বিশ্বজ্যোতি অনেক সহ্য করেছে। আর নয়। শিক্ষা আর বিবেকের মর্যাদা রক্ষা করতে এতদিন সে সহ্যের বাঁধকে কেবল বেঁধে বেঁধেই এসেছে — ভাঙা তো দূরের কথা, এতটুকু চিড় ধরতে পর্যন্ত দেয়নি। আজ সে-বাঁধকে সে ভাঙবেই ভাঙবে। এতে যদি তার শিক্ষার অমর্যাদা হয়, যদি বিবেক ক্ষতবিক্ষত হয়, তো হোক। বিশ্বজ্যোতি এখন প্রস্তুত যে কোনো ধরনের অপমান, অপবাদ নীরবে গিলে ফেলতে। এতদিনের শিক্ষাদীক্ষা, উপদেশ, আত্মগ্লানিকে আর সে ভয় করে না। ভয় পায় না বিবেকদংশনকে।
রাগে, অভিমানে ফুঁসছিল বিশ্বজ্যোতি। আদিম কালের কোনো প্রতিহিংসার শিখাহীন দহনে সর্বাঙ্গ যেন ঝলসে যাচ্ছিল ক্রমাগত। কোনো প্রকারে বেরিয়ে এসেছে বড়দিদির কমলালয় হতে। কাল সন্ধ্যার পর থেকে কেবলই তার মনে হয়েছে, কতক্ষণে এ বাড়ি থেকে সে বিদায় নেবে। ট্রেনের রিজার্ভেশন না থাকলে রাতেই বেরিয়ে পড়ত কোনো একটা বাহানায়। এক মুহূর্ত কাটাত না।
বিশ্বজ্যোতির তিন দিদির এই বড়দিদিটির যত্নআত্তির তুলনা হয় না। মেজদিদি, সেজদিদিরা যে আদরযত্ন করতে জানে না, তা নয়। মেজদিদির আতিথেয়তার মধ্যে অহংকারের আতিশয্য। তার অমুক জিনিস না হলে চলে না, তার স্বামীর তো চলেই না। খেতে বসিয়ে কেবল বকরবকর। হাজার ফিরিস্তি। নিজের ঢাক নিজেই বাজায়। ঝনঝন করে মাথা। মনে মনে বলে, দোহাই দিদি, এবার তোর অ্যারিস্টোক্র্যাসির গাড়িটা থামা!
সেজদি ওরফে ছোটদির বাড়ি যাবে কী, সেখানে রয়েছে সাধের দাম্পত্য কলহ। দাম্পত্য কলহই যেন তাদের দাম্পত্য প্রেম। দিদি-দাদাবাবুর সে কলহের কেন্দ্রে থাকে দিদির নয়নের মণি, একমাত্র সন্তান আলফা। দাদাবাবু চান, ছেলে পুরাতন ঐতিহ্যের ধারায় মানুষ হোক, কিন্তু দিদি চায় আধুনিক ধারা।
বড়দিদির যে দোষটি বিশ্বজ্যোতিকে চিরকাল উত্ত্যক্ত করেছে, তা হল তার হাত পাতার অভ্যাস। বড়দিদির চাওয়ার যেন শেষ নাই। নিঃসংকোচে সবকিছু সে চাইতে পারে। বাবার কাছে, মায়ের কাছে, এমনকি ছোট ভাই বিশ্বজ্যোতির কাছেও। অথচ বাবা তাকে বড় ঘরে বিবাহ দিয়েছেন। অবশ্য বাবাও দিতে কাতর নন।
এতদিন বিশ্বজ্যোতি পড়াশোনা নিয়েই কাটিয়েছে। জীবনের স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়া। একের পর এক পাশ করে গেছে মোটামুটি কৃতিত্বের সঙ্গেই। বড় চাকরি সে একদিন পাবেই। আর তখন তাকে স্পর্শ করে কে! বাবার একমাত্র ছেলে। অগাধ ভূসম্পত্তির মালিক। উৎকল ব্রাহ্মণ সমাজে তার অনেক দাম! মনে মনে হিসাব কষেছে। তিন দিদিকে দিয়েছে তিন লাখ করে। ন’লাখ টাকা বরপণ তাকে চাইতে হবে না, মেয়ের বাবারা দেওয়ার জন্য লাইন লাগাবে। উচ্চাশার এমন স্বর্গে বিশ্বজ্যোতি সেদিন বিভোর ছিল।
বাবাকে দিদিদের শোষণ তাই কি চোখে লাগত? না কি প্রচলিত শিক্ষাদীক্ষায় তার বিবেক জন্মেছিল — ভাইবোন সবাই সমান, সবার সমান অধিকার। বিশ্বজ্যোতির উদার মন ধীরে ধীরে বাস্তবমুখী হয়ে উঠল। কঠিন হলো। স্বার্থযুক্ত হল। এর জন্য কি পরিস্থিতি দায়ী?
