১
শ্রাবণ পূর্ণিমা। আকাশে মেঘ না থাকায় চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। দোতলার ব্যালকনিতে বসেছিল সুচন্দ্রা। মেয়ে তিন্নি পাশে এসে বসতেই সুচন্দ্রা বললো, চল না তিন্নি, চাঁদের আলোয় সামনের ঐ মাঠটা থেকে দুজনে একটু হেঁটে আসি। তোর বাবা থাকলে এরকম জোছনায় আমায় হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতো। মানুষটা যে আমাদের ফেলে রেখে এইভাবে অকালে চলে যাবে — তা তো আমরা ভাবতেই পারিনি। সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। চল, একটু হেঁটে আসি।
তিন্নি নীচু স্বরে বললো, আমারঞ অনেক কাজ আছে মা। বাবার জিনিষপত্র সব অগোছালো হয়ে এদিক সেদিক পড়ে আছে। সেসব গুছিয়ে রাখতে হবে। আজ তুমি একাই ঘুরে এসো।
সুচন্দ্রা উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ঠিক আছে, তুই তোর কাজ কর। আমি না হয় একাই ঐ মাঠে গিয়ে একটু হাঁটি।
ব্যালকনি ছেড়ে তিন্নি ঘরে এসে ঢুকলো। অভ্রর বেডরুমটা এখন খাঁখাঁ করছে। স্বামী মারা যাওয়ার পর সুচন্দ্রা এখন বড়ো একা। সুরে বাঁধা একটা সংসারের তারটাই যেন ছিঁড়ে গেছে। তাই চতুর্দিকে সব এলোমেলো। তিন্নি এর কারণটা বেশ বুঝতে পারে। তাই মাকে কিছু না বলে অবশেষে নিজেই ঘর গোছানোর কাজে নেমে পড়লো।
সারা বেডরুম জুড়ে অভ্রর স্মৃতি। তিন্নির মনে হয়, তার বাবা এখনো মারা যাননি। তিনি হয়তো পাশের রুমেই আছেন। এখুনি হয়তো ডেকে উঠবেন — বুড়িমা, আমার ডায়েরী আর পেনটা দিয়ে যা তো। খাটের পাশের টেবিলটায় বাবা-মায়ের যুগল ফটো। মায়ের মাথায় ঈষৎ ঘোমটা, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর। এটা সম্ভবত বিয়ের পরেই তোলা। বাবার বাম হাতটা মায়ের কাঁধের উপর ছড়ানো। উজ্জ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বাবা। দেখতে দেখতে তিন্নির চোখ সিক্ত হয়ে উঠে। বাবার ব্যবহার করা পাজামা-পাঞ্জাবী এক কোণে ডাঁই হয়ে পড়ে আছে। তিন্নি ঐসব জামা কাপড় কেচে তুলে রাখতে হবে বলে আলাদা করে সরিয়ে রাখে। আলমারিতে ঝুলছে বাবার কোট, টাই। সুচন্দ্রা চেয়েছিল এইসব জামা কাপড় অন্যদের দিয়ে দিতে। তিন্নি রাজি হয়নি। বাবার স্মৃতিকে সে এতো তাড়াতাড়ি মুছে ফেলতে চায় না।
বেডরুম থেকে বেরিয়ে তিন্নি এবার এলো অভ্রর পড়ার ঘরে। ঘরে র্যাকের মধ্যে থরে থরে সাজানো বই।মেঝেতে দুখানা বড়ো কাঠের বাক্স। একটা বাক্স পুরনো বই আর জার্নালে ঠাসা। আরেকটা বাক্সে অভ্রর পুরনো ডায়েরী আর ফটো অ্যালবামের সাথে একটি পুরনো ওভারকোট। বহুকাল খুলে দেখা হয়নি বাক্সটা। অন্তত তিন্নি কোনদিন খুলতে দেখেনি। প্রচুর ধুলো জমে গেছে। তিন্নি সব কিছু বার করে ধুলো ঝাড়তে আরম্ভ করলো। ওভারকোটটা ঝাড়তে গিয়ে তার পকেট থেকে বেরিয়ে এলো একটা খাম। খামের ভিতর চারভাঁজ করা একটা কাগজ। ফেলতে গিয়েও তিন্নি কাগজের ভাঁজ খুলে দেখলো একটা চিঠি। জরুরী কিছু নথিপত্র কিনা দেখতে গিয়েই চমকে উঠলো তিন্নি। একটা প্রেমপত্র! সম্বোধন প্রিয় রাঙাদাকে, শেষে "ইতি তোমার বর্ণা"।
