১
উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর লেনে ঘড়ি ধরে যে কাজগুলো রোজ সকালে ঘটে, তার একটা অলিখিত তালিকা আছে।
সকাল ছ’টায় কর্পোরেশনের পাইপলাইনে মরচে-পড়া জল আসার তীক্ষ্ণ ফিসফিস শব্দ। সোয়া ছ’টায় তিন নম্বর বাড়ির বটব্যাল মশায়ের শ্লেষ্মাজড়ানো কর্কশ কাশির আওয়াজ। সাড়ে ছ’টায় গলির কোণের নিমাই ময়রার কড়াইয়ে ফুটন্ত তেলের ছ্যাঁকছোঁক বাদ্যি। আর ঠিক পৌনে আটটায় হরিপদবাবুর দোতলার বারান্দায় তাঁর অবসরপ্রাপ্ত কেরানিজীবনের নিঃশব্দ পদচারণা।
হরিপদবাবুর বয়স বাষট্টি পেরিয়েছে। দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর সরকারি ট্রেজারি অফিসের লাল ফিতের বাঁধনে নিজের যৌবন, মেরুদণ্ডের তরুণাস্থি এবং মুখের সহজ হাসি জমা রেখে এসেছেন। পেনশন হিসেবে যা পান, তাতে টানাটানির সংসার কোনোমতে টেনেটুনে চলে বটে; তবে তেলের শিশি উপুড় করে শেষ ফোঁটাটি নিংড়ে নেওয়ার মতো একটা সার্বক্ষণিক সতর্কতা তাঁর চোখের কোণে স্থায়ী ভাঁজ ফেলে দিয়েছে। কাল সকালেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখায় গিয়ে পাসবই আপডেট করিয়েছিলেন — সুদের হার আবার আধ শতাংশ কমেছে। সেই অঙ্কের হিসাবটা তাঁর মাথায় একনাগাড়ে খচখচ করছিল। মানুষ হিসেবে তিনি কোনোদিন পাড়ার আড্ডায় মাতেননি, ঝুটঝামেলা এড়িয়ে ফুটপাথের ধার ঘেঁষে হেঁটেছেন। জীবনের একমাত্র বিলাসিতা — সকালের আধ কাপ আদা দেওয়া লিকার চা এবং আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে চোখ বোলানো।
সেদিন সকালে নিয়মের সামান্য ব্যত্যয় ঘটল। হরিপদবাবু যখন প্লাস্টিকের হাতল-ভাঙা চেয়ারটায় বসে সবেমাত্র ‘আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার সংকট’ শীর্ষক লেখাটিতে মন দিয়েছেন, তখনই বারান্দার লোহার রেলিংয়ের ঠিক মাঝখানটায় শব্দ হলো — ‘খটাস’।
হরিপদবাবু চশমার ফ্রেমটা নাকের ডগায় নামিয়ে তাকালেন।
একটি দাঁড়কাক। চেহারায় আভিজাত্যের লেশমাত্র নেই। উল্টে কলকাতার ধুলোবালিতে ঘষা খেয়ে গায়ের কালো রংটা কিছুটা কালচে-ছাইটে রূপ নিয়েছে। ডানদিকের ডানায় দুটো পালক এমনভাবে উপড়ে রয়েছে, যেন কোনো সমবয়সী চিলের সঙ্গে সদ্য ছাদের ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে মারপিট করে এসেছে। তার চেয়েও বড় কথা, কাকটির বাঁ চোখটা প্রায় বোজা, আর খোলা ডান চোখের মণিতে এমন একটা তীক্ষ্ণ, ধড়িবাজ দৃষ্টি — যা হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের আয়কর দপ্তরের কড়া অডিট অফিসারের চোখে দেখতে পাওয়া যায়।
কাকটি ঘাড় সামান্য হেলিয়ে একবার হরিপদবাবুর দিকে তাকাল। তারপর বুক ফুলিয়ে ডেকে উঠল — ‘ক্যা-অ-অ’।
শব্দটা এতই অপ্রত্যাশিত যে হরিপদবাবুর হাত থেকে খবরের কাগজটা ফসকে কোলের ওপর পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর বুকের ভেতর অবদমিত একটা পুরোনো ইচ্ছা চকিতে বিদ্যুৎচমকের মতো খেলে গেল — যদি সত্যি কোনোদিন কোনো অলৌকিক ঘটনায় এই পেনশনের হিসাবনিকাশ আর প্রতিদিনের চেনা তুচ্ছতা এক লহমায় বদলে যেত!
মুহূর্তের সেই দুর্বলতা অবশ্য পরক্ষণেই উবে গেল, যখন রান্নাঘর থেকে কাচের কাপে চা নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন হরিপদবাবুর স্ত্রী শৈলবালা।
শৈলবালার বয়স চুয়ান্ন। এই সংকীর্ণ গলির সংসারের বাইরে তাঁর নিজস্ব এক জগৎ আছে — যার অর্ধেকটা জুড়ে পাড়ার লোকেদের জন্মকুণ্ডলীর গ্রহদোষ নিয়ে ভাবনা, আর বাকিটা প্রতি রাতে দেখা স্বপ্নের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা খোঁজা।
কাকের ডাক শুনে শৈলবালা দরজার মুখেই থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর হাতের কাপ সামান্য কাঁপল, ফলে পিরিচে দু’ফোঁটা ফুটন্ত চা ছলকে পড়ল। তিনি চোখ বড় বড় করে রেলিংয়ে বসা কাকটির দিকে তাকালেন। তারপর হাত বাড়িয়ে স্বামীর কাঁধ খামচে ধরলেন।
“কী হলো শৈল? চাটা ফেলে দেবে নাকি?” হরিপদবাবু ছিটকে সরে গেলেন।
“চুপ করো!” শৈলবালার কণ্ঠে যেন কোনো নিষিদ্ধ রহস্য-উপন্যাসের স্বরগ্রাম ফুটে উঠল। তিনি প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে বললেন, “দেখতে পাচ্ছ না? কার্নিশের দিকে তাকাও।”
হরিপদবাবু তাকালেন। কাকটি তখন ঠোঁট দিয়ে নিজের ডানার খসে যাওয়া পালকের গোড়াটা নির্লজ্জ ভঙ্গিতে চুলকাচ্ছে।
“কাক বসেছে। তাতে কী হয়েছে? কলকাতায় কাক বসা কি বেআইনি?”
হরিপদবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চশমার কাচ মুছলেন। পঁয়ত্রিশ বছরের দাম্পত্য তাঁকে শিখিয়েছে, শৈলবালার স্বপ্নের যুক্তির সঙ্গে তর্ক করা আর চলন্ত ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে ছাতা মেলে ধরা একই ব্যাপার।
তিনি মৃদু গলায় বললেন, “স্বপ্নে তুমি কালো শালও দেখতে পারো, আবার নিমাইয়ের পোড়া রসগোল্লাও দেখতে পারো, শৈল। কাকটা শুধু বসেছে কারণ ও পাশের নিমাইয়ের দোকান থেকে কড়াইশুঁটির কচুরির গন্ধ পাচ্ছে। ওর পেটে খিদে আছে, কোনো দৈববাণী নেই।”
শৈলবালা তাঁর দিকে এমন একখানা দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন, যার সহজ বাংলা হলো — তুমি অভিশপ্ত, অপদার্থ এবং এই সংসারে তোমার মতো মানুষের জন্যই কোনোদিন শ্রীবৃদ্ধি হলো না। তিনি সোজা ঠাকুরঘরের দিকে হাঁটা দিলেন কাকের উদ্দেশ্যে একখানা কদমা বা বাতাসা নিবেদন করতে।
কিন্তু বাতাসার আগেই কাকটি উড়ে গেল। তবে যাওয়ার আগে রেলিংয়ের রং-চটা লোহার ওপর এক চিলতে সাদাটে স্মারকচিহ্ন রেখে গেল, যা কোনোভাবেই পুজো পাওয়ার যোগ্য নয়।
হরিপদবাবু ভাবলেন, উপদ্রব শেষ হলো। তিনি জানতেন না, উত্তর কলকাতার এঁদো গলিতে একটি চুনোপুঁটি দাঁড়কাকের ডানার ঝাপটা কীভাবে গোটা পাড়ার সমাজতত্ত্বের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
২
শ্যামপুকুর লেনের কেন্দ্রীয় সম্প্রচারকেন্দ্র হলো ‘ভোলানাথ টি স্টল’। দোকানের মালিক ভোলা এক হাতে অ্যালুমিনিয়ামের কেটলি থেকে ফুটন্ত লিকার ঢালে, আর অন্য হাতে পুরো অঞ্চলের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহবিচ্ছেদ এবং মিউটেশনের গোপন খবর ফেরি করে। তার দোকানের সামনে কাঠের বেঞ্চি পাতা থাকে তিনটে। সকাল আটটা বাজতেই সেখানে পাড়ার বিভিন্ন স্তরের দার্শনিক ও পেশাদার বেকারদের সমাগম ঘটে।
হরিপদবাবুর বাড়ি থেকে শৈলবালার স্বপ্নের খবরটা মোড়ে পৌঁছাতে সময় নিয়েছিল ঠিক পঁচিশ মিনিট। শৈলবালার দূরসম্পর্কের ভাগ্নে নিতাই — যে সারাদিন পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বন্ধ কলকারখানার জমি বিক্রির ব্যর্থ চেষ্টা করে — সে সোয়া আটটায় ভোলার দোকানে এসে ঢুকল।
“এক কাপ কড়া লিকার দে তো, ভোলা,” নিতাই উনুনের পাশে বসে পকেট থেকে কাঁচি মার্কার বিড়ির প্যাকেট বার করল। “আজ সকালে মেজমাসিমার বাড়িতে মারাত্মক একটা কাণ্ড ঘটে গেছে।”
দোকানে তখন উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় পুরোহিত রত্নাকর ভট্টাচার্য। রত্নাকরের মূল পেশা পুজো-আচ্চা হলেও আসল ব্যবসা হলো লোকের দুর্বল মুহূর্ত বুঝে গ্রহশান্তির পাথর আর মাদুলি গছানো। রত্নাকরের নিজের সংসারেও টানাটানি; গত তিন মাস ধরে সনাতন মুদির দোকানে চাল-ডালের ধার বাড়ছে। তাঁর পাশে বসেছিলেন এলাকার প্রভাবশালী নেতার খাস শাগরেদ বাবলু এবং অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক অমলবাবু।
রত্নাকর পুরুত চায়ের কাপে একটা লার্ক বিস্কুট ডোবাতে ডোবাতে চোখ কুঁচকে তাকালেন, “কী কাণ্ড হে নিতাই? হরিপদবাবুর প্রেসার আবার বাড়ল নাকি?”
“প্রেসারের চেয়েও মারাত্মক, পুরুতমশাই,” নিতাই বিড়িতে লম্বা টান দিয়ে নীলচে ধোঁয়া ছাড়ল। “আজ ভোরবেলা মেজমেসোমশায়ের বারান্দায় এক আশ্চর্য কাক এসে বসেছে। যে-সে কাক নয়। মেজমা ভোরবেলা স্বপ্ন দেখেছেন স্বয়ং শনিদেব না যমরাজ, কে যেন কালো চাদর গায়ে তাঁদের ভিটেয় পা রাখছেন। স্বপ্ন ভাঙতেই বারান্দায় গিয়ে দেখেন, একখানা প্রকাণ্ড দাঁড়কাক রেলিংয়ে বসে মানুষের গলায় শ্লোক আওড়ানোর মতো করে ডাকছে। আর কাকের ডাক শুনেই নাকি মেজমার ডান হাঁটুর সেই তিন বছরের পুরোনো বাত একেবারে উধাও!”
অমলবাবু এতক্ষণ চশমা মুছে ভাঁজ করা খবরের কাগজ সোজা করছিলেন। তিনি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “রাখো তোমার বাত আর শ্লোক! দাঁড়কাক ডাকলে যদি বাতের ব্যথা সারত, তবে কলকাতার অর্থোপেডিক ডাক্তাররা কাল থেকে নিমাইয়ের দোকানে বসে কচুরি ভাজতেন। যত সব অলুক্ষণে কথা!”
রত্নাকর কিন্তু অমলবাবুর কথায় কান দিলেন না। তিনি বিস্কুটের গলে যাওয়া অংশটা মুখে পুরে আঙুল দিয়ে পাকা দাড়ির গোড়া চুলকালেন। তাঁর ব্যবসায়িক ইন্দ্রিয় মুহূর্তের মধ্যে সজাগ হয়ে উঠল। সনাতনের আঠারোশো টাকার বাকি বিল আর পকেটের খালি অবস্থা চোখের সামনে ভেসে উঠল। যেখানে ভয় আছে, সেখানেই তো দক্ষিণার আসল উৎস।
“অমল, তুমি সব বিষয়ে স্কুলের মাস্টারি ফলাও বলেই সমাজের এই অধঃপতন,” রত্নাকর বেঞ্চির ওপর আঙুল দিয়ে কাল্পনিক গ্রহের ছক কাটতে শুরু করলেন। “আজ কী বার? বৃহস্পতিবার। তিথি কী? কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী। শাস্ত্রে পরিষ্কার বিধান আছে — ‘বৃহস্পতিবারের কৃষ্ণকাকং গৃহদ্বারে চ তিষ্ঠতি, তস্য বাসম্ ন জানামি ধনম্ বা মৃত্যুরেব চ।’ কাক স্বয়ং শনিদেবের বাহন। আবার পিতৃপুরুষের অতৃপ্ত আত্মাও বটে। হরিপদর বাবা হরেন জ্যাঠা যখন মারা যান, হরিপদ তো পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে বাপের শ্রাদ্ধের খরচ অর্ধেক ছাঁটাই করেছিল! সেই অতৃপ্ত আত্মা যে কাকের বেশে ফিরে আসেনি, তার কোনো প্রমাণ তোমার বিজ্ঞানের মাস্টারি দিতে পারবে?”
