শরতের আকাশে সাদা মেঘ, কাশফুলের দোলা, শিউলির গন্ধ, ঢাকের বাদ্য আর মৃন্ময়ী প্রতিমার চোখে প্রাণপ্রতিষ্ঠা — দুর্গাপুজো বাঙালির কাছে কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি একই সঙ্গে সামাজিক উৎসব, শিল্পের মঞ্চ, লোকসংস্কৃতির ধারক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ক্ষেত্র এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কলকাতার অলিগলি থেকে গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল, বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান থেকে পাড়ার সর্বজনীন মণ্ডপ — দুর্গাপুজো আজ যে বিশাল পরিসর অর্জন করেছে, তার পিছনে রয়েছে দীর্ঘ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন।
এই বিবর্তন সরলরেখায় ঘটেনি। দেবী দুর্গার শাস্ত্রীয় ও পৌরাণিক রূপের সঙ্গে বাংলার লোকায়ত দেবী-সংস্কৃতি, শক্তি-উপাসনা, কৃষিজীবন, রাজা-জমিদারের ঐতিহ্য, মধ্যবিত্ত নাগরিক সমাজ, বারোয়ারি সংস্কৃতি এবং পরবর্তীকালে ক্লাব ও কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতা মিলেমিশে আজকের দুর্গোৎসবের চেহারা তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি বাংলার বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং মহিষাসুরকে ঘিরে বিকল্প আখ্যানও এই বৃহত্তর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুর্গার পৌরাণিক পরিচয় মূলত মহিষাসুরমর্দিনী হিসেবে। ‘দেবীমাহাত্ম্য’-এ তিনি মহাশক্তি, যিনি মহিষাসুরসহ অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অশুভ শক্তির বিনাশ করেন। কিন্তু বাংলায় দুর্গার জনপ্রিয় রূপটি কেবল যুদ্ধরত দেবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি হয়ে উঠেছেন উমা — বাঙালির ঘরের মেয়ে। শরতের কয়েক দিনের জন্য কৈলাস থেকে বাপের বাড়িতে আসেন তিনি। সঙ্গে থাকেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। ফলে বাঙালির কাছে দুর্গা একই সঙ্গে মহাশক্তি এবং আপন ঘরের কন্যা।
দেবীকে ঘিরে এই পারিবারিক আবেগই বাংলার দুর্গাপুজোকে একটি বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। বিসর্জনের সময় ‘আসছে বছর আবার হবে’ উচ্চারণের মধ্যে তাই শুধু ধর্মীয় আচার নয়, মেয়েকে বিদায় দেওয়ার আবেগও মিশে থাকে।
এই কারণে বাংলার দেবী-সংস্কৃতিকে শুধু সংস্কৃত শাস্ত্রের আলোকে দেখলে তার সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। শাস্ত্রীয় ধর্মবিশ্বাসের পাশাপাশি গ্রামীণ লোকাচার, স্থানীয় দেবী এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ধর্মীয় স্মৃতিও বাংলার দেবী-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। সময়ের সঙ্গে এই বিভিন্ন ধারার মধ্যে গ্রহণ-বর্জন, মেলবন্ধন ও রূপান্তর ঘটেছে।
মধ্যযুগীয় বাংলায় দুর্গাপুজোর শাস্ত্রীয় কাঠামো গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে রঘুনন্দনের ‘দুর্গাপূজাতত্ত্ব’-এর মতো গ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলায় দুর্গাপুজোর প্রাচীনতম পর্যায় সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য এখনও সীমিত। ফলে দুর্গাপুজোকে বহু শতাব্দী ধরে অপরিবর্তিত একটি উৎসব হিসেবে দেখার পরিবর্তে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত একটি সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
বাংলায় দুর্গাপুজোর সামাজিক ইতিহাসে রাজা, জমিদার ও বনেদি পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অষ্টাদশ শতকে বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে জমিদার শ্রেণির উত্থান ঘটে। দুর্গাপুজো হয়ে ওঠে সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা এবং প্রভাব প্রদর্শনের অন্যতম ক্ষেত্র। কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো এই ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
