হরি ঘরের চায়ের দোকান। নতুন বাজারের মোড়ে টিনের ছাউনি দেওয়া একটা ছোট্ট চালা। পাশে একটা সাইনবোর্ডে বড় বড় করে লেখা — "হরি ঘরের স্পেশাল চা"। সামনে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বেঞ্চ করা আছে খদ্দেরদের বসার জন্য। ভোর পাঁচটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে। এলাকার চালু দোকান। দুধ চা, মশলা চা, আদা দেওয়া লেবুর চা — এমনকি এখন কফিও পাওয়া যায় খদ্দেরদের চাহিদা অনুযায়ী। চায়ের জাত বুঝত হরি। তাই তো এলাকায় একটা কথা এখনো চালু আছে — "হরি ঘরের স্পেশাল চা খেয়ে খাইয়ে বাড়ি যা।"
প্রায় ত্রিশ বছর হলো হরি গত হয়েছে। বড় ছেলে বিশু এখন চায়ের দোকানের মালিক। ছোট ছেলে যিশু পাশে মুদিখানার দোকান করেছে। বিশুর বয়স এখন পঁয়ষট্টি। সারাজীবন চা করেই কেটে গেল। পড়ালেখার মন ছিল না। বখাটে ছেলের মতো টো টো করে ঘুরে বেড়াত বনে — জঙ্গলে। মাধ্যমিকও পাশ দিল না। জোর করে হরি দোকানে বসালো। খদ্দেরদের চা দেওয়া, কাপ-প্লেট ধোয়া — সবই করতে হয়।
তখনো নতুন বাজার গড়ে ওঠেনি। মোড়ের বড় রাস্তায় ছিল 'গান্ধী মেমোরিয়াল স্কুল' — মাধ্যমিক পর্যন্ত। এখন অবশ্য উচ্চমাধ্যমিক হয়েছে। তাও দেখতে দেখতে প্রায় কুড়ি বছর হয়ে গেল। বকুলতলা গাঁয়ের দীনুজ্যাঠা যে বছর স্কুলে মাস্টারি পেল, সেই বছরেই উচ্চমাধ্যমিক হল। যতদূর মনে পড়ে, বিশুর ব্যাটা জিতেনরাই প্রথম ব্যাচ। হ্যাঁ, এবার মনে পড়েছে — সেই বছরেই ফুটবল খেলাতে 'নেতাজী বয়েজ স্কুল'কে হারিয়ে কাপ জিতেছিল আমাদের 'গান্ধী মেমোরিয়াল'। বংশীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে গোপাল বলল, "আর ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিল জিতেন।"
গল্পের মধ্যেই জেগে ওঠে পুরোনো সব স্মৃতি। চা খেতে খেতেই ওদের গল্প চলে। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের ভাঁড়, সাথে সিগারেটের সুখটান। কেউ পায়ের ওপর পা তুলে, কেউ সোজা বসে, কেউ আবার দাঁড়িয়ে। চলছে চায়ের ঠেকে জমিয়ে আড্ডা।
লাল কাঁকুরে রাস্তা। রাস্তার ওপারে সবজি বাজার — প্রতিদিন বিকেলে বসে। আশেপাশের গাঁ থেকে টাটকা সবজি বিক্রি করতে আসে চাষিরা। বাইরে কাজ বা অফিসফেরত লোক, দোকানিরা, এমনকি গাঁয়ের লোকেরাও এখান থেকেই বাজার করে। সামনে ফুটবল মাঠে একদল ছেলে ফুটবল খেলছে — অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর ছেলেগুলো। কখনো "গোল" বলে উল্লাস করে, কখনো আবার কাঁধে হাত রেখে গোল করে দাঁড়িয়ে খেলার ছক কষে। মাঠের দক্ষিণ দিকে অনেকে শরীরচর্চায় ব্যস্ত। কেউ আবার হাঁটছে পেটের মেদ কমাতে। আবার অনেকে জটলা করে বসে গল্পে মশগুল। কথায় আছে — যার যেমন ভাব, তার তেমন লাভ।
মাঠের পাশ দিয়ে কালো পিচের রাস্তা। ছাদে, বাম্পারে লোক নিয়ে নতুন মোড়ে এসে দাঁড়ায় 'শিবশক্তি' বাসটা। বংশী তাকিয়ে থাকে বাসটার দিকে — যাত্রীদের নামা-ওঠা দেখে। কিছুক্ষণের জন্য রাস্তায় ভিড় হয়। ক্লান্ত মানুষগুলোর ঘরে ফেরার তাড়া, কেউ কেনে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, কেউ আবার বন্ধু দেখে নিছক আড্ডা দিতে দাঁড়িয়ে পড়ে দোকানের দাওয়ায়। একটু পরে সব ফাঁকা। ব্যস্ত রাস্তা সুনসান। শেষ টিপ পার হবে সন্ধ্যা সাতটায়। বংশী সিগারেটে একটা টান দিয়ে আনমনে ধোঁয়া ছাড়ে। কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে যায় উপরে।
