জীবন এক সংগ্রাম। পৃথিবীর আলো দেখার মুহূর্ত থেকেই লড়াই। কান্না-হাসির খেলায় শুরু হয় জীবনের যাত্রা। এক অলৌকিক শক্তি এভাবেই সৃষ্টি করেছেন বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান জীব মানবকুলকে। বেঁচে থাকার জন্য কঠিন সংগ্রাম হোক অথবা চরম কোনো দুঃখ বা আঘাত — সব ক্ষতই সময়ের মলমে নিরাময় হয়। হয়তো দাগ থেকে যায়। তবু উঠে দাঁড়াতে পারে মানুষ। কেউই জানে না, জন্মের পর জীবন কোন গতিতে বইবে। কোন কর্ম তাকে নিজের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছা সত্ত্বেও করতে হবে। একই কর্ম করে কেউ পায় সম্মান। আবার কারও জীবন চরম অবহেলায় শুধুই দিনপাত। একেই হয়তো ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস বলে। তবু ভালো থাকার চেষ্টা করে খুঁজে নিতে চায় একটু আনন্দ।
লোকশিল্পী লোকসংস্কৃতির পরিবাহক। একটি জেলার সাধারণ মানুষের জীবনযাপন, কথোপকথন, সামাজিক সংস্কার, দুঃখ-যন্ত্রণা, আনন্দ — সবকিছুই লোকসংস্কৃতির আওতায় এসে পড়ে। অর্থাৎ একটা অঞ্চলের স্থানীয় মানুষ, লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্পী একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত।
ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও পুরুলিয়ার এটি একটি বিশেষ লোকনাচ। ছৌ, ঝুমুরের মতোই বিখ্যাত। অন্ত্যজ শ্রেণির কিছু মেয়ে অভাবের তাড়নায়, অনেক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাচকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সময় সমাজে নাচ ছিল পুরোপুরি ব্রাত্য। দরবারি ঝুমুর গান গেয়ে নৃত্য পরিবেশন করত বলে এদের নাচনী বলা হতো। আর এর থেকেই ‘নাচনী নাচ’ নাম হয়। পরিবার-পরিজন এদের ত্যাগ করেছিল। সাধারণ মানুষ নিচু চোখে দেখত। মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেও নিজের সম্প্রদায় এবং পুরো সমাজের কাছে অপবিত্র ও অস্পৃশ্য হয়ে সারাজীবন কাটাত।
মনে করা হয়, আঠারো শতকের প্রথমার্ধে ছোটোনাগপুর মালভূমির রাঢ় অঞ্চল, পুরুলিয়ার রাজবাড়ি ও জমিদারি এলাকায় শুরু হয় নাচনী নাচ। নাচনী নাচের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রাজা, জমিদার ও ধনী ব্যক্তিরা। এই নাচের জন্ম পুরুলিয়াতে হয়নি। রাজাদের আমলে এসেছে। লর্ড কর্নওয়ালিসের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (১৭৯৩ সাল)-এর ফলে রাঁচি, হাজারিবাগ, মানভূম-সিংভূম-পুরুলিয়া অঞ্চলে সামন্তপ্রভুদের আবির্ভাব ঘটে। পরবর্তীকালে এই সামন্তপ্রভু বা জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় নাচনী নাচের বিস্তৃতি ঘটে।
কাশীপুরের রাজা জ্যোতিপ্রসাদ সিংদেওয়ের আমলে প্রায় একশো বছর আগে রাজবাড়িতে নাচনী নাচের আসর বসত। প্রতিযোগিতা হতো নাচনী নাচ তথা ঝুমুর আসরের। বাঘমুণ্ডির সঙ্গে পাতকুমের রাজার ঝুমুর নাচের প্রতিযোগিতা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে।