রাজা নবকৃষ্ণ দেবের পুজোয় ব্রিটিশ শাসক ও ইউরোপীয় সাহেবদের আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনা দেখায়, কীভাবে দুর্গাপুজো ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছিল। বাংলার বিভিন্ন রাজবাড়ি ও জমিদারবাড়িতে পুজো ছিল পরিবারের সামাজিক পরিচয় ও ঐতিহ্যের অন্যতম কেন্দ্র।
বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার থেকে শুরু করে মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া, বিষ্ণুপুর এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বনেদি পরিবার — প্রতিটি অঞ্চলের পুজোর মধ্যে নিজস্ব আচার ও ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। কোথাও একচালা প্রতিমা, কোথাও বিশেষ ভোগ, কোথাও নির্দিষ্ট বিসর্জন-পদ্ধতি, কোথাও আবার বহু পুরোনো পারিবারিক রীতি আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
কিন্তু দুর্গাপুজোর ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তন আসে বারোয়ারি পুজোর মাধ্যমে। হুগলির গুপ্তিপাড়াকে বাংলার বারোয়ারি দুর্গাপুজোর অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, স্থানীয় একটি পরিবারের দুর্গাপুজোয় অংশগ্রহণের সুযোগ না পাওয়া কয়েকজন ব্যক্তি সম্মিলিতভাবে নিজেদের পুজোর আয়োজন করেন। তাঁদের সংখ্যা ছিল বারো। সেখান থেকেই ‘বারো ইয়ার’ বা ‘বারোয়ারি’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে বলে প্রচলিত।
গুপ্তিপাড়ার বারোয়ারি পুজোর সূচনাবর্ষ নিয়ে অবশ্য ঐতিহাসিক মতভেদ রয়েছে। কোনও কোনও সূত্রে ১৭৬১ সালের কথা বলা হয়েছে, আবার অন্য একটি বহুল প্রচলিত মত অনুযায়ী আনুমানিক ১৭৯০ সালে এই পুজোর সূচনা। সঠিক সাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ সন্দেহ নেই। কারণ এখানেই দুর্গাপুজোর মালিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। পুজো আর কেবল একটি পরিবারের বিষয় থাকল না; তা হয়ে উঠল একদল মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে ‘চাঁদা’ সংস্কৃতিরও বিকাশ ঘটে। অনেক মানুষের ছোটো ছোটো আর্থিক সহযোগিতায় একটি বড় উৎসব আয়োজনের ধারণা ধীরে ধীরে বাংলার সামাজিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়। বারোয়ারি পুজো পরবর্তীকালে সর্বজনীন দুর্গাপুজোর ভিত্তি তৈরি করে।
কলকাতায় বিংশ শতকের গোড়ায় এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৯১০ সালে ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোড অঞ্চলে সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার উদ্যোগে যে পুজো অনুষ্ঠিত হয়, তাকে কলকাতার প্রথম দিকের সংগঠিত সর্বজনীন দুর্গাপুজোর অন্যতম উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। এরপর বাগবাজারসহ কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে সর্বজনীন পুজো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বারোয়ারি ও সর্বজনীনের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। বারোয়ারি হল কয়েকজনের সম্মিলিত উদ্যোগ, আর সর্বজনীন ধারণার মধ্যে রয়েছে বৃহত্তর সামাজিক অংশগ্রহণ। পাড়ার মানুষ, ব্যবসায়ী, যুবক, সংস্কৃতিকর্মী, শ্রমজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ পুজোর সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন। ফলে দুর্গাপুজো ধীরে ধীরে রাজবাড়ির ঠাকুরদালান ছেড়ে রাস্তায়, মাঠে এবং পাড়ার জনপরিসরে চলে আসে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলার নাগরিক সমাজের বিকাশও গভীরভাবে যুক্ত। পুজো কমিটি শুধু পুজোর আয়োজন করত না; তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক, যাত্রা, খেলাধুলা, সমাজসেবা এবং পাড়ার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে পুজো কমিটি এবং ক্লাব সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে যায়।
