About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
অদ্রিজা
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

অদ্রিজা

ভেজা চুল থেকে তোয়ালেটা সরিয়ে খোলা জানলার দিকে তাকায় অদ্রিজা। শরতের আকাশ বড় মোহময়। পরিযায়ী মেঘের দল গোটা আকাশজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। এদিকে জানলা লাগোয়া পেয়ারা গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মিঠে, উজ্জ্বল রোদ ওর হরিণছাপ, লাল-হলুদ বিছানার চাদরের ওপর আহ্লাদে ঝাঁপ দিয়েছে। কিছুক্ষণ আদুরে রোদটার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃতিকে উপভোগ করার জন্য যে সময়টা দেওয়া দরকার, এই মুহূর্তে তা অদ্রিজার কাছে নেই। পুরী থেকে কেনা সাত্যকির পছন্দের সাউথ কটন শাড়িটা বেছে নেয় ও।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাজলের রেখা টানে দুটি চোখে। ঘন কাজল ওর বাদামি চোখের মণিটাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। ছোট্ট একটা লাল টিপ এঁকে নিয়ে গোলাপি ঠোঁটটাকে আরও একটু গোলাপি করে তোলে। এইবার একটা পারফিউম, ব্যস, সাজ শেষ। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বটার দিকে তাকিয়ে লজ্জাই লাগে। মধ্যচল্লিশে সামান্য প্রসাধনে এত সুন্দরী!

রোববার, সাত্যকি বাড়িতেই আছে। ওকে একা ফেলে বেরোতে একটু অস্বস্তি হলেও সাত্যকি কিন্তু সবসময় উৎসাহই দেয়। বলে, “কাজ আর সংসার করতে করতে যে একঘেয়েমিটা আসে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘুরতে যাওয়া সেটা কিন্তু কাটিয়ে দেবে।”

সাত্যকিও সময় পেলে যথেষ্ট আড্ডা দেয়, ঘুরতে যায়। অদ্রিজা বা বন্ধুরা না থাকলে একাই চলে যায়।

রোববার লেডিস স্পেশালটা যে কেন চলে না! নৈহাটি থেকে ভিড়ে ঠাসা কৃষ্ণনগর লোকালে উঠতে উঠতে ভাবে অদ্রিজা। একটা জায়গা যখন পায়, ততক্ষণে ঘামটা কপাল থেকে নেমে চিবুক দখল করে নিয়েছে। শিয়ালদা অবধি রিটার্ন কাটলেও ও ঠিক করে নেয়, দমদমে নেমে যাবে। বাকিটা পথ মেট্রোতে। কালীঘাট মেট্রো স্টেশনে বন্ধুরা অপেক্ষায় থাকবে। তারপর তো ক্যাব বুক করে শপিংমলটায় যাওয়া, সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, হুল্লোড়। সাত্যকিকে নিয়ে পিঁপড়ে কামড়ের জ্বালুনিটা আর টের পাচ্ছে না। অদ্রিজার মনের আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের রাশি।

শপিংমলটার গেটের কাছে ক্যাবটা দাঁড়াতেই ছাতাটা বের করার সুযোগ না দিয়ে ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। কুর্তিটার ভিজে হাতার দিকে তাকিয়ে অনুরাধা বলে, “এই হল শরতের খেয়ালি প্রকৃতি। রোদ দেখেই কিন্তু ক্যাবে উঠেছিলাম।”

রোববার দুপুরে ভিড় থাকলেও এখনও সহনীয়। পুজোর বাজারের ভিড়টা শুরু হবে বিকেল থেকে।

“তাড়াতাড়ি লিফ্টের দিকে চল, দেরি করলে কিন্তু ফুড কোর্টে বসার জায়গা পাব না।” কথাটা ছুড়ে দিয়ে লোপা পা বাড়ায় লিফ্টের দিকে। লোপার পেছনে অদ্রিজারা।

আজ রুফটপটা খোলা। একগাদা ছেলেমেয়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি মাথায় সেলফি তুলছে। কেউ বা প্রকৃতি কিংবা টুকরো কলকাতা শহরকে ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত। বেশ লাগছে অদ্রিজার। ঠান্ডা কোল্ড কফিতে চুমুক দিয়ে চোখটা বন্ধ করে।

“অদ্রিজা, তুই?”

