About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
চিঠি যার ঠিকানা পেল না
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

গত কয়েক বছরে ঋষভের আচরণ বদলে গেছে — নীরার শরীরের প্রতিটি কোষ তা অনুভব করছিল। তবু সে কিছু চাপিয়ে দেয়নি; কারণ সম্পর্ক মানে নীরবে জড়িয়ে থাকা, আবার প্রয়োজনে নীরবে ছেড়ে দেওয়া।
চিঠি যার ঠিকানা পেল না


এয়ারপোর্টের কাঁচের দরজাটা ঠেলে বেরোতেই নীরার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। বারো বছরের সম্পর্ক — যার উপর ভর করে ন’টা বছর সংসারও টিকে ছিল — হঠাৎই আজ যেন অনিশ্চয়তায় দুলে উঠছে। কোনো ঝগড়া নেই, তর্কও নেই… তবু মনে হচ্ছে যেন তাঁদের সমস্ত কথাগুলো কোনো এক অদৃশ্যের কোলে তলিয়ে যাচ্ছে। দিন যায়, নীরার মনে হয় — সময়ের হাওয়ায় পাতা ঝরে পড়ছে, একটা-দুটো, তারপর আরও… আরও অনেক। সম্পর্কের গাছটা ধীরে ধীরে পৌঁছে যাচ্ছে নীরব মৃত্যুর সামনে। ভালোবাসা কি সত্যিই এভাবে মরে যায়? নাকি মরে যাওয়ার শব্দটাই এত গভীর, এত কালো! যার কোনো ধ্বনি নেই, প্রতিধ্বনি নেই, কেবল আছে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নীরবতা….

ফ্লাইটের চারদিকের শব্দের মধ্যেও নীরার কানে শুধু এক অন্তহীন নীরবতা — যা ভালোবাসার পরিত্যক্ত ঘরে জমে থাকা ধুলোর নিঃশ্বাসের মতো। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভেসে এলো যান্ত্রিক, নির্লিপ্ত এক ঘোষণার গলা — "Ladies and gentlemen, the flight from Bengaluru has arrived and landed safely in Kolkata. Please fasten your seatbelts until the aircraft comes to a complete stop. The outside temperature is ...." ঘোষণার প্রতিটি শব্দ যেন নীরার কানে থমকে থমকে আঘাত করছিল। এই শহর, এই শীতল ফেব্রুয়ারির শেষ — সব যেন আজ অচেনা ঠেকছে। বিমানের দরজা খুলতেই চারদিক ব্যস্ত হয়ে উঠল। অনেকেই নিজের মানুষদের খুঁজে পেল — কেউ দূর থেকে হাত নেড়ে ডাকছে, কেউ ফোনে মুখ ভরে বলছে, "হ্যাঁ, পৌঁছে গেছি।" কারও হাসি, কারও তাড়াহুড়ো, কারও আলিঙ্গন। কিন্তু নীরা? সে দাঁড়িয়ে আছে শুধু নিজের সঙ্গেই। ফোনে কেউ অপেক্ষা করছে না, বাইরে কেউ ফুল নিয়ে হাত নাড়ছে না, এমনকি "ঠিকমতো নেমেছ?" — এমন একটি মেসেজ অবধিও কেউ করছে না। লাগেজ বেল্ট থেকে স্যুটকেসটা তুলতেই নীরার মনে হলো — ওজন যেন শুধু পোশাকের নয়, বরং বহু বছরের জমাট বাঁধা স্মৃতির, অকথা কথার, আর অল্প অল্প করে হারিয়ে যাওয়া উষ্ণতার। ট্যাক্সিতে উঠে দেশের বাড়ির পথে রওনা দিতেই তার বুকের ভেতরটা অজান্তে কেঁপে উঠল। সেই বাড়িটা… যেখানে পৌঁছেই একসময় সে আশ্রয় পেত, মায়ের গায়ের গন্ধে মিশে থাকা নিরাপত্তা, এক কাপ চায়ের উষ্ণতা, আর চেনা কথার মায়া পেত — সেই বাড়িতেই আজ ঢুকতে হবে তাকে একাই। এবার দরজার কপাট খুলবে শুধু নীরার হাত, আর সঙ্গ দেবে চুপচাপ শূন্যতা।