চিঠির পাতা থেকে চোখ সরছে না তিন্নির। তার হৃৎপিন্ডে মৃদু ওঠানামা। হাতদুটো কাঁপছে। ঊনিশশো পঁচাশি সালে লেখা চিঠি। অভ্র সযত্নে সবার চোখ এড়িয়ে চিঠিখানা রেখেছিল হয়তো তার অমূল্য স্মৃতি হিসেবে। বাবার এই অমূল্য স্মৃতি যে তিন্নির কাছেও অনেক দামী। চিঠিটি ভাঁজ করে আবার খামে ঢুকিয়ে রাখলো তিন্নি।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর সুচন্দ্রা শুয়ে পড়েছে তার ঘরে। অভ্রর পুরনো ডায়েরী ফটো অ্যালবাম, আর সেই চিঠিটা নিয়ে তিন্নি নিজের ঘরে বিছানার উপর এনে রাখলো। আজ আর তিন্নির ঘুম হবেনা।
অনেক রাত অব্দি জেগে চিঠি, ডায়েরী আর অ্যালবাম ঘেঁটে অবশেষে তিন্নি পুরো রহস্য ভেদ করতে পারলো। আর রহস্য উন্মোচন শেষে তিন্নির মুদিত চোখের পাতায় ভেসে উঠলো ঊনিশশো পঁচাশি সালের এক অসমাপ্ত প্রেম কাহিনী।
২
বি.টেক. ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে অভ্র বাড়িতে এলো। এখন রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা। কলেজ ক্যাম্পাসিংয়ে সে অবশ্য ইতিমধ্যেই একটা চাকরিতে নির্বাচিত হয়েছে। কিন্তু মনস্থির করতে পারছে না, চাকরি করবে, নাকি মাস্টার ডিগ্রী করবে। ওর বাবা সনৎ বাবুর ইচ্ছে — ছেলে মাস্টার ডিগ্রী শেষ করে পি.এইচ.ডি. করে প্রফেসারি লাইনে আসুক। আবার মা যুথিকা দেবির ইচ্ছে — অতো পড়াশুনার কী দরকার? চাকরি যখন একটা পেয়েই গেছে, তখন চাকরিতে জয়েন করে একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে-থা করে সংসার করুক। মা-বাবার একমাত্র ছেলে অভ্র। মা ঘরে বৌ আনার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
কলেজ হোষ্টেলে বন্ধুদের সাথে জীবনটা অভ্রর একরকম ভাবে কাটে। বাড়িতে এলে আবার অন্য রকম। মায়ের সাথে কিছুক্ষণ গল্পসল্প করে বাকি সময়টা বন্ধুদের সাথে ফোন করে অথবা আড্ডা মেরে কাটিয়ে দেয়।
সেদিন সকালে চা খেতে খেতে যুথিকা অভ্রকে জানালো, "বুঝলি অভ্র, আমার মাসতুতো বোন অনুভা আজ ভোরে ফোন করেছিল। বিয়ের পর ওর সাথে তো আর দেখাই হয়নি। এখন থাকে দুর্গাপুরে। আমাদের এখানে ওরা বেড়াতে আসবে বলেছে। ওর একমাত্র মেয়ের পরীক্ষাও শেষ হয়েছে। তাই হাতে সময় পেয়ে ওরা সবাই আসছে। এখানে কয়েকটা দিন থাকবে, আশপাশের জায়গা গুলো একটু ঘুরবে। খবরটা পেয়ে আমার তো খুবই আনন্দ হচ্ছে। সবাই মিলে একটু হৈচৈ করা যাবে। তোরও একঘেয়েমি কাটবে, কি বল?"
