সমাজ মানেই সম্পর্কের জাল। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা নানান বলয়ের ভেতর আবদ্ধ থাকি — পরিবার, আত্মীয়তা, প্রতিবেশ, বন্ধুত্ব, পেশাগত নেটওয়ার্ক। দীর্ঘকাল ধরে এই কাঠামোগুলো ছিল স্থায়ী ও নিরাপত্তাদায়ক। তবে এই সম্পর্কগুলোর ভেতরে নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খল ও বাধ্যবাধকতা কম ছিল না। পরিবারকে 'আশ্রয়' বলা হলেও বাস্তবে সেটি প্রায়শই ছিল পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র। বিয়ে মানে কেবল আবেগ নয়, সামাজিক অনুমোদন এবং অর্থনৈতিক লেনদেনও।
কিন্তু একবিংশ শতকে এসে দৃশ্যপট বদলাচ্ছে। নারী স্বাধীনতা, প্রযুক্তিগত সংযোগ এবং বিশ্বায়নের ফলে সম্পর্কগুলো আর একরৈখিক নয়। একক পরিবার, সহবাস, সমকামী দম্পতি, বা একক পিতৃত্ব/মাতৃত্ব — সবই সমাজের ভেতরে বৈধতা পাচ্ছে। এক অর্থে, আমরা সম্পর্কের গণতন্ত্রায়নের যুগে প্রবেশ করছি।
ভাঙনের ভেতরেই নতুন নির্মাণ
প্রচলিত সমাজে ভাঙন মানেই সংকট। কিন্তু ভাঙন আসলে নতুন নির্মাণের সম্ভাবনাও তৈরি করে। সামাজিক মাধ্যমের আগমন তারই এক উদাহরণ। কেউ বলে, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের বন্ধুত্ব ক্ষণস্থায়ী; আবার কেউ বলে, এখানেই সবচেয়ে বেশি সহমর্মিতা মেলে। দূরত্ব ভাঙতে গিয়ে প্রযুক্তি এক নতুন সম্পর্কের ভাষা সৃষ্টি করেছে।
শহরের ব্যস্ত মানুষ হয়তো প্রতিবেশীর খবর রাখে না, কিন্তু অনলাইনে অচেনা কারও সঙ্গে গভীর আবেগ ভাগ করে নেয়। সম্পর্ক তাই আর ভৌগোলিক নয়, অভিজ্ঞতা ও মানসিকতার সাযুজ্যের উপর নির্ভরশীল।
সমাজের দ্বৈত রূপ: সংযোগ ও বিভাজন
বর্তমান সমাজ এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে দাঁড়িয়ে। একদিকে পৃথিবী অভূতপূর্বভাবে 'সংযুক্ত' — মুহূর্তে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কথা বলা যায়। অন্যদিকে সম্পর্কগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি অগভীর। আমরা প্রতিদিন বহু মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি, কিন্তু অন্তরের গভীর সংযোগ খুঁজে পাই কম।
এদিকে সমাজে বিভাজনও বাড়ছে। ধর্ম, জাতি, ভাষা, রাজনীতি — সবকিছুকে ঘিরে হিংসা, বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ প্রবল। একদিকে গ্লোবালাইজেশন, অন্যদিকে লোকাল বিভাজন — এই পরস্পরবিরোধী বাস্তবতা আমাদের সম্পর্কের জগৎকে চাপে ফেলছে।
সম্পর্ক: আবেগ না লেনদেন?
সম্পর্ককে আমরা প্রায়শই আবেগ, ভালোবাসা, আত্মত্যাগের রঙে দেখি। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আজকের দিনে সম্পর্কগুলো অর্থনীতি ও ক্ষমতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিয়ে অনেক সময় আর্থিক জোট, বন্ধুত্বও নেটওয়ার্কিং-এর হাতিয়ার। পরিবারিক সম্পর্কেও স্বার্থ-হিসেব প্রায়শই আবেগকে ছাপিয়ে যায়।
এই সত্যটিকে আড়াল করলে সমস্যা মেটে না। বরং সাহসের সঙ্গে স্বীকার করে নিতে হবে যে সম্পর্ক এখন বহুমাত্রিক — কখনও ভালোবাসার, কখনও রাজনীতির, কখনও অর্থনৈতিক জোটের। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই বহুমাত্রিকতাকে নৈতিকতার নতুন কাঠামো দিতে পারব?