পুরোনো ভৃত্যা বিন্দি পিসিও গ্রামে গেছে — নাতি অসুস্থ, তাই ক’দিন আসতে পারবে না। নীরা আটকায়নি; সে কাউকে কোনোদিন আটকায় না, কখনোই পারে না নীরা সেটা। যে মানুষরা হৃদয়ে জায়গা করে নেয়, সে তাদের আলতো করে যত্নে রাখে — যাতে তারা নিজের মতো একটু নিঃশ্বাস নিতে পারে। এই নরম বোঝাপড়ার অভ্যাস থেকেই সে কখনো ঋষভকেও কিছুতে বেঁধে রাখেনি। ভালোবাসা তো অধিকার নয় — ঐশ্বরিক, সূক্ষ্ম এক বাঁধন। আর সেই বাঁধনেই অনেকটা ফাটল ধরেছে। গত কয়েক বছরে ঋষভের আচরণ বদলে গেছে — নীরার শরীরের প্রতিটি কোষ তা অনুভব করছিল। তবু সে কিছু চাপিয়ে দেয়নি, সম্পর্কের অধিকারে; কারণ সম্পর্ক মানে তো কাউকে আটকে রাখা নয়; বরং নীরবে জড়িয়ে থাকা, আবার প্রয়োজনে নীরবে ছেড়ে দেওয়া। সম্পর্কটাকে খানিকটা পরখ করতেই সেদিন নীরা বলেছিল, "ক'দিন দেশে গিয়ে আসি…" একসময় এই কথায় ঋষভের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠত; সে হাসত, বলত, "এখন যাস না… আমার কাজের চাপ কমলে একসঙ্গে যাব।" তার কথা, তার হাসি, তার শোনার ভঙ্গি — সবকিছু এক অদৃশ্য কোমল আবরণে জড়িয়ে রাখত নীরাকে। কিন্তু এবার? উত্তর এল এক অন্যমনস্ক, ভাঙা সুরে — "হ্যাঁ… যাও।" না কোনো আগ্রহ, না কোনো প্রশ্ন, না কোনো "থেমে যা"। কেবল এক শুষ্ক, অচেনা স্বর — যেন সম্পর্কের ভিত থেকেই ধুলো গড়িয়ে পড়ছে। এই ছোট্ট শব্দটাই নীরার ভেতরের সবটুকু কাঁপিয়ে দিল। মনে হলো, যে সুতোয় বছরগুলো জোড়া ছিল তা নীরবে ছিঁড়ে যাচ্ছে; কেউ টানেনি — তবু ছিঁড়ে যাচ্ছে।

দেশের বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছাল নীরা। মায়ের হাঁটার শব্দ আর বাজছে না, বাসনের হালকা ঠুনঠুনানি আর শোনা যাচ্ছে না, শাড়ির পরিচিত সোঁ সোঁ শব্দ দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরছে না আর। গত পুজোর আগেই মা চলে গেছেন। তবু নীরার আজও মনে হয় — দরজায় পা রাখলেই একটা উষ্ণ আলিঙ্গন, একটা মিষ্টি ডাক — "নিরু এলি মা?" — হয়তো কানে ভেসে আসছে। এ সবই কল্পনার কোমল মরীচিকা — বাস্তব তাকে শোনাচ্ছে কেবল শূন্যতার প্রতিধ্বনি। বাবা তো কবেই চলে গেছেন! বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি কোণায় তার অনুপস্থিতির দাগ এতটাই গভীর যে নীরার শৈশব থেকে কৈশোর, যৌবন — এমনকি আজকের নীরাও সেই শূন্যতাকে বয়ে বেড়ায় এক গভীর, অথচ অদৃশ্য ক্ষতের মতো।


ঘুম ভাঙতেই নীরা বুঝল — আজ তার ভেতর কোথাও এক ছায়া জমে আছে। শরীরটা ক্লান্ত, মাথায় হালকা ধকধকানি; হয়তো গতরাতের না-খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া, তাছাড়া জেট ল্যাগও তো আছে। মা থাকলে এটা ঘটত না কখনোই। মায়ের কড়া চোখ, মমতার আলতো হাত, আর আদেশভরা যত্ন — সব আজ কেবল স্মৃতির ওপর ঝোলানো ধুলো-ঢাকা আলোর মতো। মানুষ কত কিছু শিখে যায়… পরিস্থিতি আবার কত দ্রুত সেই শেখাকে বদলে দিয়ে নতুন এক কঠিন পাঠ লিখে দেয় জীবনে। আজও নীরা বুঝে উঠতে পারছে না — সে ঠিক কী করবে, কেমন করে দিন শুরু করবে। এক কাপ চা বানিয়ে নিল। কাল কেনা বিস্কুটের প্যাকেটটা ব্যাগ থেকে বের করে দু-একটা নয় — বেশ কয়েকটা মুখে পুরল। বিন্দিপিসি যাওয়ার আগে সবকিছু গুছিয়ে দিয়ে গেছেন — গ্যাস পরীক্ষা করা, লাইট ঠিক আছে কিনা দেখা, জলের কল, রান্নাঘরের ছোটখাটো জিনিস — সব। তবু আজ নীরার রান্না করতে ইচ্ছে করছিল না, খেতেও মন চাইছিল না, এমনকি বাইরে গিয়ে কিছু আনতেও নয়। বিস্কুটের শুকনো কড়মড় শব্দ তার ভেতরের শূন্যতাকে যেন আরও শুষে নিচ্ছিল।

