আমরা যদি আমাদের চারপাশকে ভালো করে লক্ষ্য করি তাহলে দেখব, আমাদের চারপাশের মানুষজন কতই না আনন্দে রয়েছে। কিন্তু আমি? তখন আমাদের কেন এমন মনে হয় যে আমরাই সব থেকে দুঃখী? কারণ আমরা কেউই আমাদের বর্তমান অবস্থায় সুখী নই — তা হওয়ারও নয়।
আমরা সকলেই আমাদের এক স্বপ্নময় ভবিষ্যৎকে কল্পনা করি, যার সঙ্গে বাস্তবের মিল খুবই অল্প। আমরা আমাদের materialistic "আমি"র মাঝে এতটাই আটকা পড়েছি যে, শুধুই সেই আমিকেই নিয়ে ব্যস্ত। তাই যখন অন্যের সামান্যতম উন্নতি দেখি, তখন মনে হয়, আমার ভাগ্যই খারাপ বোধ হয়। বাকি সবাই তো বিন্দাস! আর মনের সেই চিনচিনে অনুভূতি, যা আমাদের আরও স্বার্থপর করে তোলে, তখন যে…
বর্তমান সমাজ আমাদের কী শেখাচ্ছে?
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সমাজ আমাদের কী শেখাচ্ছে? যদি চারিপাশ ভালো করে লক্ষ্য করি, তাহলে বৃহত্তর ক্ষেত্রে যে বদল এসেছে, তা সহজেই ধরা পড়বে। সমাজ আজ আমাদের আরও, আরও বেশি করে স্বার্থান্বেষী হতে শেখাচ্ছে — কারণ সমাজ তার দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মধ্য দিয়েই চালনা করে।
আমরা যদি সমাজের ছোট ছোট ধারণাগুলোকে একটু পর্যালোচনা করি, তাহলে বুঝব তার দৃষ্টিভঙ্গি কতটা নিচে নেমেছে। আমরা জানি, মানুষের উন্নতির জন্য এক কঠিন শ্রমসাধ্য পথ রয়েছে, যা তাকে অতিক্রম করতেই হবে উন্নতির শিখরে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু আজ সমাজ শেখাচ্ছে, ওসব করে লাভ নেই — কিভাবে তুমি বিনা পরিশ্রমে স্বার্থসিদ্ধি করবে, সেই পথটাই খোঁজো।
সমাজ আরও শেখাচ্ছে — সম্পর্ককে গুরুত্ব দিও না, শুধু 'give and take' থাকুক। কেউ যতক্ষণ দিতে পারছে, ততক্ষণই সম্পর্ক, আর যখন পারছে না, তখনই সে ব্রাত্য। চারিপাশের হুকআপ কালচারই তার প্রমাণ।
চিন্তাশীলতা হারাচ্ছে মানুষ
আমরা বর্তমানে মাইন্ডলেস হয়ে পড়ছি। চিন্তাশীলতা ক্রমে কমে যাচ্ছে। কারণ চারিপাশের বিশৃঙ্খলা আমাদেরকে এক শৃঙ্খলার জালে বেঁধে ফেলেছে, আর আমরাও তাতে ডুবে থাকতে শিখে গেছি।
এই যেমন — 'Use and Throw' ধারণা। সমাজ এখন শেখাচ্ছে, যেকোনো জিনিসকে প্রয়োজনে ব্যবহার করো, আর প্রয়োজন ফুরোলেই লাথি মেরে ফেলে দাও। ফলে আমরা আরও সেলফ-সেন্টারড হয়ে উঠছি। অথচ আগে সমাজ শিখিয়েছিল — যত্নে লালন-পালন করো, তবেই জীবনের মূল্য বোঝা যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফাউন্টেন পেনের প্রতি ভালোবাসা — এখনকার ইউজ অ্যান্ড থ্রো পেনের প্রতি কি সেই ভালোবাসা আছে?
উত্তরটা সকলেরই জানা। ভালোবাসাকে আগলে রাখতে যে বোধের প্রয়োজন, তা বুদ্ধি দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না। মূল্যবোধ ক্ষয় হচ্ছে, আর তা হবেই — এটাই জীবনের রীতি। পৃথিবীও ঘুরছে তার বাঁধাধরা পথে, ভালো-মন্দের সমন্বয়ে।
নিজেকে কীভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণ করব?
