Change Is the only constant in the world.
আমরা রাতে বসেছিলাম ঘরে। হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেল। বাবা নিজের জীবনের গল্প বলতে শুরু করলেন। বাবার বন্ধু ছিলেন বিশু কাকু। তার সঙ্গে অন্যান্য বন্ধুর কথা আমরা ভাইবোনেরা অবাক হয়ে শুনলাম।
বাবা বলতে শুরু করলেন, "আমরা চার বন্ধু ছিলাম। রমেন, জীবন, বিশু আর আমি। যেখানেই যেতাম, একসাথে থাকতাম। বিশু ছিল আমাদের দলের অলিখিত নেতা। নেতা তো এমনি এমনি হয় না। তার কাজ, দল চালানোর কৌশল তাকে নেতা বানিয়েছিল। একদিন দুপুরবেলায় সে আমাদের ডাক দিল তার বাঁশি বাজিয়ে। বাঁশির ডাক শুনেই মন চঞ্চল হয়ে উঠত। ঠিক যেন রাধার পোড়া বাঁশির ডাক। চুপি চুপি বাড়ি থেকে বেরিয়ে বটতলায়। আমাদের মিলন অফিস ছিল এই বটতলা। চারজন ছুটে চলে যেতাম মাঠে। সেখানে বিশু বলত, দাঁড়া কয়েকটা তাল কাঁকড়া ধরি। ভেজে খাওয়া যাবে।"
বলেই হাত ভরে দিল সোজা ধানের জমির গর্তে। "একটা মাগুর ধরেছি", বলেই মাথা টিপে হাত বের করতেই দেখা গেল মাছ নয়, একটা বড় কালো কেউটে সাপ। বিশু সাপটাকে সাঁ সাঁ করে ঘুরিয়ে সহজেই ছুঁড়ে দিল দূরে। তারপর তাল কাঁকড়া ধরে ভেজে খাওয়া হলো মাঠে। ভাজার সমস্ত সরঞ্জাম বিশু লুকিয়ে রাখত একটা পোড়ো বাড়িতে। সাঁতার কাটতে যেতাম নতুন পুকুরে। একবার ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলাম তার প্রখর বুদ্ধির জোরে। মাথার চুল ধরে টেনে তুলেছিল ডাঙায়।
গ্রীষ্ম অবকাশে বটগাছের ডালে পা ভাঁজ করে বাদুড়ঝোলা খেলতাম বিশুর নেতৃত্বে। তারপর ঝোল ঝাপটি। উঁচু ডাল থেকে লাফিয়ে পড়তাম খড়ের গাদায়। এসব খেলা বিশুর আবিষ্কার। তারপর সন্ধ্যা হলেই গ্রামের বদমাশ লোকটিকে ভয় দেখাত বিশু। সুদখোর সুরেশ মহাজন বটগাছের ডাল থেকে শুনল, "কি রে বেটা, খুব তো চলেছিস হনহনিয়ে। আয় তোকে গাছে ঝোলাই।" সুদখোর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে ও পথে যেত না মহাজন। সাদা চুলো গান্ধিবুড়িকে রোজ সন্ধ্যাবেলা নিজের মুড়ি খাইয়ে আসত অতি আদরে। বিশু বলত, "আমি তো রাতে খাব। বুড়ির কেউ নেই, আমি আছি তো।" শ্রদ্ধায় মাথা নত হত নেতার হাসিতে।
একবার বন্যার সময় স্কুল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল আমাদের নেতা। কোথাও সাঁতার জল, কোথাও বুক অবধি জল। একটা সাপ বিশুর হাতে জড়িয়ে ধরেছে। বিশু এক ঝটকায় ঝেড়ে ফেলে দিল সাপটা। "স্কুল আমাদের যেতেই হবে।" সাঁতার কাটতে কাটতে আমাদের সে কি উল্লাস। যে কোনো কঠিন কাজের সামনাসামনি বুক চিতিয়ে সমাধান করার মতো মানসিকতা বিশুর ছিল। সে সামনে, আর আমরা চলেছি তার পিছুপিছু। শেষ অবধি পৌঁছে গেলাম স্কুল। হেডমাস্টারমশাই খুব বাহবা দিলেন স্কুলে আসার জন্য। তিনি বললেন, "ইচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।"
