Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
নিঃশব্দতার সেমিওটিক্স
তখন আমি অন্য একটা সংস্করণ পড়েছিলাম। ওটা একটা প্রাইভেট লাইব্রেরি থেকে এনেছিলাম। সেই বইটির শেষ পাতায়ও একই রকম চিরকুট ছিল — ঠিক একই নকশা। একই চিহ্ন। কিন্তু তারিখটা ছিল অন্য।
নিঃশব্দতার সেমিওটিক্স

গ্রন্থাগারের ভেতর ছায়ার শব্দ


শহরের পুরোনো লাইব্রেরিটি শহরের মানচিত্রে নেই, অথচ মানুষরা বিশ্বাস করে — যে কোনও হারানো জিনিস, কিংবা হারানো মানুষ, শেষ পর্যন্ত এখানে এসে শব্দ রেখে যায়। কেউ বলে, এই লাইব্রেরির বইগুলো নিজে নিজে নিঃশ্বাস নেয়। কেউ বলে, রাতে বইয়ের পাতাগুলো অল্প অল্প নড়ে ওঠে, যেন কেউ অদৃশ্য আঙুলে পাতা ওলটাচ্ছে।

লাইব্রেরিয়ান অদিতি বিশ্বাস এসব কথায় কান দেন না। তাঁর কাছে লাইব্রেরি মানে—ধুলো, কাগজ আর স্মৃতি মিলিয়ে তৈরি একটা আর্কাইভ, যেখানে মানুষের ভুলে যাওয়া জীবন থিতিয়ে থাকে। অদিতি সকাল দশটায় লাইব্রেরির দরজা খুলতেই যে শব্দটি শুনতে পান — তা মানুষ বা জীবনের নয়; বরং ইতিহাসের হালকা দমকা নিঃশ্বাস। এই শহরের লোকেরা তাঁকে "শব্দ-রক্ষক" বলে ডাকে। কারণ তিনি শুধু বই দেখাশোনা করেন না; মানুষ-ভাঙা স্মৃতি, পুরোনো চিঠি, আর অচেনা নোটের ফাঁকেও তিনি খুঁজে থাকেন মানুষের ভিতরের ভাষা।

অদিতি একা থাকেন। একটা খুব পুরনো বাড়ি, ঝুলে পড়া জানালা, আর রাতে ঘুম ভাঙলে তার পাশে থাকে শুধু ক্রমশ নিভে যাওয়া স্ট্রিটলাইটের আলো। তাঁর মনে হয় — জীবনের সবচেয়ে ভারী জিনিস হলো নিঃশব্দতা। লাইব্রেরিতে কাজ করতে করতে তিনি দেখতে পান — মানুষ বই ধার নেয়, ফেরত দেয়, কিন্তু কিছু কথা আরও ফেরত না-দেওয়া কথার মতো বইয়ের ভিতরেই থেকে যায়। এই লাইব্রেরিতে তিনি শিখেছেন — মানুষের জীবন কখনও কখনও একটি ভূতের মতো গল্পের ভিতর ঘুরে বেড়ায়।

বইটির নাম : অদৃশ্য পথের মানচিত্র


সেদিন দুপুরে লাইব্রেরিতে ভিড় ছিল না। বৃষ্টির পর শহরের রাস্তাগুলো হালকা ঠাণ্ডায় ভিজে আছে। একজন যুবক — অনিমেষ — ফেরত দিল একটি পুরনো বই: 'অদৃশ্য পথের মানচিত্র'।

অদিতি বইটি হাতে নিতেই বুঝলেন — এটি বহুদিনের পুরোনো, কাগজগুলো নরম হয়ে গেছে, পাতাগুলো হলুদ। বইটি যেন নিজেই নিজের পুরোনো বয়সকে স্বীকার করছে।

"বইটা কেমন লাগল?" অদিতি জিজ্ঞেস করলেন, কথার ভেতর একটা নিয়মিত সৌজন্যবোধের ভঙ্গি।

অনিমেষ হালকা হাসল, চোখে এক ধরণের ক্লান্তি — "বইটা... মনে হলো যেন আমার জীবনটাই কেউ লিখে রেখেছে বহু আগেই।"

অদিতি বিস্ময় লুকালেন না, কারণ অনেকেই এমন বলে। মানুষ বই পড়ে নিজের জীবনটাই খুঁজে পায়, আবার কেউ কেউ বইয়ের ভেতর হারিয়ে যায়। তবে অনিমেষ যখন চলে গেল, অদিতি বইটি স্ক্যান করার আগে শেষ পাতাটি ছুঁয়েই বুঝলেন — কিছু একটা আলাদা।

