About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
অন্তিম প্রহরের ভুল নম্বর
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

অন্তিম প্রহরের ভুল নম্বর
মেয়েটি জেটির শেষ প্রান্তে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। পরনে সালোয়ার কামিজ, ওড়নাটা মাটিতে লুটোচ্ছে। তার শরীরটা কান্নায় কাঁপছে। বয়স বড়জোর একুশ-বাইশ। আমি গলাটা পরিষ্কার করে শান্ত স্বরে বললাম, "জলটা কিন্তু খুব ঠান্ডা।"

রাত তখন ৩টে ৭ মিনিট। মাঘ মাসের হাড়-কাঁপানো শীত, সঙ্গে বৃষ্টির ছাঁট। ঘরের সিলিং ফ্যানটা খুব আস্তে ঘুরছে, আর প্রতিবার চক্কর খাওয়ার সময় একটা খটখট শব্দ করছে। আমি আমার পড়ার টেবিলে মূর্তির মতো বসে আছি। সামনে একটা খোলা ডায়েরি, কিন্তু গত এক ঘণ্টায় কলমের ডগাটা কাগজের গায়ে একটা আঁচড়ও কাটেনি। ঘরের আলো নেভানো, শুধু রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের মরা হলদে আলোটা জানলার গ্রিল চুঁইয়ে আমার পায়ের কাছে এসে পড়েছে। শহরের কোলাহল এখন মৃত।

হঠাৎ ফোনের কর্কশ শব্দে এই নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে গেল। ভুরু কুঁচকে তাকালাম। এই সময়ে কে ফোন করবে? ফোনটা হাতে নিলাম। অচেনা নম্বর। সাধারণত আমি আননোন নম্বর ধরি না, কিন্তু আজ কী মনে করে যেন রিসিভ বাটনটা স্লাইড করে কানে ধরলাম। "হ্যালো?" আমার গলাটা বড্ড যান্ত্রিক শোনাল, পঁয়ত্রিশ বছরের এক ক্লান্ত পুরুষের ভারি কণ্ঠস্বর।

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। শুধু একটা প্রবল বাতাসের সাঁই সাঁই শব্দ। আর তারপরই এক রুদ্ধশ্বাস কান্নার আওয়াজ। ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি গলা ভেসে এল। "মা... ও মা... তুমি তো বলেছিলে সব ঠিক হয়ে যাবে... কিন্তু আমি আর পারছি না মা... আমি আর পারলাম না... ক্ষমা করে দিও... সব শেষ..."

আমি সোজা হয়ে বসলাম। মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। "হ্যালো? কে বলছেন? হ্যালো?" ওপাশ থেকে উত্তর এল না। শুধু বাতাসের তোড় আর দূরে কোথাও একটা ট্রেনের হুইসল। তারপরই লাইনটা কেটে গেল। কলের স্থায়িত্ব — মাত্র ১৪ সেকেন্ড।

ফোনটা টেবিলে রেখে দিতে পারলাম না। কপালের শিরা দপদপ করছে। এটি কোনো প্র্যাঙ্ক কল মনে হচ্ছে না। কণ্ঠস্বরটি খুব কাঁচা, খুব তরুণ, যার পৃথিবীটা হয়তো এই মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। আমার মগজের কোনো এক কোণে সুপ্ত থাকা পুরনো ডিটেক্টিভ সত্তাটা হঠাৎ জেগে উঠল। আমি চোখ বন্ধ করে ওই ১৪ সেকেন্ডের শব্দগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করতে শুরু করলাম।

সূত্র ১: বাতাসের শব্দ। বদ্ধ ঘরে এসি বা ফ্যানের আওয়াজ এমন হয় না। এটা খোলা জায়গার বাতাস। আজ রাতে গঙ্গার দিক থেকে বেশ হাওয়া দিচ্ছে। তার মানে মেয়েটি কোনো উঁচু জায়গা বা নদীর পাড়ে আছে।
সূত্র ২: ট্রেনের হুইসল। কলের একদম শেষে একটা দীর্ঘ হুইসল শোনা গেছে। কিন্তু এটা শিয়ালদহ বা হাওড়ার ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের তীক্ষ্ণ আওয়াজ নয়। এটা ডিজেল ইঞ্জিনের ভারী, গম্ভীর আওয়াজ। এবং শব্দটার সাথে একটা প্রতিধ্বনি ছিল, যেন জলের ওপর দিয়ে ভেসে আসছে।
সূত্র ৩: ব্যাকগ্রাউন্ডের যান্ত্রিক শব্দ। মেয়েটি যখন কাঁদছিল, তখন পেছনে একটা ঘটাং-ঘটাং শব্দ হচ্ছিল। এটা ক্রেনের শব্দ বা মালগাড়ি লোড-আনলোড করার শব্দ।