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্গাপুজোর এই বিবর্তন একইভাবে ঘটেনি। উত্তরবঙ্গে রাজপরিবার ও চা-বাগানের ঐতিহ্যের সঙ্গে পুজোর সম্পর্ক রয়েছে। নদিয়ায় কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্প ও রাজপরিবারের ঐতিহ্য পুজোর সঙ্গে যুক্ত। মুর্শিদাবাদে নবাবি আমলের ঐতিহাসিক পরিবেশের মধ্যেও বহু বনেদি পরিবারের পুজো টিকে রয়েছে। বীরভূম, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় শাক্ত ও লোকায়ত সংস্কৃতির নানা স্তর পুজোর সঙ্গে মিশে আছে। বিষ্ণুপুরে মল্লভূমের ঐতিহ্য এবং টেরাকোটা শিল্পের প্রভাব দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক পরিবেশকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
বাংলার লোকশিল্পও দুর্গাপুজোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পশ্চিম মেদিনীপুরের পটুয়া শিল্পীরা দুর্গা, মনসা, রামায়ণ, কৃষ্ণ এবং নানা পৌরাণিক ও লোককাহিনি পটচিত্রে তুলে ধরেন। পটুয়া সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মুসলমান হলেও তাঁদের শিল্পে হিন্দু পুরাণের কাহিনি বহুদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বাংলার সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সামনে আনে — ধর্মীয় পরিচয় এবং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ সবসময় একই বিষয় নয়।
দুর্গাপুজোর নবপত্রিকা বা কলাবউয়ের আচারও বাংলার কৃষিজীবন ও প্রকৃতির সঙ্গে উৎসবের সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে। কলা, কচু, হলুদ, ধানসহ বিভিন্ন উদ্ভিদকে কেন্দ্র করে নবপত্রিকার আচার সম্পন্ন হয়। এসব উপাদান দেখায়, দেবী-উপাসনার মধ্যে প্রকৃতি, উর্বরতা, কৃষি এবং জীবনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের পুরোনো স্মৃতিও টিকে রয়েছে।
বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে আদিবাসী সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্মৃতির কথাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে হুদুর দুর্গার আখ্যান এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। কিছু সাঁওতাল-খেরওয়াল এবং অসুর সম্প্রদায়ের লোকস্মৃতিতে মহিষাসুরকে মূলধারার পুরাণের মতো অশুভ শক্তি হিসেবে দেখা হয় না। তাঁদের কিছু সাংস্কৃতিক পরিসরে তিনি পূর্বপুরুষ, বীর বা রক্ষকের প্রতীক — হুদুর দুর্গা। ফলে যে সময় মূলধারার সমাজ মহিষাসুরবধকে অশুভের উপর শুভের বিজয় হিসেবে উদ্যাপন করে, সেই সময় নির্দিষ্ট কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মহিষাসুরের মৃত্যু ও পূর্বপুরুষের স্মৃতিকে অন্যভাবে স্মরণ করার পরম্পরা রয়েছে।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা দরকার। হুদুর দুর্গার ধারণাকে সমগ্র আদিবাসী সমাজের বিশ্বাস হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ভারতের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতি ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস এক নয়। কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে হুদুর দুর্গা ও মহিষাসুরকে ঘিরে যে লোকস্মৃতি রয়েছে, তা বাংলার বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
হুদুর দুর্গার সঙ্গে সাঁওতালি দাঁসায় বা দাসাই নৃত্য ও গানের সম্পর্কের কথাও বিভিন্ন লোকপরম্পরায় পাওয়া যায়। এসব আখ্যানের বিভিন্ন সংস্করণে হুদুর দুর্গাকে রক্ষা করা, শত্রুর হাত থেকে তাঁকে আড়াল করা এবং পূর্বপুরুষের স্মৃতি বহন করার কথা উঠে আসে। লিখিত ইতিহাসের তুলনায় এখানে মৌখিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব বেশি। একটি সমাজ গান, নাচ, কাহিনি ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের অতীতকে যেভাবে মনে রাখে, সেটিও তার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই জায়গায় ‘অসুর’ শব্দটিও নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। পুরাণের ‘অসুর’ এবং ‘অসুর’ নামে পরিচিত বাস্তব আদিবাসী জনগোষ্ঠী এক বিষয় নয়। কিন্তু নামের এই মিল আধুনিক সময়ে পরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কিছু অসুর জনগোষ্ঠীর মধ্যে মহিষাসুরকে পূর্বপুরুষ হিসেবে স্মরণ করার সাংস্কৃতিক পরম্পরা রয়েছে।