শেষ পাতাটি ছিল খানিকটা মোটা, যেন দু'টো পাতা একসাথে লেগে আছে। আঙুলের চাপ দিলেই পাতাটি আলগা হয়ে এল। আর তার ভেতর লুকানো ছিল — একটি ছোট চিরকুট। হাতে আঁকা এক নকশা। প্রথম দেখায় মনে হয় স্রেফ অলংকরণ। বাঁকানো লাইন, অনিয়মিত বিন্দু, আর খানিকটা অদ্ভুত ক্যালিগ্রাফির মতো কিছু চিহ্ন।

কিন্তু অদিতির দীর্ঘদিনের অভ্যাস তাঁকে বলে দিল — এটি নিছক অলংকরণ নয়। এটা যেন কোনও অচেনা ভাষার ভেতরে লুকানো আরেকটি ভাষা।

চিরকুটের নীচে ছোট করে লেখা — "শেষ পাতার ভিতর যা রাখা হয়েছে — তা শেষ নয়। যারা সন্ধান করে, তারা জানে, শুরু সবসময় শেষে লুকিয়ে থাকে।"

লাইনটি দেখে অদিতির গায়ে হালকা শিহরণ উঠল। এটা শুধু সাহিত্যিক বাক্য নয় — এটা যেন কোনও সংকেত।

কারও ব্যক্তিগত স্মৃতি? কারও চিঠি? কারও গোপন বার্তা? কারও ফেলে যাওয়া দাগ? কারও ভাঙা জীবনের শেষ টুকরো?

তিনি জানেন না।

তবে অদিতির কাছে প্রতিটি রহস্য মানে মানুষের আরেকটি সম্ভাব্য গল্প। তিনি চিরকুটটি পকেটে রাখলেন। এটুকুই তার অভ্যাস — ক্যামেরার মতো স্মৃতিকে ধরে রাখা। কিন্তু ছবির বদলে তিনি রাখেন শব্দ।

নকশার ভাষা : সময়ের বাইরে একটি মানচিত্র


রাত দশটার পর লাইব্রেরি বন্ধ। কিন্তু সেই রাতে অদিতি লাইব্রেরি বন্ধ করে চলে যাননি। বাইরের রাস্তায় বাতাস, দূরের আলো, ঝুলে পড়া পাতা — সবই যেন তাকে চিরকুটটির দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। তিনি ডেস্কের ছোট ল্যাম্প জ্বালিয়ে চিরকুটটি দেখতে লাগলেন।

নকশা যেন কোনও পথ। কোনও শহর? কোনও স্থাপত্য? না কি কোনও মানুষের মনের ম্যাপ? লাইনগুলোর বাঁক দেখে মনে হচ্ছিল — এটা কোনও ছোট শহরের অলি-গলি আঁকা। কিন্তু কোথাও কোনও নাম নেই, কোনও চিহ্ন নেই, কোনও নির্দেশ নেই।

হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন — বিদূষিত কালির দাগের মতো কিছু চিহ্ন বারবার এসেছে। সেগুলো দেখতে অনেকটা — "ফিরে দাঁড়ানোর চিহ্ন"। ইউরোপীয় কিছু গোপন সোসাইটির পুরোনো নথিতে এমন চিহ্ন দেখা যায়, যেখানে কোনও পথ দেখানোর বদলে পথ হারানোর চিহ্ন রাখা হয়, যেন অনুসন্ধানী মানুষই নিজের পথ নিজে খুঁজে নেয়।

হাত কাঁপছিল না, কিন্তু মনে হচ্ছিল — তাঁর জীবন এখন এই চিরকুটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। কারণ তাঁর নিজের জীবনেও কোথাও তিনি পথ হারিয়েছেন বহুদিন আগে।

ঠাণ্ডা বাতাসের ঢেউ এসে লাইব্রেরির দরজা নড়িয়ে দিচ্ছিল, যেন কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে খুব ধীরে হাত রাখছে দরজায়। অদিতি কাগজটা আবার উল্টে দেখলেন। নিচের দিকে খুব ছোট করে একটি তারিখ লেখা —
14/02/1987

তারিখটি দেখে তিনি চমকে উঠলেন। কারণ ১৪ ফেব্রুয়ারি তাঁর নিজের জন্মদিন।

এটা কি কাকতালীয়? নাকি কেউ... কখনও... কিছু রেখে গেছে তাঁর অপেক্ষায়?

অদিতির মন ধীরে ধীরে শব্দহীন সমুদ্রে ডুবে যেতে লাগল। যে সমুদ্রে মানুষ নিজের ভেতরের গভীরতম প্রশ্নগুলোকে খুঁজে পায়।

চরিত্রদের জীবন থেকে বিচ্যুতি


এই সময়ে গল্পে চারজন মানুষ ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে — যেন চারটি ছায়া।

(১) অদিতি — শব্দ-রক্ষক
যিনি মানুষের না-বলা স্মৃতি খুঁজে পান। নিজের জীবনে এক বড় শূন্যতা — মায়ের হারানো ডায়েরি। তাঁর মা, সুহাসিনী, একজন কবি ছিলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান যখন অদিতি ছিল সাত বছরের।

