নামটা তার আপা গোহেইন থাকলেই ভালো হতো। আপা ছিল তার ঠাকুরদার দেওয়া নাম। ঠ্যাটা বাপ ছোটবেলায় তার নাম বদলে দিল। আপা হলো শিবু গোহেইন।
জঙ্গল, পাহাড়, নদী, মেঘের দেশে মানুষের নামে মাহাত্ম্যের নতুন পাখনা বেশ কিছুদিন ধরেই জুড়ছে। শঙ্কর, রাম, লক্ষ্মণ, নারায়ণ, সহদেব — আরও কত কী! অথচ রূপকুরিয়া গাঁ আজও একই নামে পরিচিত। তাহলে আপাকে শিবু ডাকা হবে কেন? শিবু নামে ডাকলেই বিপত্তি। ‘বিধর্মীর পো’ — কথাটা আপার ঠোঁটে লেগেই থাকত।
তার গ্রাম ছাড়ার কারণও ছিল এই বিভ্রাট। হিন্দুরা এসে নামধাম, পরিচয় — সব পাল্টে দিতে চায়। বাপ দাফিয়া হিঁদুদের উস্কানিতে নিজের বাপের কথা অবজ্ঞা করে অর্জুন হয়েছে। সঙ্গে ছিল নেশাখোর বন্ধুর দল। এদের সাগরেদিতে মহল্লার এই হাল হয়েছে। এসব গল্প ঠাকুরদার মুখে শুনেছে আপা। পাড়াপড়শি ও পরিবারের ওপর ঘেন্না ধরে গেছে তার। আপার শৈশবে ছেলেরা হিপ্পি চুল রেখে বিদেশি নাম নিয়ে ঘুরে বেড়াত। দাদুর ভুল-ঠিক বিধান মেনেই আপা বড় হয়েছে।
এখন কেবল মায়ের টানে সে গাঁয়ে ফেরে। গাঁ মানে জনপদের বাইরে একটা ছাওয়া অস্থায়ী ঠেক। নিজের গ্রামের মানুষজনকে সে খুব ভালোবাসে। তাদের ওপর সে প্রয়োগ করতে চায় অধীত চিকিৎসাবিদ্যা। ফিরে আসার কারণ হিসেবে এটুকুই কম নয়। যদিও ঘূর্ণির মতো আর-একটি টান তার আছে।
সুবনসিড়ি নদী-উপত্যকা থেকে মহৌষধি আহরণ করে আপা। তা দিয়েই সে উপত্যকার মানুষের সেবা করে। ডলুংমুখ, আরও ওপরে অরুণাচলের মিরি পাহাড়, যেখানে পথ রোধ করে ঝাঁকড়ামাথা গাছ আর লতাগুল্ম। সেই অরণ্যের সঙ্গে সহবাসে থাকা অনাত্মীয় জনই আজ আপার পরম আত্মীয়, তার জ্ঞানের আধার। নিজের আত্মীয়স্বজন কিংবা পড়শিরা এসব মানতে চায় না। আপা গালগপ্প মারছে বলেই তারা উপহাস করে। আপা চায় মান্যতা। আপা জানে, প্রয়োজনে নিঃস্বার্থ কর্মই মান্যতা এনে দেয়।
মায়ের পায়ে হাত ছুঁয়ে প্রণাম করে আপা। ক্ষমা চেয়ে বলে, ‘মুখিয়া যদি আমাদের রীতি মেনে এই কাজ করে, তাহলে আমি গ্রামে প্রবেশ করব।’
তাগের সঙ্গে এসেছিল মামাঙ। আপার হঠাৎ মনে পড়ে যায় খরস্রোতা নদীর বুক থেকে শিশু মামাঙকে ছিনিয়ে আনার কথা। সেদিন তাগে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘মামাঙ, তুই আপাকে সাদি করবি?’ না বুঝেই সায় দিয়েছিল মামাঙ। সে আজও নিকে করেনি। আপার ঘরে ফেরার আশায় বসে আছে। কত লোভই না তার সামনে এসেছে!