দোকানের আবহাওয়া মুহূর্তের মধ্যে ভারী হয়ে উঠল।
বাবলু এতক্ষণ একপাশে চুপ করে বসে মোবাইলে চোখ রাখছিল। সে চট করে সোজা হয়ে বসল। সামনেই পুরসভার উপনির্বাচন। পাড়ায় কোনো বড় জমায়েত বা ইস্যু নেই। এমন সময়ে যদি এই ‘অলৌকিক কাক’কে কেন্দ্র করে একটা আলোড়ন তোলা যায়, তবে ক্লাবের নামে নতুন ফ্লেক্স টাঙানো যাবে, পাড়াজুড়ে একটা মস্ত যজ্ঞের চাঁদা তোলা যাবে এবং ওপরমহলেও নিজের সাংগঠনিক ক্ষমতা জাহির করা যাবে।
বাবলু টেবিলে চায়ের গ্লাসটা সশব্দে ঠুকে বলল, “পুরুতমশাই একদম মোক্ষম কথা ধরেছেন। আমাদের লেনের ওপর অনেকদিন ধরেই একটা অশুভ বাতাস বইছে। গত মাসেই তো বটব্যাল মশায়ের মেজো ছেলেটা বাইক থেকে উল্টে হাত ভাঙল। এই কাক নির্ঘাত কোনো মহাবিপদের আগাম সিগন্যাল দিচ্ছে। হরিপদ জ্যাঠাকে বুঝতে হবে, এটা শুধু ওঁর একার ছাদ নয়, গোটা পাড়ার নিরাপত্তার প্রশ্ন!”
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভোলার চায়ের দোকান থেকে খবরটা ডালপালা মেলে তিনটে সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ নিল:
১) সনাতন মুদির কাছে খবর গেল — হরিপদবাবুর বারান্দায় স্বয়ং শনিদেবের কৃপাদূত নেমেছে, হরিপদবাবু খুব শীঘ্রই লটারিতে বড় অঙ্কের টাকা পেতে চলেছেন।
২) পাড়ার মহিলামহলে শৈলবালার কাছে বার্তা গেল — শৈলবালা নাকি কাকের রূপ ধরে আসা অলৌকিক আত্মার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন এবং কাকটি ইঙ্গিত দিয়েছে তাঁদের ভিটের নিচে পুরোনো কোনো আমলের মোহর পোঁতা আছে।
৩) আর ক্লাবের ছেলেদের কাছে খবর পৌঁছাল — হরিপদবাবুর বাড়িতে এক ভয়ংকর অপদেবতা ঘাঁটি গেড়েছে, যার হাত থেকে পাড়াকে রক্ষা করতে গেলে অবিলম্বে একটা বড় মাপের শান্তিযজ্ঞের আয়োজন না করলেই নয়।
দুপুরে যখন হরিপদবাবু ভাত-ডাল মেখে সবেমাত্র মুখে তুলতে যাচ্ছেন, তখনই সদর দরজায় কড়া নাড়ার খটখট আওয়াজ উঠল। দরজা খুলতেই তিনি দেখলেন, বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন রত্নাকর পুরুত, সঙ্গে বাবলু এবং ক্লাবের আরও দুজন মোটাসোটা চেহারার ছোকরা। রত্নাকরের বগলে একখানা লাল শালুতে মোড়া মোটাসোটা পঞ্জিকা।
হরিপদবাবুর বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। তিনি দরজার পাল্লা ধরে বললেন, “কী ব্যাপার, পুরুতমশাই? অসময়ে?”
হরিপদবাবুর এতদিনের শান্ত, নিরীহ কেরানিসত্তার ভেতর থেকেও এক ঝলক প্রতিরোধের আগুন জ্বলে উঠল। তিনি সটান বললেন, “আমার বাড়িতে কোনো অপদেবতা নামেনি, পুরুতমশাই। ওটা স্রেফ একটা এঁটোখোর পাতি দাঁড়কাক। তার জন্য আমি আমার পেনশনের টানাটানির সংসার থেকে এক পয়সাও অপচয় করব না।”
“পাতি কাক?” রত্নাকর চোখ কপালে তুলে চিৎকার করে উঠলেন, যাতে আশপাশের দোতলা-তিনতলার জানলাগুলো খুলে যায়। “সাক্ষাৎ শনিদেবের দূতকে যে মানুষ পাতি কাক বলে অপমান করে, তার নিজের সর্বনাশ তো বটেই, পুরো শ্যামপুকুর লেনটাকেই সে রসাতলে পাঠাবে! ঠিক আছে হরিপদ, কাল সকালে আমরা সবাই আসব। কাক যদি আবার আসে, তখন বুঝবে পাড়ার ধর্মরক্ষা কমিটি কার ঘাড়ে হাত দেয়!”
হরিপদবাবু শূন্য চোখে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, মধ্যবিত্তের সম্মান কাচের গ্লাসের চেয়েও সস্তা — একবার অন্যের সন্দেহের নজরে পড়লে তা চুরমার হতে মিনিটখানেকও সময় লাগে না।
৩
হরিপদবাবুর দোতলার ঠিক উল্টোদিকের বাড়িটা চ্যাটার্জিদের। সেই বাড়ির তিনতলার একটা ছোট চিলেকোঠার ঘরের জানালায় দাঁড়ালে হরিপদবাবুর বারান্দাটা একেবারে মঞ্চের মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই জানালার পাশে কাঠের পড়ার টেবিলে একগাদা সমাজবিজ্ঞানের মোটা বইয়ের মাঝে বসেছিল তিতলি।
তিতলি প্রেসিডেন্সিতে সমাজতত্ত্বের এম.এ. দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। চোখে বুদ্ধিদীপ্ত সরু ফ্রেমের চশমা, চুলগুলো পেছনের দিকে আলগা করে বাঁধা। তার মুখের শান্ত রেখার পেছনে একধরনের অনমনীয় দৃঢ়তা কাজ করে। সমাজতত্ত্বের ছাত্রী হিসেবে সে মানুষের সামাজিক ভণ্ডামি নিয়ে পড়ালেখা করে, কিন্তু গত চব্বিশ ঘণ্টায় নিজের পাড়ার চেনা মানুষগুলোর রূপান্তর দেখে তার পড়াশোনা করার উৎসাহটাই উবে গেছে।
টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটা নিঃশব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠছে — ‘অর্ক’।
তিতলি কল রিসিভ করতেই ওপার থেকে এক অস্থির কণ্ঠ ভেসে এল, “তিতলি! আমি তোমাদের লেনের মোড়ে।”
“কেন? কী মনে করে?” তিতলির গলায় ক্ষোভ স্পষ্ট।
“আরে, তুলকালাম ব্যাপার! আমাদের রবিবাসরীয়র ইন-চার্জ আমাকে পাঠালেন। তোমাদের পাড়ায় নাকি এক আশ্চর্য কাকের আবির্ভাব হয়েছে, যে মানুষের দুরারোগ্য ব্যাধি সারিয়ে দিচ্ছে? লোকাল ডেস্কে খবরটা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। আমি ভাবছি হেডিং দেব — ‘উত্তর কলকাতার কার্নিশে অলৌকিক বিহঙ্গ: ভীতি নাকি মধ্যবিত্তের মুক্তি?’”
