দোকানের ঝাপটা খুলে তড়িৎ হাতে জল ছিটিয়ে দোকানের সামনেটা ঝাঁট দিল সবিতা। চায়ের দোকান, "চা-বিস্কুট"! একটা টেবিল, দু'ধারে দুটো বেঞ্চি। তাকের উপর রাখা মা-কালি, লক্ষী, গণেশের ছবি। হাতধুয়ে ধূপ দীপ জ্বেলে প্রণাম করে গ্যাসস্টোভ ধরিয়ে একটা ডাউস কেটলিতে চায়ের জল চাপিয়ে শেল্ফে রাখা বিস্কুটের বোতলগুলো ঝাড়-পোঁছ করছিল সবিতা।
"চা পাওয়া যাবে?" সবিতা ঘার ঘুড়িয়ে দেখল এক নতুন মুখ, ছিপছিপে লম্বা সম্ভ্রান্ত চেহেরা। মনে হচ্ছে মর্নিংওয়াক সেরে ফিরছেন।
সবিতা বলল, "দুমিনিট বসুন, আমি বানিয়ে দাচ্ছি, তা কি চা চাই বলুন? কালো চা, দুধ চা, চিনি দিয়ে, চিনি ছাড়া, আদা চা, লেবু চা..."
ওকে থামিয়ে আগন্তুক সহাস্যে বললেন, "আপনার দেখছি চায়ের বিরাট ফর্দ! আমাকে কড়া করে একটা বড় কালো চা, সাথে একটা টোস্ট বিস্কিট, নো ক্রিম, নো শুগার। সরি, মানে দুধ চিনি ছাড়া..."
সবিতা বলল, "দাদা কী এ পাড়ায় নতুন?"
ইতিমধ্যে পেপারওয়ালা খবরের কাগজটা দিয়ে গেল। হাতে কাগজটা নিয়ে আগন্তুক বললেন, "হুঁ, এই দিন সাতেক হল এখানে এসেছি। কাগজটা পড়তে পারি?"
"নিশ্চয়, ওটা আপনাদের জন্যই।"
চা ভর্তি একটা বড় ডিসপোজেবল গ্লাস সামনে রেখে সবিতা বলল, "নিন আপনার চা-বিস্কুট। দেখুন পছন্দ হয় কিনা!"
খরিদ্দার আসছে, চা খাচ্ছে ,পয়সা দিয়ে বা লিখে রেখো দিদি বলে চলে যাচ্ছে। প্রাতঃভ্রমণ সেরে নানা বয়সের মহিলা পুরুষের একটা দল এসে দোকানে ঢুকল। দেখতে দেখতে ছোট দোকানটার চেহারা পাল্টে গেল। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে নিজেদের মধ্যে আলাপ আলচনায় ব্যস্ত। বোঝা যাচ্ছে এরা এখানে নিয়মিত খরিদ্দার। সবিতা সবাইকে হেসে অভ্যর্থনা জানিয়ে একে একে সবার পছন্দ মতো চায়ের পাত্র বিস্কুট সহযোগে এগিয়ে দিল।
আগন্তুক ভদ্রলোকটি চায়ের দাম মিটিয়ে চলে যাচ্ছিলেন, আবার আসবেন দাদা বলে সবিতা হাসি মুখে বিদায জানাল। দোকান থেকে বাইর পা বাড়াতেই হঠাৎ পিছন থেকে কেউ ডাক দিল, "আরে স্যার, আলাপ পরিচয় হলো না চলে যাচ্ছেন?" আগন্তুক পিছন ফিরতেই এক প্রবীণ ব্যক্তি এগিয়ে এসে হাত বাড়িযে করমর্দন করে, "অধমের নাম সাধন রায়, ডিফেন্সে ছিলাম, রিটায়ার করেছি। আর একে দেখে রাখুন লোকাল থানার বড়বাবু শিবপ্রসাদ সামন্ত। পুলিশের লোক হাতে থাকা ভাল বুঝলেন তো।" নিজের রসিকতায় হা হা করে হাসলেন সাধন বাবু।
