এই গল্প অনেকের চেনা চেনা লাগবে! দুর্গাপুজোর পরে পাড়ার ক্লাবে নাটক নামানোর গল্প! স্থান-কাল, পাত্র-পাত্রী বদলে যেতে পারে! কিন্তু এই সব ঘটনা ঘিরে মজা-হাসি-ঠাট্টা যেন চিরন্তন!
সে অনেকদিন আগেকার কথা। এই গল্পের পাত্র পাত্রীরা বেশ বুড়ো হয়ে গেছেন এতদিনে, দুই একজন পৃথিবীর মায়াও ত্যাগ করেছেন। আর আমরা যারা তখন অল্পবয়সী ছিলাম তাদের চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে। আমাদের শহর কলকাতা থেকে খানিকটা দূরে হলেও, বেশ পুরোনো শহর। অনেকের বাস বেশ কয়েক পুরুষ ধরে; অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি আমাদের শহরে জন্মেছেন।
আমাদের পাড়ার ক্লাব বন্ধুমহলের দুর্গাপুজো। সেই বছর ক্লাবের পঁচিশ বছর উদযাপন। ক্লাবের মিটিঙে ঠিক হল পুজোর পর স্টেজ বানিয়ে সবাই মিলে নাটক মঞ্চস্থ করা হবে! কমিটির সম্মতি পাওয়া মাত্রই জগাকাকু লাফিয়ে উঠে নাটকের সমস্ত দায়ভার নিয়ে নিল! অনেকে কিন্তু কিন্তু করছিলো, যে জগাকাকু সব উল্টাপাল্টা না করে দেয়। কিন্তু বড়দের আবার অন্য কেউ এইসব ঝামেলা মনে করে আবার দ্বায়িত্ব নিতেও রাজি নয়। তাই শেষ পর্যন্ত জগাকাকুই হয়ে গেলেন ডিরেক্টর। কিন্তু কোন নাটকটি সিলেক্ট করা হবে?
তিন দিনের মাথায় জগাকাকু পাঁচ বছর আগের পুরোনো কোনো এক শারদীয়া পত্রিকায় প্রকাশিত বিখ্যাত নাট্যকারের এক নাটক নিয়ে হাজির! সেটাই নাকি এবার আমরা মঞ্চস্থ করবো!
বড়ো দুই একজন বললো, এই নাটকটি তাদের পড়া। নাটকটি রাজপুত রাজাদের নিয়ে একটি কল্পিত কাহিনী! রূপকের আশ্রয়ে স্যাটায়ারর্ধমী নাটক! বেশ ভালো নাটক; কিন্তু বেশ বড় — প্রায় সোয়া দুই ঘন্টার নাটক, আর অনেক অনেক চরিত্র! আমাদের মতোন অ্যামেচারদের পক্ষে করা কি ঠিক হবে? পারবো কি নাটকের বাঁধন ধরে রাখতে? দর্শকদের এতক্ষন ধৈর্য্য ধরে বসিয়ে রাখতে পারব তো! এইসব নানান প্রশ্ন। এদিকে জগাকাকু গোঁ ধরে বসে আছেন ওটাই করবেন; শেষ পর্যন্ত জগাকাকুর উৎসাহের কাছে সবাই হার মানতে বাধ্য হল।
এখন জগাকাকুর মাথার চুল অনেকটা পাতলা হলেও, যে কটা আছে তাতে পাকা চুল দুই তিনটির বেশী পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। হেলথ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন। প্রায় বাড়ির সামনেই অফিস; হাতে তার অঢেল সময়।
বলার অপেক্ষা রাখে না জগাকাকুই ডিরেক্টর, কাস্টিং ডিরেক্টর থেকে মিউজিক ডিরেক্টর সব কিছুই! খালি অভিনয় তিনি করবেন না! তাতে নাকি ডিরেকশানে অসুবিধা হবে, ঠিকমতো ম্যানেজ করা যাবে না। মনসংযোগ করা যাবে না অভিনয়ও করলে! অবশ্য অভিনয় করার উৎসাহী লোকের খুব একটা অভাব হল না।
লালটু জগাকাকুর ফেভারিট। লালটু দেখতে শুনতে ভালো, কিন্তু মুশকিল হলো আবার তোতলাও; জগাকাকু তাকে রাজপুত্র সাজাবেনই । অনেকেই আপত্তি জানালো! জগাকাকু ছাড়ার পাত্র নন! তিনি নাটকে রাজপুত্রের সমস্ত সংলাপ কেটে দিয়ে, রাজপুত্রকে বোবা বানিয়ে দিলেন।
আমাকে একদিন রেশন দোকানের সামনে পাকড়াও করে বললে, “তোকে দারোয়ানের পার্ট দিচ্ছি”! বলেই বুঝাতে শুরু করলেন যে এই দারোয়ানের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ; সেই নাকি গুপ্ত ঘাতককে রাজমহলের পিছনের দরজা খুলে দেবে! ইত্যাদি ইত্যাদি! আমার মতোন রোগা পটকা ছেলের মধ্যে দারোয়ানের কি বৈশিষ্ট্য দেখলেন তা আজও বুঝিনি!
