ঘড়িটা অচল। কিন্তু তার সঙ্গে যে সোনার চেইন আছে, সেটা খাঁটি। ঘড়িটা দাদুর। কিন্তু তাঁকে আমি চোখে দেখিনি। মা মারা যাওয়ার পরে আমার কাছে যে জিনিসগুলো উত্তরাধিকার সূত্রে এসেছিল, তার একটা এই ঘড়ি।
ঘড়িটা সারানোর চেষ্টা করেছিলাম। দোকানদার বলল যে এটা ঠিক করা সম্ভব নয়। কাজেই কি আর করা? আলমারিতে ঘড়িটা রেখে দিয়ে সেটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।
হঠাৎ একদিন রাতে ঘুম আসছিল না। আলমারি থেকে একটা শব্দ ভেসে এলো — টিক্ টিক্ টিক্! তাড়াতাড়ি উঠে আলমারি থেকে বের করলাম ঘড়িটা। সুন্দর চলছে। আবার রেখে দিলাম আলমারিতে। কাল সকালে পরব।
সকালে আলমারি খুললাম। ঘড়ি নিশ্চল। কাল রাতে তাহলে ঘুমের ঘোরে ভুল দেখেছি। সারাদিন কাজের ব্যস্ততার মধ্যে ভুলেই গেলাম ঘড়ির কথা। কিন্তু যেই রাতে ঘুমাতে গেলাম, ঘড়ি বলে উঠল — টিক্ টিক্ টিক্।
আবার বের করলাম ঘড়িটা। এবার স্পষ্ট শুনতে পেলাম একজন বয়স্ক বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর:
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোঽপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ॥
আরে, এ তো গীতার বাণী। মানুষ যেমন ছেঁড়া পুরানো কাপড় ফেলে অন্য নতুন কাপড় পরে, তেমনি শরীর জীর্ণ হলে আত্মা নতুন দেহ ধারণ করে।
এইভাবে আস্তে আস্তে আমার ঘড়ির সঙ্গে ভাব হলো। তার টিক্ টিক্ শব্দের ভাষা আমি বুঝতে শিখলাম। যে দাদুকে আমি দেখিনি চোখে, সে আমার বন্ধু হয়ে উঠল।
আমাদের কথোপকথন:
দাদু: আমি দ্বিজ।
আমি: মানে ব্রাহ্মণ, তাই তো?
দাদু: না, আমার বসন্ত হয়েছিল। বাঁচবার আশা ছিল না। কাজেই যখন সেরে উঠলাম, সেটা আমার নব জন্ম।
আমি: কেমন ছিল দাদু তোমাদের জীবন?
দাদু: তোমাদের মতোই। সুখে দুঃখে দিন কাটত। তবে একটা আফসোস থেকে গেছে আমার। তোমার দিদিমার বড় শখ ছিল এরোপ্লেন চড়বার। তার সেই শখ আমি পূরণ করতে পারিনি।
আমি: তুমি এরোপ্লেন চড়ে ছিলে দাদু?
দাদু এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেলেন। এর উত্তর উনি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটা অনেক পরে।
দাদু: তবে তোমরা এখন অনেক বেশি দিন বাঁচো। আমাদের সময় অনেক অল্প বয়সে লোকে মারা যেত। তুমি ব্ল্যাক ওয়াটার ফিভারের নাম শুনেছ?
আমি ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও থমকে গেলাম। এই নামটা আমার অজানা। পরে জেনেছিলাম ম্যালেরিয়া হলে রক্তকণিকা ভেঙে প্রস্রাবের রং কালো হয়ে যায়। এটা আমি চোখে দেখিনি, কোনো পাঠ্য বইতেও পড়িনি।
দাদু আরও বলে চললেন, "শিশু মৃত্যু জলভাত ছিল তখন। বসন্ত রোগ শুনেছি, পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। আরো নাকি নানা রকম টিকা বেরিয়েছে, যেগুলো দিয়ে শিশুদের অকাল মৃত্যু ঠেকানো যায়।"
আমি বললাম, "মায়ের মুখে শুনেছি তুমি বিদেশ গিয়েছিলে। কেমন ছিল সেদেশের অভিজ্ঞতা?"