আগন্তুক বললেন, "আমি অতনু সরকার, গবেষনার কাজে দীর্ঘ দিন বাইরে কাটিয়ে দেশে ফিরেছি। এই দিন সাতেক হলো এ পাড়াতে একটা ফ্ল্যাট কিনে নতুন এসেছি।" এক প্রবীণা জিজ্ঞাসা করলেন, "কেমন লাগছে আমাদের এই পাড়াগাঁয়ে?" আগন্তুক থুরি অতনু জবাব দিলেন, "শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে সবুজে ঘেরা শান্ত পরিবেশ... আমি এমনটাই খুঁজছিলাম। ফ্ল্যাটটা ও আমাদের বেশ পছন্দ হয়ে গেল, ব্যস, চলে এলাম।" অনেকে এগিয়ে এল, প্রাথমিক আলাপ পরিচয়ের পর আবার দেখা হবে বলে সবাই নিজেদের গন্তব্যর দিকে এগিয়ে গেল।
পরদিন সকালে যথারীতি সবাই এসেছে। অতনুও এল। চায়ের সাথে আড্ডাটা বেশ জমে উঠল। ধীরে ধীরে অতনু সবার কাছে বেশ প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল। অফিসের কাজে বাইরে গেলে ওর অনুপস্থিতিটা সবাই অনুভব করত। একটু অন্তর্মুখী কিন্তু কথা শুনলে বোঝা যায় যে লোকটা কত কিছু জানেন। কত চবছর বিদেশে কাটিয়েছন অথচ কোন চালিয়াতি নেই। অবান্তর কথা, পলিটিক্স নিয়ে মাতামাতি নেই, তবে ফুটবল নিয়ে কথা উঠলে তখন যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়।
সবিতার মনে আছে সেবার অতনু আয়োজন করল সবাই একসাথে বসে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলা দেখবে! সবিতার দোকানে টিভি নেই। ম্যাচ শুরু হবার আগে অতনু তার ল্যাপটপ নিয়ে এসে কী সব কেরামতি করল! এক পর্দা লাগিয়ে তাতে সিনেমার মত বড় করে ম্যাচ দেখল সবাই। সে কী উত্তেজনা! গোওল, গোওওওল করে হাত তালি দিয়ে চিৎকার করে রিতিমত নাচানাচি করছিল অতনু। এই ফুটবল পাগল মানুষটার সাথে রোজ দেখা গম্ভীর মুখে কাগজ পড়া, স্বল্প ভাষী সেই মানুষটার কোনো মিল পাচ্ছিল না সবিতা।
সবিতা খেলার তেমন কিছু বোঝে না তবু ওর ও কৌতুহল হচ্ছিল, চা বানানো ভুলে মাঝে মাঝেই চোখ তুলে পর্দার দিকে দেখছিল। ম্যাচ শেষে সবাইকে চা বিস্কুট খাওয়াল অতনু, যেন মহোৎসব পালন হলো। পথ চলতি কত লোক খেলা দেখার জন্য দাঁড়িয়ে গেল, চা খেল। ওর দোকানে বেশ ভালো বিক্রিবাট্টা হয়েছিল সেদিন। রাত জেগে খেলা দেখে ফুটবল পাগল বাঙালিরা সবাই মিলে চায়ের টেবিলে আলোচনার ঝড় তুলত। ফুটবল নিয়ে অতনুর ছেলেমানুষি দেখে সবিতা মুখ লুকিয়ে হাসত।
সেইসব দিনের কথা মনে করলে ভয়ে সবিতার এখনো গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। ছেলেটা তখন মাত্র পাঁচ বছর। এক পথদূর্ঘটনায় হঠাৎ ওর স্বামী মারা যায়। এই দোকান সাথে লাগোয়া বাসস্থান আর ছেলেটা ছাড়া আর কিছুই রেখে যেতে পারেনি কমল। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে মামা-মামীর কাছে কষ্টে বড় হয়েছে সবিতা, সেখানে ফিরে যাবার অর্থ হয়না। স্বামী হারানোর শোকের ধাক্কাটা সামলে সবিতা বাঁচার একমাত্র অবলম্বন দোকানটা আঁকড়ে ধরল। রোজ সকালে সবিতা দোকান খোলে। কতলোক আসে যায় চা খায়,কত রকম তাদের কথা, আচার আচরণ... মনে হলে হাসিও পায়, আবার কখনো ভয়ে শিউরে ওঠ। কম দিনত হলো না! সেই থেকে বহু কষ্টে, লড়াই করে একা হাতে সবিতা এই 'চা-বিস্কুট' চালাচ্ছে। ঠাকুরের কৃপায় ছেলেটা পড়াশুনায় ভালো হয়েছে। ছেলে বিবেক এখন রামকৃষ্ণ মিশনের এক স্কুলে এগারো ক্লাসে পড়ে, ওখানে হস্টেলে থাকে।