ঝপ করে চোখটা খুলে ফেলে। সামনে দাঁড়িয়ে ঘন নীল জিন্স, অফ হোয়াইট টি-শার্ট, চোখে রিমলেস চশমা পরা স্মার্ট ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে বুকে ধক করে ধাক্কা লাগে। মুখ থেকে বেরিয়ে আসে কোনো অতীতে পড়ে থাকা একটা নাম — “ইন্দ্রনীল?”

বাগবাজারের গঙ্গার ঘাটে অদ্রিজারা প্রতি মাসেই আসে। রেললাইন, গঙ্গার ঘাট, দূরে অস্পষ্ট হাওড়া ব্রিজ — ওদের চার বন্ধুর বড্ড প্রিয়। আজও আকাশ যখন গোলাপি-কমলা, অদ্রিজা তখন বাগবাজারের রেললাইনের ধারে। মায়ের ঘাটটা ঘুরে ওরা যাবে ওদের প্রিয় ঘাটটায়। সোমদত্তার হঠাৎ ইচ্ছে হল, ‘পিকু’ সিনেমায় দীপিকা পাড়ুকোন ও ইরফান খানের মতো রেললাইন ধরে হাঁটবে। বহুদিন এভাবে হাঁটা হয় না।

হাঁটতে হাঁটতে শিউলি গাছটার দিকে চোখ গেল। কত ফুল মাটিতে পড়ে আছে। জীবনীশক্তি ওদের শেষ, শেষবেলাতেও সুন্দর এরা। সোমদত্তা, লোপা, অনুরাধারা এগিয়ে গেছে। অদ্রিজা গাছটার সামনে দাঁড়ায়, বুক ভরে গন্ধ নেয়। “পারিজাত, স্বর্গের ফুল” — ইন্দ্রনীল বলেছিল মনে হয়। আজ একটু একা থাকলে ভালো হত। অদ্রিজা দেখে, বন্ধুরা সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে জোয়ারের জল নিয়ে খেলছে। আহিরীটোলা ঘাটের দিকে যাওয়া যাত্রীবোঝাই লঞ্চটার দিকে তাকিয়ে ও জোয়ারের জলে পা ডুবিয়ে দেয়।

শোভাবাজার মেট্রো থেকে বন্ধুরা যে যার বাড়ি ফেরার পথ ধরে। সোমদত্তা দমদমে নামবে অদ্রিজার সঙ্গে, তারপর যে যার নিজের পথে। সাড়ে সাতটার শান্তিপুর লোকালটা ধরবে অদ্রিজা।

সামনের লেডিস কামরাটা মোটামুটি ফাঁকা। জানলার ধারের একটা সিট পেয়ে যায়। আহ্, কী শান্তি! ঠান্ডা হাওয়ায় চোখের পাতা বুজে আসছে। জানলার ধারে বৃষ্টির ছাপ। তার মানে শিয়ালদার দিকে বৃষ্টি হয়েছিল। মেঘ ডাকছে মনে হল। নিম্নচাপ আবার ফিরে এল কি?

“ডিপ্রেশনের বাংলা নাকি নিম্নচাপ? বৃষ্টি এল। সঙ্গে কফি এক-দু’কাপ...”

কবি শ্রীজাতের লেখা কবিতাটার বাকি লাইনগুলো আর মনে আসছে না। গুগল করে দেখে নিতে হবে। ট্রেনের সঙ্গে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ছুটছে, ছোট্ট ছোট্ট পরশ দিয়ে যাচ্ছে অদ্রিজাকে।

পুজোয় কি এইবার বৃষ্টি হবে? নৈহাটিতে জল জমার সমস্যা আছে। ঠাকুর কী করে দেখবে, কে জানে! সাত্যকি আর অদ্রিজা পুজোর দিনগুলো ঘরে বসে আড্ডা জমাতে মোটেও ভালোবাসে না।

আচ্ছা, মণিদীপাও ওর বিয়ের দিন নিশ্চয়ই এই ভয়টা পাচ্ছিল। নভেম্বর মাস, তার ওপর বৃষ্টি, সবাই ঠিকমতো আসতে পারবে? ওকে আর পরে জিজ্ঞেস করা হয়নি, সেদিন টেনশন করছিল কি না। কুড়ি বছরের কাছাকাছি আগের ঘটনা। দিল্লিতে থাকা মণিদীপাকে এই কথাগুলো বললে নির্ঘাত ভাববে, অদ্রিজার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

