চলতি পথে কোনো রাজনৈতিক দলের সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। মাইকে শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ভূপেন হাজারিকার সেই বিখ্যাত গান বাজছে —
মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে
একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারেনা, ও বন্ধু!
যে গানটা আমরা সকলেই শুনতে ভালোবাসি। গানটা তখনও কানে বাজছে। মেট্রো রেলে চড়ে বসতেই দুই ভদ্রমহিলা — সম্ভবত অনেকটা দৌড়ঝাঁপ করেই — মেট্রোয় বসে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গেই হাঁপাতে হাঁপাতে একজন বললেন, "উহ! আজকে জলের বোতলটাও সঙ্গে আনা হয়নি।" খানিকটা উপযাচক হয়েই খুব আন্তরিকভাবে নিজের ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা দেখিয়ে বললাম, "নেবেন?" বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখিয়ে উনি বললেন, "না।"
ভাবলাম — মানুষ বিপদে পড়েও একটু সহজ-সরল হতে পারে না কেন?
এই প্রসঙ্গে চুপি চুপি কিছু কথা বলে রাখি। পরে বাড়ি ফিরে ঘটনা বলতেই গিন্নির রসিক মন্তব্য — "কী দরকার ছিল তোমার আদর করে জল দিতে যাওয়ার? উচিত শিক্ষা হয়েছে তো?"
ভাবলাম — কথায় কথা বাড়ে, গৃহবিবাদ ডেকে আনার দরকার কী! প্রবাদেই আছে, বোবা-কালার শত্রু নেই — নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ে গেল নিজেদের এক বিপদের সময় 'আন্তরিকতা'র গুরুত্বের কথা।
২০০৪ সালের সেই ভয়ংকর সুনামির দিনগুলো। আন্দামান-নিকোবর তখন সুনামির তাণ্ডবে জর্জরিত। ভয়ানক ভূমিকম্পের দাপটে আমরা সকলেই বাসস্থানছাড়া। আকাশবাণী পোর্ট ব্লেয়ারের ঘোষণায় জানানো হলো — বিপদগ্রস্তদের জন্য সরকারি রবীন্দ্র বাংলা বিদ্যালয়ে শিবির খুলে দেওয়া হয়েছে। আমরা দিশেহারা হয়ে পাহাড়ি পথ ধরে চলেছি; পা যেন চলতে চাইছে না। পথমধ্যে কোন এক সরকারি কোয়ার্টার থেকে দয়াপরবশ হয়ে একজন বাসিন্দা পানীয় জল ও বিস্কুট নিয়ে এসে সাময়িকভাবে মনোবল বাড়িয়ে দিলেন। ভয়ংকর সেদিনের সেই আন্তরিকতার স্মৃতিটা জীবনের বহু প্রাপ্তির মধ্যে উজ্জ্বলতম হয়ে আছে। কিন্তু...
আজ এই নিবন্ধ লিখতে বসে স্বাভাবিকভাবেই মনে হচ্ছে — 'আন্তরিকতা' শব্দটির আভিধানিক মাহাত্ম্য একই থাকলেও বাস্তবে এটি অনেকটাই সংকীর্ণ হয়ে গেছে। আন্তরিকতার সঙ্গে 'সহানুভূতি' শব্দটির ওতপ্রোত যোগাযোগ আছে। যুগের সঙ্গে সঙ্গে এই সহানুভূতি ও আন্তরিকতা দেখানোর চল যেন এখন কিছুটা প্রাচীনপন্থী হয়ে গেছে। গায়ে পড়ে আন্তরিকতা দেখাতে গেলে আজ সমূহ বিপদ! খোলামেলা মন নিয়ে আন্তরিক হলে ক্ষেত্রবিশেষে আপনাকেই ধাক্কা খেতে হতে পারে। যার প্রতি আন্তরিক হতে চাইছেন, তিনি সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে বলতে পারেন — বা মনে মনে ধরে নিতে পারেন — আপনি 'ধান্দাবাজ'!