মাঝে মাঝে খুব ভয় করত সবিতার, বুদ্ধি পরামর্শ দেবার মতো কেউ নেই পাশে। ছেলেটা বড় হচ্ছে, কী লাইন ধরবে, কোথায় কী সুবিধা অসুবিধা ও নিজে কিছু জানেনা। এ সব নিয়ে কারোর সাথে আলোচনা করতে সবিতা ভয় পায়। ও দেখেছে, সহজ মনে কথা বললেও অনেকে তার সুযোগ নিতে চায়, কেউ বা ভাবে 'গায়েপড়া', তাই ও মনের দুঃখ কষ্ট চেপে নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকে। ছুটিছাটায় বিবেক এলে কোথা দিয়ে যে দিনগুলো কেটেযায়... ছেলেটা ওর হাতে হাতে কাজ করে, পিছন পিছন ঘুরে হাসি-গল্প করে! সেইদিনকটা যেন আনন্দে ভরপুর হয়ে যায়। বিবেক হস্টেলে ফিরে গেলে আবার 'থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়'। সকালে উঠে দোকান খোলো রাতে বন্ধ করো, তার মাঝে রাঁধো, খাওয়া ঘুম, ব্যাস্!
এভাবেই দিন কাটছিল এমন সময় অতনু দোকানে এল। মানুষটাকে দেখে প্রথমদিন থেকে কেন জানি সবিতার মনে হয়েছিল ইনি সবার থেকে একটু আলাদা। এজীবনে যে কতরকম মানুষ দেখেছে সবিতা... কিন্তু অতনুকে দেখলে শ্রদ্ধা জাগে, মনে হয় মানুষটাকে বিশ্বাস করা যায়। অতনু নিয়মিত দোকানে আসে, কাগজ পড়ে, দুচারটে কথা বলে চা খেয়ে নগদ পয়সা দিয়ে চলেযায়। মাঝে মাঝেই পয়সা দেবার সময় অতনুর নিজের ও অন্যান্য গ্রাহকদের সাথে খুচরো ফেরত দেওয়া নিয়ে সমস্যা বাধত। একদিন অতনু ওকে ইউপিআই মানে অন লাইন পেমেন্ট চালু করার পরামর্শ দিল। এই ব্যাপারে সবিতা অজ্ঞতা প্রকাশ করায় নিজে হাতে সব গুছিয়ে করে দিলো। সবিতাকে তালিম দিয়ে, দোকানে কিউআর কোড ঝুলিয়ে দিয়ে বলল, "দেখুন আপনার খুচরো ফেরতের সমস্যা দূর করে দিলাম।"
সবিতা করজোড়ে বলল, "একটা কথা বলব দাদা? আপনি এত জ্ঞানীগুণী মানুষ দয়াকরে আমাকে 'আপনি' বলবেন না। আমার খুব অস্বস্তি হয়।" ঠোঁটে এক টুকরো চাপা ফুটল, চলে গেল অতনু। যত দিন গেছে সবিতার মনের ধারণাটা ততই দৃঢ় হয়েছে, মনে মনে বলেছে, "আমি ভুল করিনি"।
গৃষ্মের ছুটিতে বিবেক বাড়ি এসেছিল। দোকানেই অতনুর বিবেকের সাথে দেখা। সবিতা পরিচয় করিয়ে দিল, "আমার ছেলে বিবেক, রামকৃষ্ণ মিশনে পড়ে, ওখানে হস্টেলে থাকে।" বিবেক অতনুর পায়ে হাতদিয়ে প্রণাম করলে অতনু ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে পিঠ চাপড়ে বলল, "অনেক বড় হও ইয়ংম্যান!" দোকানে ভিড় না থাকলে ওরা দুজনে বসে কত কিছু আলোচনা করে তার অর্ধেক সবিতা বুঝতে পারে না।