(২) অনিমেষ — অজান্তে বার্তাবাহক
যে বইটি ফেরত দিয়েছিল। মনের ভেতর তারও এক ভয়ানক যন্ত্রণা — এক মেয়ের স্মৃতি, যাকে সে খুঁজে পেয়েও হারিয়েছে। অদিতিকে দেখলে তার ভেতর অদ্ভুত পরিচিতি জেগে ওঠে।

(৩) রুদ্র — নিঃশব্দ চিত্রকর
লাইব্রেরির পাশের পুরোনো ভবনে বাস করে। দিনে চিত্রকর, রাতে অদ্ভুত প্রতীক আঁকে — যা দেখতে নকশার মতো, কোনও শহরের মতো, কোনও স্মৃতির মতো। সে কখনও লাইব্রেরিতে আসে না, কিন্তু জানে লাইব্রেরির সব শব্দ।

(৪) মায়া — এক অদ্ভুত নাম
যার নামই গল্পের রূপক। কেউ জানে না সে কোথায় থাকে। কেউ জানে না সে কার সঙ্গে কথা বলে। শুধু রাতে মাঝে মাঝে অদিতির ডেস্কে একটি লাল গোলাপ রেখে যায়। কেউ তাকে দেখেও দেখে না।

এই চারজনের জীবন আলাদা আলাদা জায়গায়, কিন্তু চিরকুটটি যেন তাদের চারজনকেই একসঙ্গে টানছে।

কারণ চিরকুটে যে নকশা, তা অদ্ভুতভাবে তাদের জীবনেরই প্রতিরূপ। চারটি জায়গার চারটি গোপন দরজা। চারটি হারানো স্মৃতি। চারটি না-বলা সত্য।

ছায়ার সঙ্গে প্রথম সংলাপ


রাতের লাইব্রেরি খুব নিস্তব্ধ। এতটাই নিস্তব্ধ যে মনে হয় — নিঃশব্দতারও একটা গন্ধ আছে।

অদিতি নকশার সরু দাগগুলো অনুসরণ করতে করতে হঠাৎ দেখতে পেলেন — একটি জায়গায় একটা ছোট গোল চিহ্ন রয়েছে। চিহ্নটি দেখে মনে হলো — কেউ দাঁড়িয়ে আছে। অথবা কারও অপেক্ষা করছে। তিনি মনে মনে বললেন — "এটা কি আমার জন্য?"

হঠাৎ বুক শিরশির করে উঠল। কেউ যেন খুব ধীরে, খুব মসৃণ গলায় বলল — "শেষ পাতায় যে থাকে... সে কখনও শেষ নয়।"

অদিতি চমকে উঠে চারদিকে তাকালেন। কেউ নেই। শুধু দূরের বইয়ের তাকগুলো দাঁড়িয়ে আছে — একেকটা যেন জেগে ওঠা স্মৃতির মতো।

শব্দটা কোথা থেকে এলো? মায়া কি? রুদ্র? অনিমেষ? নাকি তাঁর নিজের ভেতরের কোনও অচেনা কণ্ঠ? যে কণ্ঠ মানুষ শোনে যখন নিজেদের জীবনের গভীরে পৌঁছায়? তিনি চিরকুটটি শক্ত করে ধরে ফেললেন। এখন স্পষ্ট — এটা কোনও সাজসজ্জার অংশ নয়। এটি কোনও মানুষের হারানো স্মৃতির অঙ্কিত পথ। আর সেই মানুষটি সম্ভবত এখনও কাছেই কোথাও আছে।

রুদ্রর ঘরে নকশার অন্ধকার


লাইব্রেরির পরদিন সকাল। অদিতি হাঁটছিলেন লাইব্রেরির পেছন দিক দিয়ে। সেখানে একটা পুরোনো তিনতলা বাড়ি—ধুলো ধরা, জানালায় নেট নেই, আর দেয়ালের রং চটে গেছে। এই বাড়িতেই থাকে রুদ্র। যে লোকটা কখনও কারও সঙ্গে বেশি কথা বলে না, কিন্তু নিজের ঘরে হাজার হাজার আঁকা নকশা জমিয়ে রাখে — যেন সে কোনও অদৃশ্য মানচিত্র রচনার কাজে ব্যস্ত।

অদিতি দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে শব্দ এলো — "দরজা খোলা। ঢুকে আসুন।"

ভয় আর কৌতূহলের মিলনযাত্রার মতো অনুভূতি নিয়ে অদিতি ভেতরে ঢুকলেন। ঘরটা যেন নকশার সমুদ্র। মেঝেতে, দেয়ালে, টেবিলে—সকল দিকে হেলানো কাগজ। সবগুলোতেই একই ধরনের বাঁকা, গোল, এলিপস আকৃতির রেখা। কোনওটা শহরের রাস্তার মতো, কোনওটা মনে হয় কোনও অচেনা অঙ্গের অভ্যন্তরীণ গঠন, আবার কোনওটা যেন মানুষের মস্তিষ্কের স্মৃতির পথানুসরণ।

রুদ্র ধীরে ধীরে বলল — "আপনি চিরকুটটা পেয়েছেন, তাই না?"

