কলিংবেলটা বাজতেই টিনার ঘুমটা ভেঙে গেল। রবিবার মানেই টিনার আলসেমির দিন। গীতামাসি এসে খবরের কাগজটা আর এক কাপ গ্রিন টি টেবিলের ওপর রেখে জানলার পর্দাটা সরিয়ে দিয়ে গেল। টিনা চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। একঝাঁক পায়রা উড়ে এসে পাশের বাড়ির ছাদে বসলো। টিনার দৃষ্টি সুদূর অতীতে ফিরে গেল।
প্রতিদিন সকাল হলেই বাবার সঙ্গে ছাদে যেত একবাটি ছোলা নিয়ে। ছোলার বাটিটা উপুড় করে বাবা শরীরচর্চায় ব্যস্ত, আর সে কাক আর পায়রা গুনতে ব্যস্ত। কিন্তু সেই গোনাটা কোনোদিনই সঠিক হত না। চব্বিশটার পর পঁচিশ যেই হবে, তখনই দুটো উড়ে চলে যায়, তো আরও পাঁচটা উড়ে এসে বসে। বাবার ডাকে গোনা অসমাপ্ত রেখেই নীচে নেমে আসতে হত। নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণায় হাসির রেখা ফুটে ওঠে।
"টিনাদিদি, মা জিজ্ঞাসা করলেন আজ কী রান্না হবে?" গীতা মাসির ডাকে সম্বিত ফিরল।
"যা হোক একটা কিছু বানিয়ে দাও।"
বলেই চায়ের কাপটা মাসির হাতে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।
ব্যাঙ্কে কেওয়াইসি জমা দিতে হবে। টিনা আলমারি খুলে আধার কার্ড বের করল। কিন্তু প্যান কার্ডটা না পেয়ে আলমারির সব জামাকাপড়ের ভাঁজ তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল। মায়ের শাড়িগুলো আস্তে আস্তে খাটে নামিয়ে রাখল। বাবার জামাগুলো দেখতে গিয়ে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তার প্রাণ, তার বেস্ট ফ্রেন্ড। আজ কোথায় যেন সে বড় একা। মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক খুব ভালো হলেও বাইরের জগতে বাবা ছিল তার "ফ্রেন্ড, ফিলোসোফার আর গাইড"। সেই মানুষটা এভাবে হঠাৎ চলে যাবে, টিনা ভাবতেও পারেনি।
হ্যাঙ্গারে ঝোলানো বাবার কোটটার গায়ে খুব যত্ন করে হাত বোলাতে বোলাতে নাকটা কাছে নিয়ে যায়। আজ দশ বছর পরেও বাবার গায়ের গন্ধ পায়। কোটের পকেটে যেন কিছু একটা আছে। টিনা হাত ঢুকিয়ে বের করল একটা রঙচঙে খাম। কৌতূহলে খামের মুখ খুলতেই চোখ ছানাবড়া। এটা তো তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে লেখা প্রেমপত্র। উপরে জ্বলজ্বল করছে তারিখ "১৪/০২/১৯৮৫"। চল্লিশ বছর আগের ভ্যালেন্টাইনের দিন।
তখন তো টিনার বয়স এক বছর। তার মানে তখন বাবা স্ত্রী-কন্যাসহ সংসারী পুরুষ। অথচ মা-কে বাবার কাছে কোনোদিন অভিযোগ করতে দেখেনি সে। মা চিরকালই অন্তর্মুখী, চুপচাপ। সেই কারণেই বাবার ভক্ত বেশি ছিল। কিন্তু যে বাবাকে সে দেবতার আসনে বসিয়ে রেখেছিল, আজ তার সম্পর্কে নতুন ধারণা জন্ম নিচ্ছে। প্রশ্নের ঝড় বইছে মনে।
"প্রেমপত্র তো যে কেউ লিখতে পারে, কিন্তু এত বছর ধরে এত যত্নে রাখা মানে কী?"
"মাকে জিজ্ঞেস করবে?"