অতনুর ছুটির দিনে বিকেলে এসে বিবেকের সাথে বই খাতা নিয়ে বসে যায়। সবিতা চেয়ে চেয়ে দেখত, সে অতনু যেন আর এক অন্য মানুষ! অল্প সময়ের মধ্যে বিবেক অতনু স্যারের বেশ প্রিয় পাত্র হয়ে গেল। ছুটি শেষে বিবেক ফিরে গেল হস্টেলে। অতনু প্রাই বিবেকের খোঁজ খবর করে, বলে "চিন্তা করোনা সবিতা, বিবেক খুব ভালো ছেলে।"
প্রথম দিকে মর্নিং ওয়াকার এক মাসিমার অতনুর ঘর সংসার নিয়ে কৌতুহল প্রকাশ করায় অতনু উদাস মুখে বলেছিল ওর স্ত্রী একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, নিজের রোগী ও নার্সিংহোম নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকেন। ওরা নিঃসন্তান। কথাটা শুনে সবিতার মনে হয়েছিল অতনু খুব নিঃসঙ্গ। তখন থেকে মুখে কিছু না বললেও অতনুকে দেখে ওর খুব মায়া হত। ওর জন্য কিছু করতে সাধ হত। কিন্তু ও কী করবে, উল্টে অতনুই ওকে দোকানের উন্নতির জন্য নানা পরামর্শ দিত। অতনুর কথা মত সবিতা সকালে ডিম-পাউরুটি, দুপুরে আলুরদম, ঘুগনি, রুটি, করতে আরম্ভ করল।
দেখতে দেখতে বছর ঘুরে গেল, 'চা-বিস্কুট' বেশ ভালো দাঁড়িয়ে গেল। অতনু ওকে উৎসাহ দিয়ে বলত এই অঞ্চলটা যেভাবে ডেভেলপ করছে, চারদিকে এত অফিস আর আবাসন গড়ে উঠছে, কয়েক বছরের মধ্যে দেখো এ তল্লাটের ভোল পাল্টে যাবে! তোমার দোকান ঘরটা তো বেশ বড়। প্ল্যানিংয়ের অভাবে বা অর্থাভাবে তুমি এই ভাবে চালাচ্ছ, কিন্তু এবার ভাবার সময় এসেছে, কিছু কর সবিতা! আমি দেখতে পাচ্ছি, টালির ছাউনি ইঁটের দেওয়ালের জায়গায় এক সুন্দর ঝকঝকে মর্ডান কাফেটেরিয়া আর তুমি কাউন্টারে বসে ক্যাশ সামলাচ্ছ। সবিতা লাজুক হেসে বলল, "কী যে বলেন দাদা! আমি অত টাকা কোথায় পাব? আমার ডানে আনতে বায়ে কুলায় না... কোন মতে ছেলের পড়াটা যদি ঠিক মতো চালাতে পারি তবেই অনেক।"
সবিতা যা কল্পনাও করতে পারেনি অতনু তাই করে দেখাল। নিজে উদ্যোগ নিয়ে সবিতার জন্য স্বনির্ভর প্রকল্প থেক অল্প সুদে ঋণের ব্যাবস্থা করে দিল। সবিতার চোখে স্বপ্নের কাজল পরিয়ে দিল অতনু। সবিতা ভাবে অতনুকে নিয়ে ওর মনে কী কিছু রঙ্গিন ধারণা দানা বাঁধছে! সবিতা নিজেকে শাসন করে, "ছি ছি, একি হলো আমার?" নিজেকে যতই শাসন করুক সবিতা, তবু টের পায় অতনু এক দিন না এলে ওর বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে। বারবার পথের দিকে তাকায়, কাজে ভুল হয়। সবিতা এটাও খেয়াল করেছে অতনু ও আজকাল হঠাৎ হঠাৎ কেমন যেন উদভ্রান্তর মত শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকেন, কী দেখেন, কী ভাবেন কে জানে? তবে ওনার মনে ও কী... না না তা হয়না। হয়ত কাজের চাপে আছেন। এইত সেদিন পুরো চা না খেয়ে উঠে চলে গেলেন। একদিন চায়ের দামটা দিতে ও ভুলে গেলেন। এমন ভাবে বেরিয়ে গেলেন যেন ওকে চেনেন না। সবিতা অতনুর পরিবর্তনটা লক্ষ্য করে, কিন্তু ওর কী করা উচিৎ বুঝে পারেনা।
