আমার এক আত্মীয়া সম্প্রতি জনৈক ইনফ্লুয়েন্সারের স্কিন কেয়ার রুটিন ভিডিও দ্বারা ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে একটি নামি কোম্পানির কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট কিনেছেন। ২৯৯৯ টাকায় ৩০ স্কুপস কোলাজেন পাউডার, প্রতিদিন ১টি করে স্কুপ খেতে হবে। ওই ইনফ্লুয়েন্সারের মতে ৩০ এর পর থেকে আমাদের শরীরের কোলাজেন নষ্ট হতে শুরু করে, আর তার জন্য চামড়ায় যে বয়েসের ছাপ পড়ে, সেই ছাপ দূর করে বয়েসকে উল্টোপথে হাঁটতে বাধ্য করার অব্যর্থ উপায় ওই বিশেষ কোলাজেন পাউডারটি।
হ্যাঁ, এটা সত্যি যে কমবেশি ২৫ বছর বয়স থেকে আমাদের শরীরের কোলাজেন হ্রাস পেতে শুরু করে। ৩০ থেকে ৪০ এর মধ্যে এই হ্রাস দ্রুততর হয়। বয়েস বাড়ার সাথে সাথে শরীরে নতুন কোলাজেন উৎপাদনও কমে যায়। এর ফলে ত্বকে বলিরেখা পড়ে, ত্বক ঝুলে যায়, ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা হ্রাস পায়, এক কথায় — চেহারায় বয়েসের ছাপ পড়ে। কিন্তু কোলাজেনের ওরাল সাপ্লিমেন্ট, যেমন কোলাজেন পাউডার, ক্যাপসুল, বা গামিজ কি তা রুখতে পারে? যদিও কোম্পানিগুলি সেরকমই দাবি করে, কিন্তু তার কোনো সন্দেহাতীত প্রমাণ বা গবেষণা কিছুই এখনো নেই।
বিজ্ঞাপন দেখে অনেকেরই ভুল ধারণা হয় যে আমরা যদি কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট খাই, সেই কোলাজেন আমাদের ত্বকে গিয়ে জমা হবে, এবং ত্বকে তারুণ্যের জৌলুশ ফিরে আসবে। কিন্তু আদতে আমরা কোনো সাপ্লিমেন্ট খেলে সেটা অন্য যেকোনো খাবারের মতোই আমাদের পাকস্থলীতে গিয়ে জমা হবে। এবং অন্যান্য প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের মতোই কোলাজেন, যেটা আদতে একটি প্রোটিন, পাকস্থলীতে গিয়ে অ্যামিনো অ্যাসিডে ভেঙে যাবে।
পাকস্থলীতে অন্যান্য প্রোটিন জাতীয় খাদ্য ভেঙে তৈরী অ্যামিনো অ্যাসিডের সঙ্গে কোলাজেন ভেঙে তৈরী অ্যামিনো অ্যাসিডগুলি মিশে যাবে। এবং এই সমস্ত অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে শরীর তার দরকার মতো প্রয়োজনীয় প্রোটিনগুলি তৈরী করবে, এবং সেটা ত্বকের জন্য কোলাজেন তৈরী নাও হতে পারে। কারণ আমি হয়তো আমার ১৬ বছরের ত্বক ফিরে পেতে চাইছি, কিন্তু আমার শরীর তাই নিয়ে একটুও চিন্তিত নয়, সে চাইছে আমার হাড়গুলো শক্ত করতে, পেশিগুলো কার্যকরী রাখতে।
সাপ্লিমেন্ট ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানি এখন কোলাজেন ক্রিমও বিক্রি করে। বিজ্ঞাপনে 3D অ্যানিমেশনের সাহায্যে আপনাকে দেখিয়ে দেওয়া হবে কিভাবে কোলাজেনের অণুগুলি ত্বকের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ত্বককে মসৃন তুলতুলে করে তুলবে। কিন্তু আদতে কোলাজেনের অণু ত্বকের ছিদ্রর থেকে আকারে অনেক বড়। তাই আপনার ক্রিমে সত্যি সত্যি কোলাজেন থাকলেও তা ত্বকে শোষিত হওয়া সম্ভব নয়।
তবে কি স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সুন্দর ত্বক পাওয়ার স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যাবে?
কখনোই না। কিন্তু প্রতিদিন এক স্কুপ কোলাজেন পাউডার তার উপায় নয়।
প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার ... ভিটামিন C ... জিঙ্ক এবং তামার মতো খনিজ পদার্থ ...