আমি মনে মনে কলকাতার ম্যাপটা আঁকলাম। কোথায় নদীর ধার, ডিজেল ইঞ্জিন চালিত ট্রেন এবং মালবাহী ক্রেন একসঙ্গে থাকে? প্রিন্সেপ ঘাট? না, ওখানে রাতে মালগাড়ি চলে না। হাওড়া ব্রিজ? অসম্ভব, ট্র্যাফিক নয়েজ থাকবে। খিদিরপুর ডক এলাকার কাছে, পরিত্যক্ত জেটিগুলো। ওখানে পোর্ট ট্রাস্টের রেললাইন আছে, যেখানে রাতে মালগাড়ি চলে। জায়গাটা নির্জন এবং ওখানেই পুরনো সব ক্রেন পড়ে আছে। ঘড়িতে ৩টে ২০। আমি জানি, হাতে সময় খুব কম। মেয়েটি বলেছিল "আমি আসছি তোমার কাছে" — এর অর্থ খুব পরিষ্কার। আমি জ্যাকেটটা গায়ে চাপালাম। বাইকের চাবিটা পকেটে পুরে বেরিয়ে পড়লাম অন্ধকার রাস্তায়।

খিদিরপুরের রাস্তায় বাইক ছোটালাম ঝড়ের গতিতে। শীতের রাতের কুয়াশা চিরে হেডলাইটের আলো এগিয়ে চলেছে। আমার চোয়াল শক্ত। আমি জানি না আমি কেন যাচ্ছি। অচেনা একটা মানুষকে বাঁচানোর এই অদম্য ইচ্ছেটা কোথা থেকে এল, তা ভাবার সময় এখন নেই।

হেস্টিংসের কাছে বাইক রেখে দৌড়াতে শুরু করলাম। নদীর ধারের বাতাস হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। পুরনো জেটি এলাকাটা ভূতুড়ে অন্ধকারে ডুবে আছে। কিছুটা এগোতেই আবছা অন্ধকারে দেখলাম, রেলিংয়ের ওপারে একটা অবয়ব দাঁড়িয়ে। জলের দিকে ঝুঁকে আছে। আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। দেরি হয়ে গেল না তো? "দাঁড়ান! দোহাই আপনার, ঝাঁপ দেবেন না!" আমি চিৎকার করে উঠলাম।

আমার গলার আওয়াজে মূর্তিটা চমকে উঠল না, বরং টলে গেল। আমি এক লাফে রেলিং টপকে ওই পাশে গেলাম এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে মূর্তিটাকে জাপটে ধরলাম। দুজনে মিলে গড়িয়ে পড়লাম ঘাসের ওপর। "ছেড়ে দিন! সব ঠিক হয়ে যাবে! জীবন মানেই যুদ্ধ!" আমি শ্বাসকষ্টের মধ্যেও মোটিভেশনাল স্পিচ দিতে শুরু করলাম। হঠাৎ আমার নিচে চাপা পড়া মূর্তিটি ভয়ানক এক পুরুষালি গলায় চিৎকার করে উঠল, "আরে দাদা! করছেন কী? ছাড়ুন! প্যান্টটা তো নষ্ট করে দিলেন!"

আমি থমকে গেলাম। মোবাইলের ফ্ল্যাশটা জ্বাললাম। দেখি এক মাঝবয়েসি লোক, লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা। হাতে একটা বিড়ি। উনি সম্ভবত প্রাকৃতিক ক্রিয়াকলাপের জন্য নদীর ধারে দাঁড়িয়েছিলেন, আর আমি তাঁকে সুইসাইড কেস ভেবে ট্যাকল করেছি।

"আপনি?" আমি তোতলাম। "আমি তো আমিই! আপনি কে মশাই? ডাকাত? আমার কাছে বিড়ি ছাড়া আর কিচ্ছু নেই!" লোকটা রাগে ফুঁসছে।
"না মানে... আমি ভাবলাম আপনি সুইসাইড করছেন..."
"সুইসাইড? এই শীতে? পাগল নাকি? আমি এখানে পাহারাদার। আপনি বাড়ি যান তো!"