গত কয়েক মাস ধরে অতনু আর আগেরমতো নিয়মিত আসেনা। প্রাতঃভ্রমণকারীরা ও বলাবলি করে, "অতনু বাবুর কী হল?" কেউ কিছু বলতে পারে না। সবিতা পথ চেয়ে থাকে, ভাবে হয়তো কাজে বাইরে গেছেন, নাকি কোনো কারণে রাগ করলেন? ওর চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যায়। ধুমকেতুর মত হঠাৎ একদিন উদয় হল অতনু। সবাই ঝাপিয়ে পড়ল "আরে কী খবর মশাই কতদিন দেখা নেই"! মৃদু হেসে অতনু বলল, "না মানে একটু বিজি ছিলাম।" ওরা বলল, "আমরা সবাই মিলে পিকনিক যাচ্ছি, নেক্সট সানডে। একটা দারুন রিসর্ট বুক করা হয়েছে। আপনাকেও আসতে হবে। কাল সকালে আসুন, বিস্তারিত আলোচনা হবে।" মাথা নেড়ে সম্মতি দিল অতনু।
অতনু মন দিয়ে কাজটা পড়ছিল, সবিতা জানতে চাইল, "দাদাকে কী আর একটা চা দেব"? চমকে সবিতার মুখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকায় অতনু, "না।" সবিতা জানাল পাশের মুদি দোকানে যে ঠিকাদার কাজ করছে তার সাথে কথা হয়েছে। ওর দোকানের কাজটা তাকে দিয়ে করাবে। সামনের মাস থেকে কাজ আরম্ভ হবে। হয়তো দিন দশেক দোকান বন্ধ রাখতে হবে... আরো কিছু বলতে চাইছিল সবিতা কিন্তু অতনু এমন ভাবে তাকালেন যেন এ বিষয়ে বিন্দু বিসর্গ সে জানেনা। চুপ করে গেল সবিতা। ভয় পেল, দাদাকে কী ও বিরক্ত করছে!
পরদিন এলো অতনু। তেমন কথাবার্তা বললেন না, দু চারটে হুঁ না করে চা-বিস্কুট খেয়ে কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে গেল। আবার ডুব। পিকনিকে ও গেলনা। অতনুর এই রকম আচরণে সকলে খুব অবাক হলো! সবিতা ধরে নিয়েছে হয়ত দাদা সময় পাচ্ছেন না তাই আসেন না। সেদিন প্রাতঃভ্রমনকারী দল আলোচনা করছিল, চা বানাতে বানাতে সবিতার কানে এলো, ক’দিন আগে নাকি কেউ দেখেছে দাদা পাশের গলিদিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। "এদিকে কোথায়" জিজ্ঞাসা করাতে অচেনার মতো পাশ কাটিয়ে চলে গেছেন, সবিতা অবশ্য কথাটা বিশ্বাস করেনি।
দু'দিন পরে সকালে একটু বেলা করে এলেন, চা-বিস্কুট খেলেন। নিজে থেকে বললেন দোকানের কাজে কবে হাত দেবে? বিবেক কবে ছুটিতে আসবে? ও এলে একটা ভালো দিনে তোমার নতুন চা-বিস্কুট উদ্বোধন করো সবিতা। আগে থেকে দিনটিন দেখে রেখো। কথার রেশ টেনে সবিতা বলল দাদা আপনাকে কিন্তু ওই দিন উপস্থিত থাকতে হবে। আমিও আগে থেকে বলে রাখছি, লাল ফিতে কেটে "নিউ চা-বিস্কুট" আপনি উদ্বোধন করবেন। তখন "কাজে আছে" বললে শুনবো না !