আমাদের এক ক্লাস নীচের স্বরূপ বেশ মোটাসোটা , নাদুস নুদুস চেহারার। সে হয়ে গেল অন্ধ ভিখারী! মাঝে মাঝেই নাটকের মধ্যে তার এন্ট্রি, যাত্রাপালার বিবেকের মতোন আর খালি দুটো কথাই বলত — "দুটো খেতে দাও গো, অনেকদিন কিছু খাই নি!" তার মুখে আবার জগাকাকু বসিয়ে দিলেন মরুতীর্থ হিংলাজের সেই গান, “তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ।” এইসব কিন্তু অরিজিনাল নাটকে ছিল না। সব জগাকাকুর মস্তিষ্কপ্রসূত। অনেকেই আপত্তি জানালেন, বললেন, এইসব কেন? জগাকাকুর যুক্তি এইসব পপুলার জিনিস না ঢোকালে নাটকটি ঠিক জমবে না।
রাজকন্যা আর খুঁজে পাওয়া যায় না! ঠিকঠাক বয়সের কেউ আর রাজকন্যা সাজতে চায় না! হারুর মা একবার বলেছিলেন যে, তিনি রাজি আছেন। হারুর মাকে সেদিনের পর থেকেই রাস্তা ঘাটে দেখলেই জগাকাকু মুখ ঘুরিয়ে রাস্তার উল্টো দিকে চলে যেতেন। বিমান বাবুর ছোটো মেয়েকে জগাকাকুর পছন্দ ছিল রাজকন্যার ভূমিকায়। সে কথা বিমান বাবুর কাছে পাড়তেই, তিনি প্রায় লাঠি নিয়ে তাড়া করেন জগাকাকুকে। এদিকে বিশুর অভিনয়ের প্রবল ইচ্ছা! কিন্তু কোনো রোল পায় নি। বলেই বসলো, “আমাকেই দিন না রাজকন্যার রোলটা! আগের দিনে ছেলেরাই তো মেয়েদের রোল করত।” জগাকাকু এমন চোখ পাকিয়ে বিশুর দিকে তাকালেন, যে বিশু খেই হারিয়ে ফেললে। বিষয়টি আর বেশী গড়াতে না দিয়ে শেষে রাজকন্যার ভূমিকা নাটক থেকে বাতিল।
বিশু কিন্তু হাল ছাড়ে নি; প্রতিদিন রির্হাসালে আসত; শেষে দয়াপরাবশ হয়ে জগাকাকুই এক নতুন চরিত্রের আমদানি করলেন! বোবা রাজকুমারের বিয়ের জন্যে এক ঘটকের ভূমিকা। নাটকে ঢোকানো হল, ঘটকের উপর রেগে গিয়ে রাজমাতা নাকি তাকে সজোরে এক থাপ্পড় মারবেন। বিশু বেচারা মাথা ঘুরে পড়ে যাবে, তারপর কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যাবে। বিশুর এত প্রবল ইচ্ছা যে, প্রায় গুরুত্বহীন ভূমিকায় অভিনয় করতে এমনকি চড় থাপ্পড় খেতেও রাজি!