তিতলি কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অর্ক ছেলেটা মানুষ হিসেবে খাঁটি। মফস্বল থেকে কলকাতার এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা পড়ে এখন একটা ছোট দৈনিকে শিক্ষানবিস হিসেবে খাটছে। মেধা আছে, তবে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার কারণে বাস্তবতাকে অনেক সময় আবেগের রং চড়িয়ে দেখতে ভালোবাসে। তিতলির সঙ্গে অর্কর পরিচয় আন্তঃকলেজ বিতর্কের মঞ্চে। অর্ক আবেগের পক্ষ নিয়ে বক্তব্য রেখেছিল, আর তিতলি ঠান্ডা তথ্য দিয়ে তার যুক্তি খণ্ডন করেছিল। বিতর্কে তিতলি জিতেছিল, কিন্তু তিতলির জীবনের কঠিন বাস্তবতায় অর্কর এই নরম আবেগটাই কেমন করে যেন জড়িয়ে গিয়েছিল।
“অর্ক,” তিতলি শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল, “তুমি যদি দশ মিনিটের মধ্যে আমার ঘরে না ওঠো, তবে তোমার ওই খবরের কাগজের মতোই আমাদের সম্পর্কটা পুরোনো রদ্দি কাগজের স্তূপে চলে যাবে। ওপরে এসো।”
দশ মিনিটের মাথায় অর্ক হাঁপাতে হাঁপাতে তিনতলায় উঠল। পরনে ধুলোমাখা জিন্স আর নীল সুতির পাঞ্জাবি, কাঁধে ভারী কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
“এত রাগ করছ কেন, তিতলি?” অর্ক ব্যাগটা মেঝের ওপর নামিয়ে রাখল। “আমি তো শুধু পেশার কাজটাই করছি।”
“পেশা?” তিতলি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। “একজন সাংবাদিক হিসেবে পাড়ার একটা সস্তা মূর্খতাকে কাগজের পাতায় মহিমান্বিত করা তোমার পেশা? হরিপদ জ্যাঠার বারান্দায় যা হচ্ছে, তুমি জানো? রত্নাকর পুরুত কাল সকাল থেকে লোকটাকে ভয় দেখাচ্ছে যজ্ঞের নামে হাজার তিনেক টাকা হাতানোর জন্য। সনাতন মুদি কাকের ছবি দেওয়া ক্যালেন্ডার টাঙিয়ে ব্যবসা বাড়াতে চাইছে। আর ক্লাবের ছেলেরা পাড়ার মোড়ে ফ্লেক্স মারার ধান্দা করছে। তুমি কি অন্ধ, অর্ক? একটা নিরীহ পাখির ঘাড়ে পাড়ার যত ভণ্ডামি ভর করেছে, আর তুমি সেটাকে বলছ ‘অলৌকিক মুক্তি’?”
অর্ক জানালার দিকে এগিয়ে গেল। পর্দাটা একটু সরিয়ে হরিপদবাবুর বারান্দার দিকে তাকাল। সেখানে হরিপদবাবু শুকনো মুখে পায়চারি করছেন, আর নিচে গলিতে তিন-চারজন লোক দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে।
অর্ক ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল। তার চোখের অস্থিরতা এক নিমেষে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক অদ্ভুত বিষাদ নেমে এল। সে একটা চেয়ার টেনে তিতলির মুখোমুখি বসল।
“তিতলি, তুমি জিনিসটাকে যেভাবে বইয়ের পাতায় পড়েছ, মানুষের জীবন সবসময় সেভাবে চলে না,” অর্ক খুব নিচু গলায় বলল। “তুমি সমাজবিজ্ঞানের চশমা দিয়ে কুসংস্কার মাপছ। কিন্তু আমি এই মানুষগুলোর ভেতরে জমে থাকা নিদারুণ শূন্যতাটা দেখতে পাচ্ছি। তুমি তো জানো না, আমার বাবা যখন ক্যান্সারের শেষ স্টেজে হাসপাতালে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, তখন আমার মা — যিনি একটা স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন — তিনিও এক ভণ্ড তান্ত্রিকের দেওয়া মাদুলি এনে বাবার বালিশের তলায় গুঁজে দিয়েছিলেন। মা কি জানতেন না যে মাদুলিতে ক্যান্সার সারে না? জানতেন। কিন্তু মানুষের যখন আর কোনো উপায় থাকে না, যখন বিজ্ঞান, ওষুধ আর সঞ্চয় একে একে ব্যর্থ হতে শুরু করে, তখন মানুষ বাঁচার জন্য মিথ্যের ওপর হলেও একটা আলগা হাত রাখতে চায়। সনাতন মুদির দোকানে গিয়ে দেখেছ? ছেলেটা তিন বছর ধরে বি.কম পাশ করে বেকার বসে আছে। ওর দোকানের দেনা শোধ হচ্ছে না। হরিপদ জ্যাঠার স্ত্রী একাকিত্বে ভুগছেন। মানুষ যখন নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন সে একটা তুচ্ছ কাকের ডানাতেও কোনো অদৃশ্য শক্তির সংকেত দেখতে চায়।”
তিতলি এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। অর্কর বাবার সেই স্মৃতিটা সে জানে। অর্কর এই নরম মানবিক দুর্বলতাটাই তিতলিকে বারবার নিঃশব্দ করে দেয়। ছেলেটা কুসংস্কারের পক্ষে নয়, কিন্তু মানুষের অসহায়তাকে সে কোনোদিন ঘৃণা করতে পারে না।
তবে তিতলি পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে নিল। সে চশমাটা নাকের ওপর তুলে বলল, “তোমার এই সহানুভূতিটা আমি বুঝি, অর্ক। কিন্তু তুমি কি বুঝতে পারছ না, এই সহানুভূতির ফাঁক গলেই রত্নাকর পুরুত আর বাবলুদের মতো লোকরা বেঁচে থাকে? অসহায় মানুষের ভয়কে ব্যবসা বানানোর নাম কখনো মুক্তি হতে পারে না। তুমি যদি সত্যি একজন সৎ সাংবাদিক হও, তবে মিথ্যে আশার আফিম না বিলিয়ে আসল সত্যটা সবার সামনে আনো।”
“সত্যটা কী?” অর্ক অবাক হয়ে তাকাল।
তিতলি মুচকি হাসল। সেই হাসিতে কোনো তাচ্ছিল্য ছিল না, ছিল স্পষ্ট আত্মবিশ্বাস। সে বলল, “সত্যটা দেখতে হলে তোমাকে কাল সকালে ঠিক পৌনে আটটায় এই জানালায় ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কথা দিচ্ছ, আসবে?”