অভ্র খুশি হয়ে বললো, "খুব ভালো হবে মা। অনুভা মাসিকে তো আমি কখনো দেখিইনি।"
"অনুভা খুব ঠান্ডা স্বভাবের মেয়ে। ওর স্বামীও ভালো চাকরি করে, বেশ উঁচু পোষ্টে আছে। আর ওর মেয়েটাও নাকি লেখাপড়ায় খুব ভালো। তুই ওদের একটু আমাদের পুরুলিয়ার আশপাশের জায়গা গুলো ঘুরিয়ে দিস্।"
"কবে আসবে মাসি?"
"সামনের রবিবার।"
রবিবার অনুভা তার স্বামী বাসুদেব আর মেয়ে বর্ণাকে নিয়ে হাজির হলো। ওরা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে অভ্রর চোখ পড়লো বর্ণার দিকে। রীতিমতো সুন্দরী বলতে যা বোঝায় সেরকমটা না হলেও অসাধারণ একটা জৌলুষ আছে বর্ণার। হাঁটা-চলায় দারুণ সপ্রতিভ। এদিকে অভ্র আবার একটু লাজুক প্রকৃতির। অল্পবয়সী মেয়েদের সাথে মেলামেশা করার সুযোগ তার খুব একটা না ঘটায় মেয়েদের ব্যাপারে সে যথেষ্ট লজ্জাশীল। স্বভাবতই অনুভারা ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই অভ্র বর্ণার মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে তার নিজের ঘরে ঢুকে পড়লো।
দীর্ঘ বাইশ বছর পর দুই বোন পরস্পরকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। তাদের মধ্যে কথা যেন আর শেষ হতেই চায় না। অনুভা হঠাৎ যুথিকাকে জিজ্ঞাসা করলো, "কই রে দিদি, তোর ছেলেকে তো দেখলাম না।" যুথিকা হাসতে হাসতে বললো, "ছেলে তার নিজের ঘরে বইয়ের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে বসে আছে। ভীষণ লাজুক ছেলে। বর্ণাকে দেখে হয়তো আরো লজ্জায় জড়োসড়ো হয়ে গেছে।"
"ওমা, তাই বুঝি!"
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর অভ্র জার্নেল ঘাঁটছিল। হঠাৎ তার ঘরের দরজা টেনে ফাঁক করে মুখটা একটু বাড়িয়ে বর্ণা জিজ্ঞাসা করলো, "ভেতরে আসতে পারি?"
অভ্র প্রথমটা হকচকিয়ে গিয়ে তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে স্মিত হেসে বললো, 'আসুন।" বর্ণা সটান ঘরে ঢুকে অভ্রর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো, "বসতে বলবেন না?"
"নিশ্চয়ই, বসুন।"
অভ্রর পাশের চেয়ারটায় বসে বিন্দুমাত্র ভূমিকা না করে বর্ণা সোজাসুজি বললো, "আপনার বায়োডাটা আমি পেয়ে গেছি। আপনি আমার চেয়ে বছর খানেকের বড়ো। সেই হিসেবে আপনি-আজ্ঞা করাটা আমার সাজলেও আপনার সাজে না। আপনি আমাকে তুমি করেই ডাকবেন।" অভ্র তার বইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, "বেশ, তাই হবে। তুমি করেই ডাকবো। কিন্তু দাদাকে আপনি বলার রীতিটা এই বাঙলায় আছে বলে তো আমার জানা নেই।"
"ওমা! কে বলে আপনি লাজুক? কে বলে কথা বলতে জানেন না? এই তো দিব্যি কথা বলছেন। গ্রেট! বাঁচলাম বাবা, আপনি আপনি করে ডাকার অতো সময় আমার নেই। আমি তুমি তুমি করেই ডাকবো।"
"ঠিক আছে।"
"মোটেই ঠিক নেই। দেখি তো, মুখটা দেখি একবার। গাল দুটো লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে গেছে। শুধু দাদা ডাকে চলবে না। অমন রাঙা টুকটুকে গাল যখন, আমি রাঙাদা বলেই ডাকবো।
"মা শুনলে কিন্তু..."
"যুথিকা মাসি রাগ করবেন? বেশ, তাহলে না হয় আড়ালেই রাঙাদা বলে ডাকবো। কানে কানে ডাকবো।" একথা বলেই বর্ণা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে অভ্রর কানের কাছে মুখ এনে বলতে লাগলো, "রাঙাদা, ও রাঙাদা!"