এই অবক্ষয়ের মাঝে নিজেকে আত্মনিয়ন্ত্রণে রাখার পথ একটাই — নিজের লক্ষ ঠিক রেখে এগিয়ে চলা। নিজের অন্তর্নিহিত সত্তাকে বুঝতে শেখা। সে কী বলতে চাইছে, কী করতে চাইছে — তা শোনা দরকার।
নিজের প্রতি যত্নশীল হও, নিজের সঙ্গে নিজের যে সম্পর্ক — সেটিকে গুরুত্ব দাও। কিভাবে? মেডিটেশনের মাধ্যমে, নিজের অনুভূতিগুলোকে লেখার মাধ্যমে, নিজের অন্তরের কণ্ঠকে শোনার মাধ্যমে। সর্বোপরি — জীবনকে উদযাপনের মাধ্যমে। জীবন ও প্রকৃতির রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ, স্বাদকে আস্বাদনের মাধ্যমে।
আচার্য শংকরাচার্যের শিক্ষা — 'নির্বাণ ষটকম'
এই প্রসঙ্গে আচার্য শংকরাচার্যের এক ঘটনা মনে পড়ে। তাঁকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল — তিনি কে?
উত্তরে তিনি যে শ্লোক বলেছিলেন, তার নাম 'নির্বাণ ষটকম'। এই শ্লোক আমাদের আসল পরিচয় ব্যাখ্যা করে —
ও মনোবুদ্ধ্যহংকারচিত্তানি নাহং ন চ শ্রোত্রজিহ্বে ন চ ঘ্রাণনেত্রে।
ন চ ব্যোম ভূমির্ন তেজো ন বায়ুঃ চিদানন্দরূপঃ শিবোহং শিবোহম্।।
আমি মন, বুদ্ধি, অহংকার বা চিত্ত নই।
আমি কান, জিহ্বা, ঘ্রাণ বা চোখ নই।
আমি আকাশ, ভূমি, তেজ বা বায়ু নই।
আমি কেবল চিদানন্দরূপী, আমিই শিব।
ন চ প্রাণসংজ্ঞো ন বৈ পঞ্চবায়ুর্ন বা সপ্তধাতুর্ন বা পঞ্চকোষাঃ।
না বাষ্পাণিপাদং ন চোপস্থপায়ুঃ চিদানন্দরূপঃ শিবোহং শিবোহম্।।
আমি প্রাণ বা পঞ্চবায়ু নই। আমি সপ্তধাতু নই।
আমি পঞ্চকোষও নই। আমি হাত, পা বা গোপনাঙ্গও নই।
আমি কেবল চিদানন্দরূপী, আমিই শিব।
নমে দ্বেষরাগৌ ন মে লাভমোহৌ মদো নৈব মে নৈব মাৎসর্যভাবঃ।
ন ধর্মো ন চার্থো ন কামো ন মোক্ষশ্চিদানন্দরূপঃ শিবোহং শিবোহম্।।
আমার মধ্যে দ্বেষ বা রাগ নেই, লাভ বা মোহ নেই, গর্ব বা ঈর্ষা নেই।
আমার ধর্ম, অর্থ, কাম বা মোক্ষ নেই।
আমি কেবল চিদানন্দরূপী, আমিই শিব।
ন পুণ্যং ন পাপং ন সৌখ্যং ন দুঃখং ন মন্ত্রো ন তীর্থং ন বেদা ন যজ্ঞাঃ।
অহং ভোজনং নৈব ভোজ্যং ন ভোক্তা চিদানন্দরূপং শিবোহং শিবোহম্।।
আমার পুণ্য বা পাপ নেই, সুখ বা দুঃখ নেই।
আমার কোনো মন্ত্র, তীর্থ, বেদ বা যজ্ঞ নেই।
আমি ভোজন করি না, আমি ভোজ্য নই, আমি ভোক্তাও নই।
আমি কেবল চিদানন্দরূপী, আমিই শিব।
ন মৃত্যুর্ন শঙ্কা ন মে জাতিভেদঃ পিতা নৈব মে নৈব মাতা ন জন্ম।
ন বন্ধুর্ন মিত্রং গুরুর্নৈব শিষ্যঃ চিদানন্দরূপঃ শিবোহং শিবোহম্।।
আমার মৃত্যু নেই, কোনো ভয় নেই, জাতিভেদ নেই, পিতা-মাতা নেই, জন্মও নেই।
আমার বন্ধু, মিত্র, গুরু বা শিষ্য নেই।
আমি কেবল চিদানন্দরূপী, আমিই শিব।
