ওঁ সর্ব্ব-মঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্ব্বার্থ-সাধিকে।
শরণ্যেত্র্যম্বকে গৌরি নারায়নি নমোহস্তুতে।।
আমাদের ধর্ম্মের নাম সনাতন ধর্ম। আমাদের পূর্ব পুরুষগণ অনেকেই সিন্ধু নদীর নিকটবর্তী স্থানে বসবাস করতেন। তাই প্রচলিত ভাষায় আমরা হিন্দু বা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। শ্রী শ্রী দুর্গা পূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জগন্মাতা বিষ্ণু শক্তি স্বরূপিনী মা মহামায়ার শক্তি আরাধনা।
বছরে দুই বার মা মহামায়ার অর্চনা করা হয়। বসন্ত কালে বাসন্তী পূজা আর শরৎ কালে শ্রী শ্রী দুর্গা পূজা। শরৎ কালের দুর্গা পূজাকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শারদীয় দুর্গোৎসব বা বড় পূজা হিসেবে উদযাপন করে থাকেন। শ্রী শ্রী দুর্গাদেবী দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন। মা মহামায়া জীবনের দুর্গতি নাশ করেন বলেও তাঁকে দুর্গা (দুর্গতি নাশিনী) বলা হয়। যে শক্তি দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ, ভয় ও শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেন তিনিই দুর্গা। বসন্ত কালে অনুষ্ঠিত দুর্গা পূজা বাসন্তী পূজা নামে অভিহিত।
দেবী ভাগবত পুরাণের মতো গ্রন্থে দুর্গামাসুর বধের প্রসঙ্গের সঙ্গে মায়ের শতাক্ষী ও শাকম্ভরী রূপের কথাও যুক্ত আছে। দুর্গামাসুর পৃথিবীতে এক ভয়াবহ ১০০ বছরের খরা ও দুর্ভিক্ষ ঘটিয়েছিল। শতবর্ষব্যাপী অনাবৃষ্টির সময়ে মা শতাক্ষী রূপে আবির্ভূত হলেন, তাঁর অশ্রুতে শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলো পূর্ণ হলো এবং অসুর বধ করার আগে সমস্ত জীবকে খাওয়ানোর জন্য তিনি নিজের শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে ফল, শাকসবজি ও উদ্ভিদ উৎপন্ন করলেন। নিজের দেহ থেকে উৎপন্ন শাকের দ্বারা সমগ্র জগতের প্রাণধারণের ব্যবস্থা করায় তাঁর নাম শাকম্ভরী। মা অসুর বিনাশ করেন, আবার ক্ষুধার্ত জীবজগতের পোষণও করেন।
সেই থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শরৎ কালে শ্রী শ্রী দুর্গা পূজা করে থাকেন। দুর্গতি নাশিনী মা মহামায়ার শক্তি পূজার্চনায় শরৎ কালে পূজার পূর্বদিন সায়ংকালে বোধন করে মাকে জাগ্রত করে নিতে হয়।
দুর্গা পূজা বৈদিক পূজা। মাকে জাগ্রত করার মন্ত্রে আছে — “রাবণস্য বধার্থায় ..., অকালে ব্রহ্মনা বোধো দেব্যস্ত্বয়ি...”। ভগবান শ্রী রামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য অকালে দুর্গা পূজা করেছিলেন। শ্রী শ্রী দুর্গা পূজায় মায়ের অষ্টোত্তর শতনাম পাঠ করা হয়। দেবতাদের স্তব-স্তুতিতে মা দুর্গা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়ে তাঁদের রক্ষা করেছেন। আমরা মহিষ মর্দ্দিনী রূপের পূজা করি। মন্ত্রে আছে — “প্রভাতে যঃ স্মরেন্নিত্যং দুর্গা দুর্গাক্ষর দ্বয়ম। আপদস্তস্য নশ্যন্তি তমঃ সূর্য্যোদয়ে যথা।” দুর্গা পূজা করলে মনোস্কামনা পূরণ ও সর্ব্ব সিদ্ধি লাভ হয়।
শ্রী রামচন্দ্রের এই অকালবোধনের কাহিনি কৃত্তিবাসী রামায়ণে পাওয়া যায়। আবার কিছু পুরাণের বর্ণনায় রামচন্দ্রের জন্য ব্রহ্মা দেবীর বোধন করেন। বোধন অর্থ জাগরণ। এই আচারে বিল্ববৃক্ষ বা তার শাখায় দেবীর জাগরণের প্রার্থনা করা হয় সাত্ত্বিক ভাবে দুর্গা পূজা করতে হয়। বৈদিক রীতি অনুসারে পূজার্চনা, স্তব, দেবী মাহাত্ম্য শ্রী শ্রী চণ্ডী পাঠ ইত্যাদি করতে হয়।