ধীরে ধীরে নীরা ঘর থেকে ঘরে ঢুকছিল। যে ঘরগুলো একসময় জীবনের শব্দে ভরা থাকত — আজ সেই ঘরগুলো অবহেলায় পড়ে আছে। তার নিজের থাকার ছোট্ট ঘরটা বাদ দিলে বাকি বেশিরভাগ ঘরেই ধুলো জমে ভারি হয়ে গেছে। বিন্দিপিসিও আর পারেন না — বয়স হয়েছে, হাঁটতেও কষ্ট হয়। মা বেঁচে থাকতেও ঘরগুলো বেশিরভাগ সময় এভাবেই বন্ধ থাকত, তবু ঘরের ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত নরম উষ্ণতা। আজ সেই উষ্ণতার বদলে শুধু আছে বহুদিনের অবহেলায় তৈরি জীর্ণ, জুলে যাওয়া ধুলোমাখা এক ধরনের সোঁদা গন্ধ। তবু নীরা খুঁজে বেড়াচ্ছে — চেনা কিছু, পরিচিত কিছু, যেন বাতাসেও মায়ের ছোঁয়া আছে কোথাও। বারান্দার ওপরে একফালি রোদ এসে লুটিয়ে আছে। কোথাও বনের পেছন থেকে বসন্তের প্রথম কোকিল ডেকেছিল যেন — এক মুহূর্তের জন্য হৃদয়টা হুহু করে উঠল, আবার আচমকা থেমে গেল সেই অনুভব। এইভাবে চলতে চলতে নীরা পৌঁছল মায়ের আলমারির সামনে। অলক্ষ্যে হাত বাড়িয়ে আলমারি খুলতেই একটা অচেনা শীতলতা বেরিয়ে এল — তারপর একেক করে বেরোতে লাগল মায়ের শাড়ি, সোয়েটার, গন্ধহীন পুরোনো চিরুনি। একটা সোয়েটারের গায়ে এখনো মায়ের দু’একটা চুল আটকে আছে। নীরা জানে না কেন এগুলো হাতে নিচ্ছে — কিন্তু তবুও নিচ্ছে, কারণ এ-ই তো মা — এমন কোনো স্পর্শ, এমন কোনো গন্ধ যা আর কখনো ফিরে আসবে না।

পুরোনো জিনিসগুলো নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে বারান্দায় রোদে দিতে চাইল নীরা। শাড়িগুলো রোদে মেলে ধরতেই হঠাৎ লক্ষ্য করল — আলমারির কোণে একটা কালো কোট। বাবার। নীরা থমকে গেল। বাবার প্রায় সব জিনিসই তো রাখা আছে দোতলার ঘরে — একটা স্মৃতির কোণে। তাহলে এই কোট? মা নিশ্চয়ই কোনো কারণে এটাকে আলাদা করে রেখেছিলেন, বুকের ভেতরে লুকিয়ে — হয়তো কোনো অচেনা স্মৃতি জড়িয়ে ছিল এতে। নীরা আস্তে করে কোটটা বের করল রোদে দিতে। ঝেড়ে নিতেই হঠাৎ কোটের পকেট থেকে ঝুপ করে পড়ে গেল একটা খাম। একটা কাগজের নরম, পুরোনো শব্দ। নীরা খামটা হাতে তুলতেই মনে হলো — যেন একটুখানি নিঃশ্বাস পড়লেই পুরোনো কাগজের দেহটা ধুলো হয়ে ভেঙে যাবে। প্রাপক-প্রেরকের নাম দীর্ঘ সময়ের খাদে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে গেছে। প্রান্তের মলিন হলুদে সময় তার দীর্ঘ ক্লান্তি রেখে গেছে প্রতিটি কোণায়।