এদিকে দোকানের কাজ শুরু হয়েছে, তারমধ্যে একপাশে অসুবিধা করেও কোনমতে সবিতা 'চা-বিস্কুট' চালিয়ে যাচ্চে। নিয়মিত খদ্দেররা রোজ আসে, অসুবিধেটা তেমন গায়ে মাখেনা। সামনে ছাদ ঢালাই জন্য দিন দশ-বারো দোকান পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। ভালোমন্দ মিলিয়ে সব ঠিকঠাক চলছে, কিন্তু সবিতার মনটা বড় ছটফট করে, মনে নানা প্রশ্ন আসে! দাদা কেন একেবারে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন? ভালো আছেন তো? নাকি সময় পাননা? কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না! মাঝে মাঝে খুব অভিমান হয়, চোখে জল আসে, পরক্ষণে নিজেকে সামলে নেয়। নিজেকে বোঝায় কত বড় মাপের মানুষ, তার কত রকম কাজ থাকতে পারে, ওর সামান্য দোকানের জন্য উনি ছুটে আসবেন এমন আশা করাটাই তো ওর অন্যায়। দাদা যা উপকার করেছেন, তার জন্য খুশি মনে ও চিরকাল দাদার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।
দোকানের কাজ প্রায় শেষের দিকে। অতনু আর আসে না। সবিতা ধরেই নিয়েছে কাজের চাপে দাদা সময় পাননা। মাঝেমধ্যে মনটা একটু খারাপ লাগে, ভাবে দাদার কথা সত্যি হতে চলেছে, এখন দাদা দেখলে হয়তো খুশি হতেন, ভুল ত্রুটি কিছু দেখলে শুধরে দিতেন! কিন্তু কী আর করা! হাতে আর বেশিদিন নেই। দাদা না এলে পুজোটা সেরে মা ছেলে দোকানে ঢুকে যাবে। অবশ্য নিয়মিত খরিদ্দারদের ডেকে প্রসাদ আর চা-মিষ্টি খাওয়াবে, ওই "লাল ফিতে কাটা" আর হবে না। বুকের ভেতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সবিতার।
সবিতা মনস্থ করেছে সামনে সারদামায়ের জন্ম তিথি, বিবেকের ও ছুটি থাকবে দোকানের পুজোটা ওইদিনই সেরে নেবে। একটু ঠান্ডা পড়েছে। রোজকার মতো দোকান খুলে চা বসিয়েছে সবিতা। চেনা অচেনা খরিদ্দার আসছে চা খাচ্ছে। এক্ষুনি প্রাতঃভ্রমণকারীর দল এসে যাবে, ঢুকেই হাঁক লাগাবেন "সবিতা চায়য়া"। ভাবতে ভাবতেই ওরা এসে হাজির হলেন। একটু পরে থানার বড়বাবু হাঁফাতে হাঁফাতে এলেন। কেউ প্রশ্ন করল, "কী ব্যাপার, আজ দেরি?" "আর বলবেন না, সাত সকালে একটা খুবি অপ্রীতিকর খবর শোনাবো আপনাদের।" সবিতাও কান খাড়া করল। বড়বাবুর কাছে যা শুনলো সেটা শোনার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না।
"গতকাল তখন বেলা প্রায় তিনটে বাজে। থানায় বসে কিছু ফাইল দেখছি। এক ভদ্রমহিলা এসে ভেতরে ঢুকলেন। তাঁর হাঁটা চলা, সাজপোশাক দেখে মনে হলো যে তিনি কোনো উচ্চপদস্থ মহিলা। প্রাথমিক পরিচয় দিয়ে বললেন আমি ডাক্তার জবা সরকার। ওঁকে খুব উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। তারপর যা বললেন শুনে আমি নড়েচড়ে বসলাম।" এক মাসিমা বললেন সাসপেন্স থাক, "আসল ঘটনাটা বলুন!"
"জানালেন স্বামীর নাম অতনু সরকার। অ্যালজাইমার পেশেন্ট। এই অসুখে স্মৃতি ও চিন্তাভাবনা করার ক্ষমতাটা ক্রমশ হারিয়ে যায়। আজ দুপুরে গ্যাস সিলিন্ডার দিতে লোক এসেছিল। আমি তখন নার্সিংহোমে। অতনু খেয়েদেয়ে ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিল। গেটের তালা খুলে কাজের মাসি লোকটাকে ভেতরে নিয়ে গেছিল। গোটের তালা খোলা পেয়ে অতনু চুপচাপ বাইরে বেড়িয়ে যায়। মাসি প্রথমে টের পায়নি। ফল কেটে অতনুকে দিতে গিয়ে দেখে অতনু ঘরে নেই... সাথে সাথে আমাকে ফোনে জানায়। অতনুর একটি ছবি টেবিলের ওপর রেখে বললেন, প্লিজ ওকে ইমিডিয়েটলি খুঁজে বার করার ব্যবস্থা..."
ওনাকে থামিয়ে আমি প্রশ্ন করলাম, "কী বলছেন ম্যাডাম? এইতো ধরুন দের-দুই মাস আগেই আমি নিজে ওর সাথে বসে চা খয়ে আড্ডা দিয়েছি আর সম্পূর্ণ সুস্থ বলেই মনে হয়েছে। নিজে ডাক্তার না হলে ও আমি অ্যালজাইমার সম্বন্ধে যতটা জানি এ রোগ রাতারাতি হয়না, বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে ঘাঁটি গাড়ে। এরা সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যান, অনেক সময় পরিচিত মুখ চিনতে পারেন না, পথ চিনতে ভুল করেন, সিদ্ধান্ত নিতে টাকা-পয়সার হিসেব রাখতে অসুবিধা, প্রয়োজনিয় জিনিস কোথায় রাখেন মনে করতে পারেন না, ইত্যাদি। আপনি নিজে ডাক্তার হয়ে কী কিছু বুঝতে পারেন নি? আর এমন একজন মানুষকে তো আপনার আরো সাবধানে রাখা উচিৎ ছিল, তাই নয় কি?"
