বর্ধমান-কাটোয়া লাইনের সবচেয়ে জাগ্রত ও রহস্যময় গ্রাম হলো ক্ষীরগ্রাম। বর্ধমান থেকে ৩৯ কিমি উত্তর-পশ্চিমে এবং কাটোয়া থেকে ২১ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে মঙ্গলকোট থানায় এর অবস্থান। কাটোয়া-বর্ধমান লোকালে কৈচর স্টেশনে নেমে টোটোয় যেতে হয়। বর্ধমান রাজের ইতিহাস, ৫১ সতীপীঠ আর রামায়ণের লোকপ্রচলিত কাহিনি — তিনটিরই সঙ্গম ঘটেছে এই ক্ষীরগ্রামে।
ক্ষীরগ্রাম নামের উৎস
কথিত আছে, প্রাচীনকালে এখানে ক্ষীরের মতো সাদা মাটি পাওয়া যেত, আর গ্রামের মাঝে বিশাল দিঘির জল ক্ষীরের মতো সাদা দেখাত বলে তার নাম হয় ক্ষীরদিঘি এবং সেখান থেকেই গ্রামের নাম ক্ষীরগ্রাম। ক্ষীরগ্রামের নাম সমস্ত তন্ত্রে উল্লিখিত আছে, যেমন: কুজ্জিকা তন্ত্র, বৃহনীল তন্ত্র, গন্ধর্ভ তন্ত্র, তন্ত্রসার, তন্ত্রচূড়ামণি, অন্নদা মঙ্গল, মহাপীঠ নিরীক্ষণ ইত্যাদি।
যোগাদ্যা: ৫১ সতীপীঠের এক পীঠ
পুরাণমতে, দক্ষযজ্ঞে সতী দেহত্যাগ করলে বিষ্ণু সুদর্শন চক্রে সতীর দেহ ৫১ খণ্ড করেন। বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের দ্বারা খণ্ডিত দেবী সতীর ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পতিত হওয়ায় ৫১ সতীপীঠের অন্যতম হয়ে ওঠে এই ক্ষীরগ্রাম। এখানে দেবীর নাম যোগাদ্যা বা যুগাদ্যা, ভৈরবের নাম ক্ষীরকণ্ঠক বা ক্ষীরেশ্বর। দেবী এখানে উগ্রা ভদ্রকালী রূপে পূজিতা হন।
মন্দির চত্বরে দুটি যোগাদ্যা মন্দির আছে। একটি পুরোনো মূল মন্দির, আর ক্ষীরদিঘির মাঝে জলের নিচে নতুন মন্দির। আছে শিবমন্দিরও — ক্ষীরেশ্বর, ক্ষীরকণ্ঠক নামে পরিচিত।
রামায়ণের যোগ: মহীরাবণ-বধের কাহিনি
এই মন্দিরের সঙ্গে রামায়ণের লোকপ্রচলিত মহীরাবণ-কাহিনির সরাসরি যোগ আছে। রাবণের ছেলে মহীরাবণ মায়াবলে রাম-লক্ষ্মণকে পাতালে নিয়ে গিয়ে এই যোগাদ্যা দেবীর কাছে বলি দিতে চেয়েছিল। দেবী তখন মহিষমর্দিনী ভদ্রকালী।
বর্ধমান রাজ ও যোগাদ্যা মন্দির
মূল মন্দির বহু প্রাচীন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, কালাপাহাড়ের আক্রমণে বা মুসলিম আক্রমণে মূল মন্দির ধ্বংস হয়ে যায়। পরে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে বর্ধমানের রাজা কীর্তিচন্দ্র রায় মন্দিরের দক্ষিণ দিক পুনর্নির্মাণ করেন। কোনো কোনো মতে, রাজা কীর্তিচন্দ্রই এই মন্দিরের বর্তমান রূপের প্রতিষ্ঠাতা। এই তথ্য বর্ধমান রাজের ইতিহাসের সঙ্গেও মেলে, কারণ কীর্তিচন্দ্রই (১৭০২-১৭৪০) বর্ধমান রাজ্যের সবচেয়ে বেশি বিস্তার ঘটিয়েছিলেন।
জলের তলায় দেবীর রহস্য
ক্ষীরগ্রামের সবচেয়ে অলৌকিক বিষয় হলো মায়ের বাসস্থান। দেবী সারা বছর ক্ষীরদিঘির জলে নিমজ্জিত থাকেন। বছরে মাত্র একবার — বৈশাখী সংক্রান্তির আগের রাতে, মধ্যরাতে পুরোহিত ও ডুবুরিরা দিঘি থেকে দেবীর কষ্টিপাথরের বিগ্রহ তুলে আনেন। বৈশাখী সংক্রান্তির দিন মহা ধুমধামে পূজা হয়। প্রায় ৩-৪ দিন মেলা চলে, লক্ষাধিক মানুষ আসে। পূজা শেষে আবার দেবীকে জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এই কারণে বলা হয় — বছরে মাত্র একদিন জলের তলা থেকে ওঠেন মা। বৈশাখী সংক্রান্তি ছাড়াও বছরের আরও কয়েকটি বিশেষ তিথিতে দেবীমূর্তি জল থেকে তোলার পরম্পরার উল্লেখ পাওয়া যায়।
