দীপুর ঘুম ভাঙলো একটু দেরি করে। আজ কি মোবাইলের অ্যালার্মটা বাজে নি? কিন্তু কেন?
যাহ! মোবাইলটা অফ্ হয়ে আছে! অনেক চেষ্টার পরেও ওই কাঁচের বাক্সে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারলো না দীপু। সময় কত হল সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। বাড়িতে দেয়াল ঘড়ির পাট অনেক আগেই চুকিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে।
ফ্রেশ হয়ে সকালের জলখাবার বানিয়ে খাবার টেবিলে বসে খাচ্ছে দীপু। অভ্যাসবশত খাবারের প্লেট খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। ইস, এটা নিয়ে একটা স্টোরি পোস্ট করা যেতো! কিন্তু 'শেয়ার' করার কোনো উপায় না থাকায় খাবারটা তার কাছে অদ্ভুতভাবে ধূসর মনে হতে লাগল। দীপু এক গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল — “যদি এটার আমি একটা ছবিও না পোস্ট করতে পারি, তবে আমি সত্যি এটা খেয়েছি তার প্রমান কী?”
সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মমাফিক উপস্থিতি না দিতে পারলে দীপুর কি কোনো আদৌ অস্তিত্ব আছে? হোয়াটস্যাপ মেসেজ, ফেসবুক নোটিফিকেশন, টুইটার ট্রেন্ড, ইনষ্টা স্টোরি — এগুলোই তার জীবনের অক্সিজেন। সে নিজেকে মহাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতে লাগলো । শুধু একটা যন্ত্র হারানো নয় — তার কাছে এ যেন শরীরের কোনো একটা অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো অসহায়তা।
কোন কিছুই ভাল লাগছে না। কোন কিছু করতে উৎসাহ পাচ্ছে না। “ধুস, আর নেওয়া যাচ্ছে না!” এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে শেষে ঘুমিয়ে পড়লো দীপু। যখন ঘুম ভাঙল, দুপুর গড়িয়ে গেছে। বেশ খিদে পেয়েছে। অর্ডার করে খাবার আনানো যাবে না, অতএব 'আদিম মানব'-এর মত খাবারের সন্ধানে বের হতে হবে!
খেতে খেতে আশপাশ চেয়ে দেখছিলো দীপু। তখন দোকানের সামনেই একটা পার্ক চোখে পড়লো। দীপু কতদিন কোন পার্কে ঢোকেনি! খাওয়ার পর পার্কে গিয়ে একটা খালি বেঞ্চে বসে পড়লো। সামনেই একটা ঘনসবুজ মেহগনি গাছ। পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছটা কত উজ্জ্বল লাল! আগে সে কেবল ফোনে নানা ফিল্টারের বৈচিত্র্য দেখত, আজ দেখল সত্যিকারের রঙ।
কোথা থেকে যেন একটা কোকিলের গান ভেসে আসছে। এখন তো বসন্তকাল, কোকিল তো মাঝেমধ্যে তাহলে আগেও গান গেয়েছে। কিন্তু সে আজই প্রথম শুনতে পেল! শুনতে পেল অন্যান্য পাখির কিচিরমিচিরও । পাখিরা যেন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা, ঝগড়াঝাঁটি করছে। এইসব আওয়াজ এতদিন তার হেডফোনকে ডিঙ্গিয়ে উঠতে পারেনি।
ফেরার পথে বাড়ির কাছেই সে লক্ষ্য করল একটা লাইব্রেরি, ছোট — কিন্তু চোখে না পড়ার মতো নয়। তবু এটার অস্তিত্ব দীপু আগে কখনও খেয়ালই করেনি। এর মধ্যে আবার আকাশের মেঘগুলো কখন যেন অদ্ভুত বেগুনি রঙ ধারণ করে ফেলেছে।
দীপু এবার তার ফ্ল্যাটে ফিরে এল। এখানে সে একাই থাকে, কিন্তু একাকিত্ব ছিল না; হাজার হাজার ভার্চুয়াল মানুষের ভিড়ে সে ছিল সারাক্ষণ নিমজ্জিত। হঠাৎ মনে হলো তার জীবন যেন সাজানো কোনো নাটকের মায়াজালের অংশ। এতদিন তার অস্তিত্ব যেন কেবল হাই-রেজোলিউশনের পিক্সেলের সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ভাবতে ভাবতে খেয়াল হলো — পরিকল্পনা মতো নতুন ফোনটা কেনা হয় নি!