কো-অপারেটিভ ব্যাংকের ম্যানেজার বাবা তৃতীয় কন্যার বিবাহ দিয়ে কপর্দকশূন্য হয়ে রিটায়ার করলেন। বিশ্বজ্যোতি চাকরি পেল না। বেকার ঘুরে বেড়ায় — টিউশনি করে। সারাজীবনের সমস্ত উপার্জন দিয়ে যে মেয়েদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত লেখাপড়া শেখালেন, বড় বড় অফিসার খুঁজে পাত্রস্থ করলেন, তারা কিন্তু অসহায় পিতার কথা একদিনও ভাবল না। ভাবল না বেকার ছোট ভাইটার কথা। বিবাহের পরও তারা নিস্তার দিল না। তাদের চাওয়া-পাওয়া আর শেষ হলো না। স্নেহপ্রবণ পিতারও দুর্বলতা কন্যাদের প্রতি। প্রত্যাশা পূরণ না করলে তাঁর যেন শান্তি হয় না।
এই তো সেদিনের কথা। বিশ্বজ্যোতি তখনও চাকরি পায়নি। বড়দিদি বাবার কাছে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল, পঞ্চাশ হাজার টাকা চায়। জামাই গাড়ি কিনেছে। টাকাটা একসঙ্গে পে করলে হাজার ত্রিশ টাকা বেঁচে যাবে। টাকাটা অবশ্য কয়েক মাস পরেই শোধ করে দেবে। বিশ্বজ্যোতি মনে মনে হাসে আর বলে, কমলালয় করার সময় কত টাকা ধার নিয়েছিলে দিদি, তোমার মনে আছে?
স্টেশনে পৌঁছে বিশ্বজ্যোতি দেখল, ট্রেন দু’ঘণ্টা লেট। ভালোই হলো। সমস্ত পরিকল্পনাটা বেশ করে ঝালিয়ে নেওয়া যাবে। অ্যাটাচির ওপর পা দুটো তুলে দিয়ে একটা চেয়ারে আরাম করে বসে পড়ল। সামনে টিভিতে বিদেশি অ্যানিমেশন ফিল্ম চলছে। প্ল্যাটফর্মে লোক গিজগিজ করছে। বিশ্বজ্যোতির বিষাক্ত মনে এখন প্রতিহিংসার আগুন।
বড়দিদির নির্লজ্জ কাঙালিপনা বিশ্বজ্যোতির মনে সেদিন ঘৃণার উদ্রেক করেছে — যেদিন ছোট ভাই উচ্চশিক্ষিতা বড়দিদির ন্যূনতম কর্তব্যজ্ঞান এবং বিবেক বস্তুটি অসার এবং জড়বৎ খুঁজে পেল। কিসের শিক্ষা? যে মেয়ে সর্বস্বান্ত অবসরপ্রাপ্ত পিতার অর্থনৈতিক অবস্থার কথা ভাবতে শিখল না, বেকার ছোট ভাইয়ের প্রতিষ্ঠালাভের কথা চিন্তা করল না! সে মেয়ের শিক্ষা শূন্য। মিথ্যা অর্থ ব্যয় করেছেন পিতা তার পেছনে। পণ্ডশ্রম করেছেন শিক্ষককুল।
বিশ্বজ্যোতি! শিক্ষককুল যদি তোমার জন্যও পণ্ডশ্রম না করতেন, তবে তুমি ন’লক্ষ টাকার হিসাব করতে না। পণের টাকা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার অনুশোচনায় একটি মেয়ের নীরব ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান করতে না। পণের বাকি টাকা আদায়ের জন্য কত নিচে নেমেছিলে, এত অল্প সময়ে বিস্মৃত হয়ে গেলে! তুমিও কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে নও!
