Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
বৃষ্টির পরে
আশুতোষ কলেজে পড়তো কেমিস্ট্রি নিয়ে, আড্ডার সময় বাড়িতে এসে বলতো "মেয়েদের সাজগোজ আর রান্না না, এইবার বাইরে বেরোতে হবে। সব কাজে অংশ নিতে হবে।" আর আমি ওর গজ দাঁত দেখা যেতো সেই হাসিটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
বৃষ্টির পরে

অহনা সারা বছর অপেক্ষাতে থাকে কালীপুজোর সময় রানাঘাটে আসার জন্য, ভাইফোঁটা অবধি কাটিয়ে ঐ দিন সন্ধ্যায় রানাঘাট লোকাল ধরে টালিগঞ্জ ফিরে যায়। এইবার সব গোলমাল, কালীপুজো এসেছে নিম্নচাপের হাত ধরে। কলকাতায় বৃষ্টি হলেও রানাঘাটের আকাশ একদম লাল, কে জানে দুইদিন ধরে রানাঘাট, নৈহাটি ঠাকুর দেখার এতো চিন্তা-ভাবনা করে রেখেছে বান্টিদি, বাবান দা আর মেহুলিদির সাথে, বৃষ্টিতে সবই বোধহয় ধুয়ে মুছে যাবে! একরাশ চিন্তা নিয়ে অহনা হাঁটতে হাঁটতে ঘটক পাড়ার 'সীতারাম কুঠি'র সামনে এসে দাঁড়ায়।

মেসোরা রানাঘাটে অনেক অনেক দিনের বাসিন্দা, এই সীতারাম কুঠিটা কি বড়! এক একটা জানলা দরজার মতো বিশাল আকারের, দাবা খেলার ছকের মেঝেতে যখন রোদ এসে আলপনা কাটতো, ছোট্ট অহনা ভাবতো এটা নিশ্চয়ই কোনো রাজবাড়ি। এখনো খড়খড়ি দেওয়া জানলা, কড়িবরগার ছাদ খুব খুব টানে ওকে রানাঘাটে আসার জন্য। তবু তো বাড়িতে লোক সংখ্যা কত কমে গেছে, মেসোদের কাকা তাঁর অংশ টা বিক্রি করে কল্যাণী চলে গেছে, একতলায় ভাড়া, দোতলায় মেসো, মাসিমনি, বান্টিদি আর বাবানদা আর তিনতলায় মেহুলিদি কাকু-কাকিমার সাথে থাকে।

মা তো আসবে না, পিসিমণি আসবে টালিগঞ্জের বাড়িতে বাবা কে ফোঁটা দিতে, তাছাড়া মা-মাসিমণির কোনো ভাই নেই, কিন্তু পূর্বা কাকিমার দুই দাদা আছেন দুই জনেই বাইরে থাকে, তাই মেহুলিদিরা ও ভাইফোঁটা তে রানাঘাটেই থাকে। অহনা ধীরে ধীরে দোতলায় উঠে আসে, মাসিমনি রান্না ঘরে চা বসিয়েছে, ওকে দেখতে পেয়ে বাসবী বললেন, "হাত-পা টা ধুয়ে টেবিলে চলে আয় গরম গরম চা খা আগে।"

"বাবানদা কোথায় গো? মেহুলিদি কি ওপরে না এখনো ফেরেনি কল্যাণী থেকে?" জানতে চায় অহনা।
"ছেলে-মেয়েরা কেউ এখনো আসেনি, এসে যাবে সব। আয় তাড়াতাড়ি চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"

অহনার মেসো, একটা কলেজের অঙ্কের অধ্যাপক, যেমন মাথা ঠান্ডা, তেমন মজার মানুষ। অহনার রানাঘাটে আসতে ভালো লাগার আরো একটা জরুরি কারন মেসো তিমির বসু। "পূর্বা কেও আসতে বলছি, ও তো ওপরে একা এখন, ছোটদা ফেরেনি তো!" বলে জা-কে ফোনটা করেন বাসবী।

চা শেষ হতেই একে একে আসতে থাকে শিশির বাবু, ব্যারাকপুরে গেছিলেন অফিসের কাজে। এরপর আসে মেহুলি আর বাবান, দুইজনেই কল্যাণী থেকে আসলো। একজন নার্সিং হোমের ডিউটি থেকে আর বাবানদা ম্যানেজমেন্ট কলেজ থেকে। বান্টিদি যখন কলকাতা থেকে ভিজে দোতলার সিঁড়িতে পা রেখেছে ব্যস কারেন্ট অফ!