নাচনী নাচের মূল বৈশিষ্ট্য অঙ্গসঞ্চালনা। কোমর, বক্ষযুগল, কাঁধ, হাতের মুদ্রা, নূপুরের সঙ্গে পায়ের তাল, ভ্রু ও চোখের চাহনি মাতিয়ে তুলত আসর। নাচনীরা ঝুমুর গান গেয়ে নাচের মাধ্যমে মনোরঞ্জন করতেন বাইজিদের মতোই। লখনউয়ের বাইজিদের অনুকরণে রাঢ় সংস্কৃতিতে নাচনী নাচের অন্তর্ভুক্তি ঘটে। তাই এই নাচকে বাই নাচও বলা হয়। লাস্যময়ী নাচনী চোখের চাহনি আর ঘুঙুরের ধ্বনিতে ডেকে আনত সর্বনাশী কালবৈশাখী।
একটা সময় ছিল, যখন পুরুলিয়াতে মেয়েরা ঝুমুর গান করত না। ঝুমুর গানকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। আদি, মধ্য ও আধুনিক যুগের ঝুমুর। ঝুমুর হলো জীবনের গান। লৌকিক সমস্যা, দুঃখ-যন্ত্রণা, আনন্দ, হতাশা নিয়ে গান বাঁধতেন ঝুমুর কবিরা। ঝুমুর কবি ভবপ্রীতানন্দ ওঝা কাশীপুর রাজপরিবারের এবং ঝুমুর কবি বিনন্দিয়া সিলির রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিলেন। এছাড়াও শিরোমণি হাজরা ও রামকৃষ্ণ গাঙ্গুলী বাংলায় ঝুমুর গান রচনা করেছিলেন। ঝুমুর গান ছিল ভজন বা বন্দনামূলক গান। যেমন কুড়মালি ভাষায় একটি ঝুমুর গান হলো —
মও তো গাউ যাম
বিহানে জোনার কুটি দিয়া
ভালো করে ভুজি দিয়া
বুটু না রাখিয়া
যাহাই পানি তাহাই সানি খাব
মও তো গাউ যাম।
অর্থাৎ গ্রামের একটি ছেলে তার বউকে বলছে, সে অন্য গাঁয়ে যাবে। জুনার বা ভুট্টা ভেজে ছাতু করে দিতে। যেখানে জল পাবে, সেখানে ছাতু সেনে অর্থাৎ ছাতু মেখে খাবে (পাতা নাচ)। এই গানটির মধ্য দিয়ে তৎকালীন সময়ে গ্রামবাংলার মানুষের জীবনযাপন ও অর্থনীতির দিকটি পরিস্ফুট হয়েছে।
আদি ঝুমুর ছিল মানুষের গান। পাতা নাচ, সাঁওতালি নাচের মতো কুড়মালি সমাজের কুড়মি মাহাতোরা ছাড়াও অন্যান্য বৃত্তিজীবী সমাজের কামার, কুমোর সম্প্রদায়ের মানুষ সারাদিনের পরিশ্রমের পর ক্লান্ত শরীরে একটু আনন্দের জন্য রাতে খাওয়াদাওয়ার পর গাঁয়ের হরিচাতাল বা মনসা মেলায় যাত্রার আসর বসাত। সেখানে নিম্নবর্ণের মেয়েরা যাত্রায় নাচত আর বাজনা বাজাত ছেলেরা। ঐ সময় ঝুমুর গান ও নাচ ছিল সমাজের নাচ। কিন্তু পরবর্তীকালে রাজা বা জমিদারদের সময়ে নাচনী নাচ আমদানি করা হয়। রাজতন্ত্র বা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে এই নাচ রাজদরবারের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে আসে মেলার মাঠে ও সাধারণ মানুষের আসরে। দুর্গাপূজার সময়, ভাদু-টুসু, মকর পরবে, সরকারি মেলায় নাচনী নাচের আসর বসে।