বৃষ্টি মাথায় নিয়ে শ্যামনগর আসছে। শ্যামনগর স্টেশনের মতো এত ছাতিম ফুলের গাছ নৈহাটিতেও নেই। ছাতিম ফুল চিনিয়েছিল অদ্রিজাকে ইন্দ্রনীল, সাদার্ন অ্যাভিনিউ ধরে হাঁটতে হাঁটতে। ঝিম ধরানো গন্ধের তলায় দাঁড়িয়ে অদ্রিজার মনে হয়েছিল, মদ না খেয়েই ওর নেশা হয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যের কৃতি ছাত্রী তখন নাম না জানা আবেশে ইন্দ্রনীলের বলিষ্ঠ বাহুটা জড়িয়ে ধরেছিল।

তার কয়েক বছরের মধ্যেই মণিদীপার বিয়ের সেই বৃষ্টির সন্ধ্যায় শ্যামনগর স্টেশনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অদ্রিজা-ইন্দ্রনীল। বাকি বন্ধুরা একটু দূরে, ওদের কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে। কী বলছিল ইন্দ্রনীল! তবে যা বলছিল সেদিন, যখন ওরা লাইব্রেরিতে, লেকের ধারে, কলেজ রো ধরে পুরনো কলকাতার গলিপথে হাঁটতে হাঁটতে আলাপ জুড়ত, সেই রকম কিছু তো নিশ্চয়ই নয়।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে ইন্দ্রনীলের সঙ্গে আলাপ-বন্ধুত্ব। বনগাঁর ছেলে, কিন্তু কলেজ থেকেই কলকাতায়। মেসে থাকে। পড়াশোনায় তুখোড়। অদ্রিজাও বেশ ভালো। নোটস, বই ভাগাভাগি করতে করতে মনটাও ওরা দিয়ে দিয়েছিল। সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটের আদি বাসিন্দা ছিল অদ্রিজাদের পরিবার। কিন্তু কলকাতা চেনা, ভালোবাসা এবং পায়ে হেঁটে ঘোরা — সব ইন্দ্রনীল শিখিয়েছিল।

পার্ট-টু পরীক্ষার রেজাল্টের পরেই বিয়ে হয়েছিল মণিদীপার। বাকি বন্ধুরা এবং অদ্রিজা তখন চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিয়ালদা স্টেশনের কাছে এক চাকরির পরীক্ষার কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছিল অদ্রিজা, লোপা, মেহবুব, রোশনী, কিংশুকদের সঙ্গে। ইন্দ্রনীল পার্টটাইম লেকচারারশিপ পেয়েছিল বনগাঁর কোনো এক কলেজে। কলকাতায় তখন আর থাকত না।

বন্ধুর বিয়ে, তার ওপর ইন্দ্রনীলের সঙ্গে বহুক্ষণ ‘একা’ কাটাবে — সেই আনন্দে, উত্তেজনায় অদ্রিজার খাওয়া, পড়াশোনা দুদিন ধরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আসলে প্রতি পুজোয় ওরা একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোলেও এই পুজোয় ইন্দ্রনীল কলকাতায় আসেনি। পুজোর পর বন্ধুদের গেটটুগেদারে দেখা হলেও কেমন যেন ছাড়া ছাড়া হাবভাব! কে জানে, পড়াশোনা, চাকরি — এই সবের চাপ চলছিল হয়তো। ফোনে খুব কম কথা হত। মেসেজ চললেও সেটাও সংক্ষিপ্ত। অদ্রিজার খারাপ লাগলেও ওরও ডিসেম্বরে ব্যাঙ্কের পরীক্ষা ছিল। মণিদীপার বিয়েতেই ঠিক করেছিল, অনেকটা সময় নিজেদের নিয়ে থাকবে। আর মণিদীপাকে দেখে নিজেদের একসঙ্গে থাকার স্বপ্নটাকে আবার নতুন করে বুনবে।

ছাতিম ফুল সাদা হয়, না ধূসর, নাকি ফিকে হলুদ-সাদা! শ্যামনগর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সবুজ গাছের পাতার ভেতরে ফুলের থোকাটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। অনেক কথা বলে যাচ্ছিল ইন্দ্রনীল। আজ ছাতিমের গন্ধে কান্না পাচ্ছে কেন?

