About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
এক বাঙালী ক্যাসাবিয়াঙ্কা
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

এক বাঙালী ক্যাসাবিয়াঙ্কা

সেবারও খুব বর্ষা। ষাটের দশকের শেষ। বাবার চাকরি সূত্রে আমরা তখন ডায়মন্ড হারবারে থাকি। জলপাইগুড়ি থেকে অনেক চেষ্টায় বিভিন্ন জেলা ঘুরে ২৪ পরগনার উত্তরে পোস্টিং চেয়ে দক্ষিণে পোস্টিং পেলেন বাবা।

বর্ষা তখন বর্ষার মতোই হত। একবার ঘন কালো মেঘ করলে লাগাতার তিন-চার দিন অবিরাম, নাছোড় বৃষ্টি। পলিউশন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং শব্দরা তখনও হয়তো ডিকশনারিতেই ছিল বা তৈরি হয়নি! শাকপাতা, সবজি, ফল, মাছ নিশ্চিন্তে খাওয়া যেত।

সেবার ডায়মন্ড হারবারে ইলিশের প্লাবন লেগেছিল। লঞ্চভর্তি হয়ে মাছ আসছে আর কলকাতা-হাওড়ায় চালান হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে রাজ্যের বিভিন্ন বাজারে। কদিন কী এক কারণে মাছের আড়তে প্রচুর মাছ জমে গিয়েছিল। সম্ভবত বরফকলে বরফ তৈরি হচ্ছিল না। লোকাল বাজারে মাছ তখন প্রায় জলের দর। এদিকে কলকাতা থেকে বড় বড় ট্রেলার, ট্রাকবোঝাই বরফ নিয়ে হাজির। সব মাছ চালান হয়ে যাচ্ছে। আড়ত আর বরফকলের ঝামেলায় মাছ লুঠ হচ্ছিল, শোনা যেত। এত ছোট তখন আমি, কেন, কী কারণ, অত বোঝার মতো হইনি। বাবা, কাকা, দাদা, দিদিদের টুকরোটাকরা কথা যা কানে আসত, তা থেকে জানা।

সেদিন রবিবার। বাবার খুব ইচ্ছে টাটকা ইলিশ কিনবেন! রবিবার মানেই আনন্দ-খুশির বার! পড়া কম, বাবাকে বাড়িতে পাওয়া, আরও সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া, গল্প! বিকেলে বাদামভাজা, আলু-পিঁয়াজভাজা দিয়ে মুড়িমাখা আর চা, গানবাজনা, ছড়া, কবিতা... সে অনেক মজা।

বাবা বাজারে গেলে আমি যাবই! সেদিনও আমি তৈরি, ব্যাগ হাতে! বাবা একটু ইতস্তত করে আমায় বললেন, “তুই আজ যাস না বাবু, আজ দূরে যাব মাছ কিনতে। তুই অত হাঁটতে পারবি না।” কথা শুনেই আমার চোখ ছলছল। বাবা আমার মুখের দিকে তাকিয়েই বললেন, “আচ্ছা চল, চল, কাঁদতে হবে না। তবে পা ব্যথা করছে বলা চলবে না।”

আমি এক পায়ে খাড়া ছিলাম। এবার লাফাতে লাফাতে গেটের দিকে চললাম। গেট খুলে হাঁটা শুরু করেছি।

বাবার সঙ্গে বাজারে যাওয়ার অনেক কারণের অন্যতম হল স্টেশন টি-স্টলে সুজি বিস্কুট আর মুখে মুখে অঙ্ক শেখা! সিঁড়িভাঙা, সরল অঙ্কের নিয়ম! মুখে মুখে সবজি-মাছের দাম হিসাব করা, দশমিক বা ভগ্নাংশ — এসবও বাবার কাছেই মুখে মুখে গল্পের ছলে শেখা।

সেদিনও বেরিয়েছি, কিছুটা যাওয়ার পর ঝমঝম করে বৃষ্টি। বড় ছাতার তলায় বাবা আমায় টেনে ঢুকিয়ে নিয়ে হাঁটতে লাগলেন। পথ অনেকটা! স্টেশন পেরিয়ে বড় রাস্তায় যখন উঠেছি, দেখি আমি বেশি ভিজিনি, কিন্তু বাবা ভিজে আমসত্ত্ব।