এত বছর জলে থাকার পরেও পাথরের মূর্তির কোনো ক্ষয় হয় না কেন সেও এক রহস্য।
১৩ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত দিঘিতে প্রচুর বড় বড় মাছ আছে, দেবীর মাছ বলে কেউ তাদের ধরে না। এই মাছেরা পুকুরের ধারে এসে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে খাবার খেয়ে যায়।
নরবলি ঘিরে জনশ্রুতি
আরেকটি জনশ্রুতি আছে যে দেবী যোগাদ্যা একবার রাজা হরিদত্তের স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে প্রতিদিন নরবলি দাবি করেন। শক্তির প্রতি ভক্তিপরায়ণ রাজা সাত দিনে তাঁর সাত পুত্রকে বলিদান করেন। এই প্রথা বজায় রাখার জন্য, রাজা আদেশ দেন যে ক্ষীরগ্রামের প্রতিটি পরিবারকে পালাক্রমে একজন সদস্যকে উৎসর্গ করতে হবে।
এভাবেই একসময় স্থানীয় ব্রাহ্মণ পুরোহিতের ছেলের পালা আসে। কথিত আছে ব্রাহ্মণ কাঁদতে কাঁদতে দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন। তখন দেবী এক বৃদ্ধার রূপে এসে নিজেকে বলির জন্য উৎসর্গ করেন। রাজা বুঝতে পারেন, ইনি স্বয়ং দেবী। দেবী এরপর আদেশ দেন — আজ থেকে তাঁর পূজায় আর কখনও নরবলি হবে না। তখন থেকে নরবলি বন্ধ।
আরেকটি লোকশ্রুতি অনুযায়ী, ব্রাহ্মণ তাঁর পুত্রকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান। দেবী যোগাদ্যা তখন এক তরুণী ব্রাহ্মণ কন্যার ছদ্মবেশে পলায়নরত পুরোহিতকে আটক করে নরবলি প্রথা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন এবং অলৌকিকভাবে রাজার পুত্রদের ও অন্যান্য সকল বলিকে পুনর্জীবিত করেন।
সম্ভাব্য কারণ — মূর্তি রক্ষা
এই ক্ষীরগ্রামের মা যোগাদ্যাকে সারা বছর জলের তলায় রাখার পেছনে ইতিহাস, ভয় আর ভক্তি — তিনটেই আছে। এটি কোনো শাস্ত্রের নিয়ম নয়, এটি ইতিহাস থেকে তৈরি হওয়া একটি পরম্পরা, যা আজ অলৌকিক বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
আজ থেকে প্রায় ৪৫০-৫০০ বছর আগে বাংলায় কালাপাহাড়ের আক্রমণ হয়। কালাপাহাড় ছিলেন ব্রাহ্মণ থেকে মুসলিম হওয়া এক সেনাপতি, যিনি বাংলার বহু হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। লোকশ্রুতি ও বর্ধমান রাজবাড়ির পুরোনো নথি অনুযায়ী, তখন ক্ষীরগ্রামের মূল মন্দিরটিও ছিল পাথরের বিশাল মন্দির, ভিতরে কষ্টিপাথরের দশভুজা মহিষমর্দিনী যোগাদ্যা মূর্তি।
পরে যখন পরিস্থিতি শান্ত হয়, তখন মূর্তি তোলা হয়, কিন্তু ততদিনে গ্রামবাসীর মনে একটি বিশ্বাস জন্মে যায় — মা জলেই নিরাপদ।
পরে রাজা কীর্তিচন্দ্র যখন মন্দিরের দক্ষিণ অংশ নতুন করে গড়েন, তখন তিনি একটি নকল বা প্রতীকী মূর্তি মন্দিরে রাখেন, আর আসল জাগ্রত কষ্টিপাথরের মূর্তিটি জলেই রাখার ব্যবস্থা পাকা করেন। সেই থেকেই নিয়ম হয়ে যায় — মা সারা বছর জলেই থাকবেন। এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ঐতিহাসিক কারণ।
পৌরাণিক তথা আধ্যাত্মিক কারণ — উগ্রা দেবীকে শান্ত রাখা