— এইগুলি একসাথে পেলে শরীর প্রাকৃতিকভাবেই কোলাজেন তৈরি করে। তাই কোলাজেন সাপ্লিমেন্টের পেছনে টাকা নষ্ট না করে, সেই টাকা বরং অর্গানিক, পুষ্টিগুনে সমৃদ্ধ খাবারে ইনভেস্ট করুন।
সুন্দর ত্বকের জন্য নিয়মিত টাটকা ফল ও সবজি খান, পর্যাপ্ত পরিমান প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খান, চিনি খাওয়া একেবারে কমিয়ে দিন, প্রচুর জল খান, কড়া রোদে বেরোনো বন্ধ করুন, সাধ্যমতো শরীর চর্চা করুন, পর্যাপ্ত পরিমান ঘুমোন, মদ্যপান কম করুন, ধূমপান বন্ধ করুন, এবং আনন্দে থাকুন — কারণ মানসিক চাপ থেকে বিভিন্ন ত্বকের সমস্যা যেমন শুষ্ক ত্বক, ব্রণ, ফুসকুড়ি, আমবাত ইত্যাদি হতে পারে, এবং ত্বকের বিভিন্ন রোগ যেমন সোরিয়াসিস, একজিমা ইত্যাদি বেড়ে যেতে পারে।
এরপরেও যদি কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট খেতে চান, তাহলে কোনো নামি ব্রান্ডের কোলাজেন কিনুন। কোলাজেন একটি আমিষ প্রোটিন — মূলত গরু, শূকর, মুরগি ইত্যাদির হাড়, তরুণাস্থি, ত্বক, এবং মাছ, চিংড়ি ইত্যাদির ত্বক, আঁশ ইত্যাদি থেকে কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট তৈরী হয়। যেহেতু অনেকেরই সামুদ্রিক মাছে অ্যালার্জি থাকে, তাই কোন কোলাজেন সাপ্লিমেন্টটি কোন প্রাণী থেকে তৈরী হয়েছে, সেটা কেনার আগে লেবেল পড়ে অতি অবশ্যই জেনে নিন।
ভারতে যেহেতু বহু মানুষ নিরামিষাশী, তাই অনেক কোম্পানি নিরামিষ কোলাজেন সাপ্লিমেন্টও বিক্রি করে থাকে। কিন্তু ইনগ্রেডিয়েন্টস পড়লে দেখা যাবে যে প্লান্ট-বেসড এই সাপ্লিমেন্টগুলি শরীরে কোলাজেন উৎপাদন বৃদ্ধি করবে এরকম দাবি করলেও, নিরামিষ কোলাজেন সাপ্লিমেন্টে কোনোরকম কোলাজেন থাকে না, কারণ কোলাজেন প্রাণীর টিস্যুতে পাওয়া একটি প্রোটিন, এটি নিরামিষভাবে পাওয়া অন্তত এখনো সম্ভব হয়নি।
ওরাল সাপ্লিমেন্ট সেরকম কার্যকরী না হলেও, কোলাজেন ইনজেকশন কিন্তু সৌন্দর্যচর্চার ক্ষেত্রে কার্যকরী হতে পারে। এক্ষেত্রে ইনজেকশনের মাধ্যমে কোলাজেন সরাসরি ত্বকে প্রবেশ করিয়ে ত্বকের বলিরেখা দূর করতে এবং ত্বক মসৃণ করতে সাহায্য করা হয়, অনেকটা বটুলিনাম টক্সিন, যাকে আমরা বোটক্স নামে চিনি, সেই ইঞ্জেকশনের মতো।
এই কোলাজেন গরু, শূকর, অথবা মানুষের কোষ থেকে আসতে পারে। কোলাজেন ইনজেকশন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাপদ, তবে ইনজেকশনের স্থানে লালভাব, ফোলাভাব এবং ক্ষতের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। আরও গুরুতর (যদিও বিরল) পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলির মধ্যে রয়েছে অ্যালার্জি, ইনফেকশন, এবং দাগ। খুব বিরল ক্ষেত্রে, বিশেষ করে চোখের কাছে ইনজেকশন দিলে, অন্ধত্ব ঘটতে পারে।
কোলাজেন ইনজেকশন নেওয়ার আগে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করা আবশ্যকীয়। একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ আপনার ত্বকের অবস্থার সঠিক মূল্যায়ন করে সুরক্ষিত ও কার্যকরীভাবে সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতিটি বেছে নিতে আপনাকে সাহায্য করবেন। কোনোভাবেই একজন অভিজ্ঞ ডার্মাটোলজিস্টের তত্ত্বাবধান ছাড়া এইধরণের ইনজেকশন নেবেন না।