ধরুন আপনি দোকান থেকে একটা অত্যাধুনিক মডেলের কম্পিউটার কিনে আনলেন। প্লাগ পয়েন্টে প্লাগটা গুঁজে সুইচ অন করতেই কম্পিউটার চালু হয়ে গেল। আবার কাজ শেষে শাট ডাউন করে দিলেন। পরদিন এক সপ্তাহের জন্য ছুটি কাটাতে চলে গেলেন। এক সপ্তাহ বাদে ফিরে এসে সুইচ অন করতেই আবার কম্পিউটার চালু হয়ে গেলো। চেনা গল্প, তাই না?
কিন্তু এবার যদি বলি, এমন একটা কম্পিউটার এসেছে যার ক্ষেত্রে কাজ শেষে সুইচ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে চলে যাওয়ার হিসেবটা ঠিক খাটবে না? কারণ এই যন্ত্রটার ভেতরে রয়েছে জীবন্ত কোষ। কাজ চলুক বা না চলুক, সেই কোষকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। দরকার পুষ্টিসমৃদ্ধ তরল আর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ। সেই যত্নের জন্যই যন্ত্রের ভিতরে রয়েছে নিজস্ব লাইফ সাপোর্ট। কম্পিউটার চালানোর সঙ্গে এবার জুড়ে গেল তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও!
অস্ট্রেলিয়ার কর্টিক্যাল ল্যাবস এমনই এক যন্ত্র তৈরি করেছে, যার নাম ‘CL1’। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এটি বিশ্বের প্রথম বায়োলজিক্যাল কম্পিউটার যেখানে গবেষকেরা নিজেদের কোড চালিয়ে জীবন্ত নিউরনের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে পারেন। সহজ কথায়, এমন এক যন্ত্র যেখানে কম্পিউটার চিপের ওপরে আসল জীবন্ত নিউরন বা স্নায়ুকোষকে বড় করে তোলা হয়েছে।
তবে আঁতকে ওঠার কিছু নেই। বাক্সের ভেতরে কোনো মানুষের আস্ত মস্তিষ্ক কেটে বসিয়ে দেওয়া হয়নি! ল্যাবরেটরিতে মানুষের স্টেম সেল থেকে এই ছোট্ট স্নায়ুকোষগুলো তৈরি করা হয়েছে।এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, চিপের ওপর বসে থাকা এই কোষগুলোর সঙ্গে কম্পিউটার কথা বলে কীভাবে?
এখানে কাজ করে biOS নামের একটি বিশেষ ব্যাকগ্রাউন্ড সিস্টেম। যখন কম্পিউটার থেকে কোনো বৈদ্যুতিক সংকেত চিপের ইলেকট্রোড দিয়ে কোষগুলোর কাছে পাঠানো হয়, কোষগুলো সেই সংকেত বুঝে নিজেদের মতো প্রতিক্রিয়া জানায়। নিউরনের সেই প্রতিক্রিয়া আবার ইলেকট্রোড ধরে কম্পিউটারে ফিরে আসে। এই যাওয়া-আসার মাঝেই তৈরি হয় একটা যোগাযোগের সেতু।
বিষয়টা বুঝতে একটা মজার পরীক্ষার কথা বলা যাক। এই CL1 তৈরি হওয়ার আগে বিজ্ঞানীরা ‘ডিশব্রেন’ নামে একটা প্রাথমিক পরীক্ষা করেছিলেন। সেখানে চিপের নিউরনগুলোকে যুক্ত করা হয়েছিল সত্তরের দশকের সেই বিখ্যাত ‘পং’ (টেবিল টেনিস-এর মতো) ভিডিও গেমের সঙ্গে — যেখানে একটা বল আসে আর একটা প্যাডল সরিয়ে সরিয়ে বলটাকে আটকে ফিরিয়ে দিতে হয়।
নিউরনগুলোর কিন্তু কোনো চোখ নেই, তারা স্ক্রিন দেখতে পায় না। কিন্তু যখন বলের অবস্থান আর গেমের অবস্থা বৈদ্যুতিক সিগন্যাল হয়ে নিউরনের কাছে পৌঁছাল, তখন দেখা গেল সিগন্যাল পেয়ে নিউরনগুলো নিজেদের চালচলন বদলে ফেলছে এবং ধীরে ধীরে গেমটায় ভালো খেলতে শুরু করছে! তবে তার মানে এই নয় যে নিউরনগুলো ভিডিও গেম খেলে আনন্দ পাচ্ছিল। কিন্তু এতে বৈদ্যুতিক সংকেতের জবাবে কোষের মানিয়ে নেওয়ার এবং উন্নতি করার এক দারুণ ক্ষমতা প্রমাণিত হয়।
CL1 এই ধারণাকেই ল্যাবরেটরি থেকে বের করে একটা কাজের যন্ত্রে রূপ দিয়েছে। কোনো বিজ্ঞানী চাইলে এই কম্পিউটারে নিজের মতো কোড চালিয়ে নিউরনের সাড়া রেকর্ড করতে পারেন। এমনকি ল্যাবে এই যন্ত্র না রেখে অনলাইনে ক্লাউড সিস্টেমের মাধ্যমেও এই জীবন্ত কম্পিউটারে কাজ করা সম্ভব।
এই কম্পিউটার সাধারণ কাজের জন্য নয়, কিন্তু গবেষণার জগতে এটা বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। ধরুন, মস্তিষ্কের কোনো নতুন ওষুধ পরীক্ষা করা হবে। আগে যা প্রাণীদের ওপর পরীক্ষা করতে হতো, এখন তা সরাসরি চিপের এই নিউরনগুলোর ওপর প্রয়োগ করে দেখা সম্ভব যে ওষুধ দিলে কোষগুলো কীভাবে সাড়া দিচ্ছে বা তাদের কাজের ক্ষমতা বাড়ছে কি না। এতে কিছু পরীক্ষায় প্রাণীর ব্যবহার কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। যদিও চিপের নিউরনে পাওয়া ফলের ভিত্তিতে ওষুধটি মানুষের শরীরে কতটা নিরাপদ ও কার্যকর হবে, তা পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায় না।
CL1 হয়তো এখনই আপনার ঘরের ল্যাপটপ বা ডেটা সেন্টারের জায়গা নেবে না। কিন্তু এটি আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি শুধু সিলিকন চিপ আর বিদ্যুতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না, পাশাপাশি জীবনেরও স্পন্দন থাকবে। কে জানে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে হয়তো একদিন মানুষ আর রোবট পাশাপাশি বসে চা-ও খাবে!
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।