বড় রাস্তাটা আসলে হুগলির বাঁধ কাম রাস্তা। বড় বড় বর্গাকার স্ল্যাব ঢালাই করে পাড় বাঁধানো! পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তরের পান্থশালা সাগরিকা হোটেল এই নদীবাঁধ কাম বড় রাস্তার গায়ে। এই বাঁধ ভাঙলে ডায়মন্ড হারবার শহর জলের তলায় চলে যাবে। এখানে নদীর জল জোয়ারের সময় সমতলের চেয়ে অনেক উঁচুতে বয়ে যায়।

ভিজে যাওয়াতে বাবার পরিকল্পনা কিছু বদলে গেল! তখন ৭৬ নম্বর বাস ডায়মন্ড হারবার থেকে কলকাতার বাবুঘাট পর্যন্ত চলত। শহরে ঢোকার পর তাতে ভিড় কমে যেত। নিউটাউন ছেড়ে বাস স্টেশন বাজার স্টপে এলে দু-একজন যাত্রী আর দুজন কন্ডাক্টর-খালাসি — এরাই থাকত। এমন একটা ফাঁকা বাস আসতেই বাবা হাত তুলে দাঁড় করালেন। ছাতা মুড়েই আমায় বগলের নিচে হাত দিয়ে এক ঝটকায় পাদানিতে তুলে দিলেন!

ফাঁকা বাস। আমিও মজায় এই সিট ছেড়ে ওই সিটে দৌড়ে বেড়াচ্ছি। এটা একটা বাড়তি মজা! বাড়ি গিয়ে মেজদি, ছোড়দিকে গল্প করব।

“সু, চলন্ত বাসে দৌড়তে নেই, শান্ত হয়ে বসো...”

বাবার মৃদু ধমকে ঘাবড়ে গিয়ে তাঁর পাশে বসে পড়লাম। বাবা আমায় জানলার ধারে বসিয়ে নিজে পাশে বসলেন, আর নদী দেখাতে লাগলেন! বর্ষার হুগলি! কাদাগোলা পাটল বর্ণের জলরাশি, সঙ্গে ঢেউ — গা শিরশিরানো! বাঁধরাস্তার ধার দিয়ে চলার সময় মনে হতে লাগল, ইস্, যদি বাস নদীতে পড়ে, এক মুহূর্তে সব ডুবে যাবে! নিজের ভাবনার আতঙ্কে অজান্তে বাবার হাত শক্ত করে চেপে ধরে আছি! এমন করে বাসে চেপে নদীর ধার দিয়ে সেই প্রথম চলা! তন্ময় হয়ে নদী দেখছি!

বাবা মাথায় আলতো করে নাড়া দিয়ে বললেন, “চল বাবু, আমরা নামব।”
মাথা তুলে দেখি, বাস থেমেছে। আমি নামতে নামতে জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা, এটা কোথায়?”
বাবা বললেন, “নামো আগে, বলছি... এ জায়গাটা নগেন্দ্র বাজার। ওই দেখ, সব মাছের আড়ত।”

দেখি বাঁদিকে সারি সারি ঘর। তিনদিকে দেওয়াল, সামনে খোলা। মাথায় কারও ছাদ, কারও করোগেটেড টিনের ছাউনি! সে অনেকগুলো, পরপর! উঁচু রাস্তা থেকে বাঁ হাতে মোরাম আর ইট বিছানো রাস্তার দুদিকে বরাবর নিচের ঢালে চলে গেছে। নদী এখানে ডানদিকে ঘুরে গেছে।

আমরা নেমে পিছনদিকে হাঁটছি। জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে বললাম, “আমরা পিছনে কেন যাচ্ছি বাবা? আড়ত, বাজার তো সামনে?”
বাবা বললেন, “আমরা নদীর চরার ওই মাঠটায় যাব! এটাকে কেল্লার মাঠ বলে। ওই দেখ, সারি সারি নৌকো বাঁধা। ওরা সব মাছ নিয়ে আসে! ওই দেখ, দাঁড় বেয়ে ছোট ডিঙি নৌকো আসছে! ওরা মাঝনদীতে মাছ ধরে।”

দেখি, কতকগুলো ছোট নৌকা আসছে পাল তুলে দক্ষিণা হাওয়ায়!

“ওই মাঠটা কেল্লার মাঠ! ওই দেখ, দূরে? ওটা হল ওলন্দাজদের বানানো কেল্লার ভগ্নাবশেষ!”

ওলন্দাজ কারা? এখানে নদীতে কেন কেল্লা বানাল? কী করে অত বড় দেওয়াল ভেঙে গেল? এসব ভাবনা প্রকাশ করার আগেই মাঠে চোখ গেল! মাঠ তো জলে-কাদায় ভর্তি। আমরা কী করে যাব ওখানে!?

