Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
পকেট
তানিয়া জিজ্ঞেস করল, "তাহলে আরতি পালিয়েছিল?" অমলেন্দু কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "হ্যাঁ। কিন্তু মৃণাল আর তাকে আর খুঁজে পায়নি। তোমার বাবা তখনই ভেঙে পড়েছিল। তারপর তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা হয় — মৃণাল আবার জীবন তৈরি করে।"
পকেট

শীত নামতেই শহরটা কুয়াশার ভিতরে ডুবে গেছে। সেই সময়েই তানিয়া দত্ত বাবার পুরোনো বাক্স দড়ি ছিঁড়ে খুলে বসেছিল। বাবা চলে গেছেন দু'মাস। ঘরে আর তাঁর গন্ধ নেই; শুধু কিছু জামাকাপড়, বই, আর পুরোনো স্টিলের ট্রাঙ্ক — যা খুলতে সে সাহস করেনি এতদিন। আজ করল।

ট্রাঙ্কের এক কোণে গুটিসুটি মেরে পড়ে ছিল এক ধূসর উলের কোট। এমন কোট তানিয়া বাবাকে পরতে দেখেছে বহুবার — বিশেষ করে নববর্ষের আগের রাতে। বাবা বলতেন, "এই কোট আমাকে অনেক পথ দেখিয়েছে।" তানিয়া কোটটাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। হঠাৎ আঙুলে ঠেকল কিছু একটার কোণা — ডান পকেট।

পকেটের ভেতর ছিল মলিন, হলদেটে, ১৯৮৫ সালের তারিখ-দেওয়া একটি চিঠি। চিঠির ওপরে — "মৃণাল দত্তের জন্য" — লেখা স্টিল পেনের কালিতে। তানিয়ার বাবার নাম — মৃণাল দত্ত। তানিয়ার বুকের ভেতর এদিক-ওদিক কিছু একটার ধাক্কা লাগল। বাবার নামে কেউ যে চিঠি লিখেছে — সে কখনো ভাবেনি।

চিঠিটা খুলে দেখল। পাতার ওপর মেয়েলি হাতের লেখা। নরম, গোল, পরিষ্কার। চিঠিটা ছিল — একটি প্রেমপত্র।

"মৃণাল,
তুমি জানো না তুমি আমাকে কী দিলে।
নতুন বছরের আগের রাত, ঘাটের সেই আলো, তোমার হাসি — এগুলো আমার কাছে এতটাই সত্য যে মনে হয় জীবনে প্রথমবার নিজের ভিতরকে চিনলাম।
তুমি আমায় চুমু দিলে, আর আমি যেন পুরো আকাশটা শুনতে পেলাম। কিন্তু আমি প্রতিশ্রুতি রাখতে পারব না। ঘর থেকে বেরিয়ে তোমাকে দেখতেও পারব না। আমি পালাচ্ছি।
এভাবে কাউকে ভালোবাসা যায় না — তবুও ভালোবেসে ফেলেছি। ক্ষমা কোরো। যদি কখনো ভাগ্যে থাকে, তুমি নিশ্চয় আমাকে খুঁজে পাবে। — আরতি"


তানিয়ার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। আরতি? কে তিনি? কেন তাঁর বাবা কখনো বলেননি? বাবা-মনুষ্য যে নিখুঁত ছিলেন না, সেটা তানিয়া জানত। কিন্তু তাঁর মধ্যে এত গভীর কোনো গোপন প্রেম ছিল — তা ভাবতেই পারল না। চিঠির কোণায় ছিল আরেকটি শব্দ — "শ্যামবাজার ঘাট, ৩১ ডিসেম্বর, রাত ১১:৪৫।" তারপর আর কিছু নেই। এক শীতের সন্ধ্যায় লেখা এক টুকরো ব্যথা, এক টুকরো প্রেম — যা কোটের পকেটে আটকে যুগের পর যুগ ঘুমিয়েছিল।

চিঠিকে বুকের কাছে ধরেই তানিয়া বুঝল — সে এটা ফেলে রাখতে পারবে না। বাবার মৃত্যুর আগে তিনি কিছু বলতে চেয়েছিলেন; তানিয়া দেখেছে তাঁর চোখে অনুশোচনা। হয়তো এই চিঠির কথাই বলতে চেয়েছিলেন। হয়তো সেই "আরতি" নামটাই তাঁর বুকের ভিতর আটকে ছিল। তানিয়া সিদ্ধান্ত নিল — নতুন বছর আসার আগেই আরতিকে খুঁজে বের করবে। যেভাবেই হোক।

এটা শুধু প্রেমের গল্প নয়। এটা তার বাবার অর্ধেক-লুকোনো জীবন। আর সেই জীবনের টুকরোকে সে হারাতে চায় না। ঘাটটা এখন বদলে গেছে। গাছপালা নেই, আলো অন্য রকম। কিন্তু নদীর জল একই রকম গাঢ় অন্ধকার।