পরদিন দীপু আবার বেরোলো। হাঁটতে হাঁটতে একটা গলির মধ্যে পুরনো একটা ঘড়ির দোকান দেখতে পেল। ভেতরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। আধুনিক মেরামতের দোকানের মতো সার্ভারের গুঞ্জন নেই। কেবল নানা ধরণের ঘড়ির ‘টিক-টিক' শব্দ।
দোকানের মালিক একজন বয়ষ্ক লোক — সোমনাথ বাবু। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “বলো?”
— “আপনার দোকানে তো অনেক পুরনো ঘড়ী আছে।”
— “তোমার কি ডিজিটাল দরকার ?”
দীপু এক মুহূর্ত ভেবে জানালো, “না।” কারণ ফোন কিনতে বেরিয়ে দীপু কেন পুরোনো ঘড়ির দোকানে ঢুকে পড়েছে, সে নিজেও বোঝে নি।
দীপু লক্ষ করে সোমনাথ বাবু অনেকক্ষণ ধরে একটা পুরনো ঘড়ি সারাচ্ছেন। দীপুও ধৈর্য ধরে ঘড়ি সারান দেখতে থাকে। তার মনে হলো, একটি ছোট গিয়ার ঠিক করতে যে সময় লাগে, সেই সময়টুকু সম্ভবত নিজের সাথে কাটানো শ্রেষ্ঠ সময়গুলোর একটা।
দীপুর মনে হলো ওর মনের ভেতর থেকে 'ডিজিটাল কুয়াশা' কাটতে শুরু করেছে এবং তার বদলে জায়গা করে নিচ্ছে খুব স্বচ্ছ চেতনাবোধ।
হঠাৎ গতকালের সেই পার্কটা তাকে যেন পরম মমতায় ডাকতে লাগল। দীপু পৌঁছে গেল সেখানে। বসল সেই বেঞ্চটায়। দেখল সামনের মেহগনি গাছটা কেবল ‘সবুজ’ নয়। সেটা যেন পান্না আর সোনালি রঙের এক উত্তাল সংমিশ্রণ। সে খেয়াল করল বাতাসের ঝাপটায় গাছের পাতার শব্দ অনেকটা ঝরনার মতো — এমন একটা সূক্ষ্ম অনুভূতি যা কোনো মাইক্রোফোন কখনও ধারণ করতে পারবে না।
কয়েকদিন আগেও সে এভাবে সময় বয়ে যেতে দিত না। অবসর সময়ে সে তার ডিজিটাল ব্রান্ডের কনটেন্টর ব্যাপারে মাথা ঘামাত। সবসময় একটা চিন্তা তাড়িয়ে বেড়াতো — যা ‘অনলাইনে অ্যাভেইলেবল’ নয়, সমাজের চোখে তার কোনো অস্তিত্বই নেই।
পার্কে একদল বাচ্চা লুকোচুরি খেলাছিল। আগে হলে সে এটাকেও কোনো ট্রেন্ডিং অডিও লাগিয়ে একটা ‘হিউম্যান বন্ডিং স্টোরি’ হিসেবে পোস্ট করত। কিন্তু আজ দীপু শুধু ওদের আনন্দের ব্যাকরণটা অনুভব করছিল। একসময় সে নিজেই ওদের সাথে খেলায় মেতে উঠল।
চোখ বন্ধ করে “এক-দুই-তিন...” গুনতে গুনতে দীপু হঠাৎ অনুভব করল, গত এক দশক ধরে সে কেবল তথ্য সংগ্রহ করে গেছে, কিন্তু যোগাযোগ করতে ভুলে গেছে। তথ্য হলো ডেটা; আর যোগাযোগ হলো ঘাড়ের ওপর দুপুরের রোদের উষ্ণতা। এই জীবনটা ফিল্টারহীন, অগোছালো, কিন্তু ভীষণ জীবন্ত।