অদিতি থমকে দাঁড়ালেন! তিনি চিরকুটের কথা কাউকে বলেননি!

"আপনি জানলেন কীভাবে?"

রুদ্র তার অসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বলল, "যে নকশা আপনি পেয়েছেন — সেটা আমার আঁকা।"

অদিতির মাথার ভেতর যেন আরও দশটি প্রশ্ন জেগে উঠল, কিন্তু কোনওটার উত্তর তখনই পাওয়া গেল না।

রুদ্র তাকালেন না তাঁর দিকে। তিনি আঁকা নকশার দিকে চোখ রেখে বললেন, "মানুষ ভাবে নকশা মানেই কোনও শহর, কোনও রাস্তা, কোনও ঘর। কিন্তু আসলে নকশা হলো — একজন মানুষের মন। যেটা কখনও পুরো পড়া যায় না।"

অদিতি জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কোথা থেকে পেলেন? আর আমার বইয়ের শেষ পাতায় এটা কে রাখল?"

রুদ্র এবার ধীরে ধীরে অদিতির দিকে তাকাল। তার চোখে একটা অযাচিত বিষণ্ণতা —
"চিরকুটটা আমি আঁকলেও — এটা আমি লিখিনি। এটা কেউ রেখেছিল। একজন... যাকে আপনি চেনেন। অথবা বলা ভালো — যিনি আপনাকে চিনতেন।" অদিতি বললেন, "আপনি আমাকে রহস্যে ফেলছেন। স্পষ্ট করে বলুন।"

রুদ্র মাথা নেড়ে বলল, "স্পষ্ট বলতে গেলে গল্পটা আজই শেষ হয়ে যাবে। আর গল্প কখনও একদিনে শেষ হওয়া উচিত না।"

এই কথা বলেই সে অদিতিকে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল। নকশার ঠিক মাঝখানে একটা ছোট গোল দাগ। তার নীচে লেখা — "ভেতরের দরজা এখনও খোলা হয়নি।"

অদিতির মনে হলো তাঁর জীবনের দরজাও বহুদিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে। হয়তো এই নকশা সেই বন্ধ দরজায় প্রথম নক।

অনিমেষের অদ্ভুত স্মৃতি


অদিতি লাইব্রেরিতে ফিরে আসতেই দেখলেন — অনিমেষ ইতিমধ্যেই অপেক্ষা করছে। তার চোখে ঘুমহীনতা। যেন অনেক রাতের ভেতর দিয়ে হেঁটে এসেছে।

"আপনার সাথে কথা ছিল," অনিমেষ বলল।
"কিসের?"
"আপনি কি... শেষ পাতার চিরকুটটা দেখেছেন?"

অদিতি ভিতরে ভিতরে চমকে উঠলেন। রুদ্র বলেছিল কেউ রাখিনি, কেউ জানে না — তাহলে অনিমেষ কীভাবে জানল?

"তুমি কিভাবে জানলে?" তিনি প্রশ্ন করলেন।
অনিমেষ ধীরে ধীরে বলল, "কারণ... আমি সেটা দেখেছি। বছর তিনেক আগে।"
অদিতি অবাক! "তুমি আগে বইটা পড়েছ?"
"হ্যাঁ। তখন আমি অন্য একটা সংস্করণ পড়েছিলাম। ওটা একটা প্রাইভেট লাইব্রেরি থেকে এনেছিলাম। সেই বইটির শেষ পাতায়ও একই রকম চিরকুট ছিল — ঠিক একই নকশা। একই চিহ্ন। কিন্তু তারিখটা ছিল অন্য।"
অদিতি আরও কাছে ঝুঁকে বললেন, "কী তারিখ?"
অনিমেষ ফিসফিস করে বলল, "14/02/1987 — আপনার জন্মের পরদিন।"

অদিতির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। দুই ভিন্ন বই, দুই ভিন্ন সংস্করণ — কিন্তু একই ধরনের চিরকুট, একই নকশা, একই তারিখ-শ্রেণী। এটা আর কাকতালীয় হতে পারে না। এটা কোনও মানুষের ইচ্ছাকেই নির্দেশ করে।

অনিমেষ বলল, "যে মেয়েটিকে আমি খুঁজে হারিয়েছিলাম... সে আপনাকে ঠিক আপনার মতোই দেখতে ছিল।"

এই কথা শুনেই অদিতির শ্বাস বন্ধ হয়ে আসল।

অনিমেষ বলল — "মেয়েটি বলেছিল — 'যদি আমাকে খুঁজে না পাও, তবে শেষ পাতার ভেতর দেখো।' আমি ভেবেছিলাম সে আমাকে কবিতা শোনাচ্ছে।কিন্তু এখন বুঝছি... কেউ আমাদের মাঝেই খেলা চালাচ্ছে।"