যদিও মামাঙ কখনও মেনে নিতে পারেনি আপার এই জীবনধারা। মামাঙের বাবা-মা ছিল শিব-উপাসক। আপা ভাবে, সাদা চামড়ার যাজকেরা যা করতে পারেনি, এই শালা সিদ্ধান্ত বুধোর ঘাড়ে উদোর পিণ্ড চাপিয়ে সকলের মগজধোলাই করে দিয়েছে। এর জন্য আপা দায়ী করে শোণিতপুরের চা-বাগানগুলোকে।
দাদুর কাছে আপা শুনত সেসব গল্প। চা-বাগানের জন্য শ্রমিক চাই। শ্রমিক কোথায় পাওয়া যাবে? বামুনের ছেলে শ্রমিক হবে না, হবে লিডার। চা-বাগান খুলতেই মাঠ-ঘাট-জঙ্গল থেকে শ্রমিক জুটে গেল। বাবুরা এল শহর থেকে। কেউ খাতা লেখে, কেউ সুপারভাইজার। এলেম থাকলে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। আর যারা লেখাপড়া শেখেনি, তারা বামুন-পুরোহিত। এমনই কিছু পয়মাল এসে জুটল তাদের গ্রামে। শুরু হলো হিংটিং মন্ত্র, মূর্তিপূজা আর নতুন রীতির প্রচলন।
মামাঙকে আপা বোঝাত, ‘দেখ, কীভাবে আমাদের পাহাড়, জঙ্গল, সম্মান — সব ধুয়ে যাচ্ছে সুবনসিড়ির জলে। সবাই যা ভালো বোঝে করুক, আমি এদের হিসাবে চলতে পারব না।’
রোজ মনের কথা অব্যক্ত রেখেই বিদায় নিত মামাঙ। সে না পারত আপাকে মানাতে, না পারত নিজেকে।
দাফিয়ার মৃত্যুর পর সুযোগটা হাতছাড়া করতে চায়নি মামাঙ। অথচ নির্বিকার মুখে আপা ফিরিয়ে দিল মায়ের প্রস্তাব। এতটা ভাবেনি সে। যার নির্নিমেষ চোখের পলক মনে ভেসে উঠলেই আপার সমস্ত শরীর সুবনসিড়ির মতো জেগে ওঠে, সেই মানুষটির আজকের আকাঙ্ক্ষাকেও কীভাবে সে নিবৃত্ত করল — সেই সত্য নিজেও বুঝে উঠতে পারে না।
মামাঙের মনে পড়ে যায়, বুনোফুল দিয়ে আপা কবুল করেছিল, তাগের ছোটবেলায় বলা কথার সত্যতা রাখতে সে বদ্ধপরিকর। মামাঙ আজও কেন মুখ ফুটে মনে করিয়ে দিল না আপার সে কথা? মামাঙ কি অভিমানী? নিজেকে বুঝেও কেন সে বোঝে না! জানি না, কবে আবার এমন সুযোগ আসবে! মামাঙের চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসে।
গোটা গাঁয়ের কাছে সে ছিল ম্লেচ্ছ, আজও আছে। এই পরিচয় খণ্ডানোর কোনো দায় সে নিজের ওপর নেয় না। অথচ ফুটোকড়ি মানুষগুলোর প্রয়োজন পড়লেই তারা ছুটে আসে তার কাছে। তখন মুটিকা, কারক, ফুসকার বীজ, পাতাবাটা, তুলসী, সেন্টেলা মিশিয়ে সুবনসিড়ির ঠান্ডা জল দিয়ে মুখে তুলে দেয় আপা। নিজেকে সে বলে, ‘হ্যাঁ, ঠিকই — ওরা আমায় মানে।’ আবার যারা গাঁ দখল করে নিজেদের দেবতা অন্যের ঘরে চাপিয়ে দেয়, তাদের দালালি করতেও ওরা পিছপা হয় না।
আর বাপ? সে কোনো কালে আমার ছিল না। আমার যে ছিল, সে আমার ঠাকুরদা। মায়ের দিকে তাকিয়ে আপা বলেছিল, ‘তুমি চলে যাও। আমার জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। আমি যাব না।’