"কি রে দিদি কারেন্ট চলে গেল! কি যে করিস, তার সাথে তো বৃষ্টিটাও নিয়ে ফিরলি!"

বাবানের ইয়ার্কিতে বিরক্ত লাগে বান্টির, উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। বাসবী বোঝেন মেয়ে রেগে গেছে, হাসতে হাসতে বলে "চল আজ আমরা সবাই মোমের আলোয় খাই, বাইরে বৃষ্টি বেশ রোমান্টিক ব্যাপার হবে। তুই তাড়াতাড়ি পরিষ্কার হয়ে আয়। আমি কাকিমা খাবার দিচ্ছি টেবিলে।"

আজ খাবারের মেনু সবার প্রিয় রুটি আর চিকেন, খাওয়ার টেবিলে আড্ডাটা জমলো না, একে কারেন্ট অফ, তার সাথে নিম্নচাপের বৃষ্টি, সবার মুখেই এক কথা কাল সারা রাত ঠাকুর দেখা কি হবে কে জানে! আজ এতো আলো লাগানো হয়েছিল বাড়ির বাইরে, সেই গুলো তো জ্বললো না বেশিক্ষণ।

খাওয়ার শেষে অন্ধকারে ওপরে ওঠার ইচ্ছা কারুর নেই, সবাই দোতলার বসার ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে, চোখের সামনে মোবাইল ফোনের আলো আর দেওয়ালে আঁকিবুকি ছায়া, ঘরের পরিবেশটা ভৌতিক করে তুলেছে। আড়মোড়া ভেঙে মেহুলি বলে, "একটা খেলা খেলবে?"

"এই অন্ধকারে? আচ্ছা বল কি খেলতে চাস?" শিশির বাবু জানতে চান মেয়ের কাছে।

"ধরো কথার খেলা যদি খেলি! এমন কোনো কথা যা আমরা কোনোদিনও কাউকে বলিনি, এই অন্ধকারের সুযোগে বলে ফেলি। কেমন হবে?"
"খুব বাজে হবে," বলে পূর্বা। "মানুষের সাথে মানুষের বিবাদ লাগানোর খেলা।" সহমত পোষণ করে বাসবী। "কিন্তু আমরা রাজী" — ছেলে মেয়ে গুলো জোরে বলে ওঠে। তিমির বাবু হাসতে হাসতে বলেন, "গিন্নি আমি কিন্তু তোমার ওপর রাগ করবো না। চলো খেলি।"

খেলা শুরু হয় — বাড়িতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ছোট সদস্য অহনা, কলেজে পড়ে ফাস্ট ইয়ার, সুযোগটা ওকে দেওয়া হয়।

"সীতারাম কুঠি কে একদম ছোটবেলায় আমি ভাবতাম একদম ব্যাগে করে টালিগঞ্জে নিয়ে চলে যাবো, তারপর সবাই আমার রাজ প্রাসাদ দেখবে। একটু যখন বড় হলাম বুঝতে শিখলাম এটা সম্ভব নয়, কিন্তু বাড়ি ফিরতে একদম ইচ্ছে করতো না, খুব রাগ হতো। একবার সেই রকম রাগেই বান্টিদি আর মেহুলিদির প্রিয় ডল দুটো কে ভেঙে ছাদে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলাম।"

বান্টি তাঁর প্রায় দশ বছরের ছোট শান্ত বোনের কথা শুনে অবাক হয়ে যায়, এতো রাগ জমেছিল ওর মধ্যে।

এইবার আসে বাসবীর পালা, গলাটা একটু পরিষ্কার করে নেয় ও, বলতে শুরু করে, "হাবড়ার মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে ছিলাম, সাইকেল চালাতে পারতাম, সালোয়ার কামিজ পরতাম। তোমাদের বনেদি বাড়িতে বিয়ে হলো, সমবয়সী ননদ বিয়ের পর সালোয়ার পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমাকে এক মাথা ঘোমটা দিয়ে সকাল থেকে রাত কাটাতে হচ্ছে, মাথা থেকে ঘোমটা সরে গেলে শাশুড়ি নাহলে ননদ এসে মাথায় উঠিয়ে দিচ্ছে ঘোমটা। আশির দশকের শেষে কোন বাড়িতে ঘোমটার চল ছিল আমার জানা নেই। আমার বাবা তোমাদের মতো গয়না দিতে পারেনি, শাশুড়ি তাই সব তাঁর দেওয়া গয়না নিজের কাছে রাখতো, অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় উনি বের করে দেবেন। কেন? আমি কি গয়না সামলাতে পারবো না। পরি না তোমাদের দেওয়া গয়না আমি, সব রেখে দিয়েছি বাবান আর বান্টি কে ভাগ করে দেবো বলে।" কথা শেষ করে হাঁফাতে থাকেন বাসবী।