একই চরিত্রকে নিয়ে দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক স্মৃতি তাই একই ভূখণ্ডে পাশাপাশি থাকতে পারে। মূলধারার পৌরাণিক আখ্যানের কাছে দুর্গা শুভ শক্তি এবং মহিষাসুর অশুভের প্রতীক। আবার কিছু আদিবাসী লোকস্মৃতিতে মহিষাসুর পূর্বপুরুষ বা বীর। এই পার্থক্যকে সংঘাতের বিষয় না করে বোঝার চেষ্টা করাই ইতিহাসচর্চার কাজ। কারণ একটি সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন তার পরিচয়ের অংশ, তেমনই অন্য একটি সমাজের লোকস্মৃতিও তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
আধুনিক কলকাতায় এসে দুর্গাপুজো আরও এক দফা রূপান্তরিত হয়েছে। পাড়ার ক্লাবগুলি পুজোর প্রধান সংগঠক হয়ে উঠেছে। মণ্ডপ আর শুধু প্রতিমা রাখার স্থান নয়, তা হয়ে উঠেছে শিল্পের একটি বড় মঞ্চ। থিম পুজোর আবির্ভাব দুর্গাপুজোর শিল্পচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কোনও মণ্ডপে গ্রামবাংলার জীবন, কোথাও ঐতিহাসিক স্থাপত্য, কোথাও লোকশিল্প, কোথাও পরিবেশের বার্তা, আবার কোথাও সম্পূর্ণ কল্পনানির্ভর শিল্পকাঠামো দেখা যায়।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। প্রতিমাশিল্পী, মণ্ডপশিল্পী, কাঠমিস্ত্রি, বাঁশশিল্পী, আলোকশিল্পী, ঢাকী, ফুল ব্যবসায়ী, পরিবহণকর্মী, নিরাপত্তারক্ষী, খাদ্য ব্যবসায়ী, বিজ্ঞাপন সংস্থা, ছোটো দোকানদার এবং অসংখ্য অস্থায়ী কর্মসংস্থান — সবকিছুর সঙ্গে পুজোর অর্থনীতি জড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সমীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোর অর্থনীতির আকার কয়েক দশ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে হিসাব দেওয়া হয়েছে। ফলে দুর্গাপুজো এখন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবের পাশাপাশি রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব-অর্থনীতির কেন্দ্র।
এই অর্থনীতির কাঠামোও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। আগে পুজোর প্রধান অর্থদাতা ছিলেন রাজা বা জমিদার। পরে এল চাঁদা। এখন চাঁদার পাশাপাশি ব্যবসায়ী, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা যুক্ত হয়েছে। বড় পুজোর বাজেট ও প্রচার ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় পুজোর সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
এর ফলে নতুন প্রশ্নও সামনে এসেছে। পুজো কি অতিরিক্ত বাণিজ্যিক হয়ে যাচ্ছে? বড় বাজেটের প্রতিযোগিতা কি ছোটো পুজোকে পিছনে ফেলছে? থিমের প্রতিযোগিতা কি কখনও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়কে ছাপিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর একমাত্রিক নয়। কারণ বাণিজ্যিকীকরণ যেমন পুজোর পরিসর বাড়িয়েছে, তেমনই তা অনেক শিল্পী ও কারিগরের জীবিকার সুযোগও তৈরি করেছে।
‘সর্বজনীন’ শব্দটির অর্থও আজ নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। শুধু সকলের জন্য পুজোর দরজা খোলা থাকলেই কি তা প্রকৃত অর্থে সর্বজনীন? বয়স্ক মানুষ, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নারী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য পুজো কতটা সহজপ্রবেশ্য — এই প্রশ্নগুলি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। UNESCO এবং জাতিসংঘের উদ্যোগে দুর্গাপুজোকে আরও accessibility-friendly করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। র্যাম্প, বাধাহীন চলাচল, ব্রেইল নির্দেশিকা, বিশ্রামের স্থান এবং সহজ যোগাযোগের মতো বিষয় ভবিষ্যতের পুজো ব্যবস্থাপনার অংশ হয়ে উঠছে।