নাচনী নাচও ঝুমুর গানেই পরিবেশিত হয়। তবে নাচনী ঝুমুর গান মূলত রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা ও শৃঙ্গাররসের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয় — যা ‘দরবারি ঝুমুর’ নামে পরিচিত। ‘দরবারি ঝুমুর’ আর ‘ধুমড়ি’ বা জমিদারি ঘরানার নাচের সংমিশ্রণ ঘটে নাচনী নাচে। নাচনী ঝুমুর গানের ভিত্তি হলো গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন। রসিক ও নাচনীর যুগল পরিবেশনকে লৌকিক অর্থে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার রূপক হিসেবে ধরা হয় — যার মধ্যে বিরহ, মিলনের আকুলতা প্রকাশ পায়।
পুরুলিয়াতে নাচনী নাচের দুটি ঘরানা। নাচনী নাচ দুটি মূল চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। রসিক — যিনি দলের মূল পুরুষ গায়ক, সুরকার এবং নির্দেশক। নাচনী — যিনি মূল নারী নৃত্য ও ঝুমুরশিল্পী। নাচনীকে একাধারে নাচ ও গান, দুটোতেই পারদর্শী হতে হয়।
কাশীপুর ঘরানায় নাচনী নাচে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো হারমোনিয়াম, তবলা, জুড়ি, নাগড়া, ফ্লুট, করনেট। দ্রুত লয়ে গান ও নাচ হয়। নাচনীরা শাড়ি পরে নাচ করতেন।
বাঘমুণ্ডি ঘরানা ছিল ধুমড়ি নাচ, যেখানে নাচনীরা ঘাঘরা, চোলি, কোমরবন্ধন পরে নাচ করতেন বাইজিদের আদলে। তাই বাঘমুণ্ডি ঘরানার নাচকে ‘বাই নাচ’ও বলা হয়। এখানে বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় ঢোল, মাদল, ধামসা, ধেড়ে, নাগড়া, চেড়িপেটি, সানাই, বাঁশি। এই ঘরানায় ধীর লয়ে গান ও নাচ পরিবেশিত হয়। মাথায় পাগড়ি বেঁধে রসিক ঘুরে ঘুরে বাদ্যযন্ত্র বাজান।
এই প্রেমময়ী রাধারানি নাচনীদের জীবনেও সুখ ছিল না। নাচনীরা সামাজিকভাবে বিবাহিত জীবন অতিবাহিত করতে পারতেন না। রসিকই নাচনীর শয্যাসঙ্গী, অভিভাবক, মালিক, সর্বময় কর্তা; নাচনীর সমস্ত রোজগারের হকদার। নাচনীর সম্পূর্ণ নির্ভরতা থাকে রসিকের ওপর। অপরদিকে নাচনী হলো রসিকের ভোগের এবং উপার্জনের বস্তু। দুর্বিষহ জীবন মেনে নেওয়া ছাড়া কী আর করতে পারত তারা?
অনেক সময় অভাবের তাড়নায় নাচনী হয়েছে। দু’মুঠো খেতে পাওয়ার জন্য। যেমন পোস্তবালা নাচনী। কাউকে আবার বাবা কিংবা মা রসিকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে দুঃসহ দারিদ্র্যের যাতনায়। জমি বিক্রির মতো দু’হাত পেতে নিয়েছে মেয়ে বিক্রির টাকা। অনেক সময় দেখা গেছে, গান জানা হৃষ্টপুষ্ট সুন্দরী যুবতীকে অপহরণ করেও নাচনী করা হয়েছে। সেই সময়টা এমন ছিল যে কোনো মেয়ে ভালো গান করলে বাড়ির লোকেরা ভয় পেত। যদি বাইরে জানাজানি হয়, তাহলে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে নাচনী করে দেবে। এমন ঘটনা ঘটেছেও অনেক। ভালোবেসে ঘর ছেড়ে প্রতারিত হয়েছে প্রেমিকের কাছে। প্রেমিক ছলনা করে কোনো রসিকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে অথবা অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে বাঁচার আশায় মেয়েটি বাধ্য হয়েছে এই শিল্পকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে। এঁদের জীবনের সংগ্রাম আরও ভয়ংকর।