এখন সর্বত্র আন্তরিকতার বড় অভাব। রাস্তাঘাটে মানুষ অতিরিক্ত উদাসীনতার সঙ্গে পথ চলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ট্রেন-বাসে বয়স্কদের জন্য নির্ধারিত আসনে কম বয়সী কেউ বসে আছে; বয়স্ক মানুষ এসে দাঁড়ালে ওই ব্যক্তির মুখ ভার হয়ে যায় — সহানুভূতিশীল মন নিয়ে আসনটি ছেড়ে দিতে চায় না। চলতি পথে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বিপদগ্রস্ত মানুষটিকে সেবা করার আন্তরিক মনোভাবও যেন অন্তর্হিত। ছাত্রজীবনে বারবার পড়েছি —
স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগৎ হতে
সে কখনো শেখেনি বাঁচিতে।
স্বার্থপরতায় অন্ধ হয়ে কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে আমরা যেনতেন প্রকারে সরে পড়তে চাই। বিশ্বমানবের মাঝে নিজেকে মিশিয়ে দেবার যে সার্থকতা — পরম পরিতৃপ্তির যে রস — তার আস্বাদন থেকে আমরা যোজন যোজন দূরে।
শৈশবের স্মৃতিও তরতাজা। মাসির বাড়ি গেলে চরম আন্তরিকতার সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যেত! এই ছোট্ট অতিথিদের জন্য কত কী মহার্ঘ জিনিস জোগাড় — ইয়ত্তা নেই। পৌষের শুরুতে ঘরোয়া উৎসবে তালশাঁসের আঁটির কল, ভিজানো চাল, শাকালু — কত রকম সংমিশ্রণে সুস্বাদু পিঠে-পুলি! একবার তো মাঠে দৌড়ে গিয়ে কারও কাছ থেকে একটি বক এনে তার মাংসও খাইয়েছিলেন; সে আনন্দ আজও অমলিন।
শুধু আমার মাসি নন — আপনারও নিশ্চয় এমন অভিজ্ঞতা আছে। অতিথি এলেই পুকুরে মাছ ধরা, ফল-মূল-মিষ্টান্ন জোগাড় — এসব করে সবাই তৃপ্তি পেতেন; কারও মুখ ভার হতো না। এমনকি গৃহস্থের দরজায় ভিখারি এলেও নিজেরা অভুক্ত থেকে কাউকে মুখের গ্রাস দিতেন — সে গৌরবে তৃপ্তি ছিল। কিন্তু দিনকাল এমন বদলেছে যে আজ ঘরে অতিথি এলেই অনেকের মুখ ভার হয়ে যায়। গ্রামীণ মানসিকতায় তবু কিছুটা আন্তরিকতার ছাপ আছে; শহুরে মানসিকতায় স্বার্থপরতার বিষবৃক্ষ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো।
প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি কাব্যে লিখেছেন —
আমাদের ডান পাশে ধস
বাঁয়ে গিরিখাদ
আমাদের মাথায় বোমারু
... ... ...
আমাদের পথ নেই আর
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।
কবিতার মূল সুর — সহানুভূতি আর আন্তরিকতার বন্ধন। আজ মানুষের চলার পথে প্রতি ক্ষেত্রেই যদি সেই বন্ধন ছিন্ন হয়ে যায়, আমাদের বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন হয়ে পড়বে। আসুন, নতুন করে একটু ভাবি — আন্তরিকতার সেই সুখ-স্পর্শে মানুষকে, সমাজকে যদি একটু আনন্দদায়ক পথে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে আপনার-আমার সবারই সামগ্রিক মঙ্গল। আমাদের বেঁচে থাকাটাও নতুন করে অর্থবহ হয়ে ওঠে।
লেখক স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান ও সেতারা বেগমের পুত্র, পূর্ব বর্ধমানের টোলা গ্রামে জন্ম। বাংলা ও শিক্ষা তত্বে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড ডিগ্রিধারী এই শিক্ষাবিদ দীর্ঘদিন আন্দামানে শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতা ও অনুবাদ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশস্তিপত্রে সম্মানিত হন। CBSE-র ইংরেজি ও হিন্দি পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনুবাদের জন্যও তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত হলেও সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তাঁর অটুট সম্পর্ক রয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১৭; তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় আকাশবাণী, দূরদর্শন ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।