টিফিনের সময় ছুটি হয়ে গেল। আসার সময় একটা নৌকো পাওয়া গেল। মাঝি বললেন, "আমার বয়স হয়েছে। আমি একা অতদূর নৌকা বাইতে পারব না বাবু। তাছাড়া আমার এখনও খাওয়া হয়নি।"
বিশু সঙ্গে সঙ্গে নিজের টিফিন বের করে দিল। আমরাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিফিন বের করে দিলাম। মাঝি ভাই বললেন, "এসো সবাই এক হয়ে খেয়ে নিই।" তারপর নৌকার কান্ডারি হলো বিশু। আর আমরা সবাই মুড়ি মাখিয়ে খেতে শুরু করলাম। মাঝি ভাই ও বিশু খেল। ধীরে ধীরে পৌঁছে গেলাম গ্রামে। মাঝি ভাইকে পারিশ্রমিক দিয়ে বিদায় জানালাম।
পরের দিন রবিবার। রঙিন সকাল। আকাশে মেঘের আনাগোনা। কাশের কারসাজি নদীর তীর জুড়ে। বন্যার জল নেমে গিয়েছে। পুজো পুজো ভাব। বিশু কাশফুলের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। কয়েকদিন হলো তাকে দেখা যাচ্ছে না।
আমি ঘুরতে ঘুরতে পুজো বাড়ির ঠাকুর দেখতে গেলাম। সেখানে দেখি বিশু হাতে কাদা মেখে শিল্পীকে সাহায্য করছে। তিন দিন ধরে এখানেই তার ডেরা। এখন তার মনে বাজছে ঢাকের ঢ্যামকুড়াকুড়। মনমন্দিরে তার দুর্গা গ্রামদেশ ছাড়িয়ে অভাবি বাতাসে বাতাসে। পুজো বাড়িতে আমাকে দেখেও কোনো কথা না বলে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে চলে গেল।
আমি জানি সে এখন চাল, ডাল নিয়ে সর্দার বুড়িকে রেঁধে খাওয়াবে। সে বলে, "ওর যে কেউ নেই। ও খাবে কি?"
বিশুর বাবা বছরে একবার বাড়ি আসেন। তিনি ভারতীয় সৈন্য বিভাগে কাজ করেন। বাড়িতে এলেই বিশুর হাতে হাতখরচ বাবদ তিনি বেশ কিছু টাকা দিয়ে যান। সেই টাকা বিশু লোকের উপকারে কাজে লাগায়।
বড়ো অবাক হয়ে ভাবি, ছোট বয়সে এত বড় মন সে পেল কোথা থেকে।
বাবা গল্প শেষ করে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
লেখক কাটোয়া শহরের বাসিন্দা — কবিতা,গল্প, উপন্যাস লিখতে ভালোবাসেন। ছোটবেলায় স্কুলে পড়তে গল্প দিয়ে লেখা শুরু — বর্তমানে আরও আনন্দ, সানন্দা ব্লগ কবি সম্মেলন, কবিতাপাক্ষিক, আরম্ভ, ধুলামন্দির, অক্ষর ওয়েব, দৈনিক বজ্রকন্ঠ, দৈনিক সংবাদ, তথ্যকেন্দ্র, যুগশঙ্খ, আবহমান, অপরজন, কৃত্তিবাসী ওয়েব, ম্যাজিক ল্যাম্প, জয়ঢাক, অংশুমালী, প্রভাতফেরী, দৈনিক গতি প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে অন্তরে আলো জ্বলে, শিশিরের ছৌ (কবিতা সংকলন), তিন-এ নেত্র সহ আরও অনেকগুলি বই প্রকাশিত হয়েছে।