নীরার চোখ দুটো এখন আর আগের মতো তীক্ষ্ণ নয় — দিনরাত ল্যাপটপ আর মোবাইলের স্ক্রিনের আলোয় ভিজে দৃষ্টি তারও ধোঁয়াটে হয়েছে; তবু সে আলতো করে খামটা উল্টেপাল্টে, আঙুলের ডগায় ধুলোর রেখা সরিয়ে ধীরে ধীরে বার করে আনল সেই বহু বছরের পুরোনো কাগজ। কালি ফ্যাকাসে, কাগজের বুকে সময়ের ক্ষতচিহ্ন। ২৫শে মার্চ ১৯৮৫ — তার জন্মেরও তিন বছর আগের একটি অতীতের নিঃশব্দ ছায়া।

"প্রিয় হেম,

এই কয়েকটা লাইন লিখতে বসে মনে হচ্ছে যেন হাতের ভেতরেই হৃদয়টা নুইয়ে পড়েছে; আজ যদি তোমাকে না জানাই, তবে তুমি আবারও সেই বুধবারের গোধূলিতে গিয়ে দাঁড়াবে আমাদের ভুশণ্ডীর মাঠে — যে মাঠে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে একটু নরম আলো মাখা শান্তি লুকিয়ে থাকে, আর আমরা বিশ্বাস করতাম সেখানে দাঁড়ালেই সব জট খুলে যায়।

হেম, আজ আমি সেখানে যেতে পারলাম না — অনেক চেষ্টা করেও পারলাম না; বাড়ির ভেতরের টানাপোড়েন, অদৃশ্য ভয় আর অব্যক্ত বাধার জালে আমি যেন থমকে গেছি। আজও ভেবেছিলাম তোমার সামনে গিয়ে বলব — "দেখো, আমি এসেছি" — কিন্তু দরজার দিকে পা বাড়াতেই হঠাৎ ভার হয়ে গেল সমস্ত শরীর, যেন এক অদৃশ্য হাত আমাকে আষ্টে-পিষ্ঠে চেপে ধরছে।

তুমি জানো, তোমার কপালের সেই ছোট কালো টিপটাকে আমি কতবার মনের লাল আবিরে রাঙিয়েছি — বৈশাখের আলোয় রাঙা প্রতিশ্রুতির মতো; সেই স্বপ্ন, আমাদের নীরব ভাষা, যার কথা কেউ বলেনি, তবু দু’জনেই বুঝেছিলাম। সামনেই বৈশাখ, বসন্ত টোকা দিয়ে বারবার মনে করাচ্ছে আমাকে। কিন্তু সে… আচ্ছন্ন কুয়াশার মতো দূরে সরে যাচ্ছে — আর আমি অসহায়ভাবে তা দেখছি, আমার বসন্ত, আমার বৈশাখ মুখ থুবড়ে পড়ছে হেম… আমি নীরব দর্শক মাত্র।

আমি এমন এক বন্ধনে আটকে আছি, যেখান থেকে বেরোনো আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব — দোষ আমাকে দিতেই পারো; তবু জানি, দেবে না। তোমার বিশ্বাসের নরম, অটল টান — আমাকে দোষ দিতে দেবে না, তাই আরও কষ্ট হচ্ছে।

এই চিঠি তোমার কাছে পৌঁছনোই জরুরি — কারণ আমার কাছ থেকে সরাসরি না জানলে তুমি হয়তো আগামী বুধবারও, বা পরেরটাও, আর হয়তো জীবনের শেষ গোধূলিটাতেও দাঁড়িয়ে থাকবে, আমাদের সেই মাঠে — এই ভেবে যে অবিন আসবেই, শুধু একটু দেরি করছে মাত্র। তোমার এই অপেক্ষা… আমি জানি, মৃত্যুর সীমানা পেরিয়েও যে হার মানতে শেখেনি।

হেম, আমি আজ আসতে পারছি না — আজ কেন বলছি! হয়তোবা কোনোদিনই… আমাদের সেই মাঠ আর হয়তো দেখবে না আমাদের কোনোদিনও। আর যদি কোনোদিন দৈবাৎ তোমার সামনে দাঁড়াইও, তখন হয়তো আমি অন্য কারোর হয়ে গেছি। ভাবতে পারি না এই কথা, তবু সত্যিটা বলা ছাড়া আর উপায় নেই।