অর্ক তিতলির স্থির চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের পাঞ্জাবির হাতাটা গোটাল। তারপর নিঃশব্দে মাথা নেড়ে বলল, “আসব।”
৪
পরদিন, শুক্রবার। সকাল সাড়ে সাতটা। হরিশ মুখার্জি লেনের আবহাওয়া দেখে মনে হচ্ছিল পাড়ায় কোনো মহামানব পদার্পণ করবেন। হরিপদবাবুর বাড়ির সামনের অপ্রশস্ত গলিটা মানুষে মানুষে গিজগিজ করছে। কর্পোরেশনের সাফাইকর্মী ঝাঁটা একপাশে ফেলে রেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পাড়ার মহিলারা স্নান সেরে কপালে সিঁদুরের টিপ পরে বারান্দায় ঝুলছেন।
ঠিক উল্টোদিকের তিনতলার জানালায় তখন অর্ক আর তিতলি। অর্ক তার পুরোনো ডিএসএলআর ক্যামেরার টেলিফটো লেন্সটা কাঠের রেলিংয়ে ভর দিয়ে হরিপদবাবুর বারান্দার দিকে তাক করে রেখেছে।
“আর তিন মিনিট বাকি পৌনে আটটা বাজতে,” অর্ক নিঃশ্বাস আটকে ঘড়ির দিকে তাকাল। ভিড়ের মধ্যে তখন পিনপতন নীরবতা। “যদি আজ কাকটা না আসে? তবে তো মানুষগুলো খুব আঘাত পাবে, তিতলি।”
“কাক আসবে,” তিতলি শান্ত গলায় কফির কাপে চুমুক দিল। “ঘড়ির কাঁটা ভুল করতে পারে অর্ক, কিন্তু পেটের টান কখনো ভুল করে না।”
“তুমি এত নিশ্চিত হচ্ছ কী করে?”
তিতলি কোনো উত্তর দিল না। সে নিজের হাতটা বাড়িয়ে অর্কর ক্যামেরার ভারী লেন্সটা হরিপদবাবুর বারান্দা থেকে সামান্য ডানদিকে ঘুরিয়ে দিল। “বারান্দায় নয়, ফোকাস করো ঠিক নিচে — নিমাইয়ের মিষ্টি তৈরির পেছনের চাতালটায়।”
অর্ক ভিউফাইন্ডারে চোখ রাখল।
হরিপদবাবুর পলেস্তারা-খসা দেওয়াল ঘেঁষেই নিমাই ময়রার মিষ্টি তৈরির বড় কারখানা। সেখানে টিনের চালার নিচে প্রকাণ্ড সব কড়াইয়ে ছানা আর চিনির রস ফুটছে। কারখানার পেছনের দিকে একটা সরু খোলা ছাদ বা সানশেড রয়েছে, যা হরিপদবাবুর দোতলার বারান্দার কার্নিশ থেকে মাত্র হাত পাঁচেক দূরে।
ভিউফাইন্ডারের গোল ফ্রেমে অর্ক দেখতে পেল, সকাল ঠিক সাতটা বেজে বিয়াল্লিশ মিনিটে কারখানার ময়লা গেঞ্জি পরা কাজের লোক কালীপদ একটা বড় অ্যালুমিনিয়ামের গামলা হাতে সানশেডে এসে দাঁড়াল। গামলার ভেতর আগের দিনের অবিক্রীত ফাটা রসগোল্লা, পচা ছানার চাঁই আর বাসি মিষ্টির স্তূপ। কালীপদ সানশেডের কার্নিশের ওপর সেই নোংরা মিষ্টির দলাগুলো উপুড় করে ঢেলে দিল। তারপর গামলার তলায় চামচ দিয়ে ঠকঠক করে দুটো চেনা আওয়াজ করে ডাকল — ‘আ-আ-আ-রো-রো’।
শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই আকাশ থেকে ডানা ঝাপটানোর শব্দ পাওয়া গেল। ডান ডানায় দুটো পালক খসা, বাঁ চোখ আধবোজা সেই একই দাঁড়কাক!
কাকটি সানশেডে নামল। অত্যন্ত খুঁতখুঁতে মেজাজে স্তূপের ভেতর থেকে সবচেয়ে বড় আর শক্ত ছানার দলাটা ঠোঁটে চেপে ধরল। কিন্তু সে সেখানে বসে খেল না। কারণ নিচে গলিতে নিমাইয়ের দোকানের দুটো হাড়জিরজিরে নেড়ি কুকুর তখন খাবারের লোভে সানশেডের দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করছিল।
কাকটি ছানার দলা মুখে নিয়ে সটান ডানা মেলল। ঠিক পাঁচ ফুট উঁচুতে উঠে হরিপদবাবুর বারান্দার কার্নিশের পরিচিত জায়গায় গিয়ে জমকালো ভঙ্গিতে বসল।
নিচে তখন রত্নাকর পুরুতের উদাত্ত কণ্ঠে সংস্কৃত মন্ত্রের ধ্বনি উঠছে — ‘ওঁ শং শনৈশ্চরায় নমঃ…’। মন্ত্রের তীব্র লয়ের সঙ্গে সঙ্গে কাকটি কার্নিশে বসে খুব আয়েশ করে পায়ের নখ দিয়ে ছানার টুকরোটা চেপে ধরে ঠোঁট দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে গিলতে শুরু করল। নিচে ভক্তির উচ্চকিত স্বর, আর ওপরে কাকের পেট ভরানোর নিবিড় জৈবিক উদগ্রতা — দুটো যেন এক অদ্ভুত সুরে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
কাকটির খাওয়া প্রায় শেষ। সে ঘাড় বাঁকিয়ে একবার নিচে তাকাল। তার বাঁ চোখের কোটরে জমে থাকা কুটিল দৃষ্টিতে যেন মানুষের এই হাতজোড় করা ভক্তির প্রতি এক অপার তাচ্ছিল্য ঝরে পড়ল। আর কাকের এই উপস্থিতি দেখেই নিচে ভিড় করা অর্ধশতাধিক মানুষ একসঙ্গে সাষ্টাঙ্গে নুয়ে পড়ল।
রত্নাকর পুরুত শাঁখ বাজিয়ে উঠলেন। শৈলবালা বারান্দার মেঝেতেই প্রণাম করলেন। নিচে থেকে বাবলু তার দলবল নিয়ে সোল্লাসে চিৎকার করে উঠল, “জয় বাবা বার্তাবহ বিহঙ্গম কি জয়!”
