স্বর্গ দেখতে ঠিক কেমন তা এই একজোড়া চোখ প্রত্যক্ষ করেনি কখনও, তবে ২০২৪ সালে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে পায়ের তলায় সর্ষে নিয়ে হিমাচল প্রদেশের সিমলা স্হিত কল্পা-কিন্নর দর্শন করে স্বর্গের অনুভূতিই যেন কলকাতায় নিয়ে ফিরলাম। কলকাতা টু কালকা যাত্রার মিল শুধুমাত্র 'ক' বর্ণের প্রতিধ্বনিতে আটকে ছিল না, উপরন্তু দুটো শহরেই কালীমাতার অবস্থানজনিত অণুরণন ভ্রমণের আগাগোড়া সুরটি বেঁধে দিয়েছিল।
যাইহোক, সঙ্গে পরিবার ও পারিবারিক বন্ধুদের নিয়ে জয়কালী বলে কালকা টু সিমলা টয়ট্রেন জয়রাইড উপভোগ করেছিলাম। ছবির মত শহর টয়ট্রেনের জানালা-দরজা দিয়ে বাকি ভ্রমণের জন্য হাতছানি দিয়ে যাচ্ছিল। একদিন সিমলা শহরে কাটিয়ে সিমলা ম্যাল ঘুরে দেখা হল। একটু পাহাড়ি বৃষ্টির খপ্পরেও পড়তে হয়েছে, আর তাই মাথা বাঁচাতে কিনেই ফেলেছিলাম কিছু রেনবো আর জলপাই রঙের ছাতা।
তারপর একে একে দর্শন করা গেল সিমলা কালী মন্দির, জাখু হনুমান মন্দির ও সিমলা চার্চ।
জানিয়ে রাখি, আমাদের এই পারিবারিক যাত্রাটি সম্পূর্ণই সম্পন্ন হয়েছিল টেম্পো ট্র্যাভেলারে করে। এও জানিয়ে রাখি, কলকাতা থেকেই আমরা আমাদের পাহাড়ি যাত্রার বাহন ও হোটেল ও কিছু হোম স্টে প্রি-বুকিং করে গিয়েছিলাম।
সিমলা থেকে আমাদের গন্তব্য ছিল সারাহান। সাড়ে তিন ঘন্টার জার্নি কার্য ক্ষেত্রে লেগে গেল সাড়ে ছয় ঘন্টা। কারণ? কারণ আর কিছুই না, গ্রীনভ্যালি হয়ে যাবার সময় রোঘি গ্রামের কাছেই একম অদ্বিতীয়ম ধস। যাইহোক, মনোরম পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে দৃশ্যগুলি, এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায় দেখ। মনোমুগ্ধকর আপেল বাগান আর পাইন গাছের ফাঁকে দূরে বরফাবৃত চূড়ায় অস্তমিত সূর্যের আলো আর পাখির কাকলি মিলে এক প্রাকৃতিক লাইট সাউন্ডের প্রদর্শনী প্রাণভরে দেখলাম। পৌঁছলাম সারাহানে। পরদিন সারাহানের বিখ্যাত ভীমাকালী মন্দির দর্শন করলাম।
এখানে বলতেই হয় যে, ভীমাকালী মন্দির সহ এরপর সাংলা ও রাকসামে যত বিষ্ণু, শিব ও মাতা-মন্দির ও বৌদ্ধ মঠ দেখেছি, সবক্ষেত্রেই কাঠের ওপর অনেকটা আমাদের বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা কাজের মত লেগেছে। কোন কোন গ্রাম পায়ে হেঁটে ঘুরেছি, দেখেছি কোথাও কোথাও জনসংখ্যা ১০০০ জনেরও কম আর ভূমিপুত্র-কন্যাদের মুখের আদল ও শারীরিক গড়ন, এবং ভাষাতে ইন্দো-তিব্বতি প্রভাবের সুস্পষ্ট সংমিশ্রন। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার মাথায় চোখে পড়ল এথনিক বিশেষত সবুজ হিমাচলি টুপি। আমরাও সেরকম কিছু টুপি কিনলাম, এবং তা মাথায় চাপিয়ে কিন্নরে সুইসাইড পয়েন্টে বিশেষ বিশেষ ফটোজিনিক পোজে অনেক ছবি, সেলফি ও গ্রুপফি নেওয়া হল।
উল্লেখযোগ্য, বেশ কিছুদিন শুধু আলুর পরোটা আর গতানুগতিক হিমাচলি চালের তৈরী ভাতের থালি খেয়ে বাঙালির পেটে চড়া পড়ে গেছিল। আর সেক্ষেত্রে দুদিন কল্পায় অবস্থান কালে আমাদের রক্ষা করলেন আরেক বাঙালি বিশ্বজিত বাবু, যিনি ওখানে হোটেল ব্যবসায়ী, আর জানা গেল আদতে কলকাতার কেষ্টপুরবাসি। ভদ্রলোক ডাল, ঘি, আলুসিদ্ধ আর রাতে কচি পাঁঠার মাংসের ব্যবস্থা করে সে যাত্রায় 'বাঁচিয়েছিলেন'।
এরপর আমাদের গন্তব্য ছিল চিটকুল। জানিয়ে রাখি, যদি অফবিট জায়গায় ভ্রমণ করাই আপনার ছন্দ বজায় রাখে, তাহলে আপনার তালিকায় চিটকুল অবশ্যই থাকা উচিত!