“অদ্ভুত জীবন। ভাগ্যের ওঠানামা, ব্যস্ততা, চাওয়া — না-পাওয়ার যন্ত্রণা, সুখ — দুঃখের মধ্য দিয়েই কেটে গেল জীবনটা। এখন শেষ লগ্নে এসে মনে হয় — আবার যদি নতুন করে শুরু করা যেত।” দীর্ঘশ্বাস পড়ে।
এই তল্লাটে তখন এই একটাই স্কুল। স্কুলের পাশে ফুটবল মাঠটা বহু পুরোনো। আশেপাশের গাঁয়ের ছেলেরা এই মাঠেই ফুটবল খেলতে আসত। ফুটবল টুর্নামেন্টের সময় উপচে পড়ত লোক। বড় বড় গাছের ডালে বসে খেলা দেখত। এই অভিজ্ঞতা বিশুরও আছে। তখন ওর বয়স দশ-এগারো হবে। হরির সঙ্গে আসত খেলা দেখতে। তখন তো এই মোরাম রাস্তাটা ছিল না। জমির আল দিয়ে যাতায়াত করতে হতো। বর্ষাকালে, টানা বৃষ্টিতে যাতায়াত প্রায়ই বন্ধ হয়ে যেত। মাঠের পর মাঠ সবুজ ধানের ক্ষেত। অনেক দূরে ছোট ছোট গ্রাম। সূর্য ঠাকুর পাটে বসলেই আল ধরে কেউ পেরোবার সাহস দেখাত না — খুব প্রয়োজন না হলে।
সমস্যা হতো রাতবিরেতে শরীর খারাপ হলে। গাঁয়ে বদ্যিঠাকুর একমাত্র ভরসা। বাড়াবাড়ি হলে কাশীপুর প্রাথমিক চিকিৎসালয়ে নিয়ে যেতে হতো। খানাখন্দ, আলের রাস্তা, জল-কাদা ডিঙিয়ে চার ক্রোশ পথ রাতের অন্ধকারে মনে হতো দশ ক্রোশ পথ। তারপর আবার বটতলা পেরোনোর সময় বুকের ভেতরটা কেমন ঢিবঢিব করত। “তেনাদের বাস।” গাঁয়ের কত লোক গাছের তলায়, মগডালে সাদা শাড়ি পরে তেনাদের দেখেছে। হরি বরাবরই খুব ডাকাবুকো। সন্ধ্যায় হোক আর গভীর রাতেই হোক, কারোর কোনো অসুবিধা হলে হরি সকলের জন্য সবসময় তৈরি। তবে বটতলা পেরোনোর সময় গা ছমছম একটা ভয় — ভয়ভাব, মনে হয় কেউ যেন পিছু নিয়েছে। এটা হরিও স্বীকার করেছে অনেকের কাছে। "সীতারাম সীতারাম" করলে ভয়টা দূর হয়। এই ভয়ে গাঁয়ের বউরা পোয়াতি হলে বাপের বাড়ি বা কোনো নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো।
বকুলতলা গাঁয়ের লোক চাষবাস, সবজি বিক্রি আর গাঁয়ের মধ্যে দু-একজন মুদিখানার দোকান করত। হরির জমিজমা যা ছিল সারাবছর খেতে কুলাত না। এর-ওর ফায়ফরমাস খেটে, কখনো লোকের জমিতে কাজ করে সংসার চালিয়েছে। অভাব কী জিনিস হাড়ে হাড়ে বুঝত হরি। কত রাত ছেলেদের মুখে একটু খাবার তুলে দিয়ে হরি আর ওর বৌ শুধু জল খেয়ে সারারাত পার করেছে। গেঁটে শাক, কলমী শাক, নুন আর ফেনাভাত ছিল ওদের কাছে অমৃত। তবুও দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না হরি। কিছু একটা করবই — জেদটা ছিল বরাবরই।
একবার ফুটবল টুর্নামেন্টের সময় চা বিক্রির কথা ওর মাথায় চাপল। ব্যাস — একটা স্টোভ, কেটলি, চা, চিনি, দুধ, কয়েক প্যাকেট বিস্কুট, একটা বালতি আর কিছু মাটির ভাঁড় নিয়ে হাজির হলো ফুটবল মাঠে। একটা গাছের তলায় বসলো। সে বছর শীতটাও ছিল জম্পেশ। বিক্রি হলো ভালোই। সেই শুরু। রাস্তাঘাট, স্কুলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হল হরির অবস্থা। যেটা হয়নি, তা হল ওর নাম। এলাকার ছোট-বড় সকলের কাছেই হরি। হরির চায়ের দোকান ঠিকানায় পরিণত হলো। স্কুলের শিক্ষক, গাঁয়ের মুরুব্বি, ছেলে-ছোকরার দল — সবারই আড্ডার জায়গা হরির দোকান।
বটতলা আর আগের মতো নেই। চারদিকে চওড়া সিমেন্টের বেদি। ক্লান্ত পথযাত্রী কিছুটা সময় বিশ্রাম নেয় শীতল বটবৃক্ষের তলায়। পাখির কিচিরমিচির, বাউল একতারায় সুর তোলে। উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠে —
"গ্রামছাড়া ওই রাঙামাটির পথ