অদিতির চোখে ঝলক উঠল — "কী ধরনের খেলা?"
অনিমেষ মৃদু কন্ঠে বলল, "স্মৃতির খেলা।"

সুহাসিনীর অদৃশ্য ডায়েরি


অদিতির বাড়িতে একটা ধুলো-ধরা কাঠের বাক্স আছে। তাঁর মা সুহাসিনী বিশ্বাস, নিখোঁজ হওয়ার আগে — তাঁর কিছু লেখা, কিছু চিঠি, কিছু খণ্ড স্মৃতি রেখে গিয়েছিলেন। সেদিন রাতে অদিতি হঠাৎ বাক্সটা খুললেন। মাঝে মাঝে তিনি এটা খুলে দেখেন; মায়ের হাতের লেখা দেখলে তিনি বুঝতে পারেন — মা তাঁকে ভালোবাসতেন, কিন্তু নিজের কোনও আলাদা জগতে বাঁচতেন। বাক্সের ভেতর একটি ছেঁড়া ডায়েরি পেলেন। আগে কখনও তিনি এটিকে গুরুত্ব দেননি — কারণ অনেক পৃষ্ঠা অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু আজ একেবারে শেষ পাতাটি দেখে তিনি স্থির হয়ে গেলেন। শেষ পাতায় আঁকা ছিল — একই নকশা। একই বাঁকা লাইন, বিন্দু, চিহ্ন। ঠিক সেই চিরকুটের মতো। আর পাশে লেখা — "যদি কখনও আমার মেয়ে এই মানচিত্র খুঁজে পায় — তবে সে বুঝবে, আমি কোথায় গেছি।" অদিতির চোখ ভিজে গেল। তিনি ডায়েরি শক্ত করে ধরলেন। স্মৃতি, শহর, নকশা—সব যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। মা যদি এই নকশা রেখে গিয়েছেন — তাহলে রুদ্রের আঁকা? বইয়ের চিরকুট? অনিমেষের পাওয়া নকশা? সবই কি তাঁর মা-র রেখে যাওয়া কোনও রহস্যের অংশ? তাহলে মা কোথায় গেলেন? কেন গেলেন? কেন নকশা? কেন পথ? "মা, তুমি কি আমার জন্মদিনে আমাকে ডাকছিলে?" অদিতি ফিসফিস করে বললেন। তাঁর মনে হলো — মায়ের ডায়েরি থেকে একটা শব্দ ভেসে আসছে — "শেষ পাতার ভেতর ফিরে এসো।"

মায়ার নীরব আগমন


রাত তখন ১টা। সবাই ঘুমিয়ে আছে। শহরের উপর পাতলা সাদা কুয়াশা। অদিতি লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারণ আজ, অদ্ভুতভাবে মনে হয়েছিল কেউ তাঁকে ডাকছে। দরজার সামনে লাল গোলাপ রাখা। যেমন প্রতি মাসেই কেউ রেখে যায়। কিন্তু আজ গোলাপের সঙ্গে একটি চিরকুটও ছিল। তাতে লেখা — "রেখাগুলো অনুসরণ করো। তোমার জীবনের গল্প এখনও অসম্পূর্ণ।" অদিতির গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। চিরকুটের নিচের স্বাক্ষর — "মায়া" মায়া — যে নিজের মতো করে লাইব্রেরিতে আসে, যার মুখ কেউ দেখে না, যে শুধু অদিতির ডেস্কে গোলাপ রেখে যায়। তিনি চারিদিকে তাকালেন। কেউ নেই। শহরটা যেন রূপান্তরিত হয়ে গেছে। দূরে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে। অদিতি ডাকলেন, "আপনি মায়া?" ছায়াটি হাসল। কিন্তু কোনও শব্দ হলো না। তারপর ধীরে ধীরে ছায়াটি ডুবে গেল কুয়াশার মধ্যে। অদিতির মনে হলো — মায়া কোনও বাস্তব মানুষের নাম নয়। এটা একটা রূপক। একটা ইঙ্গিত। একটা ছদ্মবেশ। মায়া— যা ধরা যায় না, তবু পথ দেখায়। যার মুখ দেখা যায় না, তবু গল্পের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকে।

পথের ভাঁজ: স্মৃতির মানচিত্র


অদিতি ফিরে লাইব্রেরির ভেতর ঢুকলেন। তিনি নিজের ডেস্কে বসে সেই নকশার পথ ধরে আঙুল চালালেন। বাঁকা পথ — গোল চিহ্ন — একটি সরু রেখা — তারপর আবার বাঁক।

হঠাৎ নকশার মধ্যে এক জায়গায় লেখা দেখা গেল — "Aditi – 7"

তিনি ভয়ে চমকে উঠলেন। এটা আগে ছিল না। এটা এখন হঠাৎ লেখা হয়ে গেল কীভাবে?

