কলকাতার ভবানীপুর। বেশ সম্ভ্রান্ত জায়গা। অবধূত এখানে ছিলেন কয়েক বছর। তাঁর বাবা অনাথনাথ মুখোপাধ্যায় অবিভক্ত বাংলাদেশের বরিশাল থেকে কলকাতা আসেন প্রথম মহাযুদ্ধের আগে। চাকরিসূত্রে ছিলেন রেলি ব্রাদার্সের বড়বাবু। বিয়ে হয় কলকাতার বাগবাজারের প্রভাবতী দেবীর সঙ্গে। তখন তাঁদের বাস হাতিবাগানে।
হাতিবাগানেই ১৯১০ সালের ২রা নভেম্বর, কালীপুজোর পরের দিন জন্ম নেন দুলাল। তাঁরা ছিলেন ছয় বোন ও দুই ভাই। পরে বাসা পরিবর্তন করে ভবানীপুরে চলে আসেন। ছোট ভাই মৃণালকান্তি ছিল শান্ত প্রকৃতির, আর দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ডানপিটে, একরোখা ছেলে। ভয় বলে কোনো কিছু তাকে কোনো কাজে আটকাতে পারত না। মানুষের উপকার করা ছিল তার নেশা। প্রকৃতির সন্তান দুলাল — মাঠে, ঘাটে, নদীতে কেটে যেত তার বেলা। খাওয়ার কথা মাথায় থাকত না। বাবা-মা নিষেধ করলেও সে কথায় কর্ণপাত করত না।
প্রথম মহাযুদ্ধ চলছে তখন। দুলালের বাবা অনাথনাথ বাবু বরিশালের স্মৃতি বুকে নিয়ে চলে এলেন এপার বাংলায়।
বিপ্লব ও বিদ্রোহ
দুলালের শিক্ষাজীবন বেশিদূর এগোয়নি। কলেজজীবন শেষ করে ১৯৩০ সালে কলকাতা পোর্ট কমিশনের অফিসে স্টোরকিপার হন দুলাল মুখোপাধ্যায়। হুগলির রিষড়ার সুখময়ী বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিয়ে হয়। একমাত্র সন্তান অমলের জন্মের ছয় মাস পরই সূতিকাজনিত জ্বরে আক্রান্ত হন সুখময়ী। আরও ছয় মাস রোগভোগের পর মৃত্যুবরণ করেন তিনি। স্ত্রীর মৃত্যু দুলালকে ভীষণভাবে আঘাত দেয়।
ব্রিটিশদের প্রিয়পাত্র ছিলেন দুলাল। তিনি অভিনয় করতেন তাঁদের সঙ্গে। বলতেন, "বিপ্লবীদের ডেরার সন্ধান পেলে আমি আপনাদের জানাবো।" ওরা হাসত — "এটাই তো হামাদের চাই! কাজ করো আর বিপ্লবীদের খুঁজে বের করো।"
কিন্তু দুলাল ছিলেন দ্বিমুখী মানুষ — বাইরে ব্রিটিশদের বিশ্বস্ত, ভিতরে বিপ্লবীদের সহচর। পোর্ট কমিশনে কর্মরত অবস্থায় রেবতীমোহন মুখোপাধ্যায়ের নাম ব্যবহার করে পিস্তল খালাস করে বিপ্লবীদের হাতে তুলে দিতেন। ঘটনা জানাজানি হতেই ছেলেকে ফেলে পালালেন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরে বন্ধু বৃন্দাবনচন্দ্র দাসের কাছে। কারণ ধরা পড়লে পুরো সংসার বিপদে পড়বে।
সেখানেও একদিন পিছু ধাওয়া করে ব্রিটিশ পুলিশ। কিন্তু দুলালকে ধরা পুলিশের ক্ষমতার বাইরে ছিল। পুলিশের তাড়ায় তিনি বর্ষার উত্তাল পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দেন — নিশ্চিত মৃত্যুকে উপেক্ষা করেই। পাড়ে দাঁড়িয়ে গুলি ছোঁড়ে পুলিশবাহিনী, কিন্তু দুলালের কোনো খোঁজ মেলে না। আশ্রয়দাতা বৃন্দাবনচন্দ্র ঘোষণা করেন, “দুলাল মারা গেছে।” সকলে বিশ্বাস করে নেয়—বর্ষার দুরন্ত পদ্মায় ঝাঁপ দিয়ে বাঁচা কি সম্ভব? প্রচার ছড়িয়ে পড়ে, দুলাল আর নেই।
শ্মশান, সাপ, আর সাধনা
কোচবিহার জেলার দোলন নদীর পাড়ে স্যাঁতস্যাঁতে জলা, ঝোপজঙ্গলের ভেতর শঙ্খিনী সাপ — হিলহিলে, ক্ষিপ্র, চতুর। শিবাদাদু এই সর্পমালিকাটি নিয়ে আসেন পূর্ববঙ্গ থেকে। তাঁর কাছে ছিল নরাস্থির মালা — মানুষের হাড়ের মালা, পাঁচটি মানুষের খুলি বা নরমুণ্ড। সঙ্গে ছিল কামরূপ-কামাখ্যা থেকে অম্বুবাচির সময় আনা কাপড়ের টুকরো।
শিবাদাদু বাহিনের কথা বলেছেন বহুবার — সেই অতিকায় বৃক্ষ, যার ডালে-পাতায় সাপের সারি। তাঁর বর্ণনায় শ্মশান যেন জীবন্ত রহস্য। তারাপীঠেও তখন প্রচুর সাপ। ষাটের দশকে দ্বারকা নদীর উপর ব্রিজ হয়নি। তারাপীঠ মানে বামদেব, নগেন কাকা, আর বিশাল দাহভূমি। শ্মশানে ছড়ানো নানা কুহক ও রহস্য।
আশির দশকে সেখানে দেখা যেত বাকসিদ্ধ শঙ্করবাবাকে — গালে দাড়ি, মাঝারি উচ্চতা, বেশিরভাগ সময় মৌন। মাঝেমধ্যে নদীতে নেমে যেতেন, আবার ছুটে আসতেন। কলকাতা থেকে আসা বাঙালি ও মারওয়ারিরা তাঁর কাছে সাট্টা বা হাঁড়ি খেলার 'লাকি নম্বর' জেনে নিত। শঙ্করবাবা একটিমাত্র নম্বর বললেই নাকি জয়জয়কার — পাত্তি সে পাত্তি, ফিগার সে ফিগার — মিলে গেলে টাকা যেন আকাশ থেকে ঝরে পড়ে!