বাবা বললেন, “তুমি যাবে না! তুমি এই ঘেরা জায়গায় দাঁড়াবে। আমি চট করে ওই নৌকায় যাব আর মাছ কিনে নিয়ে আসব।”
শুনেই আমার মাথার পোকা নড়ে উঠল। আমি বায়না করতে লাগলাম, “আমিও তোমার সঙ্গে যাব। আমি একা এখানে থাকব না। কিছুতেই না! বাবা, ও বাবা, আমিও যাব!”
বাবা একটু কী ভাবলেন, তারপর বললেন, “বেশ, চল। এখানে এই বড় রাস্তায় একা তোর না থাকাই ভালো! তুই যা দুরন্ত...! তোকে না আনলেই ভালো হত।”

বাবাকে ঈষৎ চিন্তান্বিত মনে হল! আমার মনের সব মেঘ নিমেষে পরিষ্কার! মনটা আবার ঝরঝরে! বাবা পাশে থাকলে পৃথিবীর কোনো বিপদকে বিপদ মনে হত না! কোনো কষ্ট কষ্ট নয়! আজ এই পঞ্চাশ পেরিয়েও একই বিশ্বাসে অনড়! বাবা মানেই সব ঝড়ঝঞ্ঝাট সামলানো এক বিশাল বিটপ! এখন মনে হয়, তারাই সবচেয়ে দুর্ভাগা, যারা পিতৃমাতৃহীন হয় ছোটবেলায়।

বাবা তো আমায় কোলে তুলে নদীর চরে নামলেন। বিশাল চর, রাস্তার কাছে উঁচু, নিচের দিকে নেমে গেছে ঢাল! জোয়ারে রাস্তার কানায় জল চলে আসে। অপেক্ষাকৃত উঁচু, একটু কম ভেজা পাড়ের কাছে বাবা আমায় নামিয়ে নিজের জুতো খুলে দাঁড় করালেন! বাবার মুখ দেখে বুঝতে পারছি, কেমন আশঙ্কিত যেন! একবার বিড়বিড় করলেন নিজের মনে, “ভুল করেছি!”

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “কী হয়েছে বাবা?”
“কী হবে? কিছু না তো!” বাবা হাঁটু গেড়ে আমার সামনে বসে বললেন, “ওই যে সামনের নৌকাটা, ওই যে ভিড়ছে চরে, ওটায় যাব আর আসব! আমি তোমায় ওখান থেকেই দেখতে পাব। তুমি কিন্তু যাই হোক এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে। আমি ফিরে তোমায় নিয়ে বাসে উঠব। কিন্তু সুবু, খবরদার বাসরাস্তায় উঠবে না! আমি না আসা পর্যন্ত এখান থেকে নড়বে না! আমি যা বললাম বুঝেছ?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “তুমি না আসা পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব।”

বাবা ধুতি হাঁটুর উপরে তুলে ব্যাগ হাতে বারবার পিছন ফিরে আমায় দেখতে দেখতে নৌকার দিকে চললেন। আরও কয়েকজন লোকও ব্যাগ হাতে যাচ্ছে দেখলাম। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি, আরও কিছু লোক চরায় নামার উপক্রম করছে, রাস্তা পেরোচ্ছে। একজন বাঁধ বেয়ে নামতে নামতে আমায় জিজ্ঞেস করল, “খোকা, এখানে দাঁড়িয়ে কেন? উপরে রাস্তায় উঠে যাও!”
আমি বললাম, “না, যাব না। বাবা আমায় এখানেই দাঁড়াতে বলেছেন।”
“কোথায় তোমার বাবা?”

আমি আঙুল তুলে নৌকার দিকে দেখিয়ে দিলাম। ওরাও ইলিশ কিনতে যাচ্ছে। দূর থেকে বাবাকে চিনতে পারছি না। ছোট ছোট কটা লেমোনেডের বোতল মনে হচ্ছে!

একটু পরেই দেখি, নৌকোটা নদীর জলে চলে যাচ্ছে! কয়েকজন লোক নৌকায় উঠেছে, তার মধ্যে আমার বাবাও! আমার কেমন বুক ভেঙে কান্না এল। ওরা আমার বাবাকে নদীতে নিয়ে যাচ্ছে! দু-চারজন তখনও চরায় দাঁড়িয়ে! একজন মনে হচ্ছে ফিরে আসছে! কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকটা কাছে এসে গেল! দেখলাম, সেই লোকটাই যে আমার সঙ্গে কথা বলেছিল!