নাটকের ভয়ংকর কাটা-ছেঁড়া করার ফলে শেষে এমন হল যে সেটার নাট্যকার হিসাবে জগাকাকুকেই ঘোষণা করা যেতে পারত। এমন অবস্থা যে বাবা পর্যন্ত একদিন রাত্রে খেতে বসে বলেই ফেললেন, “জগাটা না জেলে যায়!” কিন্তু ক্লাবের সেক্রেটারি অবনীবাবুর সাপোর্ট সবসময়ই জগাকাকুর উপরে; তিনি আবার পুরসভার চেয়ারম্যান। তাই সামনে সামনে কেউ বেশী কিছু বলতে সাহস করত না।
এক মাস আগে থেকে, নিয়ম করে প্রতিদিন রির্হাসল শুরু হল। জগাকাকুর কড়া নির্দেশ সকলকে আসতেই হবে। তবে এইসব নিয়ম কানুন সব বাচ্চাদের জন্যে। অসীমবাবু বা কমলা কাকিমা, যিনি রাজমাতার ভূমিকা নিয়েছিলেন, অবশ্য জগাকাকুর হুকুম বড় একটা মানতেন না। জগাকাকু তাদের কিছু বলতেও পারতেন না। খালি গজগজ করতেন।
এত সিরিয়াস যে পুজোর কয়েকদিন দুপুরেও রিহার্সল করা হল। পুজো শেষে লক্ষীপূজাও চলে গেল। তারপরের শনিবারে পুজো প্যাণ্ডেলের মধ্যেই মঞ্চস্থ হল আমাদের নাটকটি। সেদিনে যা হয়েছিলো, তার মধ্যে থেকে কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বুঝতে অসুবিধা হবে না কি কেলেঙ্কারি হয়েছিলো।
যেমন কথা ছিল রাজপুত সেনাপতি অসীমবাবু গাফিলতির জন্যে আমাকে তিরস্কার করবেন! সেই মধ্যযুগীয় রাজপুত সেনাপতি কোমরে তলোয়ার গুঁজে, মাথায় পাগড়ি পরে সোজা আমার দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে সংলাপ শুরু করলেন, যেন তিনি তার অফিসের কোনো জুনিয়র স্টাফকে বলছেন “what are you doing here! Stupid, worthless. You know, I can sack you in a minute”! আমি নিজের সংলাপ ভুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম; আর দর্শকদের মধ্যে তুমুল হাসির বন্যা বয়ে গেল।
পার্থ প্রথমে আমার সাথে দ্বিতীয় দারোয়ান করবে বলে ঠিক ছিল। বেণী যখন দ্বিতীয় দারোয়ান করবে বলে ঠিক হলো, তখন পার্থর জন্যে সৃষ্টি হয় আসল নাটকে না থাকা নতুন এক ভূমিকার- ষড়যন্ত্রকারী মন্ত্রীর চ্যালা। পার্থ আবার দেশবন্ধু স্পোর্টিং ক্লাবের কবাডি টিমের ক্যাপ্টেন। মন্ত্রী যখন রাজাকে হত্যা করতে যাবার জন্যে পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকছে, পার্থ সবকিছু ভুলে “চু-কিত-কিত” করতে করতে পিছন থেকে “এই ধরেছি” বলে মন্ত্রীমশাইকে জাপটে ধরে!
সবথেকে গোল বাঁধান পরিমল কাকু। গলির মুখে পরিমল কাকুর চায়ের দোকান । নিন্দুকেরা বলতে শুরু করে দুবেলা ফ্রি চা খাইয়ে পরিমল শেষ পর্যন্ত মুখ্য ভিলেন মুঘল সেনাপতি খিজির খাঁয়ের পার্টটা জোগাড় করলো। ছুঁচলো দাড়ি মেক-আপ; অভ্যাস নেই এইসব ধরাচূড়ো পড়ে দীর্ঘক্ষণ থাকার। আঠা দিয়ে আটকানো দাড়ির জায়গাটা কুটকুট করতে শুরু করলো; খিজির খাঁয়ের এক একটা সংলাপ বলেন আর দাড়ি চুলকান। তবে বাঙাল ভাষার সাথে উর্দু মিশ্রিত সে সংলাপ না প্রলাপ সে নিয়ে তর্ক চলতেই পারে। শেষমেশ মঞ্চের উপরে সেই দাড়ি গেল খুলে। কিন্তু পরিমলকাকু তো বুঝতে পারছেন না দাড়ি গেছে খুলে। চারিদিকে হাসির রোল উঠাতে পরিমল কাকু আরও নার্ভাস হয়ে নাটকের মাঝখানেই সমস্ত সংলাপ ভুলে একদম শেষের দিকের সংলাপ বলে ফেললেন, “আমি আজ পরাজিত! সালাম এই রাজপুত যোদ্ধাদের। ধন্য এই বীরভূমি! আমার এখন দিল্লী ফিরে যাবার সময় এসেছে।”
তবে এর মধ্যেই ফাটিয়ে দিয়েছিল লালটু। তাকে জগাকাকু তাকে “রেশমা অউর শেরা” সিনেমার ভি সি আর এনে, তিন বার দেখিয়েছিলেন। নির্দেশ দিয়েছিলেন সোজা অমিতাভ বচ্চনকে কপি করতে। অমিতাভ ঐ সিনেমায় এক রাজস্থানী বোবা যুবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।
এরপর পরের চারটে পুজোয়, আর কেউ নাটক করার সাহস দেখায় নি!
পাঁচ বছর পরের নাটকে জগাকাকু হিরো। আর সে আর এক মহাভারত।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।