অহং নির্বিকল্পো নিরাকাররূপো বিভূত্বা সর্বত্র সর্বেন্দ্রিয়াণাম্।
ন চাসঙ্গতং নৈব মুক্তির্নমেয়শ্চিদানন্দরূপং শিবোহং শিবোহম্।।
আমি নিরাকার, কল্পনাহীন এবং সর্বব্যাপী।
আমি সমস্ত ইন্দ্রিয়ের সর্বত্র বিদ্যমান।
আমি কোনো কিছুর সাথে সংযুক্ত নই, মুক্তি বা পরিমাপের ঊর্ধ্বে।
আমি কেবল চিদানন্দরূপী, আমিই শিব।
জীবনের শিক্ষা ও প্রতিযোগিতার বাস্তবতা
জীবনের শিক্ষা আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা কখনও দেয় না। ছোট থেকে বড় হওয়ার পথে বিদ্যালয় থেকে মহাবিদ্যালয় — কোথাও শেখানো হয় না, এই জীবনকে কীভাবে যাপন করতে হয়, বা সমস্যা সম্মুখীন হলে তাকে কীভাবে সমাধান করতে হয়।
তার বদলে যা শেখানো হয়, তা একটাই — "কম্পিটিশন, কম্পিটিশন, এন্ড কম্পিটিশন!" ভালোবাসা থাকলেও চলবে না; সবাই যেন এক যান্ত্রিক রোবট হয়ে উঠছে। এই প্রতিযোগিতার দুনিয়ায় জন্ম নিচ্ছে ঈর্ষা, লোভ, ক্রোধ, কাম, মোহ ও অহং।
চিত্তপ্রসাদনম্ — মানসিক শান্তির চার পথ
ঋষি পতঞ্জলির 'যোগসূত্র' (১.৩৩) অনুযায়ী —
"মৈত্রী করুণা মুদিতোপেক্ষণাম্ সুখদুঃখপুণ্যাপুণ্য বিষয়ানাম্ ভাবনা চিত্তপ্রসাদনম্।"
অর্থাৎ — সুখী, দুঃখী, পুণ্যবান ও অপরাধী — জীবনের এই চার ধরনের মানুষকে আমরা যেভাবে দেখি, সেভাবেই নির্ধারিত হয় আমাদের মানসিক শান্তি।
▪ মৈত্রী (Maitri) — সুখীদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব
▪ করুণা (Karuna) — দুঃখীদের প্রতি সহমর্মিতা
▪ মুদিতা (Mudita) — পুণ্যবানদের দেখে আন্তরিক আনন্দ
▪ উপেক্ষা (Upeksha) — অন্যায়কারীদের প্রতি নির্লিপ্ততা
অর্থাৎ, সুখীকে দেখে যদি হিংসা হয়, দুঃখীকে দেখে উদাসীনতা, পুণ্যবানকে দেখে বিরক্তি, আর পাপীকে দেখে ঘৃণা — তবে আমাদের মনের শান্তি কখনোই আসবে না। বরং এই চারটি মনোভাব চর্চা করলেই মন হবে নির্মল ও প্রশান্ত — এটাই সত্যিকারের চিত্তপ্রসাদনম্।
ভারতীয় ঐতিহ্যময় সংস্কৃতির এই শিক্ষাই আমাদের শেখায় — জীবনের রূপ, রস, গন্ধ ও আলোককে উপলব্ধি করাই প্রকৃত শান্তির পথ।
লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতক। পরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর এবং ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টে স্পেশালাইজেশন করে বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন। মানব মনোবিজ্ঞানে খুব আগ্রহী। ভালোবাসেন বই পড়তে ও সিনেমা দেখতে। এছাড়া যোগ এবং খেলাধুলাও রয়েছে তাঁর পছন্দের তালিকায়।