যোগাদ্যা কোনো শান্ত লক্ষ্মীপ্রতিমা নন, তিনি উগ্রা ভদ্রকালী। রামায়ণমতে, মহীরাবণ এই রূপেরই পূজা করে রাম-লক্ষ্মণকে বলি দিতে চেয়েছিল।
তন্ত্রমতে, উগ্র দেবীকে সবসময় জলে বা ঠান্ডা স্থানে রাখতে হয়, না হলে তাঁর তেজে গ্রামের ক্ষতি হতে পারে। ক্ষীরদিঘির ঠান্ডা জল দেবীর উগ্রতা শান্ত রাখে। তাই তাঁকে জলবাসিনী বলা হয়। দিঘির মাছগুলোকে মায়ের সন্তান বা পাহারাদার মনে করা হয়, কেউ তাদের ধরে না।
আরেকটি বিশ্বাস আছে — দেবী নিজেই স্বপ্নে পুরোহিতকে বলেছিলেন, “আমি জলেই থাকতে চাই, আমাকে বিশেষ তিথিতে তুলে পূজা করলেই হবে।”
বৈশাখী সংক্রান্তির উৎসব
বৈশাখী সংক্রান্তির আগের রাতে এই জল থেকে তোলার উৎসবটিই ক্ষীরগ্রামের সবচেয়ে বড় উৎসব।
বৈশাখী সংক্রান্তির আগের রাতে মধ্যরাতে গ্রামের ডুবুরি ও পুরোহিতরা মশাল জ্বালিয়ে, ঢাক-ঢোল বাজিয়ে ক্ষীরদিঘিতে নামেন। মন্ত্র পড়ে দেবীকে তোলা হয়। বৈশাখী সংক্রান্তির দিন সকাল থেকে ৩ দিন ধরে বিরাট মেলা ও মহাপূজা হয়। হাজার হাজার ভক্ত তখন মায়ের আসল রূপ দর্শন করতে পারেন। পূজা শেষ হলে আবার তাঁকে জলে নিমজ্জিত করা হয়।
অনেক প্রবীণ মানুষ বলেন, মূর্তিটি তোলার সময় দিঘির জল অদ্ভুতভাবে আন্দোলিত হয়, আর মাছগুলো মূর্তির চারপাশ ঘিরে থাকে।
এক কথায় বললে, জলের তলায় রাখা শুরু হয়েছিল মূর্তি বাঁচানোর তাগিদে, আর সেটাই আজ ভক্তির পরম্পরা হয়ে গেছে। এটাই ক্ষীরগ্রামকে বাংলার ৫১ সতীপীঠের মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় করে রেখেছে — যে মা সারা বছর অদৃশ্য, শুধু বছরে একবার ভক্তদের দেখা দেন।
কীভাবে যাবেন?
ক্ষীরগ্রামের নিকটবর্তী রেলস্টেশন কৈচর, বর্ধমান-কাটোয়া রেলপথে। কৈচর স্টেশন থেকে ক্ষীরগ্রামের দূরত্ব প্রায় ৫ কিমি। স্টেশন থেকে টোটো বা স্থানীয় গাড়িতে যোগাদ্যা মন্দিরে পৌঁছনো যায়। কাটোয়া থেকেও বাস বা গাড়িতে মঙ্গলকোট হয়ে ক্ষীরগ্রাম যাওয়া যায়।
বৈশাখী সংক্রান্তির সময় মেলা ও বিশেষ পূজার জন্য প্রচুর ভক্তসমাগম হয়, তাই ওই সময় গেলে যাতায়াত ও থাকার পরিকল্পনা আগে থেকে করে নেওয়া ভালো। থাকার জন্য কাটোয়ায় হোটেল আছে। সাধারণ সময়ে কলকাতা থেকে সকালে বেরিয়ে দিনে দিনেই ক্ষীরগ্রাম ঘুরে আসা যায়।
লেখিকা পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার কর্মসূত্রে বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়া ও বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বেড়ে ওঠায় লালমাটি, শাল, পলাশ, শিমূল ও মহুয়ার প্রতি তাঁর গভীর টান তৈরি হয়, যার প্রতিফলন তাঁর লেখায়ও দেখা যায়। আদিবাসী জীবন ও সংস্কৃতি নিয়েও তিনি লিখে থাকেন। বিবাহের পর ভারতীয় বায়ুসেনার কর্মসূত্রে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাস এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বাংলা ও হিন্দি — দুই ভাষাতেই কবিতা লেখেন। পাশাপাশি তিনি গায়িকা, বাচিকশিল্পী ও নৃত্যচর্চার সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে “প্রচেষ্টা”।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।