লোভাতুর বড়দিদির সীমাহীন চাওয়া-পাওয়া বিশ্বজ্যোতিকে এক বিরাট আঘাত দিয়েছে। একটি বছর গড়ায়নি, বিশ্বজ্যোতি চাকরি পেয়েছে। খুশিতে গদগদ ভাষায় চিঠি এল দিদির — ভাই, তুই এখন চাকরি করছিস, এবার কিন্তু একটা ওয়াশিং মেশিন দিতেই হবে। আমি তোর দাদাবাবুকে জানিয়ে দিয়েছি। বলেছি, যা তুমি দিতে পারো নাই, তা আমার ভাই দেবে।
বিশ্বজ্যোতি কঠোর হতে পারে নাই, কৃপণ সাজতেও পারে নাই। দিদিকে সে ওয়াশিং মেশিন প্রেজেন্ট করেছিল। অন্য দুই দিদি হাসতে হাসতে শুনিয়েছিল, ভাই, ওয়াশিং মেশিন না দিস, একটা করে রুম ক্লিনার অন্তত দেওয়া উচিত আমাদের। আর তুই তো জানিস, বড়দিদি চিরকাল প্রায়োরিটি পেয়ে এসেছে। তুই নিশ্চয়ই আমাদের একেবারে বঞ্চিত করবি না। তোর কাছে অবশ্যই সাম্যবাদ এক্সপেক্ট করতে পারি।
বিয়ের সময় এমন কায়দা করে আবদার ধরল যে অতি বড় কৃপণ ব্যক্তিরও সাধ্য নাই তাকে উপেক্ষা করে। একটিমাত্র ভাই, বড়দিদিকে হীরের একটি নাকছাবি গড়িয়ে না দিলে ছোট ভাইয়ের বিবাহকে বিবাহ বলে মনেই হবে না! বিশ্বজ্যোতির ভীষণ কষ্ট হলেও হীরের নাকছাবি এনে দিয়েছিল। সে হীরের নাকছাবি এখন তার সঙ্গে অ্যাটাচির ভিতরে।
বিশ্বজ্যোতি বড়দিদির প্রতি রুষ্ট এবং বিরক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আর দিদির বাড়ি সে আসবে না। কিন্তু ভাগ্নির জন্মদিনে ভাগ্নির পুনঃপুন আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সে পারে নি।
তবু চিত্ত তার প্রসন্ন ছিল। হাসিমজার ভিতর দিয়ে দুটো দিন দিব্যি কেটে গেল। প্রসন্ন চিত্তকে সন্ধ্যার সময় বড়দিদি মলিন করে তুলল। চিরপরিচিত ইমেজটি অনায়াসে বেরিয়ে এল। স্বচ্ছ হাসি হাসতে হাসতে স্বচ্ছন্দে বলল, “ভাই, দিদিকে তুই নকল হীরের নাকছাবি দিলি!”
ক্ষুদ্র অলংকারটি বিশ্বজ্যোতির হাতে এসে পড়ল। দু’টুকরো। অর্থাৎ বস্তুটি ইতিমধ্যে জীর্ণ হয়েছে। বিশ্বজ্যোতি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। টুকরো দুটো নিয়ে অত্যন্ত ধীরে ধীরে নাড়াচাড়া করতে রইল। বড়দিদিই কথা বলল, “তোর দাদাবাবুও বলছিল, ডাউট আছে। এক কাজ কর, কাল তুই যাচ্ছিস যখন, এইটা নিয়ে যা। একবার চেক করিয়ে, ঠিক করিয়ে নিবি।”
বড়দিদি কী উদ্দেশ্যে ঘরে ঢুকতে যাবে, বিশ্বজ্যোতি অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “হায় ভগবান!”