অবধূতের উদ্ধারণপুর ও তার পরের যাত্রা
অবধূত বলতেন, "উদ্ধারণপুরের শ্মশানের উত্তর দিকের সীমায় একটি উঁচু ঢিবি। ঢিবির পিছনেই আকন্দগাছের জঙ্গল। সেই ঢিবির উপরেই ছিল আমার গদি। তোশকের উপর তোশক, তার ওপর আরও তোশক, তার ওপর অগুনতি কাঁথা, লেপ, কম্বল — চাপাতে চাপাতে আমার সুখাসন মাটি থেকে দু’হাত ওপরে উঠেছিল।"
শ্মশানে মৃতের জন্য আনা লেপ-কম্বলই তাঁর ভোগ্য ছিল। মৃতদেহের উপর বসে সাধনা করেছেন বহুবার। মদ দিয়েই চলত তাঁর যজ্ঞ। নিজেও বেশির ভাগ সময় থাকতেন মদে ও গাঁজায় চুর। প্রসাদ চড়ানোর লোকেরও অভাব ছিল না।
সেখানকার বাতাসে মাংস আর পোড়া স্মৃতির গন্ধ ছাড়া কিছুই মেলে না। চোখের সামনে মানুষ ও মনুষ্যত্ব পুড়ছে — বিশ্বসংসারের এক আজব রঙ্গমঞ্চ যেন রাঢ় বাংলার এই মহাশ্মশান। তবে উদ্ধারণপুরও তাঁকে আটকাতে পারেনি। আবারও অনিশ্চিত পথে বেরিয়ে পড়েন তিনি।
বলা হয়, পরে তিনি মায়ানমার যান, তারপর মরুতীর্থ হিংলাজ।
হিংলাজের পথে
তিনি বলেছেন, "মরুতীর্থ হিংলাজ হিন্দুদের এক পবিত্র তীর্থস্থান। এটি ৫১ শক্তিপীঠের একটি। এই তীর্থযাত্রায় একটি দল ভয়ঙ্কর কষ্ট সহ্য করে তীর্থের পথে চলে — সব পাপ ধুয়ে ফেলার আশায়।"
যাত্রাপথে তারা ডাকাতের কবলে পড়া এক দম্পতিকে উদ্ধার করে — কুন্তী ও থিরুমল। কুন্তী ছিলেন তীর্থযাত্রী এক যুবতী, যিনি থিরুমলের প্রেমে পড়েন। থিরুমলও ছিলেন সেই একই যাত্রার এক তরুণ। পদ্মার চিত্তাকর্ষক সংলাপে হৃদয় ব্যথিত হয়।
উপসংহার
উদ্ভট ভয়, রহস্যময় ক্রিয়া ও সীমাহীন অভিজ্ঞতার এই সাধক তথা মহান লেখক — তাঁকে আমাদের সময়ের এক নমস্য ব্যক্তি বলতেই হয়।
লেখক কাটোয়া শহরের বাসিন্দা — কবিতা,গল্প, উপন্যাস লিখতে ভালোবাসেন। ছোটবেলায় স্কুলে পড়তে গল্প দিয়ে লেখা শুরু — বর্তমানে আরও আনন্দ, সানন্দা ব্লগ কবি সম্মেলন, কবিতাপাক্ষিক, আরম্ভ, ধুলামন্দির, অক্ষর ওয়েব, দৈনিক বজ্রকন্ঠ, দৈনিক সংবাদ, তথ্যকেন্দ্র, যুগশঙ্খ, আবহমান, অপরজন, কৃত্তিবাসী ওয়েব, ম্যাজিক ল্যাম্প, জয়ঢাক, অংশুমালী, প্রভাতফেরী, দৈনিক গতি প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে অন্তরে আলো জ্বলে, শিশিরের ছৌ (কবিতা সংকলন), তিন-এ নেত্র সহ আরও অনেকগুলি বই প্রকাশিত হয়েছে।