মাথা নিচু করে জবাব দিলেন, "আপনি ভুল বলেননি অফিসার। আসলে আমরা চিরদিন যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি। ওর অসুবিধার কথাগুলো ও আমাকে কিছু জানায়নি। ইদানিং মাসি আমাকে প্রায় বলছিল, "বাবুর যে কী হয়েছে, হাতের কাছে রাখা জিনিস খুঁজে পাননা, সব ভুলে যান, সেদিন বলেন তোমার নামটা যেন কী?" শংকিত হয়ে আমি ডাক্তারের সাথে কনসাল্ট করি ও নানা পরীক্ষা-নিরিক্ষার পর অসুখটা ধরা পরার সাথে সাথে আমি ওর বাইরে যাওয়াটা বন্ধ করি এবং দরজায় সবসময় তালা লাগিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছি। ট্রিটমেন্ট চলছে। এমনিতে কিছু প্রতিবাদ করেনা কিন্তু বাইরে যাবার জন্য খুব ছটফট করে, তালা খুলে দিতে বলে। এমনটা যে হবে সেটা আমি বুঝতে পারিনি। প্লিজ হেল্প মি অফিসার..." বলে কেঁদে ফেললেন ডাক্তার।
"প্রয়োজনিয় সব ফরমালিটি সেরে ম্যাডামকে বাড়ি পাঠাই ও সাথে সাথে পল্টন নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়ি। রাত প্রায় সাড়েদশটা পর্যন্ত তন্ন তন্ন করে বিফল হয়ে ফিরে যাই থানায়। মানুষটা যেন কর্পূরের মত উবে গেছে! আজ দেখি কী হয়! চারিদিকে এত কন্সট্রাকশন হচ্ছে, কোথায় কোন আনাচে কানাচে বসে আছেন কে জানে। সুস্থ শরীরে খুঁজে পেলেই হয়।" চা-টা শেষ করে বড়বাবু চলে গেলেন।
সবিতার সব কিছু কেমন যেন গুলিয়ে গেল। কিছু ভালো লাগছেনা। পুলিশ ভ্যান সারাটা দিন অতনুর বিবরণ দিয়ে মাইকে ঘোষনা করে, পুরো তল্লাট ঘুরে কোনো খোঁজ পেলনা।
পরদিন সকালে তখনো ভালো করে আলো ফোটেনি। বেশ ঠান্ডা পড়েছে, সবিতা দোকান খুললো। মনে মনে আশা বড়বাবু এসে যদি বলেন অতনুকে খুঁজে পেয়েছেন ওরা। ও নিজের মনকে বুঝিয়েছিল দাদা সময়ের অভাবে আসছেন না, সেটাই ঠিক ছিল, এমনটা শুনতে হবে স্বপ্নেও ভাবেনি। অশান্ত মনে চায়ের জল চাপাল সবিতা। চায়ের টানে ক্রেতারা আসছেন। এমন সময় কয়েকজন মজুর মিলে কাউকে ধরে ধরে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। সামনে আসতে দেখাগেল ধুলোবালি মাখা চেহারা, লোকটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ঠান্ডায় কাঁপছে, মুখে কী যেন বিরবির করছে। সবিতা পাউরুটি টোস্ট করতে ব্যস্ত, চায়ে জন্য অনেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। এক ঝলক দেখে কাজে মন দিল। এক মাসিমা এগিয়ে গেলেন, "আহাগো বেচারা ঠান্ডায় কাঁপছে," তারপর মুখটা দেখে আঁতকে চেঁচিয়ে উঠলেন, "অতনুউউ"!