ক্যামেরার ভিউফাইন্ডার থেকে চোখ সরাল অর্ক। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম।
কাকটি মানুষের এই অতিরিক্ত চিৎকারে সামান্য বিরক্ত হয়ে ছানার শেষ টুকরোটা এক ঢোকে গিলে ফেলল। তারপর হরিপদবাবুর রেলিংয়ের রং-চটা লোহার গায়ে নিজের ঠোঁটটা দু’বার ঘষে মুছে নিয়ে অলস ভঙ্গিতে আকাশে মিলিয়ে গেল।
“দেখেছ?” তিতলি কফির কাপ নামিয়ে রাখল। তার চোখেমুখে কোনো উল্লাস ছিল না, কেবল এক শান্ত, নিবিড় প্রত্যয়। “তোমার অলৌকিক মহাপুরুষের আসল রহস্য? ও কোনো স্বর্গের শান্তির বার্তা নিয়ে আসে না, অর্ক। ও আসে কালীপদর ফেলে দেওয়া বাসি ছানা খেতে। কালীপদ রোজ ঠিক পৌনে আটটায় ছানার এঁটো ফেলে, আর কুকুরদের ভয়ে কাকটা হরিপদ জ্যাঠার নির্জন বারান্দায় এসে বসে খায়। কাকের কোনো সময়জ্ঞান নেই অর্ক, সময়জ্ঞানটা নিমাই ময়রার কর্মচারীর কাজের শিফটের!”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে নিজের ক্যামেরার এলসিডি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সেখানে পরিষ্কার জুম করা ছবিতে দেখা যাচ্ছে — কাকের কালচে ঠোঁটের ডগায় লেপটে রয়েছে সাদা ছানার টুকরো।
অর্কর মুখ দিয়ে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোল। সে বিড়বিড় করে বলল, “তাহলে এই হলো আধ্যাত্মিকতার চেহারা!”
“এবার চলো নিচে,” তিতলি দৃঢ় পায়ে দরজার দিকে এগোল। “এই ছবি আর আসল সত্যিটা সবার সামনে তুলে ধরার সময় এসেছে। তোমার কাগজের পাতায় না হোক, এই পাড়ার মানুষদের এই আত্মপ্রবঞ্চনার খেলাটা অন্তত বন্ধ হওয়া দরকার।”
অর্ক ক্যামেরাটা কাঁধে ঝুলিয়ে তিতলির হাতটা চেপে ধরল। তার চোখদুটো অদ্ভুত নরম হয়ে উঠল। “তিতলি, তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো মানুষ এই সত্যিটা মানবে? মানুষ কিন্তু তার পছন্দের মিথ্যেটা ভাঙলে বড় হিংস্র হয়ে ওঠে।”
তিতলি অর্কর চোখের দিকে তাকাল। তার নিজের চোখে ছিল এক তরুণীর আপসহীন আদর্শবাদ। সে বলল, “সত্য সবসময় আরামদায়ক হয় না, অর্ক। কিন্তু মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শান্তির চেয়ে সত্যের আঘাত অনেক বেশি খাঁটি। চলো।”
৫
নিচে যখন তিতলি আর অর্ক নামল, তখন পরিবেশ রীতিমতো ভাবগম্ভীর। রত্নাকর পুরুত হরিপদবাবুর কপালে চন্দনের তিলক পরিয়ে দিচ্ছেন এবং শৈলবালাকে কড়া নির্দেশ দিচ্ছেন, কাকের উদ্দেশ্যে একুশ দিন সন্ধ্যাবাতি দিতে হবে। সনাতন মুদি ভক্তিভরে প্রণামী হিসেবে একখানা কড়কড়ে পাঁচশো টাকার নোট পুরুতের থালায় নামিয়ে দিয়েছে।
“সবাই একটু থামবেন?”
তিতলির ধারালো, স্পষ্ট কণ্ঠস্বর গলির সমস্ত গুঞ্জনকে এক নিমেষে চাবুকের মতো থামিয়ে দিল। ভিড়ের ভেতর থেকে প্রবীণ-নবীন সবাই একসঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
রত্নাকর পুরুত বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকালেন, “কী হয়েছে মা তিতলি? এখন পূর্ণাহুতি হবে, এই শুভলগ্নে বিঘ্ন ঘটাতে নেই।”
“কাকে পূর্ণাহুতি দিচ্ছেন, পুরুতমশাই?” তিতলি ভিড় ঠেলে একদম সামনে এসে দাঁড়াল। তার পেছনে অর্ক। তিতলি আঙুল তুলে হরিপদবাবুর বারান্দার দিকে ইশারা করে বলল, “জ্যাঠামশাই, আপনারা যাকে শনিদেবের বাহন বা স্বর্গের দূত ভাবছেন, সে কোনো অলৌকিক পাখি নয়। অর্ক, ছবিগুলো সবাইকে দেখাও।”
অর্ক তার ক্যামেরার স্ক্রিনটা অন করে ভিড়ের চোখের সামনে তুলে ধরল। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে — কাকটি নিমাই ময়রার পেছনের সানশেড থেকে ছানার দলা ঠোঁটে তুলছে, আর সেই ছানা মুখে নিয়ে হরিপদবাবুর কার্নিশে এসে বসছে।
তিতলি ভিড়ের ভেতর থেকে একরকম হিঁচড়ে কালীপদকে সামনে এনে দাঁড় করাল। বেচারা কালীপদ তখন মালিকের ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে কাঁপছে।
“কালীপদদা, সত্যি করে সবার সামনে বলো তো, তুমি রোজ ঠিক পৌনে আটটায় ওই সানশেডে বাসি ছানা ফেলো কি না?” তিতলি সোজাসুজি প্রশ্ন করল।
কালীপদ দুই হাত জোড় করে থতমত খেয়ে বলল, “হ্যাঁ গো দিদিমণি… কারখানার ফাটা রসগোল্লা আর বাসি ছানার গুঁড়ো তো আমরা ওই পেছনের সানশেডেই ফেলি রোজ। ওই কাকটা গত ছ’মাস ধরেই ওখান থেকে খাবার মুখে তুলে খায়। তবে হরিপদবাবুর বারান্দায় গিয়ে বসে কি না, তা তো আমি নজর করিনি গো বাবু!”
মুহূর্তের মধ্যে পুরো শ্যামপুকুর লেনে এক পাথুরে নীরবতা নেমে এল।
বাতাসে শুধু যজ্ঞের ধোঁয়া রইল, আর নিমাইয়ের দোকানের ফুটন্ত তেলের ছ্যাঁকছোঁক ছাড়া কোনো আওয়াজ রইল না। অমলবাবু চশমা ঠিক করে একবার হরিপদবাবুর দিকে তাকালেন। সনাতন মুদির হাতটা প্রণামীর থালার ওপর থমকে গেল। তাঁর চোখে এক মুহূর্তের জন্য ফুটে উঠল ঘোর অস্বস্তি — নিজের বোকা বনে যাওয়ার গভীর লজ্জা। হরিপদবাবুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
তিতলি এক মুহূর্তের জন্য ভাবল, যুদ্ধ শেষ। মানুষ এবার নিজেদের অন্ধবিশ্বাস বুঝতে পেরে লজ্জা পাবে, মাথা নিচু করে যে যার বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু পরবর্তী পাঁচ মিনিটে যা ঘটল, তা মানুষের মনস্তত্ত্বের সবচেয়ে নিদারুণ সত্যটাকে উন্মোচন করে দিল।
রত্নাকর ভট্টাচার্য প্রথমে কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর সনাতন মুদির অস্বস্তি আর ভিড়ের দ্বিধাগ্রস্ত চোখের দিকে এক পলক তাকালেন। তিনি বুঝলেন, এই মুহূর্তে যদি তিনি পিছিয়ে যান, তবে তাঁর তিন মাসের রুটিরুজি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
রত্নাকরের মুখে হঠাৎ এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। তিনি দুই হাত আকাশের দিকে তুলে সজোরে বলে উঠলেন, “হরিবোল! হরিবোল! শুনলেন আপনারা? শুনলেন তিতলি মা কী বলল? আহা, ভগবানের অপার লীলা বোঝা কি এই চর্মচক্ষুর কর্ম!”