ঢি-ঢি পড়ে যায় গ্রামে। কেউ কেউ আপাকে শয়তান বলতেও ছাড়ে না। আপা গাঁ ছেড়ে আবার গিরিকন্দরের নির্জন আশ্রয়ে ফিরে যায়। গাঁয়ে রটতে থাকে, ভিন্ন ভিন্ন উপত্যকায় আপার নাকি আলাদা আলাদা সংসার পাতা আছে। তাই সে পালা করে সেখানে থাকে। আপাকে নিয়ে বানানো এমন রূপকথাই ছিল সিদ্ধান্তের তৈরি করা গল্পের অংশ। সিদ্ধান্তদের দল আপার প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাকে গাঁয়ের মানুষের কাছে আপন গাঁয়ের প্রতি উদাসীনতা বলে চালাতে সক্ষম হয়েছিল। সিদ্ধান্ত জানত, গাঁয়ের মানুষ নিজেরাই নিজেদের শত্রু।
ধাপচাষের জমিতে ধানের গোড়ায় জল জমেছে। বীজ বোনার উৎসবে মেতে উঠেছে গাঁয়ের মানুষ। মাঠজুড়ে বেজে চলেছে সৃষ্টির সুর। বর্ষা প্রেমের প্রতীক। মামাঙের বিশ্বাস, এই সময় আপা অবশ্যই ফিরবে।
কিন্তু মামাঙের বাপের ভাবনা অন্য। মেয়ের এই দীর্ঘ অপেক্ষায় সে আর সায় দিতে পারে না। সিদ্ধান্ত তার মেয়েকে বিয়ে করতে চায় — এ কথা সে জানে। সিদ্ধান্তের টাকাকড়ি আছে। এবর হিসেবে পরিবারের ভবিষ্যতের কথাও তাকে ভাবতে হয়। তা ছাড়া সাদিবিয়া হলে সিদ্ধান্ত ঘরজামাই থাকবে। তাই এবরের তরফ থেকেই দ্বিপ্রাহরিক নিমন্ত্রণ যায় সিদ্ধান্তের কাছে।
সিদ্ধান্তের বহুদিনের ইচ্ছা পূরণ হতে চলেছে। আনন্দের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। লখিমপুর থেকে আনা মিঠাই আর বনশুয়োরের মাংস সে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে।
মামাঙ এসবের কিছুই জানত না। মাঠের কাজ সেরে তাগের বাড়ি হয়ে যখন ফিরছিল, তখনই সিদ্ধান্তের আগমনে উঠোন জমজমাট। ঘরে না ঢুকেই বাপ-মায়ের অভিসন্ধি টের পেয়ে সে সরে যায়। ভাবে, গভীর রাতে ফিরলে অন্তত শয়তানটার মুখোমুখি হতে হবে না।
পাহাড়তলি যখন নিদ্রামগ্ন, তখন নিঃশব্দে ঘরে ফেরে মামাঙ।
রাতেও প্রবল বৃষ্টি হয়েছে। আপার ছাউনির চাল বেয়ে দরদর করে জল ঝরেছে। তার পরানও যেন অকারণ ঝড়ে কাবু। অঝোর বৃষ্টিতে বারবার ভেঙে গেছে তার ঘুম।
ভোরে ছইয়ের বাইরে বেরিয়ে আসে সে। আজ আর শুকনো পাতা সাফসুতরো করার প্রয়োজন নেই। বৃষ্টি সব ধুয়েমুছে দিয়েছে। ঝিরি-ঝোরার সামনে পাথরের ওপর পসরা সাজিয়ে বসে পড়ে আপা। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে শিঙা ফুঁকে নিজের অস্তিত্বের সংবাদ জানিয়ে দেয়।
বৃষ্টি থেমেছে বটে, কিন্তু চারদিকে গভীর কুয়াশার চাদর। আপার ভুরু কুঁচকে যায়। প্রকৃতির আগাম বার্তা পড়তে পারে সে। ভারী বৃষ্টির লক্ষণ অনেক সময় ঘোলাটে মেঘ আর কুয়াশার গভীরেই লুকিয়ে থাকে। মুহূর্তেই নিজেকে প্রস্তুত করে নেয় সে। প্রয়োজনে গ্রামের ভেতরে কোথাও আশ্রয় নিতে হতে পারে। মুম্বা নামে তার এক স্যাঙাত আছে; প্রয়োজনে তার বাড়িতেই থাকা যাবে।