দেবত্ব, ধর্ম, সত্য, সাত্ত্বিকতা ও অন্যান্য সব বাঁচিয়ে রাখতে হলে চাই শক্তি। সে শক্তি আসে সর্ব্ব শক্তির আধার দুর্গা দেবী থেকে। মহর্ষি মার্কণ্ডেয় এই পুরাণের বক্তা এবং ক্রৌষ্টকি ভাগুরি হলেন শ্রোতা। শ্রী শ্রী চণ্ডী মার্কণ্ডেয়-পুরাণ অন্তর্গত। এই শ্রী গ্রন্থে ১৩টি অধ্যায় — ৭০০টি মন্ত্র ও ৫৭৮টি শ্লোক আছে।
এক সময়ে রাজ্য হারা হয়ে চৈত্র বংশের রাজা সুরথ, ও স্ত্রী, পুত্রাদি দ্বারা বিতাড়িত হয়ে ধনী বৈশ্য সমাধি একটি তপোবনে আশ্রয় নিলেন। মায়ার কারণে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি রাজ্যের প্রজা ও অন্যান্যদের জন্য চিন্তিত। দুই জনে পরামর্শ করে ঐ তপোবনে সাধনারত মুনি মেধার নিকটে গেলেন। তাঁরা মুনিবরের কাছে এই মায়ার কারণ জানিতে চাইলেন। মেধা মুনি তাঁদের দু’জনকে বললেন — এ সব হচ্ছে মা মহামায়ার মায়া। তপস্যা করে মা মহামায়াকে তুষ্ট করতে পারলে তিনি মায়ার পর্দা সরিয়ে নিবেন।
মেধা মুনি আরও জানালেন — একবার সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার স্তবে তুষ্ট হয়ে নিদ্রারূপিণী দেবী ভগবতী যোগমায়া ভগবান বিষ্ণুর শরীর থেকে যোগনিদ্রা অপসারণ করেছিলেন। তখন ভগবান বিষ্ণু জাগ্রত হয়ে মধু ও কৈটভ দুই অসুরকে বধ করেছিলেন। আর একবার দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হয়ে দেবী মহিষাসুরের সৈন্য বধ করেছিলেন। আর একবার দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হয়ে দেবী মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। আর একবার দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হয়ে অসুর ধূম্রলোচনকে বধ করেছিলেন। আর একবার দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হয়ে শুম্ভ নিশুম্ভের দুই সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেছিলেন। আর একবার দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হয়ে শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামের দুই অসুর ভাইকে বধ করেছিলেন। আর একবার দেবতাদের স্তবে তুষ্ট হয়ে অসুর রক্তবীজকে বধ করেছিলেন। দেবীর কৃপা লাভের পর দেবতারা দেবীর স্তব মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করেছিলেন।
শ্রী শ্রী দুর্গা দেবীর মাহাত্ম্য কথা শ্রবণ করে রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধি নদীর তীরে বসে মৃন্ময়ী প্রতিমা তৈরী করে দেবী সূক্ত জপ ও অন্যান্য রীতি পদ্ধতি অনুসারে শ্রী শ্রী দুর্গা দেবীর আরাধনা করলেন। তিন বছর তপস্যার পর তাঁদের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা তাঁদের সম্মুখে আবির্ভূত হলেন। শ্রী শ্রী দুর্গা দেবী তাঁদেরকে বর চাইতে বললেন।
রাজা সুরথ ইহ জন্মে নিজের শক্তি দ্বারা শত্রু সৈন্য বিনাশ করিয়া নিজ তাঁর হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার ও পর জন্মে অক্ষয় রাজ্য পাওয়ার বর চাইলেন। সমাধি বৈশ্যের আর সংসারের দিকে আকর্ষণ ছিল না। তিনি চাইলেন পরম জ্ঞান, আমি ও আমার অভিমান নাশ তত্ত্বজ্ঞান, ব্রহ্ম জ্ঞান ও মুক্তি। যাতে সংসারের সব কিছুর মায়া কেটে যায়। শ্রী শ্রী দুর্গা দেবী বললেন — “তথাস্তু”। মায়ের কৃপায় তাঁদের মনোবাসনা পূর্ণ হলো।