"না। স্বামী হারানোর ধাক্কা সামলে উঠে তিনি এখন নিজের কাজ আর আমার দেখভালেই ব্যস্ত। নতুন করে আঘাত দেওয়ার দরকার নেই।"
চিরকুটের লাইনগুলো বুকে ঝড় তোলে —
"তোমার সঙ্গে কাটানো সময়টা আমার জীবনের পাথেয় হয়ে রইল। আমি সারাজীবন তোমার অপেক্ষায় বসে থাকব।
ইতি, তোমার রাণী।"
কে এই রাণী? বাবার জীবনে তার ভূমিকা কী ছিল? উত্তর খুঁজতেই হবে। এখন ডিসেম্বর। নতুন বছরের আগেই এই রহস্যের শেষ দেখতে চায় টিনা।
দুপুরে খেতে বসেও খেল না। শরীর খারাপ বলে উঠে পড়ল। বিকেলে মায়ের ঘরে এসে বসল। ইনিয়ে-বিনিয়ে বিয়ের কথা, নিজের জন্মের কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল। মিনা দেবী অবাক হলেন। তিনি জানালেন, টিনার বাবা মৃণালের বাড়ি ছিল দিল্লিতে। দুজনেই জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন। পরে আলাদা হয়ে যাওয়া, আবার কলকাতায় ফিরে এসে পুনরায় দেখা, সেখান থেকেই প্রেম ও বিয়ে।
সেই সপ্তাহেই টিনা অফিসের কাজে দিল্লি যায়। টিনা সুযোগ নিয়ে বাবার পৈতৃক বাড়ির খোঁজ করে পৌঁছায় লোধী গার্ডেনে। দরজা খুলে অনিমেষ নামে এক ভদ্রলোক। নিজের পরিচয় গোপন রেখে বাবার বন্ধুর মেয়ে বলে পরিচয় দেয়। অনিমেষ মাকে ডাকেন। সধবা মহিলা ঘরে ঢুকতেই টিনার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়।
"আমিই সেই রাণী," মহিলা বলেন। "আমি ওনার স্ত্রী। অনিমেষ আমাদের একমাত্র সন্তান। বিয়ের এক বছর পর উনি বদলি হয়ে বেঙ্গালুরু যান। তারপর চিঠি বন্ধ হয়ে যায়। আমরা আর কোনো খোঁজ পাইনি।"
অনিমেষ বলে ওঠে, "আমি একবার ওনার মুখোমুখি হতে চাই। মায়ের কী দোষ ছিল?"
টিনা বলতে পারে না, দশ বছর আগে মানুষটা মারা গেছেন। শুধু বলে, "আপনি কাল আমার হোটেলে আসুন।"
বছরের শেষ দিন। লাগেজ গুছিয়ে টিনা বসে থাকে অনিমেষের অপেক্ষায়। জানাতে চায় নির্মম সত্যটা — এই জীবনে বাবা-ছেলের দেখা আর হবে না। অপেক্ষাটা রয়ে যাবে অনন্তকালের। আর তার নিজের মনে প্রশ্ন থেকেই যায় — সব জেনেও কি তার মা নীরব ছিলেন, নাকি বাবা সব গোপন করেই বিয়ে করেছিলেন? উত্তর কোথায়? সে জানে না।
লেখিকা মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরের বাসিন্দা। বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করেছেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। শৈশব থেকেই তাঁর মায়ের উপস্থিতিতে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ গড়ে ওঠে। স্কুলের ম্যাগাজিন, পুজোর পত্রিকায় লেখা প্রকাশের মধ্য দিয়েই লেখালেখির শুরু। এরপর নানা পত্র পত্রিকায় বহু কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ছন্দময় কবিতার প্রতি অধিক আকর্ষণ। লেখালেখি ছাড়াও তাঁর বিশেষ শখ হল আবৃত্তি, সবুজ প্রকৃতি চর্চা এবং হস্তশিল্প। বর্তমানে সংসার জীবনের আবর্তে একমাত্র কন্যার প্রেরণা তাঁর লেখার উৎসাহকে উজ্জীবিত করে।