দু'মাস পরের ঘটনা। দীপু সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারের কাজ ছেড়ে এখন তার জমানো টাকা দিয়ে একজন ল্যান্ডস্কেপ আর্কিটেক্টের কাছে কাজ শিখছে। পার্ক এবং বাগান তৈরি করার কাজ — যেখানে মানুষ ও মাটি কাছাকাছি। নখে কাদা ঢোকে। তার হাতের আঙ্গুল যা আগে কেবল কি-বোর্ড আর মাউসের সংস্পর্শে আসতো, এখন তা মাটি আর কাদার ছোঁয়া পায়, হাতে লেগে যায় মাটির সোঁদা গন্ধ। সেই গন্ধ তার ভেতরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয় । একটি বীজ থেকে চারা বের হওয়ার যে আনন্দ, তা কয়েক হাজার ‘লাইক’ পাওয়ার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি শক্তিশালী।
সে এখন আর ইন্টারনেটে ব্যবহার করে আবহাওয়া দেখে না, আকাশের মেঘের গতি দেখে বুঝতে পারে কখন বৃষ্টি আসবে। সে পাখির ডাক শুনে আন্দাজ করতে পারে ভোর কটা বাজে! সে বোঝে যে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় বন্দী করা অসম্ভব — কারণ যখনই সেই মুহূর্তটিকে অন্যদের দেখানোর জন্য ফ্রেমে আটকানোর চেষ্টা করবে, তখনই নিজে সেই মুহূর্তটা বাঁচা বন্ধ করে দেবে। তার জীবন এখন আর ভার্চুয়ালি 'লিঙ্কড' নয়, পুরোপুরি বাস্তব।
তার দীর্ঘদিনের অনিদ্রা রোগ সেরে গেছে। স্ক্রিনের নীল আলোর প্রভাব কাটিয়ে সে প্রাকৃতিক ঘুমের প্রশান্তি ফিরে পেল।
মাঝে মাঝে তার মনে হয়, সেদিন তার ফোনটার সাথে মরে গেছিলো তার জীবনের সমস্ত কৃত্রিমতা আর বোঝা। আজ সে মুক্ত। তার কোনো পদক্ষেপ এখন আর অ্যালগরিদম ঠিক করে দেয় না, সে নিজেই তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের নির্মাতা।
হ্যাঁ, একটা স্মার্টফোন সে এখনো ব্যবহার করে, কিন্তু সেটা তার জীবনের মালিক নয়, কাজের সরঞ্জাম মাত্র।
লেখক মাল্টিমিডিয়ায় স্নাতকোত্তর। বর্তমানে গ্রাফিক ডিজাইন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করেন। তিনি দমদম মতিঝিল স্কুল এবং দমদম মতিঝিল বিজ্ঞান কলেজ থেকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। বিভিন্ন ধরনের শিল্পকলার প্রতি তাঁর আগ্রহ রয়েছে। ভ্রমণ ও ফটোগ্রাফি তাঁর অন্যতম নেশা। সম্প্রতি তিনি লেখালেখি শুরু করেছেন। ‘নিল বৃত্তের ওপারে’ তাঁর প্রথম লেখা। তিনি নতুন যুগের সমস্যাগুলি পাঠকের কাছে প্রকাশ করতে পছন্দ করেন।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।