"৭ মানে কি আমার বয়স? যখন মা নিখোঁজ হলেন?" তাঁর চোখ জ্বালা করতে লাগল। তিনি মনে করলেন সেই রাত — মা তাঁকে শুইয়ে দিয়ে বলেছিলেন, "যদি হারিয়ে যাই, আমার নকশা অনুসরণ করবে।"

তখন তিনি কিছুই বোঝেননি। আজ বুঝতে শুরু করলেন। হয়তো মা কোনও মানসিক ধাঁধায় ভুগছিলেন। হয়তো কোনও গোপন সংগঠন বা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। হয়তো কারও হাত থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। হয়তো কোনও সত্য উদ্ঘাটনের জন্য নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

অদিতি মনে মনে বললেন, "মা... তুমি কোথায় গেলে?"

ঠিক সেই মুহূর্তে লাইব্রেরির বাতাস নড়ে উঠল। একটি বই তাক থেকে পড়ে গেল। বইটির নাম — "শহরের নিঃশব্দ ঘর"

বইটির ঠিক শেষ পাতায় — একই নকশা। একই চিহ্ন। একই পথে বাঁক। এখন আর কোনও সন্দেহ নেই — এই নকশা কোনও একক ঘটনার নয়। এটি একটি ছড়িয়ে থাকা গল্প। অনেক লোকের জীবনের ভেতরে লুকানো পথ।

রুদ্র, অনিমেষ, মায়া, তাঁর মা — সবাই একই নকশার ভেতর হাঁটছেন। একই পথ, কিন্তু ভিন্ন কারণ। ভিন্ন দুঃখ। ভিন্ন স্মৃতি।

অদিতি চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর মনে হলো — লাইব্রেরির ভেতর দিয়ে কেউ হাঁটছে। বইয়ের পাতাগুলো নড়ে উঠছে। শব্দগুলো জেগে উঠছে। আর সেই অচেনা কণ্ঠ বলছে, "শেষ পাতায় ফিরে এলে — তবেই শুরু হবে প্রকৃত গল্প।"

লাইব্রেরির গোপন কক্ষ


রাত তখন ২টা ছুঁইছুঁই। অদিতি, রুদ্র আর অনিমেষ—তিনজন লাইব্রেরির ভেতর দাঁড়িয়ে। চিরকুটের নকশা তিনজনের হাতেই। তিনটি আলাদা কাগজ, কিন্তু তিনটিতেই একই পথ। একই বাঁক, একই গোল দাগ, একই কেন্দ্রীয় রেখা।

রুদ্র টেবিলে তিনটি চিরকুট পাশাপাশি রাখতেই দেখা গেল — তিনটি নকশা একসাথে মিলে এক বিশাল মানচিত্র তৈরি করছে। যেন কোনও শহরের, কোনও স্মৃতির, কোনও হারানো মানুষের অন্তর্লীন পথ।

অনিমেষ ফিসফিস করে বলল, "এটা... এতো স্পষ্ট! আমরা তো এতদিন টুকরো টুকরো দেখছিলাম। আসলে এটা একটা সম্পূর্ণ পথ।"

অদিতির মনে হলো — তাঁর হৃদয়ের ভেতর কোথাও এই মানচিত্র আগেই লেখা ছিল। মা নিশ্চয়ই এটাই চাইতেন — সে একদিন অন্য মানুষদের টুকরো স্মৃতি জোড়া লাগাবে।

রুদ্র টেবিলের নিচে হাত ঢুকিয়ে একটা পুরোনো লোহার রড টানলেন। একটা ক্লিক শব্দ হলো। লাইব্রেরির মেঝে ধীরে ধীরে সরে গেল এক ফুটের মতো। তলার অন্ধকার গর্ত থেকে একটা ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এলো।

"এটাই," রুদ্র বলল, "গোপন কক্ষ।"
অদিতি বিস্ময়ে বললেন, "এটা তুমি কিভাবে জানলে?"
রুদ্রের ভয়ঙ্কর শান্ত উত্তর, "কারণ এটি আমি ডিজাইন করেছি। কিন্তু আমি এটি তৈরি করিনি। আমি শুধু সেই নকশা এঁকেছি, যা আমাকে পাঠানো হয়েছিল।"
অনিমেষ বলল, "কে পাঠিয়েছিল?"
রুদ্র ধীরে বলল, "সুহাসিনী বিশ্বাস।"

অদিতির মা।

অদিতি নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেলেন।
"মা... তোমার গোপন পথ এতদিন এই লাইব্রেরির নীচে ছিল? তুমি কাকে লুকিয়ে রাখছিলে? কাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলে?"