তবু জেনে রেখো — তুমি থাকবে আমার ভেতর, যতদিন আমি বেঁচে থাকব। আর আমি না থাকলেও প্রেম তো নিভে যায় না; নিজের মতো চুপচাপ জ্বলতে থাকে। সেই আগুনটাকেও তো একটা ঘর দিতে হয়; আমার ভেতরে সেই ঘর চিরকালের জন্যে থাকবে।

আমাকে কখনো ক্ষমা কোরো না লক্ষীটি — ক্ষমা হয়তো ব্যথা আরও বাড়াবে, আমি আর পারব না। তোমার যে ঘরটা আমার ভেতরে আছে — সেটাকে আগলে রেখেই তুমি তোমার নিজের ঘর বানিয়ো।

ইতি,
তোমার বীন"

চিঠিটা পড়া মাত্রই নীরা যেন বহু বছরের পুরোনো এক অদেখা গোলকধাঁধার দোরগোড়ায় এসে থমকে দাঁড়াল — যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার মতো মানুষ দু’জনেই আজ আর পৃথিবীতে নেই। তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে আছে; ধুলো ধরা অক্ষরের ফাঁক গলে মাথা তোলে, নিশ্বাস ফেলে, যেন কোনো পুরোনো ক্ষত আবার খুলে যেতে চাইছে। নীরার বাবার সঙ্গে তার পথচলা ছিল খুবই অল্প দিনের — তবু সেই সংক্ষিপ্ত সময়টুকুই বাবাকে আজও তার ভীষণ মনে পড়ে। ধোঁয়াটে স্মৃতির ভিতর থেকেও নীরা বাবাকে অনুভব করে — একটি ছায়ার মতো, মমতার মতো। বাবার পুরোনো কলেজ-ডায়রি, দাদু-ঠাম্মাকে লেখা চিঠি… এসব হাতড়েই সে বাবাকে বুঝতে চেয়েছে এতদিন। তাই চিঠির হাতের লেখা চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগেনি। কিন্তু যতদূর মনে পড়ে — বাবা কখনোই মাকে 'হেম' বলে ডাকেননি। বরং 'শ্রী' বলেই ডাকতেন — মায়ের নাম স্মৃতি, সেখান থেকেই হয়তো 'শ্রী'। তাহলে 'হেম' কে? আর 'তোমার বীন' — এই সম্বোধনটিই বা কোন সম্পর্কের? মা তো বাবাকে সে নামে কখনও ডাকেননি। তবে কি এগুলো ছিল তাঁদের একান্ত সম্বোধন — যেখানে বাইরের কারো প্রবেশের অধিকার ছিল না, এমনকি তাঁদের মেয়েও সে অন্দরমহলের গোপনীয়তার বেড়াজাল কোনোদিন অতিক্রম করতে পারেনি। তবে চিঠির ভাষা পড়ে নীরার তা মনে হয় না। এখানে যেন লুকিয়ে আছে দুই মানুষের গভীর না-মিলনের যন্ত্রণা — নিবারণহীন, ভাঙনের তীরে থমকে থাকা প্রেমিক-প্রেমিকার আর্তি।

কিন্তু যদি এই চিঠি মাকে লেখা না হয়ে থাকে — তবে সেটি মায়ের কাছে এল কীভাবে? নীরা জানে, তার মা অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরে পা রাখার মানুষ ছিলেন না। তবে? বাবার অনুপস্থিতি তাদের ঘরে কতটা শূন্যতা রেখে গেছে, নীরা তা ছোটবেলা থেকেই টের পেয়েছে। সে বুঝত — মায়ের চোখের দুঃখ ছিল বাবাকে হারাবার দুঃখ, না পাওয়া ভালোবাসার আক্ষেপ কোনোদিন তার চোখে পড়েনি। তাহলে কি নীরা এতদিন ভুল বুঝেছে? সবই কি ভুল? তাহলে কি সত্যিই বাবা — মায়ের আগে, বা মায়ের বাইরে — কাউকে ভালোবেসেছিলেন? চিঠির প্রতিটি শব্দ যেন সেই দিকেই নীরাকে ঠেলে দিতে চায়। ভাবতেই যেন ভিতরটা কেঁপে ওঠে। কিন্তু কেন কাঁপছে নীরা? কারণ চিঠির মানুষটি তার বাবা বলে? একজন মানুষের কি প্রেমিক হবার অধিকার নেই? নীরা মাথা নাড়তে চাইল, কিন্তু মনের গভীর থেকে আরেকটি ভয় উঠল — যদি বাবা সত্যিই কাউকে ভালোবেসেছিলেন, তবে সেই মানুষটি কোথায়? এবং যদি সত্যিই 'হেম' নামের সেই মানুষটি আজও কোথাও বেঁচে থাকেন — তবে কি তিনি প্রতি বুধবারের গোধূলিতে, এখনও দাঁড়িয়ে থাকেন ভূসুণ্ডীর মাঠে — অপেক্ষা করেন? নীরার বাবার জন্য?