আমি লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছিলাম। "সরি দাদা, আসলে একটা ভুল ফোন এসেছিল..."

লোকটা আমাকে পাগল ভেবে গালি দিতে দিতে চলে গেল। আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। তাহলে কি আমার সব ডিডাকশন ভুল? আমি কি সত্যিই ব্যর্থ? শার্লক হোমস হতে গিয়ে মিস্টার বিন হয়ে গেলাম? কিন্তু ঠিক তখনই, আবার সেই শব্দটা কানে এল। ঘটাং-ঘটাং। একটু দূরে, পোর্ট ট্রাস্টের লাইনে একটা মালগাড়ি শান্টিং করছে। এবং সেই শব্দের উৎস ধরে তাকাতেই আমি দেখলাম, এখান থেকে প্রায় দুশো মিটার দূরে, একটা ভাঙা জেটির মাথায় কেউ একজন বসে আছে। এবার আর তাড়াহুড়ো করলাম না। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম।

মেয়েটি জেটির শেষ প্রান্তে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। পরনে সালোয়ার কামিজ, ওড়নাটা মাটিতে লুটোচ্ছে। তার শরীরটা কান্নায় কাঁপছে। বয়স বড়জোর একুশ-বাইশ। আমি তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। গলাটা পরিষ্কার করে শান্ত স্বরে বললাম, "জলটা কিন্তু খুব ঠান্ডা। আর এই জোয়ারের সময় নিচে প্রচুর ঘূর্ণি থাকে।"

মেয়েটি চমকে বিদ্যুৎবেগে ঘুরে তাকাল। তার চোখে ভয় আর বিস্ময়। টর্চের আলোয় তার বিধ্বস্ত মুখটা দেখা গেল। "কে? কে আপনি?" মেয়েটি ভয়ার্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল। "আমি সেই লোকটা, যাকে তুমি একটু আগে ফোন করেছিলে। ভুল করে।" আমি পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করে দেখালাম। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। "আপনি... আপনি খুঁজে পেলেন কী করে?" "ওটা আমার পেশা নয়, নেশা। ডিডাকশন," আমি হাসার চেষ্টা করলাম। তারপর তার পাশে বসলাম, কিন্তু নিরাপদ দূরত্ব রেখে। "বসা যায়?"

মেয়েটির নাম সৃজা। সৃজা কোনো উত্তর দিল না, আবার মুখ গুঁজে কাঁদতে শুরু করল। আমি পকেট থেকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিলাম। "কী হয়েছে বলো তো? খুব বড় কোনো ঝড়?" সৃজা মুখ তুলল। তার চোখে এখন আর ভয় নেই, আছে একরাশ ঘৃণা আর অভিমান।

"ঝড়?" সৃজা তিক্ত স্বরে বলল। "আমার পুরো জীবনটাই তছনছ হয়ে গেছে। যাকে ভালোবেসেছিলাম, যার জন্য বাড়ির সবার সাথে লড়াই করলাম, সে অন্য একটা মেয়ের সাথে জড়িয়ে পড়ল। ধরা পড়ার পর ব্রেকআপ করলাম। ভেবেছিলাম ওখানেই শেষ।" সে থামল, শ্বাস নিল। কান্নায় গলা বুজে আসছে তার। "কিন্তু এক সপ্তাহ আগে ও আমাকে ফোন করল। বলল, আমার সব চিঠি আর গিফট ফেরত দিতে চায়। শেষবারের মতো দেখা করে ক্ষমা চাইতে চায়। আমি বোকার মতো বিশ্বাস করে ওর ফ্ল্যাটে গেছিলাম। আর সেখানে..." সৃজার শরীরটা শিউরে উঠল। "ও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি চিৎকার করেছিলাম, কিন্তু কেউ শোনেনি। ও জোর করে আমার শরীরটাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেল। বলল, 'ছেড়ে যাওয়ার শাস্তি'। আর হুমকি দিল, পুলিশে গেলে আমার কিছু গোপন ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেবে।"

আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। একুশ বছরের একটি মেয়ে, কী ভয়ানক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। "বাড়িতে বলোনি?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। "কাকে বলব?" সৃজা চিৎকার করে কেঁদে উঠল। "মা মারা যাওয়ার পর বাবা নতুন সংসার পেতেছেন। তাঁর নতুন স্ত্রী, নতুন জীবন। সেখানে আমার কোনো জায়গা নেই। যখন বাবাকে বলার চেষ্টা করলাম, উনি ব্যস্ততার ভান করে এড়িয়ে গেলেন। আমি একা... এই পুরো পৃথিবীতে আমি বড্ড একা। ওই লোকটার বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষমতা আমার নেই। তাই ভাবলাম, মায়ের কাছে চলে যাওয়াই ভালো। মা-ই একমাত্র যে আমাকে আগলে রাখত।"

"তাই মাকে ফোন করেছিলে?"

সৃজা ম্লান হাসল। "এই নম্বরটা... এই নম্বরটা মায়ের ছিল। মা মারা যাওয়ার পর সিমটা ডিঅ্যাক্টিভেট হয়ে যায়। কিন্তু নম্বরটা আমার মুখস্থ। আজ খুব ভয় করছিল, তাই অবচেতনে মায়ের নম্বরটাই ডায়াল করেছিলাম। ভাবিনি রিং হবে। ভেবেছিলাম ওপারে মা আছে।"

মায়ের পুরনো নম্বর এখন আমার কাছে। টেলিকম কোম্পানি রিসাইকেল করে আমাকে দিয়েছে। একেই কি কাকতালীয় বলে? নাকি নিয়তি? আমি চুপ করে শুনলাম। একুশ বছরের একটি মেয়ে, যার মাথার ওপর ছাদ নেই, ভালোবাসা নেই, আছে শুধু লাঞ্ছনা আর শরীরী অপমানের দগদগে স্মৃতি।

"দেখো সৃজা," আমি ভারি গলায় বললাম, "তুমি যে সমস্যাগুলোর কথা বলছো — বিশ্বাসঘাতকতা, মোলেস্টেশন — এগুলো জঘন্য, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এর শাস্তি নিজেকে কেন দিচ্ছ?"
"কারণ আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই।"
"জায়গা নেই বলে জীবন শেষ করে দেবে?" আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। "তুমি ফোন করেছিলে তোমার মৃত মাকে, কিন্তু ফোনটা তুলল একটা জ্যান্ত মানুষ। কেন জানো? কারণ হয়তো তোমার মা-ই চাইলেন না তুমি এখন তাঁর কাছে যাও। তিনি চাইলেন তুমি লড়ো। ওই কিছু জঘন্য মানুষের জন্য তোমার জীবন শেষ হতে পারে না। তোমার জীবন বিচার হবে তুমি কাল সকালে উঠে কী করবে তার ওপর।"

আমি আমার জ্যাকেটটা খুলে সৃজার গায়ে জড়িয়ে দিলাম। "চলো, আজ রাতটা অন্তত মরার প্ল্যান ক্যানসেল করো। কাল সকালে যদি মনে হয় পৃথিবীটা খুব জঘন্য, তখন আবার এসো। কিন্তু আজ নয়।" সৃজা আমার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে এক গভীরতা আর আস্থা ছিল।

ভোর পাঁচটা। সৃজাকে তার এক বান্ধবীর হস্টেলের সামনে নামিয়ে দিলাম। মেয়েটি এখন অনেকটা শান্ত। "থ্যাঙ্ক ইউ," সৃজা বলেছিল। "আপনি না থাকলে আজ আমি একটা ভুল করে ফেলতাম। আপনি খুব ভালো মানুষ। আপনার জীবনে নিশ্চয়ই অনেক সুখ, তাই আপনি এত পজিটিভ কথা বলতে পারেন।"

আমি কিছু বলিনি, শুধু হেসেছিলাম। বাইক চালিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরলাম। লিফটে করে যখন ওপরে উঠছি, তখন আমার শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মনটা অদ্ভুত হালকা। ফ্ল্যাটের দরজা খুললাম। সেই অন্ধকার ঘর। জানলার গ্রিল দিয়ে আসা ভোরের আলো এখন আরেকটু উজ্জ্বল। আমি আমার পড়ার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম। যেখানে আমি বসে ছিলাম ফোনটা আসার আগে। টেবিলের ওপর ডায়েরিটা খোলা। তার ওপর রাখা আছে একটা খাম। খামের ওপর লেখা — "To whom it may concern"।

