মহিষাসুর আমাদের পুরাণে যাঁকে দানব বলা হয়েছে, দেবী দুর্গার হাতে যাঁর মৃত্যু 'অশুভের বিনাশ' হিসেবে উদযাপিত হয়। অন্যদিকে মেটাভার্স — ২১শ শতকের প্রযুক্তির স্বপ্ন, যেখানে মানুষ প্রবেশ করবে এক নতুন ডিজিটাল জগতে। শুনলে মনে হতে পারে দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কিন্তু মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে মহিষাসুর আর মেটাভার্স আসলে একই লড়াইয়ের দুই প্রান্ত। একদিকে প্রান্তিক, বঞ্চিত মানুষের প্রতীক; অন্যদিকে প্রযুক্তি-নির্মিত পুঁজিবাদী বাস্তবতার নতুন রূপ।
পুরাণের দানব, ইতিহাসের প্রান্তিক
মহিষাসুরের গল্প আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি। তিনি অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক মহিষ — দেবতাদের অজেয় প্রতিপক্ষ। দেবী দুর্গা তাঁকে হত্যা করে প্রতিষ্ঠা করলেন শুভশক্তির জয়। কিন্তু ইতিহাসবিদদের অনেকেই বলছেন, মহিষাসুর হয়তো আসলে দানব ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রান্তিক উপজাতি বা কৃষক সমাজের নায়ক।
আর্য সমাজ যখন ক্ষমতায় এল, তারা নিজেদের দেবতাকে বানাল শুভশক্তির প্রতীক, আর ভিন্ন সংস্কৃতির নায়ককে বানাল অশুভ। ফলে মহিষাসুরের মৃত্যু হলো কেবল পৌরাণিক কাহিনিতেই নয়, বরং ইতিহাসের শ্রেণি-বিশ্লেষণেও।
মার্কস বলেছিলেন, প্রতিটি সমাজের ইতিহাস হলো শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস। মহিষাসুর সেই সংগ্রামেরই প্রাচীন প্রতীক — যিনি প্রান্তিক, excluded, শোষিত।
মেটাভার্স : প্রযুক্তির নতুন সাম্রাজ্য
আজকের দিনে আমরা শুনি — মেটাভার্সই ভবিষ্যৎ। ফেসবুক নিজের নাম বদলেছে মেটা, তারা বলছে — আগামী দিনে আমাদের কাজ, শিক্ষা, বিনোদন, সম্পর্ক — সব হবে মেটাভার্সে। মাইক্রোসফট বলছে, অফিস হবে ভার্চুয়াল স্পেসে। এনভিডিয়া বলছে, তারা তৈরি করবে 'Omniverse' — যেখানে ডিজাইন, আর্কিটেকচার, বিজ্ঞান — সব চলবে এক ভার্চুয়াল দুনিয়ায়।
এই ভবিষ্যৎ শুনতে রোমাঞ্চকর। কিন্তু প্রশ্ন হলো — কার ভবিষ্যৎ এটা? যাদের কাছে দামি ভিআর হেডসেট আছে, যাদের কাছে হাই-স্পিড ইন্টারনেট আছে, তাদের জন্য। শ্রমজীবী মানুষের জন্য নয়। ফলে মেটাভার্স এক নতুন exclusion তৈরি করবে।
মার্কসবাদী বিশ্লেষণ : শ্রম ও উদ্বৃত্ত
মার্কস দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদ টিকে থাকে উদ্বৃত্ত শোষণের ওপর। শ্রমিক যত মূল্য তৈরি করে, তার চেয়ে কম মজুরি পায়। সেই উদ্বৃত্ত চলে যায় পুঁজিপতির পকেটে।
মেটাভার্সে শোষণ হবে আরও সূক্ষ্ম। কারণ শ্রমিক কেবল কাজই করবে না, তার প্রতিটি data, প্রতিটি ক্লিক, প্রতিটি আচরণ হবে পুঁজিপতির পণ্য। আজ ফেসবুক বা গুগল আমাদের data বিক্রি করে। মেটাভার্সে এই ডেটা হবে আরও গভীর — চোখের গতি, শরীরের নড়াচড়া, কণ্ঠস্বর — সব হবে মাপা ও বিক্রি করার মতো পণ্য।
অর্থাৎ, মানুষ শুধু শ্রম নয়, নিজের শরীর ও অবচেতনকেও পুঁজির কাছে বিক্রি করবে।
Alienation : বিচ্ছিন্নতার নতুন মাত্রা
মার্কস alienation-এর কথা বলেছিলেন — শ্রমিক তার নিজের কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, নিজের সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। মেটাভার্সে এই বিচ্ছিন্নতা বাড়বে বহুগুণ।
মানুষ বসে থাকবে ঘরে, হেডসেট পরে প্রবেশ করবে অন্য এক জগতে। সেখানে সে হয়তো কাজ করছে, জমি কিনছে, গেম খেলছে। কিন্তু বাস্তবে সে বিচ্ছিন্ন প্রকৃতি থেকে, সমাজ থেকে, প্রতিবেশী থেকে।
এই বিচ্ছিন্নতা আসলে পুঁজিবাদের লাভ। কারণ বিচ্ছিন্ন মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। বাস্তবের শ্রমিক একত্রিত হয়ে সংগঠিত হতে পারে, কিন্তু মেটাভার্সের শ্রমিক ছড়িয়ে থাকবে ভার্চুয়াল দ্বীপে।
হেজিমনি : পুঁজির সংস্কৃতি
গ্রামসি বলেছিলেন, শাসকশ্রেণি কেবল জোর দিয়ে নয়, সংস্কৃতির মাধ্যমেও আধিপত্য বজায় রাখে। মেটাভার্স সেই সাংস্কৃতিক হেজিমনির নতুন রূপ।
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বলবে — মেটাভার্স মানে স্বাধীনতা। তুমি এখানে চাইলে জমি কিনতে পারো, কনসার্ট দেখতে পারো, অফিস করতে পারো। কিন্তু এর সবকিছুই পুঁজির নিয়ন্ত্রণে। তুমি জমি কিনবে ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে, পোশাক কিনবে ডিজিটাল টোকেনে, এমনকি নিজের পরিচয়ও বানাবে পুঁজিপতির সফটওয়্যারে।
অর্থাৎ, মেটাভার্স হবে নতুন বাজার — যেখানে পণ্য হলো শুধু বস্তু নয়, মানুষ নিজেই।
মহিষাসুর বনাম মেটাভার্স : প্রতীকী সংঘর্ষ
এবার প্রশ্ন — মহিষাসুর আর মেটাভার্স কোথায় মিলে গেল?