অশান্ত মনে নানান ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। এমন সময় দূর থেকে ভেসে এল হালকা কোলাহল। ক্রমশ শব্দটা স্পষ্ট হতে লাগল। কুয়াশার বুক চিরে দেখা গেল খাটো ধুতি পরা এক মানুষের আবছা অবয়ব। সে নদীর পাড় ধরে প্রাণপণে দৌড়ে আসছে। তার পেছনে কুয়াশার জটা মেখে এগিয়ে আসছে আরও অনেক মানুষ। আপা বুঝতে পারল, তাদের হাতে লাঠিসোঁটা।
নিজের কাজে মন দিতে চাইলেও বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল সেই দৃশ্যের দিকে। উঠে গিয়ে একবার দেখে এল প্রাকৃতিক কালভার্টের নিচে বাঁধা তার ডিঙি নৌকাটি। তারপর ফুঁসতে থাকা সুবনসিড়ির দিকে তাকিয়ে সাত-পাঁচ ভাবতে লাগল। একান্তই যদি পালাতে হয়, তবে নৌকাই শেষ ভরসা।
ঘন কুয়াশার ভাষা সে ঠিকই পড়েছিল। তবু মন স্থির হচ্ছে না। বুকের ধুকপুকানি বাড়ছে। কুয়াশার চাদরে মোড়া ভৌতিক মানুষের ঢল ক্রমশ কাছে চলে আসছে। কোথায় পালাবে, বুঝে উঠতে পারে না আপা। বাঁধের উৎরাই ধরে সে নদীর সেই বাঁকের দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে স্রোত দৃষ্টির আড়ালে মিলিয়ে গেছে।
নদীর তোড়ের চেয়েও দ্রুত ছুটছিল তার ভাবনা। উত্তাল নদী পেরিয়ে পালানোর কথা মনে এলেও মন সায় দিল না। বিদ্রোহী সত্তা বলে উঠল — জীবনে কোনো অন্যায় করিনি। দেশ ছেড়ে যাওয়ার অধিকার আমার আছে, কিন্তু পালিয়ে বাঁচার নয়। নদী, পাহাড়, জঙ্গল, গুহাই আমার দেশ। প্রকৃতিই আমার ঈশ্বর। আমি নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারব না।
এগোতে এগোতে হঠাৎ ফিরে তাকিয়ে সে দেখল, সিদ্ধান্ত প্রায় তার কাছাকাছি এসে পড়েছে। এখান থেকে কোলাহল শোনা গেলেও উত্তেজিত জনতার মিছিল আর চোখে পড়ছে না। মুহূর্তেই আপা বুঝে গেল — এই ক্ষোভ সিদ্ধান্তকে ঘিরেই।
মনের ভেতর অন্য এক ঝড় বয়ে গেল — শালা, এতদিন পর তোকে বাগে পেলাম। আজ আমার হাত না তুলেও অশুভের বিনাশ হবে। তুই আমাকে দেশছাড়া করেছিস, পরিবারছাড়া করেছিস। আজ আমি বিধর্মী। তোর জন্যই এবর চাচা আমার হাতে মামাঙকে তুলে দিতে চায়নি। আমার ভালোবাসা আজও অধরাই রয়ে গেছে।
লাঠিসোঁটা হাতে একপাল মানুষ এসে পড়ল। আপাকে দেখেই তারা জিজ্ঞেস করল, ‘শয়তানটার হদিস কোথায়?’
আপা শান্ত গলায় বলল, ‘জানি না।’
সে জানত, আসামির পক্ষে পালিয়ে বাঁচা সম্ভব নয়। তবু সে চেয়েছিল, সিদ্ধান্ত একান্তে তার কাছে নিজের অপরাধ স্বীকার করুক।
উত্তেজিত জনতা আবার প্রশ্ন করল, ‘দেখনি ওকে?’
আপা উল্টে জানতে চাইল, ‘হিংসার কারণ কী?’
মুখিয়া গর্জে উঠল, ‘শালা! নিজের পরিবার, নিজের প্রেম সব ছেড়ে ভয়ে পালিয়েছিস। এখন তোকে আবার জবাবদিহি করতে হবে?’