পরিবেশের প্রশ্নও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে। প্রতিমার রং, প্লাস্টিকের ব্যবহার, থার্মোকল, বিদ্যুৎ খরচ, শব্দদূষণ, যানজট এবং বিসর্জনের ফলে জলদূষণ — এসব বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যেই সচেতনতা বাড়ছে। আগামী দিনের দুর্গাপুজোকে তাই পরিবেশবান্ধব করার জন্য প্রাকৃতিক রং, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশসম্মত বিসর্জনের দিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
এর পাশাপাশি ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পালাবদল আগামী দুর্গাপুজোর সামাজিক ও সাংগঠনিক চরিত্রেও কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। পুজো কমিটি বহুদিন ধরেই শুধু ধর্মীয় সংগঠন নয়; অনেক ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্বের কেন্দ্র। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পুজো কমিটির নেতৃত্ব, প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক, সরকারি সহযোগিতা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে।
সরকারি আর্থিক সহায়তা নিয়েও আগামী দিনে নতুন নীতি দেখা যেতে পারে। বড় ও ছোটো পুজোর ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার কাঠামো যদি পুনর্বিন্যাস করা হয়, তাহলে বড় পুজোগুলিকে আরও বেশি কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতার উপর নির্ভর করতে হতে পারে, অন্যদিকে ছোটো পুজো সরকারি সহযোগিতা পেলে তাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা বাড়তে পারে। এর ফলে দুর্গাপুজোর অর্থনৈতিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে পুজোর সাংস্কৃতিক ভাষায় পরিবর্তন। বাংলায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে নতুন করে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব থিম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুজোর প্রচারে পড়তে পারে। হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য, পুরাণ, দেবী-সংস্কৃতি ও বাংলার প্রাচীন সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সামনে আনার প্রবণতা বাড়তে পারে। তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
দুর্গাপুজোর ইতিহাস নিজেই দেখায় যে এর শক্তি সর্বজনীনতার মধ্যে। রাজবাড়ির ব্যক্তিগত পুজো থেকে বারোয়ারি এবং বারোয়ারি থেকে সর্বজনীন হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা আসলে পুজোর সামাজিক পরিসরকে ক্রমাগত বিস্তৃত করেছে। তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়েও দুর্গাপুজোর সেই সর্বজনীন চরিত্রকে অক্ষুণ্ণ রাখা জরুরি।
তবে এই কাজের ক্ষেত্রে আদিবাসী সংস্কৃতিকে শুধু ‘থিম’ হিসেবে ব্যবহার না করে সংশ্লিষ্ট শিল্পী, গবেষক এবং সম্প্রদায়ের মানুষকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
দুর্গাপুজোকে ঘিরে সামাজিক কাজের পরিসরও আরও বাড়ানো সম্ভব। রক্তদান, স্বাস্থ্যশিবির, শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ, কর্মসংস্থান মেলা, স্থানীয় শিল্পীদের বাজার, নারী নিরাপত্তা প্রচার, পরিবেশ রক্ষা, প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থা এবং শিশুদের সাংস্কৃতিক শিক্ষা — এই ধরনের উদ্যোগ পুজোকে আবার একটি শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারে।
এখানেই বারোয়ারি পুজোর পুরোনো শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। একজনের নয়, অনেকের সম্মিলিত উদ্যোগেই উৎসবের শক্তি তৈরি হয়েছিল। রাজা ও জমিদারের পুজো থেকে সাধারণ মানুষের পুজোয় রূপান্তরই দুর্গাপুজোর সামাজিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।
আজ তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে — রাজনীতি থাকবে, পৃষ্ঠপোষকতা থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে; কিন্তু পুজোর প্রকৃত মালিক কে?
