার ফলাফল ছড়িয়ে দেওয়া হবে, যাতে তাঁরা রেশমশিল্পে সফল উদ্যোগ নিতে পারেন।
মুর্শিদাবাদী সিল্কের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় বেশ ছোটবেলায়। আমার মামাবাড়ি ছিল বহরমপুরে। প্রতি বছর গরমের ছুটির সময় সপ্তাহখানেকের জন্য যাওয়া হতো মামাবাড়ি। মা প্রতি বছরই মামীর কাছ থেকে বেশ কিছু সিল্কের শাড়ী উপহার পেতেন। আমি ছিলাম মায়ের ন্যাওটা, সব সময়ই মায়ের কোল ঘেঁষে। তাই আজ আমার পরিচিত মহলে আমিই বোধহয় একমাত্র পুরুষ যে গরদ, বালুচরি, জামদানি, কোরিয়াল, মসলিন এইসব শব্দগুলোর সাথে সুপরিচিত। গত কয়েক বছরে এই সবকটি শাড়ীই জি আই ট্যাগ পেয়েছে। কিন্তু তাতে মুর্শিদাবাদি সিল্ক কি তার ঐতিহাসিক গৌরব ফিরে পাবে?
সময়ই এর উত্তর দেবে।