আবার এমন নজির আছে, গান ও নাচ তার স্বভাবজাত। ঝুমুর গান শুনলেই মনে ও শরীরে হিল্লোল জাগে। স্বেচ্ছায় নাচনী হতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সরস্বতী নাচনী। তাঁর মনের ইচ্ছাকে সম্মান দিয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ির পরিবারের লোকজন। শাশুড়ি অঞ্জনা সিং পাতর ও রসিক তথা সরস্বতীদেবীর স্বামী খেপু সিং পাতর। যিনি স্বেচ্ছায় নোয়া ও সিঁদুর দিয়ে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছিলেন সরস্বতীদেবীকে। তবে এমন নজির খুব কম।
রসিক-নাচনীর গান্ধর্ব সম্পর্ক। নাচনীকে সাঙা করত রসিক। এককথায় রক্ষিতার জীবন অতিবাহিত করত নাচনী। একজন রসিকের একাধিক নাচনী থাকত। কিন্তু একজন নাচনীর একজন মাত্র রসিক থাকত। কখনো রসিকের প্রেমে মজে নাচনী রসিকের কাছে আসত। ভালো নাচনী হলে নাচের আসর থেকে অথবা রসিককে খুন করে নাচনীকে তুলে নিয়ে যেত অন্যত্র। রসিকের স্ত্রী ও সন্তানেরা ছিল রসিকের সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। অথচ নাচনীর কোনো বৈধতা থাকত না। নাচনীর সন্তান অবৈধ তকমা নিয়ে বড় হতো অনাদরে, অবহেলায়; সামাজিক তিরস্কারে জর্জরিত হয়ে।
উপেক্ষার ছাইচাপা আগুনে ধিকিধিকি করে জ্বলত নাচনীদের বিদ্রোহ। সমস্ত বঞ্চনা একত্রিত করে রাতের আসরে কাঁপিয়ে তুলত শিলাই, কংসাবতীর বুক। ভেতরের নদীটিকে চিনত না লোহার শিকল পরা কঠিন, রুক্ষ সমাজ। দেখতে পেত না রসিক, নাচনীর কাজলরেখায় ছলছল নয়নের গভীর অশ্রুপাত। জীবনের সমস্ত বঞ্চনা-লাঞ্ছনা “একদিন নিকুঞ্জবনে/আর শ্রীরাধা পড়িল মনে/ব্যাকুল হল শ্যামরাই/একদিন নিকুঞ্জবনে”-তে রেখে দিয়ে যমুনার জলে ধুয়ে নিত মনের কষ্ট-বেদনাকে। আসর মাতিয়ে গেয়ে উঠত, “আয় ভ্রমরা আয়/বসবি যদি মোর কুঞ্জেতে/আয় ভ্রমরা আয়”। শীতের নরম রোদে, কনকনে ঠান্ডায় বা ফাগুনের উতলা বাতাসে নাচনীর গলায় “তবে কাজল পর গো কেনে” — ঝুমুরের সুরে, করতাল ও ঘুঙুরের ছন্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকত সামাজিক অবহেলা ও বেদনাবিধুর ইতিহাসের করুণ কাহিনি।
এই সংস্কৃতির ইতিহাস যেমন সমৃদ্ধ ও শৈল্পিক, তেমনই সামাজিক ট্র্যাজেডি ও অন্ধকারের জ্বলন্ত প্রতীক। মঞ্চে বা আসরে হাজার হাজার মানুষের হাততালি একদিকে উপভোগ করত, অন্যদিকে সেইসব মানুষের কাছে, সমাজের মধ্যে অচ্ছুত হয়ে দিন কাটাতে হতো। ধর্মীয় কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারতেন না। কঠোর পরিশ্রমী ও প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও জাতিভেদ, লিঙ্গবৈষম্য ও চরম দারিদ্র্যের শিকার হতেন। কেউ ওদের স্পর্শ করত না। ঘৃণার চোখে দেখত সমাজ। জনবসতি থেকে দূরে মাটির কুটিরে বাস করত। রসিকের পরিবারের লোকজনও ওদের ছুঁত না।
