১৯৪২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুনে তখন পুড়ছে ইউরোপ। পোল্যান্ডের হাজার হাজার মানুষ নিজেদের দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের অনেকের পথটা নিছক দেশ ছেড়ে পালানোর ছিল না। সোভিয়েত বন্দিশিবির ও নির্বাসন থেকে মুক্ত হয়ে, জেনারেল ভ্লাদিস্লাভ আন্দের্সের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা পোলিশ বাহিনীর সঙ্গে তাঁরা সোভিয়েত ভূখণ্ড ছেড়েছিলেন। সৈনিকদের পাশাপাশি ছিলেন অসামরিক উদ্বাস্তুরাও। কেউ বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে, কেউ নির্বাসনের যন্ত্রণা পেরিয়ে, নতুন করে বাঁচার আশায় পৌঁছেছেন ইরানে। সামনে দীর্ঘ পথ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কোথায় আশ্রয় মিলবে, কতদিন পরে ঘরে ফেরা যাবে — কেউ জানতেন না।
এমন সময় একদিন তাঁদের দেখা হল এক ইরানি বালকের সঙ্গে। তার কাছে রয়েছে একটি ছোট্ট বাদামি ভালুকছানা। শিকারিদের গুলিতে সম্ভবত মারা গিয়েছে ভালুকটির মা। মাতৃহারা ছানাটিকে নিয়ে কী করবে ছেলেটি? সৈনিকদের মধ্যে একজনের নজর পড়ল তার দিকে। আর সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হল এমন এক বন্ধুত্বের গল্প, যা যুদ্ধের ইতিহাসে আজও বিস্ময় জাগায়। প্রথম কয়েক মাস এক তরুণী উদ্বাস্তু তার দেখাশোনা করেন। পরে সৈনিকেরা ভালুকছানাটিকে নিজেদের কাছে নিয়ে নিলেন। তার নাম রাখা হল ভইটেক (Wojtek)। পোলিশ ভাষায় নামটির অর্থ — খোশমেজাজি যোদ্ধা।
প্রথমদিকে ভইটেক এতটাই ছোট ছিল যে নিজে শক্ত খাবার খেতে পারত না। জলের সঙ্গে মেশানো কনডেন্সড মিল্ক খাওয়ানো হত তাকে ভদকার খালি বোতলে করে। ধীরে ধীরে সে বড় হতে লাগল। আর সেই সঙ্গে বড় হতে লাগল সৈনিকদের সঙ্গে তার সম্পর্কও। তারা শুধু তার দেখাশোনা করতেন না, তাকে নিজেদের পরিবারের একজন বলেই ভাবতেন।
আদরের ছানাটি অবশ্য বেশিদিন ছোট থাকল না। চেহারা বাড়ল, শক্তি বাড়ল। কিন্তু মানুষের সঙ্গ ছাড়ার কোনও ইচ্ছেই তার দেখা গেল না। বড় হওয়ার পরে তার জন্য আলাদা কাঠের বাক্সে শোওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। অনেক রাতে সেই জায়গা ছেড়ে সে চলে আসত সৈনিকদের তাঁবুতে। পরিচিত মানুষগুলোর পাশে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ত। একটি বিশাল ভালুক এসে পাশে শুয়ে পড়ছে — বাইরের কারও কাছে দৃশ্যটা আতঙ্কের হতে পারে। কিন্তু এই সৈনিকেরা তো তাকে বোতলে দুধ খাইয়ে বড় করেছেন। তাঁদের কাছে সে তখনও সেই পুঁচকে ভইটেক। শুধু তাকে আগলে রাখার জন্য এখন অনেক বেশি জায়গা দরকার।
বড় হতে হতে তার খাবারের চাহিদা বাড়ল, বাড়ল দুষ্টুমিও। খাওয়াদাওয়ার বেলায় ফল, মধু, জ্যাম তার পছন্দ ছিল। সৈনিকেরা তাকে বিয়ারও দিতেন। মানুষের সংসর্গে মানুষের কিছু বদভ্যাসও জুটেছিল — সিগারেট পেলে চিবিয়ে খেত সে! তার সঙ্গে কুস্তিও খেলতেন সৈনিকেরা। স্বাভাবিকভাবেই বেশির ভাগ খেলায় জিতত ভালুকটিই। পরাজিত সৈনিকের মুখ চেটে দেওয়ার মতো কাণ্ডও করত কখনও কখনও। তাকে স্যালুট করতে শেখানোর কথাও পাওয়া যায়।
কিন্তু ভইটেকের জীবনে এবার আসতে চলেছে আরও অদ্ভুত এক অধ্যায়। ১৯৪৪ সাল। পোলিশ দ্বিতীয় কোরের সৈনিকেরা ইতালির রণাঙ্গনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই — মন্টে ক্যাসিনোর যুদ্ধ। সমস্যা হল, ব্রিটিশ জাহাজে করে ইতালিতে যেতে হলে ভইটেককে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চাই। একটি পূর্ণবয়স্ক ভালুককে সেনাবাহিনীর সঙ্গে জাহাজে তোলা তো আর সাধারণ ব্যাপার নয়! শেষ পর্যন্ত সমাধান বেরোল এক আশ্চর্য উপায়ে। ভইটেককে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে নথিভুক্ত করা হল। তারও হল সামরিক পরিচয়পত্র। সে হয়ে উঠল পোলিশ সেনাবাহিনীর সদস্য — প্রাইভেট ভইটেক। পরে তার নামের সঙ্গে জুড়ে গেল ‘কর্পোরাল’ পদও।
এবার তার গন্তব্য ইতালি। মন্টে ক্যাসিনোর যুদ্ধ ছিল ভয়াবহ। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জার্মান প্রতিরক্ষা অবস্থান দখল করতে মিত্রবাহিনীকে প্রাণপণ লড়াই করতে হচ্ছিল। গোলাবারুদ পৌঁছে দেওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণের মধ্যে কামানের গোলা ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে যেতে হত সৈনিকদের।