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের পর যুথিকার নির্দেশ মতো অভ্র বর্ণাদের তিনজনকে গাড়ি করে নিয়ে চললো ঝালদার উদ্দেশে। বর্ণা পাহাড় দেখতে চেয়েছে। রাঁচি রোড ধরে ঘন্টাখানেক গাড়ি ছোটার পর অবশেষে কপিলা পাহাড়ের সামনে গাড়ি এসে থামলো। গাড়ি থেকে নামলো সবাই। সামনে উঁচু কপিলা পাহাড় এবং সংলগ্ন সবুজ অরণ্য। শ্রাবণ মাস। বৃষ্টি নেই, তবে আকাশে মেঘের আনাগোনা। নরম স্নিগ্ধ হাওয়ায় বর্ণার মাথার চুল উড়ছে। পাহাড়ের মাথা মেঘে ঢাকা। অভ্র বর্ণার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, "মেঘকে ছুঁয়ে দেখতে পাহাড়ের মাথায় উঠবে নাকি?"
বর্ণা দুষ্টু দুষ্টু চোখে তাকিয়ে বললো, "যেতে পারি যদি কেউ হাত ধরে ওঠায়।"
অভ্র লজ্জা পেলো। ওর গাল দুটো আবার লাল হয়ে উঠেছে দেখে বর্ণা দুষ্টু হাসি হেসে বললো, "ও রাঙাদা, হাতটা ধরো না, চলো পাহাড়ের মাথায় উঠি।" অভ্র তাকে ইশারায় থামতে বলে বললো, "মাসি মেসো শুনতে পাবে বর্ণা।"
"চিন্তা নেই রে বাবা, মা কানে খাটো। আর কোন্ মিউচুয়াল ফান্ডে টাকা রাখলে বেশি রিটার্ন পাওয়া যাবে, সেই চিন্তায় বাবা মগ্ন। ওরা কেউই আমাদের কথা শুনতে পাবে না।"
"ন্যটী গার্ল!"
কিছুটা হাঁটার পর অনুভা বললো, "আমরা বাপু পাহাড়ের উপরে উঠতে পারবো না। যেতে হলে তোরা ঘুরে আয়। আমরা ততক্ষণ সামনের মন্দিরটায় গিয়ে বসি।"
অভ্রর হাত ধরে উঠতে থাকে বর্ণা। বেশ কিছুটা উপরে ওঠার পর একটা গুহার সামনে এসে দাঁড়ালো দুজনে। অভ্র সেইদিকে বর্ণার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, "ঐ দেখ এক প্রাচীন গুহা। ওর দেওয়ালে সংস্কৃতে কতো কিছু লেখা আছে। সেসব পাঠোদ্ধার করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।"
বর্ণা আশ্চর্য হয়ে দেখতে দেখতে বললো, "এই পাহাড়ের নাম কপিলা কেন?
"শোনা যায়, মহামুনি কপিল এই গুহায় বসে সাধনা করতেন।"
"গঙ্গাসাগরের কপিল মুনি আর এই কপিলমুনি কি একই ব্যক্তি?"
"না। ইনি অনেক প্রাচীন ঋষি। ভারতের প্রাচীনতম দর্শন হলো সাংখ্য দর্শন। আর সেই দর্শনের প্রবক্তা হলেন এই কপিল মুনি।"
"সাংখ্য দর্শন? আমি তো নামই শুনিনি।"
"আমিও এই গুরুগম্ভীর বিষয় সম্পর্কে কিছু জানি না। তবে আমার ঠাকুর্দা একজন বিশিষ্ট সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে যেটুকু শুনেছি, সাংখ্য দর্শন অনুসারে কারণের মধ্যেই অব্যক্ত অবস্থায় রয়েছে কার্য। এখন যে কাজটা আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেটা কারণের মধ্যেই নিহিত ছিল।"
"বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো!"