বৃষ্টির ফোঁটা অদ্রিজাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে একটু একটু করে। ও মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করছে। ইন্দ্রনীল বলছে, “সম্পর্কটা এখানেই শেষ করলাম। ভেবে দেখলাম, তুই আমার গ্রাম্য, আচারসর্বস্ব পরিবারে থাকতে পারবি না। তুই, আমি, আমার পরিবারের কেউ ভালো থাকবে না। তার চেয়ে এই ভালো।”

ইন্দ্রনীলকে পাঞ্জাবি আর জিন্সে কী অসম্ভব সুন্দর লাগছে! অদ্রিজা তার দীঘল চোখের দৃষ্টি দিয়ে ওকে ছুঁতে চাইছিল, কিন্তু ইন্দ্রনীলের দেখার সময়টুকু নেই। কখন যেন সামনে থেকে সরে গিয়েছিল। অদ্রিজা ভাবে, তাই এক ট্রেন হলেও আলাদা কামরা, আলাদা গিফ্ট। বন্ধুরা দাঁড়িয়েছিল অদ্রিজার জন্য। ওরাও হয়তো সব জানত, কে জানে?

লোপা ওদের ব্যাচের হলেও এমন কিছু বন্ধুত্ব ছিল না। মেয়েটা এগিয়ে এসে শক্ত করে অদ্রিজাকে ধরে। কানের কাছে জপ করার মতো বলে যায়, “কিচ্ছু হয়নি। বি স্টেডি, বি স্টেডি। এই রকমটা সবার সঙ্গে কমবেশি ঘটে। জাস্ট ভুলে যা।”

ব্যাঙ্কের চাকরিটা অদ্রিজার হয়নি। হবে কী করে, পরীক্ষাটাই তো দেওয়া হল না। বিশ্বাসঘাতকতা, অপমান — এই শব্দগুলো চারপাশে থাকলেও অদ্রিজার জীবনে তাদের স্থান ছিল না। নিজের পড়াশোনা এবং ইন্দ্রনীলের জন্য আকণ্ঠ ভালোবাসা — এই নিয়েই বেশ ছিল। জীবনের প্রতি আস্থা হারানো মেয়েটাকে আবারও মূলস্রোতে ফিরে আসতে সাহায্য করেছিল লোপা। ইন্দ্রনীল চলে গেলেও জীবনদেবতা অদ্রিজার জন্য লোপার মাধ্যমে সৎ বন্ধু ফিরিয়ে দিয়েছিল।

এই সময়ে সাত্যকিও আসে অদ্রিজার জীবনে। নরম হাতে দরজায় কড়া নেড়ে প্রবেশ করে। যে ব্যাঙ্কের চাকরির পরীক্ষাটায় অদ্রিজা বসতেই পারেনি, সেটায় পাশ করে সাত্যকি। লোপা এবং সাত্যকির বন্ধুত্ব, সাহচর্য পুরনো ক্ষত সারিয়ে তোলে। তারপর তো অদ্রিজারও প্রাইমারি টেট পরীক্ষায় পাশের খবর হারানো আত্মবিশ্বাসটা ফিরিয়ে দেয়।

“জোরে হাওয়া দিচ্ছে, নিম্নচাপের একটা ফোরকাস্ট ছিল। কে জানে বাবা! সারা বছর হয় গরম, নয়তো বৃষ্টি।”

অদ্রিজার ট্রেনের সহযাত্রী এই প্রথম কথা বলল। কী উত্তর দেবে ভেবে না পেয়ে কাঁধটা ঝাঁকিয়ে আলতো হাসে ও।

নৈহাটিতে সাত্যকির পৈতৃক বাড়িটা একদম গঙ্গার কাছে। তিনতলার ছাদ থেকে জুবিলি ব্রিজটা মোটামুটি দেখা যায়। এই মার্চের শেষের দিকে রাতের বেলা আচমকা কালবৈশাখী শুরু হয়। অদ্রিজা কোনোমতে খাওয়া শেষ করে ছাদে দৌড়ায়। গাছপালায় ঘেরা ওদের বাড়ি, পাড়া। অদ্রিজা দেখছিল, ঝড়টা তীব্র আক্রোশে নিমগাছ, নারকেলগাছ, আমগাছের ডাল, পাতাকে বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে। ট্রেনের কামরায় বসে অদ্রিজাও তার মনে ওঠা ঝড়ে নাস্তানাবুদ হয়ে চলেছে সেই দুপুর থেকে।