তিতলি হতবাক হয়ে বলল, “মানে? আপনি এখনও এই নির্লজ্জ ভণ্ডামি চালিয়ে যাবেন?”
নিমাই ময়রা ভিড়ের ভেতর থেকে হাত কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এল। তার চোখেমুখে তখন নতুন এক সম্ভাবনার আলো। সে গদগদ গলায় বলল, “আজ্ঞে… রাধামাধব জিউর একশো বছরের পুরোনো মন্দির!”
“ঠিক ধরেছ!” রত্নাকর চিৎকার করে উঠলেন, তাঁর গলার শিরাগুলো ফুলে উঠল। “রাধামাধবের মন্দিরের বাতাস যে ছানায় লাগে, সেই ছানা কি সাধারণ ছানা হতে পারে? এ যে স্বয়ং মহাপ্রসাদ! সেই মহাপ্রসাদ গ্রহণ করে কাকটি উড়ে এসে বসছে আমাদের হরিপদর কার্নিশে। এ তো কাকের ভোজন নয়, এ হলো স্বয়ং বৈষ্ণব মতে প্রসাদ গ্রহণকারী এক দিব্য বিহঙ্গমের নিত্যসেবা! তিতলি মা আর এই সাংবাদিক বাবাজিকে শত ধন্যবাদ, তাঁরা ছবি তুলে প্রমাণ করে দিলেন যে এই কাক নোংরা কিছু মুখে তোলে না, স্বয়ং রাধামাধবের মহাপ্রসাদ ছাড়া সে কিছুই খায় না!”
ভিড়ের চোখে এক পলকের জন্য যে সংশয়ের ছায়া নেমেছিল, তা নিমেষে উবে গেল। সনাতন মুদি, যিনি এক মুহূর্ত আগে নিজের বোকামির জন্য কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন, তিনি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। তিনি পাশের বটব্যাল মশায়ের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে সজোরে হাততালি দিয়ে উঠলেন, “জয় রাধামাধব! আমি আগেই বলেছিলাম, এর মধ্যে একটা মহিমা আছে!”
শৈলবালা বারান্দা থেকে আঁচলে চোখ মুছে বললেন, “আমি তো শুরুতেই হরিপদকে বলেছিলাম! সাধারণ কাক হলে কি আর ছানা খায়? সে তো আবর্জনা ঘাঁটত!”
নিমাই ময়রা তখন মনে মনে হিসাব কষে ফেলেছে — কাল থেকে দোকানের সামনের কাচের শো-কেসে ‘ঐশ্বরিক বিহঙ্গম ভোগ ছানাপোড়া’ নাম দিয়ে আলাদা স্পেশাল মিষ্টি সাজানো হবে। পঁচিশ টাকার নিচে এক পয়সাও রাখা যাবে না।
বাবলু চটজলদি এসে অর্কর পিঠ চাপড়ে দিল। “ফাটিয়ে দিয়েছিস ভাই অর্ক! তোর এই ছবিগুলো দিয়ে কাল সকালে পাড়ায় ব্যানার পড়বে — ‘ক্যামেরার চোখে ধরা পড়ল দেব-বিহঙ্গমের মহাপ্রসাদ গ্রহণের দৃশ্য’!”
তিতলি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সমস্ত তথ্য, তার বৈজ্ঞানিক যুক্তি, তার স্পষ্ট ক্যামেরা ফুটেজ — সবকিছু এই মানুষগুলোর সম্মিলিত আত্মপ্রবঞ্চনার সামনে স্রেফ রসদ হয়ে গেল। মানুষ সত্যের মুখোমুখি হতে ভয় পায় না; মানুষ ভয় পায় সেই সত্যের সামনে নিজের আরামদায়ক মুখোশটা খসে পড়ার আশঙ্কায়।
অর্ক তিতলির পাশে এসে দাঁড়াল। সে খুব আলতো করে তিতলির বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যাওয়া আঙুলগুলো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তিতলির চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল — পরাজয়ের নয়, মানুষের এই সম্মিলিত ভণ্ডামির প্রতি এক তীব্র অসহায়তার।
“আমি হেরে গেলাম, অর্ক?” তিতলি খুব নিচু গলায় বলল।
অর্ক শান্ত চোখে তিতলির দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে কোনো ব্যঙ্গ ছিল না, কোনো উত্তেজনা ছিল না; ছিল কেবল এক গভীর প্রজ্ঞার স্পর্শ। “তুমি হারোনি, তিতলি। তুমি শুধু মানুষের আদিম স্বভাবটাকে চিনে রাখলে। মানুষ যুক্তি চায় না, মানুষ চায় তার নিজের সাজানো অন্ধকারের স্বপক্ষে একটা শক্ত অজুহাত।”
৬
ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ পর।
শ্যামপুকুর লেনের পরিবেশ এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। হরিপদবাবুর বাড়ির দোতলার বারান্দার কার্নিশটিতে আর খসে-পড়া পলেস্তারা নেই; সেখানে ক্লাবের খরচে নীলরঙা অ্যালুমিনিয়ামের একটি ছোট্ট সুন্দর ছাউনি করে দেওয়া হয়েছে। ছাউনির কপালে সোনালি হরফে লেখা — ‘শ্রী শ্রী বার্তাবহ বিহঙ্গমের নিত্য বিশ্রামস্থল’।
নিমাই ময়রার দোকানে এখন সকাল থেকেই ক্রেতাদের ভিড় উপচে পড়ছে। মিষ্টির শো-কেসে বড় বড় করে লেখা ফ্লেক্স ঝুলছে — ‘ঐশ্বরিক ছানাপোড়া সন্দেশ (যা বিহঙ্গম দেব স্বয়ং প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করেন)’। প্রতিদিন ভোরে অন্তত শ’খানেক প্যাকেট বিক্রি হয়ে যাচ্ছে নিমেষেই।
আর গতকাল সন্ধ্যায় শ্যামপুকুর লেনের তরুণ সঙ্ঘের কার্যালয়ে এক জরুরি সাধারণ সভা বসেছিল। সর্বসম্মতিক্রমে একটি নতুন স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়েছে — ‘শ্রী শ্রী বার্তাবহ বিহঙ্গম সংরক্ষণ ও শ্যামপুকুর লেন উন্নয়ন সমিতি’।
কমিটির পদবণ্টন নিয়ে কোনো মনকষাকষি হয়নি।
কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন নিমাই ময়রা, কারণ তাঁর তহবিলে এখন কোনো টান নেই।