যেকোনো জেলার লোকশিল্প সেই অঞ্চলের অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষজন ধরে রাখেন। একজন ভালো শিল্পী হতে গেলে তার পিছনে থাকে কঠোর শ্রম, ধারাবাহিকতা, একনিষ্ঠতা এবং অবশ্যই যোগ্যতা। অথচ সেই শিল্পীর ভাগ্যে জোটে মানুষের গঞ্জনা আর সামাজিক লাঞ্ছনা।
মনসাপুজোর আগে এক মাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় ‘মনসামঙ্গল’ বা ‘জাঁতগান’ দলবদ্ধভাবে গাওয়া হয়। সাধারণ মানুষ ভক্তিতে আত্মহারা হয়ে মা মনসার উদ্দেশ্যে প্রণাম জানায় শিল্পীদের। অনেকে আবার বকশিশও দেয়। ঢাকিরা যখন পুজোর সময় ঢাক বাজায়, মানুষ আনন্দ করে। পুজোর পর নাড়ু, মুড়কি, পুরোনো জামাকাপড় দিয়ে বিদায় করে। তার পরে সারাবছর এদের কেউ খোঁজ রাখে না। তখন এরা অস্পৃশ্য, ঘৃণার পাত্র।
নাচনী শিল্পীদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। মঞ্চে যতক্ষণ থাকেন, ততক্ষণ শিল্পী। ঝুমুর গানে, মাদলের তালে মাতিয়ে রাখেন আসর। আনন্দ দেন দর্শকদের। কিন্তু মঞ্চ থেকে নামলেই তলিয়ে যান উপেক্ষার অন্ধকারে। অন্যকে সুখ ও আনন্দ দিলেও সুখী হওয়ার ও আনন্দ পাওয়ার অধিকার এঁদের নেই। এক অভিশপ্ত জীবনের ভার বহন করে চলেন প্রতিটি মুহূর্তে।
সেই সময়কার নাচনীদের মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন সিন্ধুবালা, মালাবতী, সুশীলা, বিমলা, পার্বতী, ভানুমতী, বালিকা, সরস্বতী, বুটনদেবী, পোস্তবালা। বর্তমানে শীলা, লীলা, কবিতা, শান্তিদেবী নাচনী হিসেবে নাম করেছেন। নাচনী নাচের পারিশ্রমিক হিসেবে বর্তমানে কাছাকাছি হলে পান দশ থেকে বারো হাজার টাকা। আর দূরে হলে পনেরো থেকে পঁচিশ হাজার টাকা। দূরত্ব ও গাড়িভাড়ার ওপর পারিশ্রমিক নির্ভর করে। একটা সময় মালাবতী ও বুটনদেবী নাচনী নাচ ধরে রেখেছিলেন। বুটনদেবী কাশীপুর ও বাঘমুণ্ডি, দুটি ঘরানাতেই নাচ করতেন। বুটনদেবী এখনও বেঁচে আছেন। নাচনীরা নিরক্ষর হওয়ার কারণে আধুনিক নাচ ও গানের তালিম নিতে পারেন না। তাই বুটনদেবী বেঁচে থাকলেও কদর নেই তেমন।
‘সেন্ট্রাল ফর কমিউনিকেশন কালচারাল অ্যাকশন’ থেকে কলকাতায় প্রথম সিন্ধুবালাদেবীকে পুরস্কার দেওয়া হয়। সেই সময় তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের ডেপুটি আধিকারিক (রাইটার্স) মানিক সরকার নিজের হাতে তাম্রপত্র পুরস্কার দিয়েছিলেন সিন্ধুবালাদেবীকে (১৯৮৪-৮৫ সাল)। এরপর লালন পুরস্কার পান সিন্ধুবালাদেবী। তিনি ১৯৭৫ সাল থেকে অল ইন্ডিয়া রেডিও এবং কলকাতার নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। অভিনেত্রী শাঁওলি মিত্র পুরুলিয়াতে এসে সিন্ধুবালাদেবীর কাছে নাচনী নাচের তালিম নিয়েছিলেন। এসব পুরস্কার শিল্পী হিসেবে সম্মান, স্বীকৃতি এবং সামাজিক মর্যাদা এনে দিয়েছিল ওঁদের জীবনে। ফলে অস্পৃশ্যতার গ্লানি থেকে পেয়েছিলেন মুক্তির স্বাদ।
