Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
আক্রোশ
শম্পা তখন একাদশের ছাত্রী। টিউশন পড়ে রাতে বাড়ি ফিরে টেবিলের উপর একটা বিয়ের কার্ড দেখতে পেল। মাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল বিয়েটা ওদের সেই গোপাল কাকার। মুহূর্তে শম্পার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে হাজার প্রশ্ন।
আক্রোশ

শম্পা পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী আর ভাই বাবাই তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। দুজনে স্কুল থেকে ফিরে প্রতিদিনের মতো সেদিনও মায়ের রেখে দেওয়া টেবিলের উপরে ভাত আর মাছের ঝোল খেয়ে কাঠের ঘোড়ার পিঠে চেপে দোল খাচ্ছিল; চারপেয়ে ঘোড়ার পায়ের নিচে নৌকা লাগানো যে! এই খেলাটি তাদের রোজকার ভালোবাসা। সন্ধ্যা হলে হোমটাস্ক নিয়ে বসতে হয়। জোরে পড়তে হবে, নয়তো মা শুনতে পাবেন না। সেদিনও প্রাত্যহিক সূচির মতোই চলছিল বিকেলটা। তবে সন্ধ্যে হলেই আবার লোডশেডিং; হারিকেন জ্বেলে মা শম্পাকে আর বাবাইকে হারিকেনের দুপাশে বসিয়ে দেবেন পড়তে। কিন্তু তার চেয়েও বেশি অসুবিধা পাশের কারখানার জেনারেটরের শব্দ! গরমকালে দক্ষিণের দরজা দিয়ে হাওয়া আসে। তাই এক কামরার ভাড়া বাড়িতে দরজা খুলে সন্ধ্যার পড়া শুরু হয়েছিল সেদিনও।

পড়া শুরু হতেই অফিস থেকে বাড়ি ফিরলেন বাবা। সেদিন লোডশেডিং না হওয়াতে শম্পা আর বাবাই মন দিয়ে হোমওয়ার্ক করছিল। শেখরবাবু, ওদের বাবা, সরকারি চাকরি করেন। বাড়ি ফিরে চা-মুড়ি খেতে খেতে রেডিওতে কান দিয়ে খবর শুনছিলেন। ছন্দাদেবী, শম্পা-বাবাইয়ের মা, বাইরের রাস্তায় একটা শোরগোলের শব্দ শুনে জানলার কাছে যেতেই আলো নিভে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ভালো করে কিছু দেখা গেল না। পেছন ঘুরে দেশলাই খুঁজে হারিকেন জ্বালাতে যাবেন এমন সময় রাস্তার শোরগোল আরও জোরালো হলো। কে যেন চিৎকার করছে, "বাঁচাও, বাঁচাও!" পড়া থামিয়ে শম্পা মাকে জিজ্ঞেস করল, "গোপাল কাকুর গলাতো? কী হল মা?" মা-বাবা নীরব। বাইরে কারা যেন লাঠি দিয়ে মারছে আর বলছে, "সাত বছরের অন্যায়ের বিচার হবে।" সঙ্গে ভেসে আসছে গোঙানো কান্নার সঙ্গে "আহ মাগো, উফ বাবারে..."। শম্পা আশ্চর্য হয়। ভাবে, আজ জেনারেটরের শব্দ নেই তো! কাকে কারা এমনভাবে মারছে, বাবা-মা কেন লোকটাকে বাঁচাতে যাচ্ছে না! সত্যিই যদি গোপাল কাকু হয়, সে দোষ কী করল? কারা মারছে?

হঠাৎ দরজায় কেউ নক করছে মনে হলো। শম্পার মা-বাবা ভয়ে স্তব্ধ। শম্পা ভাইকে দুহাতে আগলে রাখে। শরীরে কাপুনি, দরজার দিকে এগোনোর জন্য পা বাড়াতে পারছে না। অসম্ভব অন্ধকার আর অসম্ভব ভয় বাইরের কারোর আর্তনাদে গ্রাস করছে চারজনের পরিবারটিকে। আবার নক করছে দরজায় কেউ! শম্পা এগিয়ে জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। মাকে বলল, দরজায় রানু পিসি। রানু পিসি ওদের প্রতিবেশী। ছন্দাদেবী মেয়ের কথায় দরজা খুলল। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে রানু পিসি বলল, "গোপালকে মেরে ফেলল রে!" রানু পিসি শম্পার মায়ের বন্ধু। ছন্দাদেবীর চোখেও জল। কিন্তু শম্পার মনে প্রশ্ন — গোপাল কাকু তো বাবার কাছে আসেন মাঝে মাঝে; বাবাকে শেখরদা, মাকে বউদি ডাকেন, চা খান, গল্প করেন। তবে আজ কেন তাঁকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে যাচ্ছে না?