আমি খামটা সরালাম। তার নিচে রাখা আছে এক তাড়া কাগজ। একদম ওপরের কাগজটা আমার ডিভোর্স পেপার। তিন বছরের দাম্পত্য জীবনের তিক্ত সমাপ্তি। স্ত্রী চলে গেছে তার বিজনেস পার্টনারের সাথে, আমার সমস্ত জমানো টাকা আর বিশ্বাস নিয়ে। তার নিচের কাগজটা ব্যাঙ্কের নোটিশ। ঋণের দায়ে আগামী সপ্তাহেই এই ফ্ল্যাট সিজ করা হবে। আর সবশেষে আছে আমার টার্মিনেশন লেটার। গত সপ্তাহে কোম্পানি কস্ট কাটিংয়ের নামে আমাকে ছাঁটাই করেছে। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে, খালি পকেটে, ভাঙা সংসার নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম এক অতল খাদের কিনারে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কাল রাতের বিষাদের ছাপ। টেবিলের ওপর সেই ওষুধের শিশিটা, যা দিয়ে আমি আজ রাতে সব শেষ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমি শিশিটার দিকে তাকালাম। গতকাল রাতে এই শিশিটাই ছিল আমার জীবনের গন্তব্য। কিন্তু এখন আর নয়।

সৃজা বলেছিল, "আপনার জীবনে নিশ্চয়ই অনেক সুখ..." আমি হাসলাম। শব্দ করে হাসলাম এবার। সৃজা জানে না, সে কাকে ফোন করেছিল। দুটি মানুষ, দুটি আলাদা প্রজন্মের, দুটি ভিন্ন ধরনের যন্ত্রণায় জর্জরিত। একজন সদ্য যৌবনে পা দেওয়া, অন্যজন যৌবনের মাঝপথে সব হারানো। কিন্তু সৃজাকে বাঁচাতে গিয়ে, তাকে জীবনের মানে বোঝাতে গিয়ে, আমি নিজের অজান্তেই নিজেকে বুঝিয়ে ফেলেছি। সৃজার ওই অসহায়তা আমাকে আয়নার মতো আমার নিজের কাপুরুষতা দেখিয়ে দিয়েছে। আমি শিশিটা তুলে নিলাম। ড্রয়ারে রেখে দিলাম। আমার আর মরতে ইচ্ছে করছে না।

টেবিলে ফিরে এসে ডিভোর্স পেপার আর ব্যাঙ্কের নোটিশগুলো ডায়েরির ভেতরে ঢুকিয়ে ডায়েরিটা বন্ধ করলাম। আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকালাম। চোখের নিচে কালি, চুল উসকোখুসকো। কিন্তু চোখের মণি দুটোতে একটা নতুন ঝিলিক অন্যের জীবনের একটা ছোট 'ভুল' ফোনকল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় 'সঠিক' কাজ হয়ে দাঁড়াল। আমি অনুভব করলাম, আমার বুকের ভেতরের সেই পাথরটা আর নেই। কষ্ট আছে, একাকীত্ব আছে, কিন্তু এখন আমার একটা উদ্দেশ্য আছে। পৃথিবীতে হয়তো আরও অনেক সৃজা আছে, যাদের একটা হাত ধরা দরকার। আমি ডায়েরিটা খুললাম। সুইসাইড নোট লেখার জন্য যে পাতাটা খুলে রেখেছিলাম, সেটা ছিঁড়ে ফেললাম। নতুন পাতায় লিখলাম: "বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার। আজ থেকে শুরু হলো নতুন অধ্যায়।"

জানলার পর্দাটা সরিয়ে দিলাম। একরাশ রোদ এসে ঘরটা ভরিয়ে দিল। ঠিক যেমন একটু আগে নদীর ঘাটে ভোরের আলো ভরিয়ে দিয়েছিল আমাদের। পকেট শূন্য, ঘর ফাঁকা, কিন্তু বুকটা ভরে আছে এক অদ্ভুত সাহসে।




আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শারদ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ (১৭ই আশ্বিন) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
4.6 16 ভোট
স্টার
guest
9 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।