কথা শেষ হতে না হতেই আরেকজন বলে উঠল, ‘মুখিয়া, এখন ওসব থাক। তুমিও তো সিদ্ধান্তের টাকায় বিকিয়ে ছিলে।’
সে আপার দিকে ফিরে বলল, ‘শোনো, গতরাতে মামাঙের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শয়তানটা ওর শরীর দখল করেছে। মামাঙ, তুই নিজে বল।’
ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এল মামাঙ। তার চোখে তখন প্রতিশোধের আগুন। সে বলল, ‘তোমার জন্যই আজ আমার এই অবস্থা।’
কথা গলায় আটকে গেল। সিদ্ধান্ত কতদূর কী করেছে, তা মুখে বলতে পারল না সে। উপজাতি সমাজে এমন ঘটনার ভাষা নেই; এমন লাঞ্ছনার পূর্বানুমানও নেই। অপমান তাকে প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত করে তুলেছে।
টাঙির হাতলে হাত রেখে সে বলল, ‘আগে ওকে কাটব, তারপর ফিরে গিয়ে বাপটাকে।’
মুখিয়া তাড়া দিল, ‘সময় নষ্ট করিস না। খুঁজে বের কর!’
উদাসীন মুখে আপা বলল, ‘ওদিকে গেছে — বামুনের পো।’
খুনির উন্মত্ততায় সবাই ছুটে গেল সেই দিকে। কেবল মামাঙ দাঁড়িয়ে রইল। সে ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কবে আর সাদিবিয়া হবে আমাদের?’
প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল আপা। বলল, ‘মামাঙ, এখন অনেক কাজ বাকি। টাঙিটা দে।’
মামাঙ বিনা আপত্তিতে টাঙি এগিয়ে দিল। আপা তা হাতে নিয়ে কোমরসমান জলে নেমে কালভার্টের নিচ থেকে কাঁপতে থাকা সিদ্ধান্তকে টেনে বের করল। কুর্তার কলার চেপে ধরে হিড়হিড় করে বাঁধের ওপর তুলে আনল তাকে।
মামাঙ টাঙিটা ছিনিয়ে নিতে উদ্যত হলে আপা শক্ত হাতে তা আটকে রাখল। তারপর এক লাফে বাঁধের অপর পাড়ে নেমে সিদ্ধান্তকে টেনে নিয়ে গেল নদীর ধারে। সেখানে এসে তাকে ছেড়ে দিয়ে ডিঙির বাঁধন খুলে দিল। এখন নৌকার রশি আপার হাতে।
অকম্পিত কণ্ঠে সে বলল, ‘ডিঙিতে ওঠ।’
সিদ্ধান্ত একবার খরস্রোতা নদীর দিকে তাকাল, তারপর ভীত চোখে ফিরে চাইল আপার মুখে। দূরে আবার জনতার কলরব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শিকার না পেয়ে তারা ফিরে আসছে।
আপা শুধু চোখের ইশারায় নির্দেশ দিল। মামাঙ যেন জাদুবলে স্থবির হয়ে গেছে। তার পা দুটো কাদায় প্রোথিত। মুখ দিয়ে একটি শব্দও বেরোচ্ছে না। বিস্ময়ে সে শুধু আপার দিকে তাকিয়ে আছে। আপা কী করতে চলেছে, তার কোনো ধারণাই তার নেই।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ডিঙিতে উঠে বসল। আপা ধীরে ধীরে রশি ছেড়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যেই ডিঙি খরস্রোতা সুবনসিড়ির স্রোত ধরে তরতর করে ভেসে চলল।
এখন গ্রামের কাদামাখা পথ ধরে হাঁটছে আপা। মামাঙ বসে আছে তার কাঁধে। আদুরে আবদারে দু-পা ছুড়ে চলেছে সে। যেন কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চায়।
আপা তাকে মাটিতে নামিয়ে দিল। তারপর তার চোখের কোমল আগুনে গলিয়ে ফেলে মামাঙের মনে জমে থাকা শুভ্র বরফের স্তর।
কিন্তু আর কোনো প্রশ্ন করার অধিকার সে মামাঙকে দেয় না। কারণ, তার ওষ্ঠযুগল তখন বন্দি আপার ওষ্ঠে।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।