এক বৃদ্ধ চা-ওয়ালা বললেন, "৮০-৯০ সালের সময় এখানে এক আরতি নামে মেয়ে আসত রোজ। চুপ করে বসত। তারপর হঠাৎ একদিন আর আসল না। শুনেছি, পালিয়ে বিয়ে করতে হয়েছিল।" তানিয়ার বুক আরও ধুকপুক করতে লাগল।

মৃণাল দত্তের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু অমলেন্দু কাকু। তানিয়া তাঁকে চিঠিটা দেখালো। কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "মৃণাল আর আরতি কলেজে সহপাঠী ছিল। আরতি ছিল দারুণ শিল্পী। মৃণাল ওকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু আরতি… এমন বাড়িতে বড় হয়েছিল যেখানে ভালোবাসার ফলাফল কেবল শাস্তি।" তানিয়া জিজ্ঞেস করল, "তাহলে আরতি পালিয়েছিল?" অমলেন্দু কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "হ্যাঁ। কিন্তু মৃণাল আর তাকে আর খুঁজে পায়নি। তোমার বাবা তখনই ভেঙে পড়েছিল। তারপর তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা হয় — মৃণাল আবার জীবন তৈরি করে।"

তানিয়া জানল, আরতি চিত্রশিল্পী ছিলেন। সে শহরের পুরোনো আর্ট স্কুলে গেল। এক বৃদ্ধ লেকচারার বললেন, "আরতি মুখার্জি? হ্যাঁ, চমৎকার মেয়ে ছিল। দারুণ আঁকত। কিন্তু তারপর কোথায় গেল, কেউ জানে না। তার একটা চিত্র প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৮৬ সালে।" পাঁচটা ছবি দেখানো হলো — সবকটিতেই নদী, আর কোথাও কোথাও একটি লম্বা, চশমা-পরা পুরুষ। তানিয়া বুঝল — এটি তাঁর বাবার ছবি।

চিত্রগুলোর পিছনে ছোট্ট একটা স্বাক্ষরে লেখা — "A. M. — চন্দননগর, কদমতলা।" সেখানেই পৌঁছল তানিয়া। পুরোনো নীল রঙের দোতলা বাড়ি। দরজায় নামফলক — অমর মুখার্জি — আইনজীবী (অব.)। দরজা খুলল প্রায় সত্তরের এক বৃদ্ধা। তানিয়া জিজ্ঞেস করল, "আপনি কি আরতি মুখার্জি?" বৃদ্ধা হাসলেন। "হ্যাঁ। তুমি মৃণালের মেয়ে, তাই না?"

আরতি বললেন, মৃণাল তাঁকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু তখনকার দিনে মেয়েদের নিজের ইচ্ছে বলার সুযোগ ছিল না। তিনি পালিয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তানিয়া জানতে চাইল কেন আর খুঁজলেন না। আরতি বললেন, "মৃণাল সৎ ছিল। আমি ওকে জীবনে টানতে চাইনি। ও সুখে থাকুক — এই চাইতাম।" তিনি জানতেন মৃণাল তাঁকে খুঁজেছিল। শেষবার দেখা হওয়ার দিন মৃণাল বলেছিল — "যদি কখনো তুমি চাও, আমি সব ছেড়ে দেব।" কিন্তু আরতি চেয়েছিলেন মৃণাল নতুন জীবন গড়ে নিক।

আরতির ঘরে একটি অসম্পূর্ণ পোর্ট্রেট — চশমা-পরা, উষ্ণ হাসির এক পুরুষ। তানিয়া বুঝল — তাঁর বাবা। আরতি বললেন, পোর্ট্রেটটা শেষ করতে পারেননি। শেষ করলে আর বাঁচতে পারতেন না।

নববর্ষের রাতে চন্দননগরের ঘাটে তানিয়া আর আরতি দাঁড়িয়ে। আরতি তানিয়াকে দিলেন আরেকটি চিঠি — ১৯৮৫ সালের প্রেমপত্রের জবাব, যা কখনো দেওয়া হয়নি।

"মৃণাল,
আমি আজও তোমাকে সেই আগের মতোই ভালোবাসি।
শুধু তোমাকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলাম।
— আরতি"

তানিয়া বলল, "আমি এটা বাবার ছবির পাশে রেখে দেব।" আরতি বললেন, "তাই হওয়া উচিত।"

রাত বারোটা ছুঁল। নতুন বছর এল। তানিয়া বাবার ছবির সামনে চিঠিটা রেখে দিল। কোটের পকেটে পাওয়া চিঠিটা — যা এতদিন অন্ধকারে ছিল — আজ যেন তার নিজের জায়গায় ফিরে গেল। তানিয়া অনুভব করল, তার ভিতরে কিছু বদলে গেছে। নরম, উষ্ণ, প্রাচীন আলো। প্রেমের, ক্ষমার, প্রাপ্তির।

জীবনে যত বছরই কেটে যাক, হৃদয়ের পকেটের ভিতর একটুকরো চিঠি সবসময়ই থাকে — যা আমাদের জীবনকে না জানি কখন বদলে দেয়।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 1 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top