"তাতো বটেই। তবে এতো গুরুগম্ভীর ব্যাপার নিয়ে আলোচনা এখন থাক। প্রকৃতি আমাদের বসার জন্য একটা সুন্দর আসন পেতে রেখেছে — যা পৃথিবীর যেকোন আসনের চেয়ে সুন্দর। চলো ঐ পাথরটার উপরে আমরা বসি।"
দুজনে একটা শিলাখন্ডের উপরে এসে বসলো। বর্ণা জিজ্ঞাসা করলো, "তুমি তো ক্যাম্পাসিংয়ে একটা চাকরি পেয়েই গেছো, জয়েন করছো নিশ্চয়ই?"
"ঠিক নেই। মাস্টার ডিগ্রী করারও ইচ্ছে আছে।"
"বিয়ে-পাগলা পাকা ছেলেরা অবশ্য চাকরিটার দিকেই এগোবে। চাকরি হলে তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ঘরে বউ আনতে পারবে।"
"আর যারা মাস্টার ডিগ্রী করতে যাবে?"
"তারা ভালো ছেলে, পড়ুয়া ছেলে।"
"তুমি কাদের পছন্দ করো?"
"চাকরির দিকে ঝোঁকা বিয়ে-পাগলাদের। এরা বৌ ছাড়া আর কিছু জানে না। সারা জীবন বৌয়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াবে।"
"বাহ্, এমন করে তো ভাবিনি কখনো।"
"আমার কবেই এসব ভাবা হয়ে গেছে।"
"ন্যটী গার্ল! সব কিছু জেনে বসে আছে। চলো এবার নেমে পড়ি।"
"না, আরেকটু বসি। তুমি একটু আগে সাংখ্য দর্শনের কার্য-কারণের কথা বলছিলে না? কথাটা যে কতো বড়ো সত্যি তা আমি আজ এখানে বসে টের পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে, আমাদের এই পাশাপাশি বসে থাকা, এই আকাশের দিকে আকুল হয়ে চেয়ে থাকা — এ হলো শুধু মাত্র একটা কাজ, যার পিছনে নিহিত কারণটা তুমি আমি জানি অথবা না জানি, এই মাথার উপর উড়ে চলা মেঘ, এই নির্জন পাহাড়, এই শাল-পিয়ালের অরণ্য — এরা সবাই কিন্তু জেনে গেছে।"
"সেই কারণটা কী বর্ণা?"
"খুব চুপি চুপি দুটো কুঁড়ি ফুটে ওঠা।"
"এই কুঁড়ি কি কোনদিন ফুল হয়ে ফুটে উঠবে?"
"ফুল হয়ে ফুটে না উঠলেও কুঁড়ি দুটো কিন্তু চিরসত্য হয়ে রয়ে গেল। মেঘ পাহাড় অরণ্য তার সাক্ষী।"
"এই সাক্ষীদের এখানে রেখে চলো আমরা এবার নীচে নামি। মাসি মেসো অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন।"
পাহাড়ের গড়ানে বর্ণা নামতে চেষ্টা করতেই অভ্র তার হাতটা ধরে ফেললো। বললো, "পাহাড়ে ওঠা সহজ, নামা কঠিন। হাত ছাড়বে না কিন্তু।"
বর্ণা হাসতে হাসতে বললো, "হাত ধরা কঠিন, হাত ছেড়ে দেওয়া তার চেয়েও কঠিন।"
"শুধু দুষ্টুমি।"
পরদিনটা ছিল গুরুপূর্ণিমা। আকাশে মেঘ না থাকায় চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল চারদিক। বর্ণা অভ্রর ঘরে ঢুকে কানে কানে বললো, "চাঁদের আলোয় আমার খুব বেরোতে ইচ্ছে করছে।"
"বেশ তো, ঘুরে এসো।"
"তাই বলে একা একা যাবো নাকি?"