মানুষ বিপদে পড়ে ভক্তিভরে দেবী দুর্গার আরাধনা করলে তিনি ভক্তের সমস্ত সংকট ও দুর্গতি নাশ করেন। 'দুর্গতি নাশিনী' বলেই তিনি দেবী দুর্গা নামে পরিচিত। শাক্ত পদাবলী ও পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবীর শাশ্বত ও নিত্যধাম 'মণিদ্বীপ' হলেও লৌকিক ও বাঙালি সংস্কৃতির রূপকে মহাদেব শিবের সাথে তিনি কৈলাসে অবস্থান করেন এবং বছরে একবার মর্ত্যে আসেন।
শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল সূচনার আগের দিন — অর্থাৎ মহাষষ্ঠীর সায়ংকালে (সন্ধ্যায়) — অধিবাস্তু, আমন্ত্রণ ও দেবীর বোধন সম্পন্ন হয়। এরপর মহাসপ্তমীর দিন সকালে কল্পারম্ভের মাধ্যমে মূল পূজা শুরু হয়। তান্ত্রিক ও পৌরাণিক বিধান অনুযায়ী মৃন্ময়ী প্রতিমায় দেবীকে আবাহন করা হয়।
সপ্তমী পূজার অন্যতম প্রধান অঙ্গ হলো নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্নান। নয়টি বিশেষ উদ্ভিদের সমন্বয়ে গঠিত এই নবপত্রিকায় দেবীর নবশক্তি বা স্বরূপের আবাহন করা হয়। এছাড়া মহাসপ্তমীর সকালে দর্পণে (আয়নায়) দেবীর মহাস্নান সম্পন্ন হয় এবং শাস্ত্রীয় মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে প্রতিমায় দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা করা হয়।
অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে ঐতিহ্যবাহী সন্ধিপূজা অনুষ্ঠিত হয়। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট — এই মোট ৪৮ মিনিটের লগ্নটিই সন্ধিপূজার জন্য নির্ধারিত। শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, এই পবিত্র সময়েই দেবী দুর্গার উগ্র ও সংহারিণী শক্তি রূপের পূজা করা হয়। চণ্ড ও মুণ্ড অসুর বধের পটভূমিতে উদ্ভাসিত দেবী চামুণ্ডা বা উগ্রচণ্ডা রূপেই এই পূজায় মাকে আরাধনা করা হয়।
এ বারে অর্থাৎ ১৪৩৩ সালে গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা মতে মা আসবেন ঘোটকে। ফল — ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে, অর্থাৎ অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা। তবে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে মা আসবেন গজে। ফল — শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা। গুপ্তপ্রেস মতে সপ্তমী শনিবার এবং বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে সপ্তমী রবিবার হওয়ায় আগমনের বাহনে এই পার্থক্য। দুই পঞ্জিকা মতেই মা যাবেন নৌকায়। ফল — শস্য বৃদ্ধি ও জল বৃদ্ধি।
দেবী মাহাত্ম্য শ্রী শ্রী চণ্ডী (৫/৬) গ্রন্থে আছে —
তয়াস্মাকং বরো দত্তো যথাপৎসু স্মৃতা খিলাঃ।
ভবতাং নাশয়িষ্যামি তৎক্ষণাৎ পরমা পদঃ।।
শ্রী শ্রী মা দুর্গা যুগে যুগে বিভিন্ন বিপদে আবির্ভূত হয়ে দেবতা ও মানুষদের রক্ষা করেছেন। তিনি বিপদ নাশিনী। সবাইকে বিশ্বাস রাখতে হবে যে শ্রী শ্রী দুর্গা দেবী আমাদের সকল বিপদ হতে রক্ষা করবেন।
।। ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ ।।
লেখক ১৯৫৪ সালের ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশের এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ গোস্বামী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শ্রীদ্বিজেন্দ্রনাথ সান্যাল গোস্বামী ও মাতা শ্রীমতি নিলীমা রাণী সান্যাল গোস্বামীর পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সোনালী ব্যাংকে ৩৮ বছর চাকরি করার পর বর্তমানে তিনি অবসরজীবন যাপন করছেন এবং কুলগুরু হিসেবে দীক্ষাদান করে থাকেন।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।