শীতের রাত বড়ই দীর্ঘ। সেটা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে পবন। সঙ্গী বলতে ঘুটঘুটে অন্ধকার আর হাড়মাস এক করে দেওয়া ঠান্ডা। উপরি পাওনা হিসেবে একরাশ মশা। তবুও রাত দুটো–আড়াইটা পর্যন্ত বেশ কাটছিল ইউটিউবে গান শুনে, কিন্তু তারপর যেই ফোনের চার্জ ফুরোলো, অমনি সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং! এখন প্রায় রাত সাড়ে তিনটে, কারেন্ট আসার নাম নেই। অবশ্য তাতে মনে হয় ও বাদে কারোর অসুবিধা নেই, কেননা সকলেই এখন গরম বিছানায় ঘুমিয়ে। এর মধ্যে কারেন্টের কী কাজ? কিন্তু পবন!
আসলে পবন একটা এজেন্সির হয়ে পাহারাদারের কাজ করে। দোকান, অফিস, শপিং মল — এসব জায়গায় পাহারা দেয়। বছর ছয়েক পবন এই কাজে যুক্ত। কিন্তু যখন যা করেছে, সব দিনের আলোয়। এই প্রথম রাতে কাজ পড়ল, আর গত দুই বছরে এই প্রথম ও সীমাকে ছেড়ে রাতে একা।
সীমার কথা মনে পড়তেই নড়েচড়ে বসল পবন। কিন্তু নড়বে কোথায়? নামী সোনার দোকানের সামনে অস্থায়ী পাহারাদারের ঘরে একটা চেয়ার রেখে নড়াচড়ার জায়গা নেই। তার ওপর আপাদমস্তক কম্বল মুড়ি দিয়ে হাত দুটো অবধি নাড়াতে পারছে না। মনে মনে মালিককে কড়া কথা শোনালো। এই শীতে চোরের কী খেয়েদেয়ে কাজ নেই যে চুরি করতে বেরোবে? কেন যে ওকেই বেছে নিল, কে জানে! কোথায় সীমার হাতের গরম খাবার খেয়ে আরাম করে ঘুমোবে, তা না! অবশ্য সীমাই বা একা কী করছে?
পবনের বাড়ির লোক দেখেশুনে সীমাকে ওর বৌ করে আনে। বেশ মেয়ে। তবে চাহিদা বড্ড বেশি। আজ এটা চাই, কাল ওটা চাই। নতুন শাড়ি, নতুন গয়না। মাঝে মাঝে ঘুরতে যাওয়ার বায়না, হোটেল–রেস্টুরেন্টে খাওয়া তো আছেই। ওর কোনো বন্ধু কিছু কিনেছে শুনলে আর রক্ষে নেই। যতক্ষণ না ওটা পাচ্ছে, ততক্ষণ খাওয়া–দাওয়া, এমনকি জল পর্যন্ত ছোঁবে না। পবন আর কী করে! সুন্দরী বৌয়ের চোখের জল কাহাতক সহ্য করা যায়। তাই প্রাণপণে খাটে বেচারা। নিজের শখ–আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে শুধু বৌয়ের ভালো থাকার চিন্তা।
তাই আজ যখন মালিক রাতের কাজের কথা বলল, ও চলে এসেছে। কিছু পয়সা বাড়তি দেবে। সীমা কয়েক দিন একটা স্মার্ট ঘড়ির জন্য বায়না করছে। টাকাটা পেলে কিনে আনবে। বড্ড ভালোবাসে বৌকে পবন।
তবে যতই যাই হোক, পবন বড্ড বৌ-পাগল। ওর বন্ধুরা, বাড়ির লোক, পাড়া–প্রতিবেশী সকলেই ওকে এই বিষয়ে খ্যাপায়। ও কিছু বলে না, কেবল হাসে। সীমাকে পেয়ে ও যে কত খুশি, তার কাছে এগুলো কিচ্ছুটি না।
কিন্তু কয়েক দিন ধরে কাঞ্চনটা বড্ড জ্বালাচ্ছে। সমানে বৌদি, বৌদি করে সীমার আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। দেখলেই অসহ্য লাগে পবনের। কাঞ্চন ওর পাড়ার ছেলে। কাজ নেই, কম্ম নেই, খালি চায়ের দোকানে আড্ডা আর মেয়েদের দেখলেই বাজে ইয়ার্কি।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা পবন আর সীমা বাজারের দিকে যাচ্ছিল ফুচকা খেতে। ব্যস, যেই সীমাকে দেখেছে, অমনি সামনে এসে দাঁত বের করে হেসে বলে উঠল, "কি বৌদি, কেমন আছো? সব ঠিকঠাক তো?" ওর চোখের চাহনি ভালো লাগেনি পবনের। তাড়াতাড়ি চলে গিয়েছিল।