বড়দিদি ফিরে এসে বলল, “কিছু বলছিস?”
বিশ্বজ্যোতি বলল, “না।”
বড়দিদি ফিরে এল একটা ম্যাগাজিন হাতে। একটু ব্যস্ত হওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “হ্যাঁ, শোন, এই ম্যাগাজিনটা নিয়ে যা। এই, এই ডিজাইনটা দেখছিস, এই রকম হবে। কী, তোর ভালো লাগছে না?”
বিশ্বজ্যোতি এক অদ্ভুত চাহনিতে চাইল। মাথা নাড়িয়ে বলল, “বেশ বটে।”
দ্বিগুণ উৎসাহিত হয়ে বড়দিদি বলে চলল। আর বিশ্বজ্যোতি ভাবতে লাগল, টাকার গাছ থাকলে বেশ হতো, নাড়িয়ে দিলেই টাকা পড়ত ঝরঝর।
বড়দিদি চকিতে আবার এসে বলল, “বিশু ভাই, তোকে আরেকটা কাজ করে দিতে হবে।”
মাথা গরম হয়ে যাওয়ার উপক্রম। দেখল, আবার কিছু গয়না বের করেছে কাচের সুন্দর সুন্দর বাক্স থেকে। বিশ্বজ্যোতি উত্ত্যক্ত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু কঠিন হতে পারল না। মুখ ভার করে শুধু বলল, “এগুলো আবার কী হবে?”
বড়দিদির যেন বলার সুযোগ হয়ে গেল। বলল, “তুইই দেখ। বলিস যে দিদিদের বাবা এত এত গয়না দিয়েছে! তার অবস্থাটা নিজের চোখেই দেখ। সব ভেঙেফুটে একাকার।”
বুঝতে আর বাকি রইল না নাটকের অবশিষ্টাংশ। এখন অপেক্ষা, মডেলের বই কখন বাহির হয়!
বড়দিদি বলল, “তোর সময় হবে তো?”
না — ভিতরে ভিতরে ভীষণ কঠিন হচ্ছিল, কিন্তু অপ্রিয় কথা শোনাতে পারল না। প্রবল অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলল, “দাও। চেষ্টা করে দেখব। না হলে না হবে।”
বড়দিদি ভ্রু দুটো উপরে উঠিয়ে হাসিমুখে বলল, “এসবের রিপেয়ারের টাকা তুই যেন না দিস। বাবাকে দিতে বলবি।” একটু থেমে বলল, “বাবাকে একটা চিঠি লিখে দেব?”
বিশ্বজ্যোতি সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো শান্ত গলায় বলল, “আবার চিঠি লিখবে কেন?”
বড়দিদি অত্যন্ত সহজ হয়ে বলল, “তবে আর লিখছি না।” এবার নিচু গলায় বলল, “বাবাদের পেনশন তো আবার বেড়ে গেল!”
বিশ্বজ্যোতি ক্রুদ্ধ সিংহের মতো বড়দিদিকে একবার চেয়ে দেখল, কিন্তু গর্জনের কোনো বহিঃপ্রকাশ হল না। স্বাভাবিক গলায় বড়দিদি এবার দ্রুতলয়ে বলে চলল, “গভর্নমেন্ট এখন তোদেরই। তোর দাদাবাবু মাথায় হাত চাপড়ে হায় হায় করছে। গভর্নমেন্ট জব সেদিন নিল না কম পয়সার জন্য, আর আজ! দশ বছর পরে তো তোদের টাকা রাখার জায়গা হবে না রে! জ্যোতিবাবুকে দুবেলা পুজো করা উচিত তোদের।”
ট্রেনের খবর বাজল মাইকে। বিশ্বজ্যোতি অ্যাটাচি খুব সাবধানে নিয়ে চলল প্ল্যাটফর্মের দিকে। তিন ভরি সোনার গয়না, একটি হীরের নাকছাবি। বিশ্বজ্যোতি জেনে গিয়েছে, এগুলি সমস্তই চুরি যাবে আজকালের মধ্যে। সীমাহীন লালসা আর চাতুর্যকে সে আর ক্ষমা করবে না। ভালোবাসার ছলে শোষণ করার সুযোগ আর কাউকে সে দেবে না। সামাজিকতার অপর নাম যদি নিজেকে নিঃশেষিত করা হয়, তবে সামাজিকতাকে সে ঘৃণা করে। সামাজিকতা যদি মানবিকতার মূলসূত্রগুলি জলাঞ্জলি দেয়, তবে চাই না তার সামাজিকতা। চায় না মিথ্যা সম্পর্কের মুখরোচক বন্ধন। সমাজে সে আত্মীয়পরিজনহীন নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করবে। নাই দেখাল কেউ সহানুভূতি, নাই দাঁড়াল পাশে এসে কেউ, নাই দিল সান্ত্বনা।
রাতের বেলা বিশ্বজ্যোতি অ্যাটাচিটাকে চেন দিয়ে মাথার কাছে ভালোভাবে বেঁধে ঘুমাবার চেষ্টা করল। ভীষণ ক্লান্তি বোধ করছে। চোখ বুজে ভাবতে লাগল — আগামীকাল তাকে কী কী করতে হবে! হাওড়া স্টেশন... জুয়েলারি দোকান... ব্যাংক... ঘর... তারপর অভিনয়...
