এই আশ্বিন মাসে এমন একজন মানুষের জন্মদিন যিনি বারংবার নিজস্ব মুনশিয়ানায় ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতকে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করে শান্তির বার্তা দিয়েছেন। তিনি মাসুম আলি খান, কিন্তু এঁনাকে চেনা গেল কি?
গোয়ালিওর দরবারের সংগীতজ্ঞ উস্তাদ হাফিজ আলি খান ও রাহাত জাহানের সাত সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠতম সন্তান মাসুম ১৯৪৫ সালের ৯ই অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন,শৈশবেই এক সাধুর কথামতো যাঁর নাম হয় আমজাদ। বিখ্যাত সেনিয়া বাঙ্গাশ ঘরানার ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রতিনিধি আমজাদ আলি খান আজ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক প্রবাদপ্রতিম শিল্পী।
১৯৫৭ সালে দিল্লির এক সাংস্কৃতিক সংস্থার অতিথি হিসেবে পিতা উস্তাদ হাফিজ আলি আমন্ত্রণ পেলে সপরিবারে দিল্লিতে বসবাস শুরু হয় আমজাদ সাহেবদের। এরপর প্রথাগত শিক্ষার উদ্দেশ্যে দিল্লির মডার্ন স্কুলে ছোট্ট আমজাদের লেখাপড়া শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে প্রথম মার্কিন মুলুকে বাজাতে যান উস্তাদ আমজাদ আলি খান। প্রতিনিয়ত নতুনত্বের সন্ধানে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন, যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭৪ এ আমরা পেলাম নবসৃষ্ট রাগ আমিরি টোরি, ১৯৮০তে শ্যাম শ্রী, সরস্বতী কল্যাণ, চুরাশিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে তৈরি প্রিয়দর্শিনী।
১৯৭৫ সালে পদ্মশ্রী সম্মান লাভের পরে পদ্মভূষণ (১৯৯১), পদ্মবিভূষণ (২০০১), সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৯), ফুকোওকা এশিয়ান কালচারাল পুরস্কার (২০০৪) , বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম এরকম কত সহস্রবিধ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন সরস্বতীর এই বরপুত্র। শান্তি সম্প্রীতির উদ্দেশ্যে বহু খ্যাতনামা অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন উস্তাদজি। লয়কারি নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা ও অভিনবত্বের মিশেলে সব বয়সের শ্রোতাই তাঁর বাজনায় পরিতৃপ্তি খুঁজে পান, তাই ভোররাতে সোহাগ ভৈরবের আলাপ কিম্বা দরবারির গাম্ভীর্য সবেতেই তাঁর হাতের জাদুতে শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যান।
১৯৮৪ সাল থেকে মার্কিন মুলুকে ম্যাসাচুসেটসে বিশ এপ্রিল দিনটি আমজাদ আলি খান ডে হিসেবে পালিত হয়। ১৯৯১ সালে ভেনিসে ওয়ার্ল্ড আর্ট সামিটে ভারতের প্রতিনিধি বা ওয়ার্ল্ড বিট ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করা এই মানুষটি ইউনেস্কোর বিশেষ সম্মান পেয়েছেন, পেয়েছেন ইউনিসেফের বিশেষ আনুষ্ঠানিক পদ। আমজাদ আলি খান টেক্সাস, হাউস্টন, ন্যাশভিলের মতো বহু প্রদেশের সাম্মানিক নাগরিকত্ব পেয়েছেন, পেয়েছেন কলকাতা, রবীন্দ্র ভারতী, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতির সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধি।
ইয়র্ক, স্টানফোর্ড, নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি অধ্যাপকের পদ অলংকৃত করা মানুষটি ১৯৭৬ সালে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন আসামের নৃত্যশিল্পী শুভলক্ষ্মী বড়ুয়ার সাথে। দুই পুত্র আমান ও আয়ান এই উজ্জ্বল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেদের ইতিমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বিদেশে বহু জনপ্রিয় প্রজেক্টে কাজ করে ভারতের সংগীতকে অন্য উচ্চতায় তুলে ধরেছেন খান সাহেব। ব্যারি ম্যাশন, জো ওয়ালশের মতো গিটারিস্ট, এলমিরা ডারভারোভা, ইগর ফ্রোলোভের মতো বেহালা বাদকদের সাথেও বহু জনপ্রিয় কাজ করেছেন উস্তাদ আমজাদ আলি খান। হংকং ফিলহার্মোনিক অর্কেস্ট্রা, স্কটিশ অর্কেস্ট্রার সাথেও অনুষ্ঠান করেছেন উস্তাদজি।
তিনি যে সত্যিই তাঁর যন্ত্রের মাধ্যমে গানের কথাও ফুটিয়ে তোলেন সেটা উপলব্ধ হয় "যদি তোর একলা চলো রে" শুনে। প্রখ্যাত শিল্পী সুচিত্রা মিত্রের সাথে তাঁর রেকর্ডিং করা 'ট্রিবিউট টু টেগোর' অ্যালবাম এক অবিস্মরণীয় উপস্থাপনা। সম্প্রতি পরিচালক সুমন ঘোষ পরিচালিত 'কাদম্বরী' সিনেমায় তাঁর সরোদের রূপ লাবণ্য অনুভূত হয়েছে, প্রথমবার বড়ো পর্দায় তার সুরের জাদু শোনা গেছে।
আমজাদ আলি খান কে নিয়ে গুলজারের তৈরি করা তথ্যচিত্র ১৯৯০ সালে শ্রেষ্ঠ ডকুমেন্টারি হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার লাভ করে।
এহেন বর্ণময় চরিত্র কিংবদন্তী উস্তাদ আমজাদ আলি খানের জন্মমাসে রইল শ্রদ্ধার্ঘ্য।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।