তারপর থেকে ওদের দেখলেই এগিয়ে এসে আজেবাজে কথা বলে। কেমন করে তাকায় সীমার দিকে। সীমাকে আড়াল করে পবন। কিন্তু সেদিন সহ্যের বাইরে চলে গেল ঘটনাটা। বিকেলে এক গাদা আলুর চপ নিয়ে হাজির হয়ে বলল, "বৌদি, তোমার জন্য গরম গরম নিয়ে এলাম।"
সীমাও পবনকে অবাক করে কাঞ্চনের জন্য চা নিয়ে এলো। সেই থেকে কাঞ্চনের যাতায়াত শুরু হয়েছে বাড়িতে। কত কী নিয়ে আসে সীমার জন্য। সীমাও গলে জল। পবনকে বলে, "কাঞ্চনদা বেশ মানুষ। আমার জন্য কত ভাবে।"
কথাটা বুকে লেগেছিল পবনের। কিন্তু তারপর সীমা যখন পবনের জন্য লুচি ভেজে আনল, পবন স্বস্তি পেল। যাক, সীমা শুধু ওর, ওরই।
নাহ্, অনেক সময় ধরে ঠায় বসে আছে। একটু দাঁড়াতে পারলে ভালো হতো। কম্বল সরিয়ে উঠে দাঁড়াল পবন। সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বলে উঠল। আড়মোড়া ভেঙে ফোনটা চার্জে বসাতে, কাছাকাছি পাখি ডেকে উঠল — দিনের প্রথম পাখি।
মোবাইলে সময় দেখল পবন, ভোর সাড়ে চারটে। দরজা খুলে বেরোতেই আমূল কেঁপে উঠল পবন। মারাত্মক ঠান্ডা। চারদিকে কুয়াশা আর কুয়াশা। পথবাতির ঝিমোনো আলোয় সব কেমন ভূতুড়ে। রাস্তার একদিকে পরপর সব বন্ধ দোকান। উল্টো দিকে একটা বড়ো পার্ক আছে। তার ওপাশে ঘন বসতি। এই রাস্তাকে কানাগলি বলা চলে। রাস্তার একদিকে সিমেন্ট কারখানার উঁচু পাঁচিল। অপরদিকে বড়ো রাস্তা। ওখানে একটা চায়ের দোকান রাত তিনটেয় খোলে। দূর থেকে ওই দোকানটার আলো দেখতে পাচ্ছে পবন।
সারা রাত ঘুম হয়নি। চোখ দুটো জ্বলছে। এখন একটু চা হলে ভালো হবে। পবন দোকানের দিকে এগোল। ওখান থেকে এই দিকেও নজর রাখা যাবে। আর কিছু না ভেবে এগোল পবন। আবার মাথায় এলো সীমা। না জানি সারা রাত একা একা কী করে কাটিয়েছে? এই তো ছ’টায় ওর ডিউটি শেষ। ফেরার পথে গরম জিলিপি নিয়ে যাবে সীমার জন্য।
চলতে চলতে হঠাৎ পার্কের দিকে চোখ পড়ল পবনের। ওপাশে যে বসতি আছে, সেখানে কাঞ্চনের দিদির বাড়ি। বহু বছর আগে দিদির বিয়ের সময় এসেছিল। কিন্তু এই সময়ে পার্কের ওই গেটটা দিয়ে যে দু’জন বেরিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছে, শাল দিয়ে মুখ–মাথা পেঁচানো থাকলেও অবয়ব দুটো ভীষণ চেনা পবনের।
গরম স্রোত বয়ে গেল পবনের শরীরে। ছিঃ, সীমা! ছিঃ! এক রাত বাড়ির বাইরে বলে সীমা গোটা রাত কাটাল ওই কাঞ্চনের সঙ্গে? শুনেছে ওর দিদি এখন বাইরে থাকে, তাই বাড়ি ফাঁকাই থাকে। শেষে ওখানেই গিয়ে উঠল সীমা? এখন ফিরে যাচ্ছে বাড়ি। এরপর পবন পৌঁছলে এমন ভাব দেখাবে, যেন সারা রাত বাড়িতেই ছিল।
কিন্তু না, পবন ভুলবে না। কিছুতেই না। ভাগ্যিস পবন বলেনি কোথায় ওর ডিউটি পড়েছে! না হলে এত বড় সত্যি সারা জীবন ঢাকা পড়ে থাকত। না, না — কিছুতেই না। আজই সব শেষ করে দেবে সীমার সঙ্গে। এতখানি বিশ্বাসঘাতক সীমা! পবনের চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে।
ওদিকে সীমা তখন সবে ঘুম থেকে উঠে আনন্দে আত্মহারা। খালি ঘড়ি দেখছে, কখন পবন আসবে। বুঝতে পারছে না কীভাবে সুখবরটা দেবে। এখন যে ওদের দুই থেকে তিন হবার সময় এসেছে। ওই তো, দরজার আওয়াজ। নিশ্চয়ই পবন ফিরল। সীমা প্রজাপতির মতো উড়ে ছুটল দরজা খুলতে।