আমায় মন ভোলায় রে।"
আশেপাশের গ্রামের ছেলেরা চাকরির আশা ছেড়ে ব্যবসা শুরু করল স্কুলকে কেন্দ্র করে। সবজি বাজার, হোটেল, মিষ্টির দোকান, স্টেশনারি, পার্লার, টেইলারিং, কোচিং সেন্টার — সবকিছু নিয়ে সেজে উঠল স্কুল মোড়। এলাকার মুরুব্বিরা নাম দিল নতুন মোড়। এলাকায় এখন জমাটি বাজার। বিশুদের চোখের সামনে ঘটল সব। বংশী বলল, দীনুজ্যাঠা আগেই বলেছিল — "এই তল্লাট একদিন জমাটি হবে। এই স্কুলই আলো জ্বালাবে গ্রামগুলোর।" সত্যি হলোও তাই।
গোপাল কাঁচের জার থেকে বেকারির একটা খাস্তা বিস্কুট বের করে বলল, "জ্যাঠা কয়েক দিন আসেনি। কী ব্যাপার বলত, জানিস কিছু?" এক কাপ চা দে বলে বিস্কুটে কামড় দিল।
"না। কোনো খবর নিতেও পারিনি। কয়েক দিন টানা নিম্নচাপের জন্য আসেনি হয়তো।"
"এই তো দুদিন আগেই দীনুজ্যাঠাকে দেখলাম। রাস্তায় হাঁটছিল। কেমন আনমনা ভাব। কয়েকবার ডাকলাম — সাড়া দিল না। আমার তাড়া ছিল। তাই আর কাছে গিয়ে কথা বলিনি ভাই। তবে যাই বল, নাতিটা চাকরি পাওয়ার পর জ্যাঠার পরিবর্তন হয়েছে। পাত্তাই দেয় না। আরে বাবা, টাকা আছে — তা তোমার আছে। আমার বাপের কী? তার জন্য অহংকার করার তো কিছু নেই।"
"তুই যাই বল। আমার কিন্তু তা মনে হচ্ছে না। এত বছর ধরে দেখছি মানুষটাকে। সহজ, সরল — একজন নিপাট ভদ্রলোক। হঠাৎ করে অহংকারী হয়ে যাবেন — এটা মনে হয় না।" এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে বলল, "আমার মনে হয় পারিবারিক কোনো কাজ বা শরীর খারাপ বলে আসেনি হয়তো।"
বংশীর কথাটা পছন্দ হল না।
রাত বাড়ে। পরিষ্কার আকাশ। জ্যোৎস্নার আলোয় আলোকিত হয়ে আছে চারদিক। বিশু দোকানের ঝাঁপ ফেলে। অনেক দিনের পুরোনো সঙ্গী সাইকেল নিয়ে বাড়ির পথ ধরে। কয়েক দিন ধরে ভালো নেই মনটা। আগামীকাল খোঁজ নিতেই হবে দীনু জ্যাঠার। পুরোনো খদ্দের — কত বছরের সম্পর্ক জ্যাঠার সঙ্গে। হরির দোকানের চা না খেলে যেন ভাত হজম হয় না। সেই মানুষটি আসছে না — চিন্তা তো হবেই।
সাইকেলের প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে পৌঁছাল ঘরের সদর দরজায়। শরীরটা আজ বড় ক্লান্ত। কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়ল বিশু। একটু বিশ্রাম দরকার। বালিশে মাথা রেখে শরীরটা এলিয়ে দিল বিছানায়। চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। ঘুম ধরল না দুচোখে। ঘুম না হলেই বার বার উঠতে হয় — এই বয়সটাই এ রকম। চোখ বন্ধ করে বসে রইল বিছানায়।
ভোরের আলো ফুটেছে। পাশের শিরিস গাছে কোকিলটা থেমে থেমে ডেকে যাচ্ছে — কুহু কুহু। জিতেনের বৌ বার দুয়ারে মাড়ুলি দিয়ে চায়ের জল বসিয়ে উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছে। বিশু দোকান যাওয়ার জন্য তৈরি। ও বাড়িতে চা খায় না। দোকানে ধূপ জ্বেলে চা করে। ফার্স্ট টিপ বাসযাত্রীদের চা দিয়ে তারপর খায় — প্রতিদিনের রুটিন। আজও তার অন্যথা হয়নি।
সময়মতো দোকানে হাজির। কিন্তু দোকানের সামনে জটলা দেখে বিশু চমকে উঠল। সাইকেল দাঁড় করিয়ে এগিয়ে গেল। দীনু জ্যাঠার নাতিকে দেখে একটা অজানা ভয়ে শিউরে উঠল। অস্ফুট স্বরে বলল, "কী হয়েছে?"
"দাদুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।"
"কী বলছ? একটা মানুষ এমনিই উধাও হয়ে যাবে?"
"দাদুর যে স্মৃতি হারিয়ে গেছে।"
বিশুর পা টলটল করে। মাথা ঘুরে পড়ে যায়। কানে ভেসে আসে —
"এক কাপ চা দে বাবা।"