তিনজন নিচে নামলেন। শীতল, ধুলোসিক্ত, পুরোনো কাগজের গন্ধ ভেসে উঠল। দেয়ালে আঁকা অসংখ্য নকশা, চিহ্ন, শব্দ, বাক্য। সবশেষে একটি বড় দেয়ালমাপা মানচিত্র। মাথার ওপর জ্বলছে একটাই কমলা রঙের বাল্ব। মানচিত্রের উপরে বড় অক্ষরে লেখা —
"MANUSCRIPT OF MEMORY – স্মৃতির পাণ্ডুলিপি"
আর ঠিক নিচে — "For Aditi – When she is ready."

অদিতির পা কাঁপতে লাগল। মায়ের হাতের লেখা। চোখের সামনে স্পষ্ট। তিনি মানচিত্রে হাত ছুঁতেই মনে হলো — এটা কোনও শহরের পথ নয়। এটা কোনও গোপন দলের নকশাও নয়। এটা তাঁর নিজের জীবনের পথ। শিশুকাল → স্কুল → কৈশোরের দুঃস্বপ্ন → মায়ের নিখোঁজ হওয়া → বাবার নীরবতা → লাইব্রেরির প্রতি আকর্ষণ → একা রাতগুলো → হারানো মানুষদের প্রতি টান — সব একেকটা বিপরীতমুখী বাঁক হয়ে নকশার গায়ে আঁকা।

অনিমেষ বলল, "তোমার মা এই মানচিত্র বহু বছর ধরে বানিয়েছিলেন। তিনি জানতেন তুমি একদিন এটা খুঁজে পাবে।"
অদিতির চোখ ভিজে উঠল — "কিন্তু তিনি গেলেন কোথায়? কেন আমাকে রেখে গেলেন?"
রুদ্র বলল, "এর উত্তরও আছে এখানে।"

সুহাসিনীর শেষ চিঠি


দেয়ালের নিচে একটি কাঠের বাক্স ছিল। অদিতি বাক্স খুলতেই দেখতে পেলেন — একটি মোটা খাম, তাতে লেখা — "অদিতির জন্য — যখন সে নকশা বুঝবে।"

অদিতি কাঁপা হাতে চিঠিটি খুললেন। মায়ের লেখা —
"অদিতি, একদিন তুমি বুঝবে — মানুষ শুধু শহরে থাকে না, সে থাকে স্মৃতির গোপন ঘরে। আমি কোনো দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হইনি। আমি পালিয়েও যাইনি। আমি ছিলাম অনুসন্ধানের ভিতরে। আমি একটি সত্য খুঁজছিলাম — মানুষের ভেতরের মানচিত্র..."

অদিতির চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।

"...এই দুনিয়ার সকল মানুষের নিজের ভেতর একটা গোপন পথ আছে। কেউ তাকে বোঝে, কেউ হারিয়ে ফেলে। আমি যতজনের সাক্ষাৎ পেয়েছি — তাদের সবার ভিতরে দেখেছি একই নকশা, একই গোল চিহ্ন, একই অন্তর্গত ভয়, একই আকাঙ্ক্ষা।
তুমি জন্মানোর পর বুঝলাম — তোমার ভেতরেও ওই নকশা আছে। তাই তোমাকে আমি শেখাতে চেয়েছিলাম — নিজের ভিতরের পথ খুঁজে নেওয়ার শিল্প..."

রুদ্র আর অনিমেষ নিশ্চুপ। শুধু অদিতির নিশ্বাস শোনা যাচ্ছে।

"...আমি তোমার কাছে ফিরে আসতে পারিনি, কারণ আমার অনুসন্ধান শেষ হয়নি। আমি যে মানুষদের পথ খুঁজে দিচ্ছিলাম — তারা আমাকে ডাকত 'মায়া'।
হ্যাঁ অদিতি — আমি-ই মায়া। আমি-ই সেই মানুষ, যে গোলাপ রেখে যেত..."

অদিতি যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না। তাঁর বাবা যে বলতেন — মা মানসিক সমস্যায় ছিলেন — সবই মিথ্যে। মা নিজের ভিতরের বিজ্ঞান খুঁজছিলেন। স্মৃতির বিজ্ঞান, অভিজ্ঞতার মানচিত্র।

"...যদি আমাকে খুঁজতে চাও — শেষ পাতার পথ অনুসরণ করবে..."

শেষে একটি লাইন —
"...তোমাকে হারাতে হয়নি — শুধু সময়ের ভেতর অন্য পথে যেতে হয়েছিল।"

অদিতির শরীর থরথর করে কাঁপছিল। তিনি চিঠি বুকে চেপে ধরে কেঁদে ফেললেন।

মায়ার মুখাবয়ব


হঠাৎ দেয়ালের উপরের বাল্বটা টিমটিম করে নিভে গেল। অন্ধকার। রুদ্র মোবাইলের আলো জ্বালাল। দীপ্ত আলোর মাঝে দেখা গেল — ঘরের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে একজন। একজন নারী। শাড়ি পরা। দীর্ঘ চুল। মুখে স্বপ্ন-আঁচলা দুঃখ আর এক অজানা উজ্জ্বলতা।