মহিষাসুর ছিলেন excluded identity। দেবসভা তাঁকে গ্রহণ করেনি। মেটাভার্সও তেমনি হবে exclusion-এর দুনিয়া। শ্রমজীবী মানুষকে সেখানে বাদ দেওয়া হবে।
মহিষাসুর ছিলেন মাটির মানুষ, কৃষিকাজ আর পশুপালনের প্রতীক। মেটাভার্স সেই বাস্তব মাটিকে মুছে দেবে, তার জায়গায় দেবে ডিজিটাল মায়া।
ফলে দেবী বনাম মহিষাসুরের লড়াই আজ যেন দাঁড়িয়েছে মানুষ বনাম মেটাভার্সের লড়াই। দেবী দুর্গা দেবসভা ও পুঁজির প্রতীক, মহিষাসুর প্রান্তিক মানুষের প্রতীক।
তথ্যের খনিতে নতুন শোষণ
আজকের পৃথিবীতে ডেটা হলো নতুন কয়লা। গুগল, মেটা, টেসলা — সবাই আমাদের প্রতিদিনের জীবনকে খনির মতো ব্যবহার করছে। আমরা বুঝতে পারি না, প্রতিটি স্ক্রল, প্রতিটি ক্লিক কীভাবে উদ্বৃত্তে পরিণত হচ্ছে।
মেটাভার্স এই শোষণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। তখন শুধু আমাদের কাজ নয়, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের অবচেতনকেও পণ্য বানানো হবে। মার্কস যে 'commodity fetishism'-এর কথা বলেছিলেন, তার সবচেয়ে চরম রূপ হবে এই মেটাভার্স।
প্রতিবাদের সম্ভাবনা
কিন্তু ইতিহাস দেখায়, শোষণ যত গভীর হয়, প্রতিরোধও তত জন্ম নেয়। মহিষাসুর পুরাণে হেরে গেছেন, কিন্তু লোকসংস্কৃতিতে তিনি আজও দেবতা। মেটাভার্সও হবে পুঁজির দুর্গ, কিন্তু তার ভেতরেই জন্ম নেবে নতুন প্রতিবাদ।
আজ ইউটিউব বা টিকটকে শ্রমিকরাই content তৈরি করছে, তারাই কমিউনিটি গড়ছে। মেটাভার্সে তারাই হয়তো গড়বে বিকল্প জগৎ — যেখানে থাকবে না পুঁজির শাসন, থাকবে সমতার রাজনীতি।
কাব্যিক উপসংহার : বাস্তবতার ডাক
মহিষাসুর বনাম মেটাভার্স — এ আসলে বাস্তব বনাম মায়ার লড়াই। একদিকে মাটির মানুষ, যার শরীরে ঘামের গন্ধ অন্য দিকে ভার্চুয়াল মানুষ, যাকে তৈরি করছে কোড আর পিক্সেল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ মাটির সন্তান। যতই মেটাভার্স ঝলমল করুক, নদীর জলে বিসর্জনের ঢেউ আমাদের মনে করিয়ে দেয় — বাস্তবতা ছাড়া মুক্তি নেই।
হয়তো কোনো দিন মেটাভার্সের ভেতরে ভেসে উঠবে মহিষাসুরের ছায়া। তিনি বলবেন — "ভুলে যেও না, মানুষের জগৎ শ্রমের, রক্তের, বাস্তবতার।"
আর সেই ডাকেই আবার জন্ম নেবে নতুন প্রতিরোধ।
মহিষাসুর বনাম মেটাভার্স-এর লড়াই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় গণবিষণের অনুবাদে পিট সিগারের সেই কালজয়ী গান —
আজ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে দুটো দল,
আর মাঝামাঝি নেই তো কিছুই,
হয় পা-চাটা দালাল, আর নয়তো
এক লড়াকু মজুর হবি তুই;
বল কোন দিক, সাথী, কোন দিক বল —
কোন দিক বেছে নিবি তুই?