আমায় কাঁদতে দেখে আবার বলল, “এ কী, কাঁদছিস কেন, খোকা?”
প্রবল কান্না এসে আমার গলা আটকে গেল! কান্নার দমক সামলে কোনোমতে বললাম, “আমার বাবাকে ওই নৌকায় নিয়ে গেল মাঝনদীতে...”

আর বলতে পারলাম না। হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম!

লোকটি বলল, “বোকা ছেলে, তাতে কী? এখুনি ফিরে আসবে! নৌকা লুঠ হতে পারে, তাই মাঝিরা নদীতে নেমেই কেনাবেচা করছে! তুই আমার সঙ্গে উপরে বাঁধে উঠে আয়! জোয়ার আসছে। জোয়ারে নদীর জলে কামোট আসে! ঘড়িয়ালও থাকে! সাপখোপ ভেসে আসে। চলে আয়, আমি তুলে দিচ্ছি উপরে!”
চিৎকার করে বলে উঠলাম, “আমি কোথাও যাব না! আমায় বাবা এখানেই দাঁড়াতে বলেছেন।”

চেয়ে দেখি, দূরে নৌকা আরও দূরে চলে যাচ্ছে আর নদীর জল যেন ফুলে উঠছে! কামোট, ঘড়িয়াল এসব কী, কতটা বিপজ্জনক, কিছুই জানি না! তবে সাপের কথায় একটু ভয় করছে! জল এগিয়ে আসছে! আমার পায়ের পাতা ডুবল, আমি নড়ছি না। গোড়ালি, পায়ের গোছা ডুবে গেল দেখতে দেখতে! ওই দূরে তাকিয়ে মনে হল, যেন নৌকা কূলে ফিরছে। ছলাৎ ছলাৎ শব্দে জল হাঁটুতে ধাক্কা মারছে। রাস্তা থেকে লোকজন চেঁচিয়ে ডাকছে, “এই ছেলে, ওখানে কী করছিস? উঠে আয় শিগগির, জোয়ার আসছে!”

জল হাঁটু ছাড়িয়ে আমার প্যান্ট ছুঁয়েছে, আমার ভ্রুক্ষেপ নেই! বাবার জুতো ভেসে চলে যাচ্ছে দেখে আমি জলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি! বুকজলে এসে এক পাটি জুতো ধরে ফেললাম! আর একটা একটু দূরে। আমি হাত বাড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছি। মনে হল, পায়ের তলায় মাটি নেই। তবু একটু সাঁতরে জুতো ধরে ফেললাম, কিন্তু মাটি পেলাম না। আর তক্ষুনি বাবাকে পেলাম — উদ্‌ভ্রান্ত, বিধ্বস্ত, চিন্তাক্লিষ্ট, আমার জামার কলার ধরে উঁচু করে তুলে ধরে বুকসমান জলে দাঁড়ানো!

আমি আনন্দে কান্না ভুলে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম। বাবা মাছের থলি ফেলে আমায় জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন!

পরে মায়ের কাছে শুনেছি, মাঝিদের সঙ্গে প্রবল ঝগড়া করে নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নৌকা কূলে এনে আমায় সে যাত্রায় রক্ষা করেছিলেন বাবা! আর নিজের বোকামির জন্য বাকি জীবন আফসোস করতেন! বলতেন, “টাটকা ইলিশের লোভে ছেলে হারাতে বসেছিলাম!”

ফেরার সময় আমায় শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হ্যাঁ রে সুবু, জল বাড়ছে দেখে তুই উপরে কেন উঠে গেলি না?”
জবাবে আমি বলেছিলাম, “তুমি তো আমায় ওখানেই দাঁড়াতে বলেছিলে!”

আমি সারাটা পথ বকবক করতে করতে ফিরেছিলাম, “বাবা, ওলন্দাজ কারা? ওরা এখানে কেল্লা বানাল কেন? কামোট কী? ঘড়িয়াল কেমন দেখতে হয়? জোয়ার কেন আসে?”

বাবা শুধু ছলছল চোখে আমার দিকে চেয়ে নিজের চিন্তায় ডুবেছিলেন!




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের কার্তিক ১৪৩৩ সংখ্যাটি ১ নভেম্বর ২০২৬ (১৪ই কার্তিক) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২০ অক্টোবরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
গঠনমূলক পরামর্শ দিন
মন্তব্যে আপনার মতামত জানান
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
Scroll to Top

‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।