বিশ্বজ্যোতি উপুড় হয়ে বালিশে মুখ লুকাল। উর্মিলা গলার ভলিউমটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “কী হয়েছে বলবে তো? শরীর খারাপ নয় তো?”
বিশ্বজ্যোতি ধরা গলায় বলল, “না।”
“তবে এরকম চেহারা কেন? এভাবে শুয়ে রইলেই বা কেন?” আশপাশ দেখে নিয়ে উর্মিলা জিজ্ঞাসা করল, “অ্যাটাচি নিয়ে গিয়েছিলে না?”
বিশ্বজ্যোতি বালিশে মুখ চেপে গমগমে গলায় জানাল, “চুরি হয়ে গেছে।”
“ওহ্! তাই তো বলি, কিসের এত শোক! তা শোকের আছেটা কী শুনি! দিদিকে দিয়েথুয়ে শূন্য হাতেই তো ফিরছিলে। ভাঙাফুটো অ্যাটাচিটার জন্য এত দুঃখ!”
জ্বলে উঠল বিশ্বজ্যোতি। হিংস্র দৃষ্টিতে স্ত্রীকে দেখতে দেখতে বলল, “খবরদার! বলেছি না, দিদিদের সম্বন্ধে কোনোদিন তুমি ব্যঙ্গোক্তি করবে না।”
উর্মিলা ঠোঁট উল্টে বলল, “সরি। শোকাহত হয়ে তুমি থাকো। রাঁধুনির অধিকার রান্নাঘরেই থাক, যাই...”
উর্মিলা বাহির হতে যাবে, দেখল, সামনে শ্বশুরমশাই। বিমলেশবাবু বললেন, “বউমা, বিশ্ব ফিরেছে?”
উর্মিলা ঘোমটা টেনে মৃদু ভাষায় জানাল, “হ্যাঁ বাবা। ট্রেনে তার অ্যাটাচি চুরি গেছে।”
বিমলেশবাবু ছেলের কাছে এসে মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে স্নেহসিক্ত কণ্ঠে বললেন, “ফিরলি কখন? সবাই ভালো তো?”
অ্যাটাচি চুরির খবরে একটুও বিচলিত হলেন না। বিশ্বজ্যোতি নিশ্চুপ হয়ে পড়ে রইল বিধ্বস্ত অবস্থায়। বিমলেশবাবু মৃদু ভর্ৎসনা করে বললেন, “ট্রেনে জিনিসপত্র সাবধানে রাখতে হয়! ওঠ। চেহারা কী হয়েছে! সকালে কিছুই খাসনি তো। বউমা...”