সেই সময় ভইটেককে দেখা গেল এক আশ্চর্য ভূমিকায়। সে লক্ষ করেছিল, তার সঙ্গীরা কীভাবে ভারী গোলাবারুদের বাক্স এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন। তারপর সেও তাদের অনুকরণে কাজে নেমে পড়ল। পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে উঠে সামনের থাবায় ভারী বাক্স তুলে নিয়ে যেতে শুরু করল সে।
এই ঘটনার স্মৃতি অমর করে রাখতে পোলিশ সেনাবাহিনীর ২২তম আর্টিলারি সাপ্লাই কোম্পানির প্রতীক হয়ে উঠল একটি ভালুক, যার থাবায় ধরা রয়েছে কামানের গোলা।
যুদ্ধ শেষ হল। কিন্তু ভইটেকের জীবনে শান্তির সময়টা খুব সুখের হয়ে উঠল না। ১৯৪৫ সালের পর ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে গেল। বহু পোলিশ সৈনিকের পক্ষে আর নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়া সম্ভব হল না। তাঁদের সঙ্গে ভইটেকের যাত্রাও চলল। স্কটল্যান্ডে এসে কিছুদিন উইনফিল্ড ক্যাম্পে সঙ্গীদের সঙ্গে ছিল সে।
সেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ব্রিটিশ সেনাকর্মী আর্চি ব্রাউনের। যুদ্ধফেরত পোলিশ সৈনিকদের ইংরেজি বোঝার ক্ষমতা যাচাই এবং তাঁদের কাজের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করছিলেন তিনি। সেই কাজ করতে গিয়েই পরিচয় হল রেজিমেন্টের তালিকায় থাকা এক আশ্চর্য কর্পোরালের সঙ্গে — ভইটেক! শেষ পর্যন্ত তাকে এডিনবরার চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাতেও সাহায্য করেন ব্রাউন।
১৯৪৭ সালের ১৫ নভেম্বর চিড়িয়াখানায় পৌঁছল ভইটেক। শেষ হল সৈনিকদের সঙ্গে তার প্রতিদিনের থাকা। একসময় যে ভালুক সৈনিকদের সঙ্গে তাঁবুতে ঘুমিয়েছে, তাদের সঙ্গে পথ হেঁটেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে গোলাবারুদ বহন করেছে, সে এবার বন্দি হল চিড়িয়াখানার সীমানায়। তাঁবু, যাত্রাপথ, ট্রাক আর শিবিরের বদলে এবার একটি নির্দিষ্ট ঘেরাটোপ।
তার পুরনো সঙ্গীরা অবশ্য তাকে ভুলে যাননি। তাঁরা দেখা করতে আসতেন। পরিচিত পোলিশ ভাষার শব্দ শুনলে ভইটেক সাড়া দিত বলে বহু স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে। তবে দেখা করতে আসা আর একসঙ্গে থাকা তো এক নয়। যে মানুষগুলোর সঙ্গে তার বড় হয়ে ওঠা, তাঁদের উপস্থিতি এবার মাঝেমধ্যে পাওয়া কিছু সময়ের মধ্যে সীমিত হয়ে গেল।
১৯৬৩ সালে এডিনবরার চিড়িয়াখানাতেই মারা যায় ভইটেক। তার জীবনের শেষ অধ্যায়ে সে ছিল একটি চিড়িয়াখানার ভালুক। অথচ তার স্মৃতি আজও বেঁচে রয়েছে পোল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে। তার মূর্তি তৈরি হয়েছে, তার গল্প লেখা হয়েছে, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তার অসাধারণ জীবনকাহিনি। ২০১৫ সালে এডিনবরার প্রিন্সেস স্ট্রিট গার্ডেন্সে স্থাপিত হয় তার মূর্তি। সেখানে ভইটেক একা নেই। তার পাশে রয়েছেন এক পোলিশ সৈনিক।
হয়তো সেই কারণেই ভইটেকের গল্প এত বছর পরেও আমাদের মনে থেকে যায়। কারণ যুদ্ধের ইতিহাসে অস্ত্রের শব্দ একদিন থেমে যায়, পতাকা বদলে যায়, মানচিত্রও বদলে যায়। কিন্তু ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের স্মৃতি কখনও কখনও ইতিহাসের সমস্ত কোলাহল পেরিয়ে বেঁচে থাকে। আর সেই স্মৃতির পাতায় আজও এক ভালুক দাঁড়িয়ে আছে — দুই পায়ে ভর দিয়ে, থাবায় গোলাবারুদের বাক্স নিয়ে, তার প্রিয় মানুষগুলোর পাশে।
তার নাম প্রাইভেট ভইটেক।
লেখক বায়োটেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর। একটি বেসরকারি সংস্থায় কোয়ালিটি কন্ট্রোল এনালিস্ট পদে কর্মরত। শৈশবে 'ছোটদের বিশ্বকোষ' পড়তে পড়তে জীববিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায় এবং এখনো সেই আগ্রহ অটুট। তিনি খুব সম্প্রতি লেখালেখি শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা বিস্ময়কর জীবেদের নিয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছা রয়েছে। শখ বলতে পুরনো দিনের বিশেষ করে সাদাকালো সিনেমা দেখা।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।