অদিতি আলোটা চোখের সামনে ধরতেই কেঁপে উঠল। সে তার মা। সুহাসিনী। যেন তিনি কখনও বুড়িয়ে যাননি। যেন তিনি সময়ের ভেতর আটকে ছিলেন এতদিন।

"মা..." অদিতির কণ্ঠ ভেঙে গেল।
সুহাসিনী হাসলেন — দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্লান্ত সৌন্দর্যের হাসি।
"তুমি নকশাটা খুঁজে পেয়েছ, অদিতি। আমি জানতাম। তুমি আমার চেয়ে বেশি পারবে।"

অদিতি ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন। এতদিনের দুঃস্বপ্ন এক মুহূর্তে গলে গেল।
সুহাসিনী বললেন, "আমি তোমাকে ফেলে যাইনি। আমি মানুষের ভিতরের দরজা খুলছিলাম।"

রুদ্র, অনিমেষ — দুইজনই চুপ। এরা দুজনই জানে — এই মুহূর্ত তাদের নয়। এটা মা আর মেয়ের পুনর্মিলন।

কিছুক্ষণ পর সুহাসিনী বললেন, "এই লাইব্রেরিটা শুধু বইয়ের জন্য নয়। এটা মানুষের মনের জন্য। যে বইয়ের শেষ পাতায় তুমি চিরকুট পেয়েছিলে — সেটা আমার দেওয়া সংকেত। তুমি প্রস্তুত কিনা — তা দেখার জন্য।"
অদিতি কাঁপা গলায় বললেন, "তারপর তুমি কী করবে, মা?"
সুহাসিনীর চোখে এক অদ্ভুত শান্তি, "এখন সময় হয়েছে — তোমার হাতে নকশা তুলে দেওয়ার।"

সত্যের চৌকাঠ


সুহাসিনী তিনটি চিরকুট তুলে নিলেন। একটি অদিতির হাতে দিলেন। একটি অনিমেষকে। একটি রুদ্রকে।
"সব পথ একই জায়গায় যায় — কিন্তু কারণ আলাদা। কারও পথ প্রেমের, কারও পথ হারানোর, কারও পথ সত্যের সন্ধানে।"

তিনি অদিতির দিকে তাকালেন — "তোমার পথ নিজেকে খুঁজে পাওয়ার।"
তারপর অনিমেষের দিকে — "তোমার পথ অতীতকে ক্ষমা করার।"
রুদ্রের দিকে — "তোমার পথ অদৃশ্যতাকে বোঝার।"

শেষে তিনি তিনজনকে বললেন, "তোমাদের তিনজনের গল্প — একই মানচিত্রে আঁকা ছিল। তাই তোমরা একে অপরের কাছে এসেছ।"

অদিতি বুঝলেন — মানুষ কোনওদিন একা নয়। যারা আমাদের জীবনে আসে — তাদেরও নিজের ভিতরের নকশা একদিন আমাদের পথে এসে মিশে যায়।

সুহাসিনী ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেলেন। তাঁর শরীর ম্লান হতে লাগল। যেন সময়ের পর্দায় ফিরে যাচ্ছেন।
"মা!" অদিতি চিৎকার করে উঠলেন।
সুহাসিনী মৃদু হাসলেন — "আমি কখনও দূরে যাইনি। আমি তোমার ভিতরেই আছি। যতদিন তুমি শেষ পাতায় আলো জ্বালাবে — আমি ফিরবো।"

একটি উজ্জ্বল আলো। একটি নিঃশব্দ হাওয়া। সুহাসিনী অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

শেষ পথ — নতুন সূচনা


রুদ্র, অনিমেষ, অদিতি — তিনজন আবার লাইব্রেরির মেঝেতে উঠে এলেন। উপরের ঘরে আলো জ্বলছে। বাইরে ভোরের প্রথম নরম আলো দেখা যাচ্ছে।

অদিতি চিরকুট নিজের বুক পকেটে রেখে বললেন, "আজ থেকে লাইব্রেরিটা বদলে যাবে। এটা আর শুধু বইয়ের জায়গা থাকবে না। এটা হবে মানুষের ভেতরের মানচিত্র খোঁজার ঘর।"
রুদ্র বলল, "তুমি কি প্রস্তুত?"
অদিতি মৃদু হেসে বললেন, "আমি জন্মের পরদিন থেকেই প্রস্তুত ছিলাম।"
অনিমেষ বলল, "তাহলে আমাদের তিনজনের পথ এখান থেকে শুরু।"

সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। নতুন ভোরের ভাঙা আলো বইয়ের তাকের উপর পড়ে আছে। নকশার রেখাগুলো আলোয় আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অদিতি মনে মনে বললেন — "শেষ পাতার চিরকুট কখনও শেষ নয়। এটি সবসময়ই প্রথম পাতার দরজা।"




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 13 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top