বেশ খানিক সময় পর আর্তনাদের শব্দ মিলিয়ে যেতে লাগল। রাত নটা নাগাদ আলো এলো। সেদিন রাতে শম্পার বাড়ির কারোর মুখে কথা ছিল না, খিদে ছিল না। অনেক রাত শেখরবাবু খবর শুনছিলেন। শম্পা শুনতে পেল মা-বাবা আলোচনা করছেন — কিছুদিনের জন্য কোথাও গা ঢাকা দেওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু কেন? আমরা কেন?

সাহস করে সে রাতে শম্পা মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করতে পারেনি কেন এই গা ঢাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত। নভেম্বর মাসের এই ঘটনায় শম্পার জীবনের পথচলা পিছিয়ে গেল এক বছর। সেবার বার্ষিক পরীক্ষার আগেই সপরিবারে চলে যেতে হয়েছিল ডালমিয়ানগর (বিহার) পিসির বাড়ি। পরের বছর আবার পঞ্চমে ভর্তি হতে হয়েছিল শম্পাকে আর ভাইকে তৃতীয়তে।

ছয় বছর পর। শম্পা তখন একাদশের ছাত্রী। টিউশন পড়ে রাতে বাড়ি ফিরে টেবিলের উপর একটা বিয়ের কার্ড দেখতে পেল। মাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল বিয়েটা ওদের সেই গোপাল কাকার। মুহূর্তে শম্পার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে হাজার প্রশ্ন। মনে করার চেষ্টা করে ছয় বছর আগের সেই অন্ধকার রাতের কথা। তবে সেদিন তো শুনেছিল রানু পিসির মুখে, "গোপালকে মেরে ফেলল রে!" তবে কি রানু পিসি ভুল করেছিল?

কৌতূহলে শম্পা বাবা-মায়ের সামনে ১৯৭৭ সালের নভেম্বরের সেই রাতের প্রকৃত ঘটনা জানতে চায়। শম্পার বাবা বলতে থাকেন — সেবছর রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে বিজয়ী দলের সমর্থকদের '৭২ থেকে '৭৭-এর বিচার চাইতে পুরোনো আক্রোশের শিকার ছিল পরাজিত দলের সমর্থকরা। তাই সেদিন কৃত্রিম লোডশেডিং করে পরাজিত দলের সক্রিয় কর্মী গোপাল কাকাকে মারা হয়। হয়তো প্রাণটাই চলে যেত, কিন্তু সব দলেই ভালো কিছু মানুষ থাকেন। সেদিন রাতে প্রকাশ কাকা, বিজয়ী দলেরই সমর্থক, নিজের দায়িত্বে গোপাল কাকাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। শম্পার বাবাও পরাজিত দলের সমর্থক হওয়ায় প্রায়ই কাজে বা বাজারে যেতে টোন-টিটকিরির শিকার হতেন — "এবার সাত বছরের বিচার হবে!" সেই রাতে গোপাল রায়ের উপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন শম্পার বাবা-মায়ের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রেডিওতে শোনা খবরগুলো আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই রাতারাতি পাড়া ছেড়ে পিসির বাড়ি চলে যায় শম্পার পরিবার। দেওয়া হয়নি দুই ভাইবোনের সে বছর বার্ষিক পরীক্ষা। আক্রোশ আর আতঙ্ক সেবছর রাজনৈতিক বোধশূন্য দুটি শৈশবের এগিয়ে যাওয়ার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়।

সব বুঝতে পারে শম্পা। তবে প্রশ্ন থেকে যায় — গোপাল কাকা এতদিন কোথায় ছিল? বাবা জানান, অনেকদিন দিদির বাড়িতে থেকে হারানো চাকরি ফিরে পেতে কেস চালাচ্ছিল। '৮৩ সালের শুরুতে কেস জিতে পরিবহন সংস্থার চাকরি ফিরে পেয়েছে। তাই দিদিই এখন ভাইয়ের বিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। শম্পা ভাবে, গোপাল কাকা সব পাওনা টাকা আর চাকরি ফিরে পেলেন, কিন্তু শম্পা আর বাবাইয়ের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া বছরটা আর ফিরে পাওয়া যাবে না। সেদিনের আলো নিভিয়ে দেওয়া যে লোডশেডিং ছিল না, তা এতদিনে শম্পার কাছে পরিষ্কার হলো।

শম্পা ভাবতে থাকে — পাঁচ নয়, সাত বছরের আক্রোশ? কেন? শম্পা একাদশের আর্টসের ছাত্রী; রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ছে। ডান-বাম রাজনীতির গোড়ায় থাকা মতবাদগুলো সম্পর্কে শিক্ষক যা বলেছিলেন — মার্ক্সবাদ, উদারনীতি, গান্ধীবাদ — সব মিলিয়ে আজ বাবার কথায় ওর মনে প্রশ্ন জাগে। ডান-বাম দলের সকলের কাছে কি মতবাদগুলো সত্যিই পরিষ্কার? নাকি এও এক মোহ, এক আবেগ, এক স্বার্থসিদ্ধির নেশা — কার দোষে সে আজ দ্বাদশের ছাত্রী না হয়ে একাদশের ছাত্রী?




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 1 ভোট
স্টার
guest
3 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top