প্রধান ধর্মীয় উপদেষ্টা হয়েছেন পণ্ডিত রত্নাকর ভট্টাচার্য, যাঁর মুদির দোকানের ধার এখন পুরোপুরি শোধ হয়ে গেছে। প্রচার সচিবের দায়িত্ব পেয়েছে বাবলু। আর সভাপতি? সভাপতি পদের জন্য যখন হরিপদবাবুর নাম সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব করা হলো, তখন হরিপদবাবু প্রথমে পকেট থেকে রুমাল বার করে সামান্য খাঁকারি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করলেন। তারপর তিনি ধীরেসুস্থে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
আজ তাঁর পরনে ইস্ত্রি করা সিল্কের পাঞ্জাবি — যা তিনি গত দশ বছর আলমারির লকার থেকে বার করেননি। তাঁর মুখের সেই কুঁকড়ে থাকা, তেলের শিশি উপুড় করা কেরানিজীবনের দীনহীন ছাপ আজ আর কোথাও নেই। তিনি চশমাটা নাকের ডগায় ঠিক করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।
“উপস্থিত সুধীবৃন্দ,” হরিপদবাবু অত্যন্ত রাশভারী এবং আত্মবিশ্বাসী গলায় বলতে শুরু করলেন। “প্রথম দিন যখন কাকটি আমার বারান্দায় এসে বসেছিল, আপনারা অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন ঘটনাটা নেহাতই কাকতালীয়। কিন্তু আমি… আমি প্রথম দিনই যখন ওর চোখের দিকে তাকাই, তখনই শৈলকে ডেকে বলেছিলাম — এই কাক সাধারণ কোনো পাখি নয়। এর চাউনির ভেতর এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক তেজ আছে। মানুষ অনেক সময় চর্মচক্ষে সত্য দেখতে পায় না, কিন্তু পঁয়ত্রিশ বছর সরকারি ট্রেজারির খাতাপত্র দেখার পর আমার চোখ অন্তত কোনো মেকি জিনিসকে সত্যি বলে ভুল করে না। আমাদের শ্যামপুকুর লেনের ঐতিহ্য রক্ষা করার যে পবিত্র দায়িত্ব আজ এই বিহঙ্গমের মাধ্যমে আমাদের ওপর অর্পিত হয়েছে, সভাপতি হিসেবে আমি শপথ নিচ্ছি — আমার জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমি এই ঐতিহ্য রক্ষা করে যাব।”
পুরো ক্লাবঘর করতালির তুমুল শব্দে ফেটে পড়ল। রত্নাকর পুরুত একখানা মস্ত গাঁদাফুলের মালা হরিপদবাবুর গলায় ঝুলিয়ে দিলেন। পেছনের সারিতে শৈলবালা গরদের আঁচলে মুখ ঢেকে গর্বের চোখের জল মুছলেন।
ক্লাবের পেছনের গলির মুখে, আবছা হলুদ সোডিয়াম বাতির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল তিতলি আর অর্ক। তিতলির হাতে সমাজতত্ত্বের টার্ম পেপারের ফাইল। অর্কর গলায় ঝুলছে প্রেস কার্ড। অর্ক তার সেই রবিবাসরীয় ফিচারের রিপোর্টটা লোকাল এডিটরকে জমা দেয়নি। সে এক লাইনে লিখে দিয়ে এসেছে — এই গল্পটা পড়ার মতো উপযুক্ত পাঠক কোনো সংবাদপত্রের নেই।
“হরিপদ জ্যাঠার বক্তৃতাটা শুনলে?” তিতলি একটা ম্লান, ক্লান্ত হাসি হাসল। “যে মানুষটা প্রথম দিন কাকটাকে দূর দূর করে তাড়াচ্ছিলেন, আজ তিনি সভার মধ্যমণি হয়ে নিজেকে প্রথম আবিষ্কারক বলে দাবি করছেন।”
অর্ক পকেট থেকে একখানা পুরোনো নোটবই বার করল। নোটবইয়ের প্রথম পাতায় সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা — ‘নবুর নোটবুক’।
“কী লিখছ ওখানে?” তিতলি মৃদু গলায় জিজ্ঞেস করল।
অর্ক তিতলির দিকে মুখ ফেরাল। লেনের হলুদ আলোয় তিতলির মুখটা তখন বড় মায়াবী দেখাচ্ছিল — একরাশ ক্লান্তি, সামান্য অভিমান আর গভীর ভালোবাসার এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। অর্ক আলতো করে তিতলির হাতটা নিজের হাতের ভেতর টেনে নিল। তিতলি এবার আর হাত সরিয়ে নিল না।
“আমি একটা শেষ কথা লিখে রাখছি, তিতলি,” অর্ক শান্ত গলায় বলল।
“কী কথা?”
অর্ক জানালার ওপারে ক্লাবের দিকে তাকাল, যেখানে হরিপদবাবুর গলায় মালা ঝুলছে আর নিমাই ময়রা সবাইকে ছানাপোড়া সন্দেশ বিলি করছে। অর্কর কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না, কোনো অভিযোগ ছিল না; ছিল কেবল এক পরিণত শিল্পীর নির্মম বাস্তবতাবোধ।
তিতলি আর কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে নিজের মাথাটা অর্কর কাঁধের ওপর নামিয়ে রাখল।
দূর থেকে মাইকে তখন হরিপদবাবুর রাশভারী গলায় শোনা যাচ্ছিল শ্যামপুকুর লেনের আগামী বাজেট বরাদ্দের খসড়া। আর গলির মোড়ে নিমাই ময়রার নতুন কড়াইয়ে ফুটছিল তেল।
রাত গাঢ় হচ্ছে। লেনের নিস্তব্ধ গলির প্রতিটি জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, মানুষগুলো নিজেদের সুবিধামতো এক-একটি নতুন মিথ্যে বুকে জড়িয়ে পরম তৃপ্তিতে আলো নিভিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছে।
লেখক তিনি ২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে দমদম রবীন্দ্রনগরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতার একজন পরিচিত সাহিত্যিক, কবি ও প্রাবন্ধিক। মধ্যবিত্ত সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের সূক্ষ্ম সমীকরণ এবং সামাজিক বাস্তবতার নানা অসঙ্গতি তাঁর লেখার মূল উপজীব্য। ছোটগল্প ও মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান রচনায় বিশেষভাবে সক্রিয় এবং নিয়মিত সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘নবুর কলমে’ (২০২৫) ও ‘মা-কে বড্ড মনে পড়ে’ পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।