ভারতে মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের শরীরে দুই বিখ্যাত যোদ্ধার রক্ত প্রবাহিত ছিল। পিতার দিক থেকে তিনি তাইমুর লঙের অধস্তন পঞ্চম পুরুষ এবং মাতার দিক থেকে ছিলেন চেঙ্গিস খানের অধস্তন চতুর্দশ পুরুষ। বাবরের পিতা ওমর শেইখ মির্জা ছিলেন মধ্য এশিয়ার ক্ষুদ্র রাজ্য ফারঘানার শাসক।
ফারঘানা বর্তমানে উজবেকিস্তানে অবস্থিত, এবং আজকের আন্দিজান শহরেই (বর্তমান উজবেকিস্তান) ১৪৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাবরের জন্ম হয়েছিল। সেখানে এখনো তাঁর নামে বাবর মেমোরিয়াল পার্ক ও হাউস মিউজিয়াম রয়েছে, শহরের একটি প্রধান সড়কের নামও "বাবর রোড" — যা স্থানীয়রা আজও গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন।
মুঘলদের উত্তরসূরীরা কোথায় হারিয়ে গেলো?
মুঘল সম্রাজ্যের শেষ বাদশা ছিলেন বাহাদুর শাহ জাফর। আমরা সকলেই জানি সিপাহী বিদ্রোহের পরে তাকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো বাহাদুর শাহর বংশের উত্তরসূরীরা কালের গহ্বরে কোথায় হারিয়ে গেলো?
সেই সময়ে একজন শাহেনশাহর প্রচুর ছেলেমেয়ে থাকতো, বাহাদুর শাহও-এর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সিপাহী বিদ্রোহের পর তার বেশির ভাগ পুত্রকেই নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। ইতিহাস অনুযায়ী, ব্রিটিশ অফিসার উইলিয়াম হডসন দিল্লির খুনি দরওজার কাছে তাঁর তিন পুত্র — মির্জা মুঘল, মির্জা খিজর সুলতান ও মির্জা আবু বকর-কে গুলি করে হত্যা করেন। সেই ভয়াবহ ঘটনার পর থেকেই দরওজাটির নাম হয় "খুনি দরওজা"।
কেউ কেউ আবার পালিয়ে বাঁচে। যারা পালিয়েছিলো তাদের হদিশ আর কেউ দিতে পারে নি। বাদশার সবচেয়ে প্রিয় পুত্র ছিলেন মির্জা জওয়ান ভকত। তিনি ছিলেন বাদশার অন্যতম প্রিয় বেগম জিনাত মহলের পুত্র। মুঘল সম্রাজ্যের পতন না হলে এই জওয়ান ভকতই হতো পরবর্তী বাদশাহ।
ব্রিটিশরা দয়া দেখিয়ে বাদশার দুই পুত্রকে সে বারের মতো প্রাণে বাঁচিয়ে দেন — একজন হলেন এই মির্জা জওয়ান ভকত, অন্যজন শাহ আব্বাস। এদের সবাইকে একসাথে বাহাদুর শাহের সাথে রেঙ্গুনে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
রেঙ্গুনের নির্বাসিত রাজপরিবার
মির্জা জওয়ান ভকতের আগেই নিকাহ হয়ে গিয়েছিল, তার পুত্রের নাম ছিল জামশেদ ভকত। রেঙ্গুনে পৌঁছে তিনি মদ ও আফিমে আসক্ত হয়ে পড়েন। সরকারি ভাতার পুরোটাই যেত নেশার ঠেকে, ফলস্বরূপ ১৮৮৪ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা যান তিনি।
ওদিকে শাহ আব্বাস তাঁর বংশপরিচয়ের তোয়াক্কা না করে রেঙ্গুনে এক মুসলমান মৎস্য ব্যাবসায়ীর কন্যাকে বিয়ে করে মাছের কারবারে লেগে পড়েন। এই পরিবারের একটা অংশ আজও ইয়াঙ্গুনে (রেঙ্গুন) বসবাস করে।
বাহাদুর শাহের বেগম জিনাত মহলও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রেঙ্গুনে নির্বাসনে ছিলেন। বর্তমানে তাঁর নামও বাহাদুর শাহের সমাধি প্রাঙ্গণে স্মৃতিফলকে সংযোজিত আছে।
বাহাদুর শাহ জাফর নিজে ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর রেঙ্গুনে মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন তাঁর সমাধির স্থান অজানা ছিল, অবশেষে ১৯৯১ সালে সেটি আবিষ্কৃত হয় এবং ১৯৯৪ সালে সেখানে দারগাহ নির্মিত হয়। বর্তমানে এটি ইয়াঙ্গুনের Zi Wa Ka Road, Dagon Township–এ অবস্থিত এবং বহু ভারতীয় ও বাংলাদেশি পর্যটকের দর্শনীয় স্থান।
কলকাতায় মুঘল বংশের উত্তরাধিকার
বেশ কিছু বছর আগে বর্তমান পত্রিকায় একটা সংবাদ বের হয়েছিল — সেটা অনুযায়ী এই জামশেদ ভকতের একজন বংশধর পরবর্তীকালে কলকাতায় চলে আসেন। তার বর্তমান প্রজন্মের একজন হলেন সুলতানা বেগম।
তিনি ঐসময় কলকাতা হাইকোর্টে মুঘলদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তির উপর তার দাবি জানিয়ে মামলা করেন। দাবি ছিল — ভারত সরকার মুঘল স্থাপত্য (যেমন তাজমহল ও লালকেল্লা) থেকে যা আয় করছে, তার কিছু অংশ যেন তাঁকে দেওয়া হয়। আদালত সে দাবি খারিজ করে, তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁদের পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি ও মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করে।
এই মামলাটি পরবর্তীতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও ওঠে (২০২১–২০২৫), এবং আদালত সেই দাবিকে "ভ্রান্ত" (misconceived) বলে খারিজ করে দেয়। বর্তমানে সুলতানা বেগম হাওড়ার একটি বস্তিতে বসবাস করেন।
শেষ সম্রাটের শেষ সুর
বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন শিল্পকলার এক মহান পৃষ্ঠপোষক। তাঁর দরবারে মির্জা গালিবের মতো কবিদের যথাযোগ্য সম্মান ছিল। তিনি নিজেও ছিলেন একজন দক্ষ উর্দু কবি, 'জাফর' ছদ্মনামে লিখতেন। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর নিজের কষ্ট ও বেদনা তিনি কবিতায় বারবার ফুটিয়ে তুলেছেন। আজ তাঁর বংশধরদের করুণ অবস্থার কথা ভাবলে উর্দু কবি মুজতার খায়রাবাদীর সেই অমর পঙ্ক্তিগুলো মনে পড়ে — যা ১৯৬০ সালের লাল কিলা ছবিতে বাহাদুর শাহ জাফরের চরিত্রের জন্য গেয়েছিলেন মোহাম্মদ রফি। যেন ইতিহাসের বুক থেকে আজও ভেসে আসে সেই সুর —
ন কিসী কি আঁখ কা নূর হুঁ ন কিসে কে দিল কা করার হুঁ
জো চমন খিজাঁ সে উজড় গয়া মৈ উসী ফস্ল-এ-বহার হুঁ