বিশ্বজ্যোতি উঠে বসে করুণ কণ্ঠে বলল, “চেন কেটে নিয়েছে।”
বিমলেশবাবু সান্ত্বনা দিলেন, “নিয়েছে তো কী হবে? মন খারাপ করতে হবে না, ওঠ।”
বিশ্বজ্যোতি এবার বাষ্পরুদ্ধ গলায় বলল, “ওর মধ্যে বড়দিদির অর্নামেন্ট ছিল, বাবা।”
এমন সময় উর্মিলা এসে দাঁড়াল। বউমাকে লক্ষ্য করে বিমলেশ বললেন, “বউমা, শুনেছ? এর মধ্যে সোমার গহনা ছিল। এজন্য বিশ্ব কাঁদতে বসেছে। বোকা কোথাকার। যা, হাতমুখ ধুয়ে নে। ওর আরও অনেক গয়না আছে।”
উর্মিলা বলল, “দিদির গয়না কী জন্য নিয়ে আসছিলে?”
বিমলেশবাবু বললেন, “আমি জানি বউমা। নিশ্চয়ই মেরামতির কাজ। মেয়েটা এরকমই। শাড়ি-গয়না ছাড়া জীবনে আর কিছু চিনল না। ভেবেছিল, ভাইয়ের দৌলতে কাজটা করিয়ে নেবে। হল হিতে বিপরীত। বেশ হয়েছে — যা। অফিসে যাবি তো আজ, না ফ্রেঞ্চ লিভ!”
উর্মিলা হাসতে হাসতে বলল, “না বাবা, ও শব্দের মিনিং আপনার ছেলের জানা নেই।”
বিমলেশবাবু গর্বভরে হাসলেন। বললেন, “কার ছেলে, দেখতে হয়!”
বাবাকে যতই দেখছিল, ততই অবাক হচ্ছিল বিশ্বজ্যোতি। স্নেহের স্পর্শে সহসা তার দু’চোখ দিয়ে অশ্রুধারা ঝরতে লাগল। ছেলেকে বুকে চেপে বিমলেশবাবু কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “বোকা, তুই কী এমন হারিয়েছিস যে কাঁদছিস! বউমা, তুমি সোমাকে একটা ফোন করো তো।”
উর্মিলা দ্বিধান্বিত হয়ে বলল, “কী বলব!”
“তুমি লাইনটা ধরো বউমা, আমি বলছি।”
বিমলেশ বউমার পিছে পিছে ড্রয়িংরুমে গেলেন। মাউথপিসে হাত রেখে উর্মিলাকে বললেন, “যাও বউমা। বিশ্বকে নিয়ে এসো। বলো, সোমা কথা বলবে।”
ফোনের ওপ্রান্ত থেকে ভেসে এল বড়দিদির গলা, “হাঁদারাম, দিদির সম্পত্তি হারিয়ে এখন বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদতে বসেছ!”
বিশ্বজ্যোতির মনে হল, কে যেন বলছে, বড়দিদির গয়না চুরি করে এখন অভিনয় হচ্ছে! মাটির সঙ্গে মিশে যেতে তার ইচ্ছা হচ্ছে।
নির্বাক বিশ্বজ্যোতি শুনছে বড়দিদির কথা, “ভাই, কাঁদিস নে ভাই। সামান্য অলংকার বই তো নয়! আর ও দিদির সম্পত্তি নয় রে ভাই! ও যে তোরই সম্পত্তি! তোর এই অবোধ কাঙাল বড়দিদি নির্লজ্জের মতো কখনও বাবার কাছে, কখনও তোর কাছে, মা বেঁচে থাকতে — কখনও তাঁর কাছে হাত পেতে পেয়েছি।
ফোনটা হাত থেকে সশব্দে মাটিতে পড়ে গেল। বিশ্বজ্যোতি হাউহাউ করে কাঁদছে। এই অশ্রু যেন তার অন্তরের ময়লা ধোয়া জল। ভাইয়ের হৃদয়ে সঞ্চিত ময়লাকে দিদি তার স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে যেন ধুয়ে দিয়েছে। বিশ্বজ্যোতি এখন নিভৃতে কাঁদছে... কাঁদছে শুধু এই ভেবে, বড়দিদির ওপর অভিমান করে যে নিচে সে নামতে গিয়েছিল, কোনো অদৃশ্য দেবতা সেই গ্লানিময় পাপক্লিষ্ট পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছে। চিরকলঙ্কের দাগ থেকে রক্ষা করেছে।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।