দাদু বললেন, "প্রথমে ট্রেনে চড়ে বম্বে গেলাম। সেখান থেকে জাহাজে। আমার প্রায় এক মাস লেগেছিল পৌঁছতে। পড়াশোনা করতে। কিন্তু হঠাৎ বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছিলাম। সেটা এসেছিলাম প্লেনে।
আমার বাবা তুমি হয়তো জানো, খুব বড় শিকারি ছিলেন। শ্বেত পাথর আর কালো মার্বেল পাথরের মেঝে ছিল বাড়িতে। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকত একটা মস্ত বড় স্টাফড ভাল্লুক। হরিণের মাথা তো অজস্র ছিল দেয়ালে লাগানো। বাবা অনেক বাঘও মেরেছিলেন। তোমার মায়ের একটা গলার লকেট আর কানের দুল আছে বাঘের নখ দিয়ে তৈরি। এরকম শুধু তোমার মা নয়, ওনার সব নাতনি আর নাতবউদের আছে।"
এটার কথা আমি জানতাম না। দিদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে সে পেয়েছে কিনা।
"কিন্তু বাবার মৃত্যু খুব কষ্টকর। সেদিন জ্বর হয়েছিল ওনার। বাবা নিজেই আমায় কতবার বলেছেন যে বাঘ শিকার করলে মাচা থেকে নামতে নেই। ওদের খুব কড়া জান। সেদিন গুলি করেছিলেন। অব্যর্থ নিশানা। সঙ্গে সেদিন ওনার ভাই, মানে তোমার ছোট দাদুও ছিলেন। উনিও গুলি করেছিলেন। দুই ভাইয়ের ঝগড়া বেঁধে গেল। কার গুলিতে মরেছে বাঘটা? বাবা নেমে দেখতে গেছিলেন সেটা। কাকা নামেননি। বাঘটা লাফিয়ে উঠে বাবাকে শেষ করে দিয়েছিল।
আমি দেশে পৌঁছানোর আগেই শ্রাদ্ধ শান্তি হয়ে গেছিল। অপঘাত মৃত্যুতে চার দিনে শ্রাদ্ধ হয়। আমার মা খুব ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু আমার রাগ হয়েছিল ছোট কাকার ওপর। সেদিন ঝগড়া না করলে বাবা নিচে নামতেন না। পরে বুঝেছিলাম ভাগ্যের ওপর কারো হাত নেই। আর বাবা মারা যাওয়াতে আমার যতটা কষ্ট, কাকার কষ্ট তার চেয়ে কিছু কম ছিল না।"
"তারপর আবার ফেরত গিয়েছিলে পড়তে?" আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
"হ্যাঁ," বললেন দাদু। "প্রথমবার বিদেশ যাওয়ার আগেই বাবা বিয়ে দিয়েছিলেন। ওনার ধারণা ছিল, না হলে আমি ওখানে কোনো শ্বেতাঙ্গিনীর প্রেমে পড়ব। এবার যখন গেলাম, তখন তোর মা এসে গেছেন দিদিমার গর্ভে। ভেবেছিলাম পড়াশোনা শেষ করেই ফিরে আসব পাকাপাকিভাবে। কিন্তু সে আর হলো কই?"
দাদু পড়াশোনা শেষ করে যখন ফেরত আসবেন ঠিক করেছিলেন, সেই সময় চাকরির সুযোগ এসে গেল — প্লেন চালানোর সুযোগ। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগেছে।
"কি ভালই লাগতো আকাশে উড়তে। গ্রীষ্মের দুপুরে আকাশে চিলকে উড়তে দেখেছ? ঠিক সেই রকম লাগতো। আর ঈগল যেমন ছোঁ মেরে ওপর থেকে এসে শিকার তুলে ফের উড়ে পালিয়ে যায়, আমরা ঠিক একইভাবে বোমা ফেলতাম।"
"এত রিস্ক নেবার কি দরকার ছিল? উপর থেকে ফেললেই তো পারতে?"
"নাহ্, তাতে বোমা মাঝ পথে ফেটে যেতে পারে।"
"কিন্তু, তুমি যখন অত নিচুতে টার্গেটের কাছাকাছি এসে বোম ফেলছ, তখন তো তোমাকে শত্রুপক্ষ গুলি করে প্লেন নামিয়ে দিতে পারে।"
একটু থেমে দাদু বললেন, "সেটাই তো হয়েছিল। আমি ছ বার বোমা মেরেছি। আমার কিছু হয়নি। সাত বারের বার ওরা গুলি করে আমার প্লেন নামিয়ে দেয়।"