কিন্নর সাংলা উপত্যকার মনোরম পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত চিটকুল। একজন অ্যাডভেঞ্চার প্রেমিকের আনন্দ ও একজন ভূগোল উত্সাহীর । স্বর্গসমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১১,৩১৯ ফুট উপরে, চিটকুল একটি স্বর্গ যা খানিকটা দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছতে হয়।। জীবনে যা কিছু পাওয়া যায় তা সহজে আসে না, তাই চিটকুল অবশ্যই সেই তালিকায় থাকা উচিত।
চিটকুলের মতো হ্যামলেটগুলি পায়ে হেঁটেই সবচেয়ে ভালো আবিষ্কৃত হয় - ছোট ছোট গলিপথগুলি ঘুরে দেখুন এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর অনুভূতি পান। গ্রামটির জনসংখ্যা মাত্র ১০০০-এর নিচে এবং সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ে সমৃদ্ধ।
চিটকুলে কিছু মন্দির আছে মাতা দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। কম্পাউন্ডগুলি সুন্দর কাঠের স্থাপত্যের নিদর্শন।
নিঃসন্দেহে, আপনাকে বাসপা নদীর তীরে হেঁটে যেতে হবে, এবং হিমবাহের জলে আপনার হাত ডুবিয়ে আপনার আত্মাকে পুনরায় জাগিয়ে তুলতে হবে। স্ফটিক-স্বচ্ছ জল আপনাকে মুগ্ধ করে রাখবে।
এখানে জাদুকরী ও মনোমুগ্ধকর রঙ বেরঙের জমির ঢালগুলি রাজকীয় দেবদারু এবং চিলগোজা গাছ দ্বারা আবদ্ধ। বাসপা উপত্যকায় প্রচুর পরিমাণে বাগান রয়েছে, যা বিশ্বের সেরা কিছু 'গোল্ডেন অ্যান্ড রয়্যাল ডেলিসিয়াস' আপেল সরবরাহ করে। এছাড়াও, উপযোগী আবহাওয়া এবং উর্বর মাটির কারণে এই বসতিটি তার উচ্চ মানের আলুর জন্য বিখ্যাত।
চিটকুল ইন্দো-চীন সীমান্তে অবস্থিত ভারতের দিক থেকে শেষ গ্রাম। চোখে পড়বে ভারত সীমান্তের শেষ বিদ্যালয় ও শেষ ধাবা। বাসপা নদী বয়ে চলেছে আপন খেয়ালে, নদীর পাড়ে শুধু বিভিন্ন আকারের নুড়িঁ পাথর — কোনোটা যেন মহাদেব আবার কোনোটা যেন শালগ্ৰাম বিষ্ণু শিলার রূপ পেয়েছে। ঝর্ণা ও জলপ্রপাতগুলি যেন প্রকৃতির উদারতার সাক্ষ্য বহন করে। রবিঠাকুরের গান তখন কানে বাজে — 'আমি কান পেতে রই'। ভ্রমণ শেষে বাড়ি ফেরার পালা অবধারিত তবে কান এখনও পাতা 'ঝর্ণা তলায় নির্জনে'।