অবহেলিত সম্পর্কহীনরা
সমাজ যখন সম্পর্কের গুণগান করে, তখনই অনেক মানুষ তার বাইরে থেকে যায়। একাকী বৃদ্ধ, অনাথ শিশু, যৌনকর্মী, প্রবাসী শ্রমিক কিংবা LGBTQ সম্প্রদায় — তাদের সম্পর্কের লড়াইকে সমাজ প্রায়শই অগ্রাহ্য করে। অথচ সমাজের শক্তি তখনই বাড়ে, যখন সম্পর্ক কেবল 'আমাদের' সীমারেখায় আটকে থাকে না, বরং 'তাদের' প্রতিও প্রসারিত হয়। এই দিকেই আমাদের মনোযোগী হতে হবে। সম্পর্কহীনদের আলোয় আনা মানেই সমাজকে আরও মানবিক করে তোলা।
সম্পর্কের রাজনীতি ও প্রতিরোধ
সম্পর্ক আর নিছক ব্যক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিকও। একজন নারী যখন একা সন্তান মানুষ করেন, তিনি আসলে প্রচলিত নিয়মকে ভাঙছেন। তরুণরা যখন বন্ধুত্বকে রক্তের সম্পর্কের ওপরে স্থান দেয়, তখন তারা সামাজিক কাঠামোর সীমা অতিক্রম করছে। LGBTQ দম্পতির সম্পর্ক স্বীকৃতি পেলে সেটি কেবল আবেগ নয়, সমতার সংগ্রামের অগ্রযাত্রা। এই প্রতিরোধগুলো সমাজে আলোড়ন তোলে। নতুন সম্পর্ক মানে নতুন আলোচনার সূত্রপাত।
ভবিষ্যতের প্রশ্ন
আজকের পৃথিবী ভুগছে যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট, রাজনৈতিক হিংসা ও বৈষম্যে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে প্রায়শই ভয় ও একাকীত্ব তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে মানবিক সম্পর্কই একমাত্র আশ্রয় হতে পারে। কিন্তু যদি সেই সম্পর্কও কেবল লেনদেন বা ক্ষমতার কৌশল হয়ে দাঁড়ায়, তবে সমাজ টিকবে না। ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ তাই — আমরা কি সম্পর্ককে নতুনভাবে কল্পনা করতে পারব? আমরা কি পারব সম্পর্ককে গড়ে তুলতে সহানুভূতি, বিশ্বাস ও দায়িত্বের ভিত্তিতে?
উপসংহার: ভাঙা আয়নার টুকরো থেকে নতুন ছবি
সমাজ ও সম্পর্ককে বোঝার জন্য আমাদের আর পুরনো সংজ্ঞা যথেষ্ট নয়। এখন দরকার এক নতুন কল্পনা —
🔹 পরিবার মানে শুধু রক্তের বাঁধন নয়, নির্বাচিত আত্মীয়তা।
🔹 ভালোবাসা মানে কেবল আবেগ নয়, টিকে থাকার নৈতিকতা।
🔹 সম্পর্ক মানে কেবল ব্যক্তিগত সুখ নয়, বরং সমষ্টিগত দায়িত্ব।
লেখকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা বর্ধমান শহরে। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর ঝোঁক। শব্দকে তিনি কেবল প্রকাশের বাহন নয়, মনে করেন আশ্রয় — ভেতরের আলো ও অন্ধকারকে নীরবে প্রকাশ করার এক মাধ্যম। পদার্থবিদ্যায় অধ্যয়ন ও এমবিএ (সিস্টেমস) সম্পন্ন করার পর গবেষণার মাধ্যমে ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত থেকে নীতি নির্ধারণ, উন্নয়ন প্রকল্প, তথ্যের অধিকার আইন ও উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন সংক্রান্ত কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের বরিষ্ঠ উন্নয়ন আধিকারিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়-অধীন মহাবিদ্যালয়সমূহের ভারপ্রাপ্ত পরিদর্শক। এই বহুমাত্রিক প্রশাসনিক পরিচয়ের আড়ালে তিনি এক নীরব শব্দসংগ্রাহক — যিনি কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধে মানুষের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতার স্থাপত্য খুঁজে ফেরেন।