"মাকে ম্যানেজ করতে হবে তো। ঠিক আছে, সামনেই যাচ্ছি বলে তুমি আগে বেরোও, আমি তোমায় খুঁজতে বেরোব।"
একটা সাদা শিফনের শাড়ি পরে যুথিকাকে বলে রাস্তায় বেরোল বর্ণা। কিছুটা এগিয়ে পিছন ফিরে সে দেখলো, অভ্র দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে। বর্ণা যেন তৈরীই ছিল। অভ্র কাছে আসতেই ওর হাতখানা চেপে ধরে নিজের মুঠির মধ্যে নিলো।
রাঁচি রোড ধরে চাঁদের আলোয় হাঁটছে যেন দুই অপার্থিব নরনারী। দুজনের হাত কোন এক যাদুমন্ত্রে বাঁধা পড়ে গেছে। বর্ণা ফিসফিস করে বললো, "চাঁদের আলো যে এমন সুন্দর হয়, আগে কখনো বুঝিনি। চাঁদটাও আজ আমাদের সাথে সাথে হাঁটছে। অথচ দেখো, এই চাঁদটা আসলে একটা মরা পাথর দিয়ে তৈরী।"
"ঐ চাঁদটার চেয়েও অনেক সুন্দর আরেকটা চাঁদ আছে — সে কি জানো?"
"সেটা কোথায়?"
"তোমার আমার বুকের ভিতরে। সেই চাঁদেও এখন ভরা পূর্ণিমা। তাই তো বুক জুড়ে ভরা কোটাল চলছে পরী।"
"পরী কে?"
"কে আবার, তুমি। এখন থেকে তোমায় পরী বলেই ডাকবো। তোমরা কতোদিন থাকবে পরী?"
বর্ণা উদাস কন্ঠে বললো, "বাবা বলছিল, সামনের রবিবার আমাদের চলে যেতে হবে। আমার কিন্তু যাবার সময় খুব মন কেমন করবে। তোমার খারাপ লাগবেনা?"
"খুব মন খারাপ হবে। তুমি চলে যাবার পর আমি যে কী করবো জানি না।"
পরদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বর্ণাকে সাথে নিয়ে অভ্র বেরোল। তার কাঁধে ঝুলছে একটা ক্যামেরা। একটা নির্জন পার্কে এসে বসলো দুজনে। জায়গাটা ভারী মনোরম। অভ্র ওর এক বন্ধুকে বলে রেখেছিল। সেই বন্ধু এসে ওদের দুজনের বেশ কিছু ফটো তুললো।
অবশেষে রবিবার এসে গেল। আজ বর্ণাদের ফিরে যাবার দিন। জিনিষপত্র সব গোছানো হয়ে গেছে। বেরোবার আগে সবার অলক্ষ্যে অভ্রর ঘরে ঢুকে বর্ণা ফিসফিস করে বললো, "তুমি কিন্তু মাস্টার ডিগ্রী কোর্সে ভর্তি হবে।"
"তবে যে বলেছিলে, চাকরি-করা বিয়ে-পাগলা ছেলেদের তুমি বেশি পছন্দ করো।"
"এমনি মজা করে বলেছিলাম। আমি পড়াশুনোর জগতে থাকা ছেলেদেরই বেশি পছন্দ করি।"
"তাই হবে পরী। কিন্তু ততোদিন তুমি অপেক্ষা করবে তো?"
"করবো।"
বর্ণারা চলে যাবার পর অভ্র ফটো গুলো প্রিন্ট করে এনে নিজের শোবার ঘরে বিছানার তলায় লুকিয়ে রাখলো। মা-বাবাকে তো আর ঐসব যুগল ফটো দেখানো যাবে না।
রেজাল্ট বেরোবার একদিন আগে অভ্র চলে এলো খড়গপুরে। রেজাল্ট হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরবে সে। বর্ণাও অধীর আগ্রহ নিয়ে অভ্রর রেজাল্টের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছে।
রেজাল্ট হাতে পেয়েই অভ্র মাকে ফোন করে খবরটা জানালো। বর্ণাকেও জানাতে সে দেরী করলো না। অভ্রর ভালো রেজাল্টে বর্ণা খুব খুশি।
রেজাল্ট হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরে অভ্র দেখলো, মা যেন বেশ গম্ভীর। অভ্রকে দেখামাত্র যুথিকা কাঁদতে আরম্ভ করলো।
হতভম্ব অভ্র মাকে জিজ্ঞাসা করলো, "একি! তুমি এমন করে কাঁদছো কেন? আমার রেজাল্ট তো খুব ভালো হয়েছে মা।"
"তুই এ কী করলি অভ্র?"
"কী করেছি আমি?