শিশির বাবু ভাবে বৌদির এখনো কি রাগ-অভিমান! তিমির বাবু বুঝতে পারেন না লজ্জাটা কার জন্য পাবেন বৌ না মা-বোন।

বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, ঘরে একটা নাটকের দৃশ্য অভিনয়ের পর প্রতিটা কুশীলব চুপ, বাসবী কি কাঁদছেন বুঝতে পারে না অহনা। আচমকা কানে আসে গুনগুন করা, "কেউ বলে ফাল্গুন কেউ বলে পলাশের মাস" গানের কিছু লাইন, বাবান দেখে কাকিমা গাইছে, কতদিন পর কাকিমার গলায় গান শুনলো!

পূর্বা বলে চলে — "বালিগঞ্জে থাকতাম সত্তরের উত্তাল সময়ের আগে জন্ম তাই কিছুই আমি বা দাদারা টের পাইনি, মুরলীধর গার্লসে যখন পড়তাম, ছোটদার বন্ধু তনুদা বাড়িতে আসতো, গালে না কামানো দাঁড়ি, চোখে মোটা কাঁচের চশমা। নাটক করতো, গান গাইতো রক্ত গরম করার, নাইট স্কুল চালাতো। যেন এক ঝড়! আর আমি খড়কুটোর মতো উড়ে যেতাম।"

শিশির বাবুর যদি উপায় থাকতো পঁচিশ বছরের মেয়ের গালে আর নিজের গালে একটা চড় মারতেন, আপাতত নিজের নখকেই কষ্ট দেওয়া যাক!

পূর্বা আপন খেয়ালে বলে চলে, "আশুতোষ কলেজে পড়তো কেমিস্ট্রি নিয়ে, আড্ডার সময় বাড়িতে এসে বলতো "মেয়েদের সাজগোজ আর রান্না না, এইবার বাইরে বেরোতে হবে। সব কাজে অংশ নিতে হবে।" আর আমি ওর গজ দাঁত দেখা যেতো সেই হাসিটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। একবার গান গাইতে বলেছিল আড্ডায়, আমি গাইলাম, "হয়তো তোমারই জন্য...।" কিছুটা গাইতেই বলে উঠলো "থাম থাম, প্যান প্যান করিস না আর। আইপিটিএ-র গান জানিস না? শেখ এই গুলো।" কি অপমান! মনে হলো কেঁদে ফেলি সবার সামনে। সেইদিনের পর থেকে রাগ করে আর যায়নি আড্ডাতে, একদিন বিকেলে জানলার ধারে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি, কিছু আগে কালবৈশাখী হয়ে গেছে, কৃষ্ণচূড়ার ফুল, পাতা রাস্তায় পরে আছে। সেটা মারিয়ে ঘরে এলো। বললাম ছোটদা নেই। বলল "জানি, তোর কাছে আসলাম। রাগ করেছিস খুব না!" বলেই হাসতে থাকলো, দেখলাম ঘন চুলের মধ্যে গাছের পাতা। কষ্ট করে আটকালাম নিজেকে। শুনতে পেলাম বলছে, "একসাথে চলতে গেলে নিজেদের তো একটু গড়ে পিঠে নিতে হবে নাকি কমরেড! এই বইটা আমার প্রিয়, 'পুতুল নাচের ইতিকথা', পড়িস।" তারপর হাসতে হাসতে চলে গেল।

পূর্বা চুপ করে থেকে বলে গেল, "আমার না হলো বই ফেরত দেওয়া নাহলো চুল থেকে পাতাটা সরিয়ে দেওয়া। আর দেখা হয়নি, ছোটদা আসতে বারণ করে দিতে পারে।"

অহনা দেখে অন্ধকারে মেহুলিদি আর কাকু মাথা ঝুঁকিয়ে বসে আছে, পূর্বা কাকিমা একমনে বন্ধ জানলা দেখছে নাকি অতি প্রিয় কোনো মুখ কে দেখার চেষ্টা করছে! তবে নিজের কম বয়স ও অল্প অভিজ্ঞতা দিয়ে আজ বুঝলো, বৃষ্টির পরে যেমন ঝকঝকে নীল আকাশ দেখা যায়, তেমনি কাল থেকে কাকিমা আর মাসিমনির জীবনের আকাশে ঝকঝকে নীল আকাশ দেখা যাবে। আর কালো মেঘের টুকরো উঁকি দেবে না।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 2 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top