বারান্দার একফালি রোদ কখন যে সরে গেল, নীরার খেয়ালই থাকল না। মায়ের পুরোনো শাড়িগুলো রোদে একটু উষ্ণতা পেতে না পেতেই আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল। সেগুলো ভাঁজ করতে করতে নীরার মনে হলো — এই চিঠিটা যেন তার জন্মেরও বহু আগের একটা অদৃশ্য ঝড়ের শব্দ নিয়ে এসেছে। যে ঝড় একদিন তার মা-বাবার জীবনের ওপর দিয়েই বয়ে গিয়েছিল হয়তো। তাই কি মা কখনো কখনো অকারণে থমকে যেতেন? আনমনা থাকতেন? নীরা ভেবেছিল — শুধু বাবাকে হারানোর শোকেই মায়ের মন এমন ভারী থাকে। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে — মায়ের হৃদয়ের গোপনতম কোনে আরও গভীর, অচেনা একটা ক্ষত ছিল, যার কথা কাউকে বলেননি কোনোদিন। হয়তো বাবাকে পুরোপুরি না-পাওয়ার এক দীর্ঘশ্বাসই ছায়ার মতো মায়ের পাশে পাশে ঘুরে বেড়াত। হঠাৎই নীরার তীব্র ইচ্ছে হলো — এই বৈশাখের আগেই সে সব সত্যি খুঁজে বের করবে। তার নিজের প্রেম নেই, কিন্তু বাবার চিঠির ভেতর যে জ্যোৎস্নার মতো ভালোবাসা বেঁচে রইল — সেটা সে অন্তত তার ঠিকানায় পৌঁছে দিতে চায়। জানতে ইচ্ছে করছে — কোন শুভক্ষণে, কোন বৈশাখে এক হওয়ার কথা ছিল এঁদের দু’জনের? কোথাও তো আছেন হেম — যার জন্য লেখা হয়েছিল এই দগ্ধ উত্তাপের চিঠি। নীরা ভাবে — হয়তো তিনি এখনো জানেন না তার বাবা এই পৃথিবীতে নেই বহুদিন। হয়তো এখনো অপেক্ষা করছেন কোনো এক বুধবারের ফিকে আলোয়, ভুসুন্ডীর মাঠে — সেই প্রতিশ্রুত সন্ধ্যার মতো।


বৈশাখ এগিয়ে আসছে, আর নীরা নিজের কাছে প্রতিশ্রুতি নিল — সে হেমকে খুঁজে বের করবেই। এক এক করে দিন এগোচ্ছে, নীরার উদ্বেগ বাড়ছে… বাবার পুরোনো ডায়েরিগুলো, ছেঁড়া পাতা, হলদে হয়ে যাওয়া বই — কোথাও নেই 'হেম'। পুরোনো ঠিকানার তালিকা পর্যন্ত মুখস্থ করে ফেলল — তবু নেই। তাহলে কি এ শুধু কল্পনার কোনো ছায়া? কিন্তু এমন রক্তমাংসের যন্ত্রণা — কল্পনা হয় নাকি? মায়েরও একটি ডায়েরি আছে — "স্মৃতির পাতায়"। আজ পর্যন্ত নীরা কখনো তাতে হাত দেয়নি। মা বলতেন — "অন্যের গোপন জায়গায় হাত দিস না।" আজও সেই শিক্ষা নীরাকে টানে, তবু প্রয়োজন সকল ভয়কে ছাপিয়ে উঠছে। এ তো কারো গোপন ভাঙা নয় — বরং এতদিন অনুচ্চারিত একটি ভালোবাসাকে তার নিজের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া। নীরা সাহস সঞ্চয় করে, একটু একটু করে, অবশেষে একদিন মায়ের "স্মৃতির পাতা" খাতাটি খুলে ফেলে। পাতা উল্টোতে উল্টোতে বিস্ময়ে দেখে — সেখানে নেই কোনো অভিযোগ, নেই কোনো অপূর্ণতার দগদগে ক্ষত। আছে সংসারের খুঁটিনাটি, প্রথম প্রথম দাম্পত্যের জড়তা, পরে ধীরে ধীরে গভীর হওয়া সম্পর্ক। আছে নিঃশব্দে একে অপরকে বুঝে নেওয়ার গল্প। আছে নীরার জন্মের আগের মায়ের প্রত্যাশা আর পরের দিনগুলোর আনন্দ। তবে কি মা-ই হেম? কোনো এক অনিশ্চয়তার মুহূর্তে লেখা এই চিঠি? তাই কি এত যত্নের? — না! মন সায় দিচ্ছে না। নীরার চোখ হঠাৎই থমকে গেল এক পাতায়। পাতাটা অন্যসবের মতো নয় — কালি একটু আবছা, জলে ভেজা; অক্ষরগুলো কাঁপা কাঁপা। যেন লেখার সঙ্গে লেখিকার হৃদয়ও কেঁপে উঠেছিল সেদিন।