ব্যাগটা খুলে মোবাইলটা হাতে নেয়। ইন্দ্রনীলের ডিপিটা দেখতে হবে, এখুনি। অদ্রিজা এখনও ভেবে পাচ্ছে না, এতকাল তো দেখা হয়নি, প্রায় উনিশ-কুড়ি বছর পর আজই কেন দেখা হল? লোপাও তো পাশে ছিল, তাহলে অদ্রিজাকেই বা খামোখা ডাকতে গেল কেন? লোপাকে তো চিনলই না।

হোয়াটসঅ্যাপের ডিপিটায় ইন্দ্রনীলের পাশে দাঁড়িয়ে বউ। বেশ সুন্দরী। ছেলেমেয়ে আছে কি না কে জানে। অদ্রিজা তো আপাতত ঝাড়া হাত-পা, তবুও কোথাও গিয়ে কষ্টটা তো আছেই। ঈশ্বর পুরোপুরি সুখী বোধহয় কোনো মানুষকেই করেন না।

ফেসবুকে ইন্দ্রনীলের নামটা লিখে খোঁজার একটু কৌতূহল হয় অদ্রিজার। পরিবারটাকে ভালো করে দেখা যেত। কী করে এখন, কে জানে! তবে গোলাপি আভাযুক্ত গাল, পেটানো চেহারা, দামি জামাকাপড়ে সজ্জিত সুপুরুষ মানুষটা যখন দুপুরে খেতে এসেছে শপিংমলটায়, ভালোই রোজগার করে।

তখনও প্রাইমারি টেট পাশ করেনি অদ্রিজা। একটার পর একটা পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। সেই সময় মেহবুব বলেছিল, একই কলেজের পার্টটাইমারের সঙ্গেই প্রেম ইন্দ্রনীলের, আর ওরা বেশ সিরিয়াস। তার মানে অদ্রিজাকে নিয়ে শুধুই ‘সময়’ কাটিয়েছে। পুরনো অপমানটা নতুন করে অদ্রিজার জীবনে ফিরে আসে।

এখুনি ইন্দ্রনীলের নম্বরটা ডিলিট করবে বা ব্লক করবে। ইচ্ছে করছে নিজেকে চড় মারতে। জাস্ট “চিনি না, চিনতে পারছি না” বললেই মিটে যেত। অপমান আর রাগের খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়ে অদ্রিজা।

ট্রেন কাঁকিনাড়ার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ায়। বৃষ্টি এখানে হয়ে গেছে, চারপাশটা জলভেজা। অদ্রিজা ইন্দ্রনীলের নম্বরটা ব্লক করতে গিয়ে ডিলিট করে দেয়। কেন, ভেবে পায় না অদ্রিজা। কে জানে, হয়তো ইন্দ্রনীলকে নিজের সুখী গৃহকোণ দেখানোর লোভটা রয়ে গেল মনের কোনো কুঠুরিতে।

কাঁকিনাড়া অনেকটা পেছনে চলে গেছে। নৈহাটি স্টেশনের আলো দেখা যায়। অদ্রিজা এখনও অষ্টমীর বিশেষ শাড়িটা কেনেনি, পুজোর উপহার বাকি রয়ে গেছে। নিজের ঘর, ছাদ, জুবিলি ব্রিজ, গঙ্গা আর সাত্যকির কাছে ফিরছে অদ্রিজা। নিম্নচাপের বৃষ্টি, কালবৈশাখী ঝড় থেমে গেছে। ওর মনের আকাশে শরতের সাদা মেঘ দুধের সরের মতো ভাসছে। সেখানে কাশফুল হাওয়ায় দোলে, শিউলি ফুলের গালিচা পাতা হয়।




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের কার্তিক ১৪৩৩ সংখ্যাটি ১ নভেম্বর ২০২৬ (১৪ই কার্তিক) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২০ অক্টোবরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
গঠনমূলক পরামর্শ দিন
মন্তব্যে আপনার মতামত জানান
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
Scroll to Top

‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।