পরবর্তীকালে পুরুলিয়া রবীন্দ্রভবনে নাচনীদের নিয়ে একটি সংগঠন করা হয়। ভালো নৃত্যশিল্পী (কত্থক) দিয়ে নাচনীদের আধুনিক ধ্রুপদি নৃত্য শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফলপ্রসূ হয়নি নাচনীদের অশিক্ষা ও নিরক্ষরতার কারণে।
পুরুলিয়ার বাসস্ট্যান্ডে একটি চায়ের দোকান থেকে নাচনী নাচের বায়না করা হতো। ঝাড়খণ্ড মুভমেন্টের সময় সুনীল মাহাতোরা নাচনীদের গাইড করতেন। বাসস্ট্যান্ডে দোকানটি এখনও আছে। কাজ কমে গেলেও প্রতিদিন নিয়ম করে দোকানে আসেন নাচনী ও রসিকরা। অনেকটা অভ্যাসবশত।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে সংগীত মেলায় নাচনী সরস্বতীদেবী পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন এক লাখ টাকা। পোস্তবালা নাচনী পেয়েছেন লালন পুরস্কার। তৎসত্ত্বেও নাচনীদের অবস্থা ভালো নয়। দু’একজন ছাড়া সবাই আর আগের মতো অনুষ্ঠান পান না। রসিক নাচনীদের কাছ থেকে জোর করে অনুষ্ঠানের টাকা কেড়ে নেন। অনুষ্ঠান করতে না পারলে মারধর করেন। বর্তমানে নতুন কোনো নাচনী উঠে আসছেন না। নাচনীরা অশিক্ষিত হওয়ার জন্য তাঁদের কাছে কেউ তালিম নিতে চায় না। পোস্তবালা নাচনীর মতে, রসিকবিহীন নাচনী নাচ কেউ শিখলে তবেই নাচনী নাচ বাঁচবে। গ্রামের ছেলেমেয়েদের এগিয়ে আসতে হবে।
‘দুর্বা মহিলা সমন্বয় কমিটি’ নাচনীদের সংগঠন তৈরি করে দেয়। ডঃ স্মরজিৎ জানার নেতৃত্বে দুর্বা সমন্বয় কমিটির সদস্যরা নাচনীদের উন্নয়নের জন্য কাজ করেন। পরবর্তীকালে ‘আমরা পদাতিক’ সংগঠন সেই দায়িত্ব নিয়েছে। বর্তমানে পোস্তবালা ‘নাচনী সংগঠন’-এর সম্পাদক। সরকারি ও বেসরকারি লোকশিল্প উন্নয়নমূলক সংস্থা এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠানের সুযোগ হওয়ায় নাচনীরা সামাজিকভাবে মর্যাদা পাচ্ছেন। আগের সরকার শিল্পীভাতার (ষাট বছর পর্যন্ত) ব্যবস্থা করায় শিল্পী হিসেবে সম্মান ও স্বীকৃতি যেমন পাচ্ছেন, আবার কিছুটা হলেও আর্থিক সহায়তা হচ্ছে।
সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘রসিক’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘নাচনি’ নাটকের নাট্যরূপ, নির্দেশনা ও সংগীত দিয়েছিলেন পার্থপ্রতিম দেব। নাটকটির মাধ্যমে একবিংশ শতকে দাঁড়িয়েও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী লোকশিল্পীদের জীবনের ওপর চলা অবহেলা ও শোষণ নিয়ে সামাজিক ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
নাচনী নাচ একদিকে যেমন উচ্চমানের শিল্পকলা, অন্যদিকে তেমনই প্রান্তিক নারীদের টিকে থাকার এক দীর্ঘ লড়াইয়ের দলিল।
তথ্যসূত্র: সাক্ষাৎকার
১) সুনীল মাহাতো (লোকগবেষক এবং ‘পিন্দারে পলাশের বন’ গানের রচয়িতা)।
২) পোস্তবালা নাচনী।
৩) সরস্বতী নাচনী।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।