"পৃথিবীর সব সত্যের মুখোমুখি হওয়ার দরকার হয় না। আজ অকারণে সে কথাটা মনে পড়ল। নীরুর বাবার মতো মানুষ… আমি কি কোনো জন্মে পাব বলে ভেবেছিলাম? হয়তো কোনো অচেনা শুভক্ষণে কিছু পুণ্য করেছিলাম — না হলে জীবনে এমন মানুষকে পাওয়া যায় না। তিনি নিজের ভালোবাসাকে একটুও অমর্যাদা করেননি — বরং সেই ভালোবাসার মানুষটিকেও সম্মান দিয়ে গেছেন নিঃশব্দে। তাঁর এই নীরব ত্যাগ… হে ঈশ্বর, আমায় কোন সত্যের মুখোমুখি করলে!"

নীরার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো, একটু থেমে সে আবার পড়ল —
"শুধু নিজের পিতাকে প্রতিশ্রুতি চ্যুত করবেন না বলেই হয়তো এই বিয়ে। আমাকে সে কথা কোনোদিন বুঝতে দেননি মানুষটা। কেন? আমি পিতৃহারা বলেই… সেদিন তিনি আমার হাত ধরেছিলেন।
নলিনী দেবীর কথা আমি জানতাম না। জানলে হয়তো — এই বিয়েটা আটকাতে চাইতাম। আজ জানলাম। দেখার ইচ্ছে ছিল… হলো না। আর কোনোদিন হবেও না।
তিনি আর নেই — এই পৃথিবীতে কোথাও নেই। তাঁর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই, তবু — কী এক অজানা মৃত্যুর দায় চাপা ব্যথার মতো বুকে বাজছে।
যদি পরজন্ম বলে কিছু থাকে… বা তারও পরে — তখন যেন সেই অন্য আমি যেন শুধু স্ত্রী নয়, অবিনের প্রেমিকাও হতে পারি।"

নীরার বুকের ভেতর হঠাৎ ঝড় উঠল। মানে কী? নলিনীই কি 'হেম'? চিঠির সেই 'হেম' — তার বাবার দেওয়া গোপন ডাকনাম? ডায়েরির তারিখ বলছে নীরার বাবা তখন বেঁচে, তাহলে কি মা সব জানতেন? কে ছিল নলিনী বা হেম? তার বাবার জীবনের সেই ভালোবাসা? আর সেই নলিনীর মৃত্যু — স্বাভাবিক? নাকি সেই নীরব ত্যাগের কোনো অদৃশ্য মূল্য? নীরার বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা শূন্যতা চিনচিন করে উঠল। মা কতটা কাঁদতেন ভেতরে ভেতরে? মা কি বাবাকে কোনো প্রশ্ন করেছিলেন? নাকি নীরবেই থেমে গেছিলেন? কেন তাঁর মুখের অতল নীরবতাকে নীরা কখনো বোঝেনি?