নামটা শুনে হাতের কাজ ফেলে সবিতা ছুটে সেদিকে গেলো। মজুররা তখন কিভাবে অতনুকে আবিষ্কার করল সেই ঘটনা বলছে। একটা বড় বিল্ডিংয়ের জন্য ভিত খোঁড়া হচ্ছে ওই কবরখানার পাশে। চারদিকে উঁচু করে রাখা মাটির স্তুপ। ওখানে একটা গর্তে হয়তো রাতের অন্ধকারে লোকটা কোনো ভাবে পড়ে গেছিল, আর উঠতে পারেনি। আজ সকালে ওরা মানুষের গলা শুনে ওদিকে গিয়ে ওকে দেখে কষ্ট করে ওপরে তুলেছে। নাম-ধাম কিছু বলতে পারছে না। মনে হয়ে ওর ক্ষিদে পেয়েছে, শীত করছে। চা-বিস্কুট, চা-বিস্কুট বলছে তাই ওরা ওকে দিদির দোকানে নিয়ে এসেছ।
ওকে এনে চেয়ারে বসান হলো। সবিতা তাড়াতাড়ি ভিতর থেকে একটা চাদর এনে দিল। মাসিমা অতনুর গায়ে জড়িয়ে দিল চাদরটা। ওকে সবাই জিজ্ঞাসা করছে কী করে গর্তে পড়ল? কেউ কী ওকে ধাক্কা দিয়েফেলে দিয়েছে? কোনো কথার উত্তর দিচ্ছেনা অতনু, বিভ্রান্তর মতো সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে। সবিতা বড় গ্লাসে চা আর প্লেটে করে টোস্ট বিস্কিট এনে সামনে রেখে বলল দাদা গরম চা-টা খান। মজুরদের ও চা-বিস্কুট দিল। অতনু সবিতার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে! সবিতা বললো, "দাদা দেখুন দোকানের কাজ কমপ্লিট হয়ে গেছে। সামনের সপ্তাহে আপনাকে নিউ চা-বিস্কুট উদ্বোধন করতে হবে।" কোনো কথাই ওর মাথায় ঢুকছে না। সবিতা চোখের জল লুকিয়ে সরে গেল।
কেউ বড়বাবুকে ফোনে খবরটা দিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশের জিপ নিয়ে বড়বাবু এলেন। "কী হলো অতনুবাবু? কোথায় লুকিয়ে ছিলেন মশাই? সবাইকে তো ঘোল খাইয়ে ছাড়লেন আপনি... নিন চা-টা শেষ করুন, তারপর থানায় চলুন আমর সাথে। আপনার মিসেসকেও খবর দিয়েছি থানায় আসার জন্য।" বড়বাবু হাঁক পারলেন, "কারা অতনুবাবুকে নিয়ে এসেছ, এদিকে এসো।" ওরা একদিকে বসে চা খাচ্ছিল, বড়বাবুর হাঁক শুনে ঘাবড়ে গেল। বড়বাবু বললেন, "তোমরাও আমার সাথে থানায় যাবে। ভয়ে জড়সড় হয়ে ওরা ডুকরে উঠল, "আমরা কিছু করিনি স্যার।" অতনুর দিকে ঘুরে বলল, "আপনি একবার বলুন না বাবু, আমরা কিছু করিনি।" অতনু ওদের দিকে দুটো বিস্কুট এগিয়ে দিল।
বড়বাবু উঠে দাঁড়ালেন, "চলুন অতনুবাবু।" অতনু বলে উঠল, "কোথায়? বড়বাবু বললেন, "থানায়," বলে হাসলেন, "এটাইতো হয়... ধুপছায়ার মতো মেমরী অসে যায়।" মাসিমা চোখের জল মুছে জানতে চাইলেন, "কী হয়েছে আতনুর?" "অ্যালজাইমার। ক্রমশ ওর স্মৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।" সবিতা ফুপিয়ে উঠল, "আবার আসবেন দাদা। আমরা পথ চেয়ে থাকব।" অতনু বিরবির করছে, "বিবেক, চা-বিস্কুট।"
অতনুকে নিয়ে জিপটা ধুলো উড়িয়ে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল।
লেখিকা চারুকলা অনুরাগী। ৺স্বামীর কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন প্রবাসে কেটেছে। এখনো অধিকাংশ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিন সন্তানের কাছে কাটান। দেশে বিদেশে বিভিন্ন লিটিল্ ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। নানা সাহিত্য প্রতিযোগিতায় বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। বর্তমানে অনেকগুলি সাহিত্য পরিবার ও অনলাইন-পত্রিকার সাথে গভীর ভাবে যুক্ত।