উত্তরটি সম্ভবত ইতিহাসের মধ্যেই রয়েছে — মানুষ।
দুর্গাপুজোর ইতিহাস কোনও একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়। কোনও একটি শ্রেণির ইতিহাসও নয়। এটি বহু মানুষের অংশগ্রহণে তৈরি একটি সাংস্কৃতিক ইতিহাস। এখানে রাজা আছেন, জমিদার আছেন, মধ্যবিত্ত আছেন, শ্রমজীবী মানুষ আছেন, শিল্পী আছেন, কারিগর আছেন, পটুয়া আছেন, ঢাকী আছেন, ক্লাবকর্মী আছেন। পাশাপাশি রয়েছে বাংলার বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্মৃতিও।
এই বহুত্বই বাংলার দুর্গাপুজোর প্রকৃত শক্তি।
২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজো UNESCO-র মানবজাতির অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়ার মধ্য দিয়ে এই বৈচিত্র্যময় উৎসব আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই স্বীকৃতির গুরুত্ব শুধু বড় মণ্ডপ বা আলোকসজ্জায় নয়। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পী ও কারিগরের শ্রম, মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ, লোকশিল্পের ধারাবাহিকতা এবং একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অস্তিত্ব।
তাই বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাসকে যদি কয়েকটি শব্দে বলা যায়, তাহলে তা হবে — রাজবাড়ি থেকে বারোয়ারি, বারোয়ারি থেকে সর্বজনীন, সর্বজনীন থেকে বিশ্বমঞ্চ এবং সেখান থেকে আরও বহুস্বরের বাংলার দিকে যাত্রা।
দুর্গা একই সঙ্গে মহিষাসুরমর্দিনী, উমা, ঘরের মেয়ে, শক্তির প্রতীক এবং বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। তাঁর পাশে রয়েছে চণ্ডী, মনসা, শীতলা, ষষ্ঠী ও অসংখ্য লোকদেবীর পরম্পরা। আবার বাংলারই কিছু আদিবাসী সাংস্কৃতিক পরিসরে রয়েছে হুদুর দুর্গা ও মহিষাসুরকে ঘিরে অন্য এক স্মৃতি।
এই ভিন্নতাগুলিকে সংঘাতের কারণ না করে বোঝার চেষ্টা করাই হতে পারে আগামী দিনের সাংস্কৃতিক পরিণতিবোধের পরিচয়।
কারণ দুর্গাপুজো শেষ পর্যন্ত শুধু দেবীর আরাধনা নয়। এটি বাংলার সমাজের নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংলাপ। ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন। বিশ্বাসের সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক। এবং সর্বোপরি, বহু মানুষ একসঙ্গে একটি উৎসবকে নিজের করে নেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস।
সেই কারণেই দুর্গাপুজো এখনও জীবন্ত। এবং বাংলার সমাজ যত বদলাবে, দুর্গাকে ঘিরে তার ভাষা, শিল্প ও সামাজিক প্রকাশও তত বদলাবে। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও যদি মানুষের অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক বহুত্ব এবং সর্বজনীনতার মূল চেতনাটি অটুট থাকে, তাহলেই বাংলার দুর্গাপুজোর দীর্ঘ বিবর্তনের ধারাটি সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যাবে।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।