হঠাৎ যেন নীরার মনে হলো — যে বেদনা মানুষ কাউকে বলতে পারে না, তা-ই হয়তো ডায়েরির পাতায় আশ্রয় খুঁজে নেয়। নীরা আবার বাবার পুরোনো সব খাতা/ডায়েরি খুলে ঠিকানা মিলাল — হ্যাঁ, নলিনীর ঠিকানা আছে! যে মানুষটা বাবার জীবনের অলিখিত অধ্যায়, সে জানে তাঁকে খুঁজে পাওয়া আর কোনোভাবেই সম্ভব না। তবুও সে বাড়িতে একবার নীরা যেতে চায় — যেখানে এককালে থাকতো সে, যাকে ঘিরে বাবার অন্তরে ঘর রাখা আছে। পরদিন সকালেই নীরা বের হলো। পুরোনো ট্রামলাইন, কাঠের বৈদ্যুতিক খুঁটি, মুছে যাওয়া নামফলক — সব যেন তাকে নিয়ে চলল কোনো হারিয়ে যাওয়া দিনের দিকে। ঠিকানাটাও যেন পুরোনো সময়ের গন্ধে ভেজা — লিখে রাখা কালি মাথা তুলে জিজ্ঞেস করে, "এখনো কি আমাকে খোঁজা সম্ভব?"

নীরা পৌঁছল গলির মুখে। সেখানে দাঁড়াতেই একটা অদ্ভুত শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরল। যেন গলি জানে — এখানে কেউ ফিরবে বলে কেউ ভাবেনি। বাড়িটা দূর থেকে দেখা যায় — জং ধরা তালা, ছেঁড়া দড়ির মতো লতা, দরজার চৌকাঠে কাঠ পোড়া গন্ধ। অবহেলিত বাড়ি হঠাৎই যেন বড় জীর্ণ হয়ে যায় — ভাঙা মনেরই মতো। নীরা দোরগোড়ায় হাত রাখতেই হঠাৎ মনে হলো — এখানেই কি কখনো তার বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন? এই দরজায় কি একদিন হেম — অথবা নলিনী — কারো জন্য অপেক্ষা করেছিলেন? পাড়ার এক বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি মাথা নেড়ে বললেন — "বাড়িটা অনেক বছর খালি। মাসের পর মাস কেউ আসেনি। যেসব নাম বলছ… এ পাড়ায় আজ আর কেউই মনে রাখে না মা। আমারও স্মৃতি আবছা হয়ে এসেছে…"

নীরার বুকের ভেতরটা যেন ধপ করে নেমে গেল। অচেনা মানুষের জন্য এভাবে মন খারাপ হয়? হয় — যদি সেই মানুষ নিজের বাবার জীবনের অর্ধেক আলো-ছায়া হয়ে থাকেন। নীরা কিছুক্ষণ থেমে থাকল জীর্ণ বাড়িটার সামনে। বাতাস যেন গায়ের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে বলল — "এখানে অনেক কথা ছিল… এখন শুধু নীরবতা।" চিঠিটা তখনও নীরার হাতেই। হালকা, হলদে, পুরোনো — কিন্তু ভেতরে কত কথা! কত প্রতিশ্রুতি! কত না-পাওয়া! নীরা হঠাৎ অনুভব করল — এই চিঠি নিজের কাছে রাখা মানে দুটো মানুষের অসমাপ্ত ব্যথা আরও টেনে রাখা। গঙ্গার ধারে গিয়ে বসে নীরা, হঠাৎই কাগজে আগুন ছুঁইয়ে দিয়ে চুপ করে বসে থাকে সে। একসময় আগুন নিভে গেল, ছাই ভেসে গেল উড়ন্ত পাপড়ির মতো। কেউ দেখল না। কেউ জানল না। শুধু নীরা জানল — এখানেই সমাপ্তি নয়, আবার শেষও নয়, শুরুও নয় — এ শুধু এক মুক্তি। মুক্তি তাদের — যাদের ভালোবাসা কথা হতেই পারেনি। তবু হৃদয়ের গভীরে জ্বলেছে আগুন, নীরবতা আর বেদনার মাঝখানে বাঁধা ছিল একটি অমলিন অঙ্গীকার। আর নীরার মুক্তি — যেন মানুষের বাইরে, সময়ের গহীনে, নীরবতায় গাঁথা এক অনন্ত প্রতিজ্ঞা, যা কখনো মুছে যাওয়া নয়, কখনো হারানো নয়। সেই অনন্ত দেশে — হয়তো কোনো এক ধূসর বুধবারে, ভূসুণ্ডীর শূন্যতায় বেজে ওঠে, হেম আর বীনের অদৃশ্য প্রেমের বীণা।




আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শারদ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ (১৭ই আশ্বিন) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 7 ভোট
স্টার
guest
5 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।