"বর্ণার সাথে এইভাবে তুই জড়ালি! আমার একমাত্র ছেলে তুই, আমার স্বপ্নকে এইভাবে ধ্বংস করলি?"
"বর্ণার সাথে তুমি আমায় কীভাবে জড়াতে দেখলে মা?
যুথিকা অভ্রর বিছানার তলা থেকে একটা খাম তুলে আনলো, তারপর সেখান থেকে এক গুচ্ছ ফটো বের করে এনে অভ্রকে দেখিয়ে বললো, "এসব কী করেছিস্? কী রকম বেহায়া মেয়ে, একেবারে ঘোমটা মাথায় দিয়ে তোর পাশে বসে!"
অভ্রর মুখে কথা নেই। ভুল করে ফটোগুলো ফেলে রেখে যাওয়ার খেসারত এখন তাকে দিতে হচ্ছে। ফটোগুলো কুটি কুটি করে ছিঁড়তে ছিঁড়তে যুথিকা বললো, "বেড়াতে এসে আমার সুখের সংসারে কিনা সিঁধ কাটা! এতো বড়ো বেইমানি? এ আমি কিছুতেই মেনে নেবো না। আমি এখনই ফোনে অনুভাকে সব জানাচ্ছি।"
দুই বোনে ফোনে কথা কাটাকাটি, দোষারোপ, পাল্টা দোষারোপের পর যুথিকা কাঁপতে কাঁপতে ঘরে খিল দিলো। বাপ বেটা মিলে কেউ তার ঘরের খিল খোলাতে পারলো না। অভ্র বন্ধ দরজার সামনে কাঁদতে কাঁদতে বললো, "মা, দরজা খোল। তুমি যা চাইছো — তাই হবে। আর কোনদিন বর্ণার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হবে না মা। তোমায় কথা দিলাম।"
অনেক রাতে যুথিকা যখন ঘরের দরজা খুললো, তখন তার গায়ে জ্বর। অভ্র মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, "যদি ভুল করেই থাকি, তাই বলে কি তুমি এইভাবে প্রতিশোধ নেবে?"
বর্ণার ফোন এসেছিল রাতের দিকে। অভ্র সব কথা জানিয়ে বললো, "আমাদের ভালোবাসার আকাশে ঝড় উঠেছে পরী। দমকা হাওয়ায় ডানা গেল ভেঙ্গে। আমাদের উড়ান চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল। যে কুঁড়ি দুজনের হৃদয়ে ফুটেছিল, তার আর ফুল হয়ে ফুটে ওঠা হলো না।"
৩
পরদিন সকালে তিন্নির ঘুম ভাঙ্গলো দেরিতে। অভ্রর লাগানো ফুল গাছটায় জল দিচ্ছিল সুচন্দ্রা। তিন্নি পাশে এসে জিজ্ঞাসা করলো, "মা, তোমার কোন মাসি-শাশুড়ী ছিল নাকি?"
"হ্যাঁ, ছিল। অনুভা মাসি।তবে ওদের সাথে আমার শাশুড়ীর খুব একটা ভালো সম্পর্ক ছিল না। তুই এসব জানতে চাইছিস্ কেন?"
"এমনি। আচ্ছা, ঐ মাসি-শাশুড়ীর ছেলে মেয়েদের নাম জানো?"
"অনুভা মাসির একটাই মেয়ে। বর্ণা। ওর নাম শুনলেই আমার শাশুড়ী রেগে যেতেন।"
"কী করেন তিনি? কোথায় থাকেন?"
"অনেকদিন আগে একবার শুনেছিলাম, দুর্গাপরে একটা কলেজে নাকি লেকচারার। এখন হয়তো আরো উঁচুতে উঠেছে।"
তিন্নি মনে মনে স্থির করলো, তাকে যে একবার দুর্গাপুর যেতেই হবে। তার বাবা যাকে হৃদয়ের গভীর গোপন কুঠুরীতে বৈদুর্যমণির মতো ধরে রেখেছিলেন, তিনি যে তারও একান্ত প্রিয়জন। তাঁকে খুঁজে বের করে একবার যে তাঁর সামনে গিয়ে তাকে দাঁড়াতেই হবে।