About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
হারানো সুর
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

হারানো সুর

লিলুয়ার পটুয়াপাড়ায় আমরা ঘরভাড়া নিয়ে থাকতাম বাবার চাকরিসূত্রে। ভাড়াবাড়ির সামনে একটা কুলগাছ ছিল। টালির চাল। তখন চোর-ডাকাতের উপদ্রব ছিল খুব। আমার বাবা সন্ধে হলেই দরজা-জানলা বন্ধ করে দিতেন। আমরা চার ভাই। কিন্তু বড়দা গ্রামের বাড়িতে কাকাবাবুর কাছে থাকতেন। বাবার কাছে থাকতাম আমরা তিন ভাই।

বিশ্বকর্মাপুজোতে ঘুড়ি ওড়াতাম। দোলে রং মাখতাম উল্লাসে। তখন আকাশ এত খোলা ছিল, পুকুর ছিল। শীতকালে পুকুরের জল শুকিয়ে গেলে আমরা মাঠ তৈরি করে খেলতাম। ঝুড়ি, কোদাল নিয়ে পুকুরের তলা সমান করে ক্রিকেট খেলার পিচ বানাতাম। কবাডির কোর্ট বানাতাম দাগ দিয়ে। ছুটির দিনে সকালে কবাডি খেলতাম ছেলেমেয়ে একসঙ্গে। একটা মেয়ের নাম ছিল তনু। তার সঙ্গে আমি কবাডি খেলতে পারতাম না। কত বন্ধু। তাদের সঙ্গে পড়াশোনায় চলত কম্পিটিশন। কিন্তু বাইরে বন্ধু। বিকেলে ক্রিকেট খেলতাম। শটিবনের জঙ্গল ছিল পুকুরের পাড়জুড়ে। সেখানে লুকোচুরি খেলতাম।

সৈকত তার স্কুলবেলায় বিজ্ঞানের স্যারকে খুব ভালোবাসত। সৈকতের অন্য বন্ধুরা বলত পাগলা স্যার। সৈকতের খুব রাগ হতো। সে বলত, “এইরকম পাগল হাজার হাজার প্রয়োজন আমাদের শিক্ষার জন্য।”

বিজ্ঞানের স্যারের নাম ছিল পাই স্যার। মার্চ মাসে বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের জন্ম। এই বিজ্ঞানীর জন্মদিনে খুব মজা করে বিজ্ঞান বোঝাতেন স্যার। তিনি একবার বলেছিলেন, “ছোটোবেলায় আমরা সৌরজগতের গ্রহগুলো সূর্যের থেকে কত দূরে, শিখেছিলাম। পৃথিবীর থেকে সূর্য পনেরো কোটি কিলোমিটার দূরে। কিন্তু মুশকিল হলো, এই ‘পনেরো কোটি কিলোমিটার’ কত দূর, তার ধারণা আছে নাকি আমাদের? তোমার স্কুল আর মামার বাড়ির দূরত্ব কত, বল তো সৈকত।”

সৈকত বলল, “স্যার, তিন কিলোমিটার হেঁটে স্কুল যেতে মিনিট কুড়ি লাগে। একশো কিলোমিটার দূরে মামার বাড়ি যেতে বাসে ঘণ্টাখানেক লেগে যায়।” অমর বলল, “আমার মামা দিল্লিতে থাকেন। কলকাতা থেকে দিল্লির দূরত্ব দেড় হাজার কিলোমিটার — প্লেনে যেতে লাগে ঘণ্টা দেড়েক কি দুয়েক।”

স্যার বললেন, “তাহলে দেখ, এই একশো কিলোমিটার বা দেড় হাজার কিলোমিটার দূরত্বের সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে একটা সম্পর্ক তৈরি হলো। কিন্তু পনেরো কোটি? সেটা কত বড় সংখ্যা, তা বুঝি নাকি? সুতরাং, সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব আমাদের কাছে একটা মুখস্থ করার সংখ্যা হিসেবেই রয়ে গেল, অনুভূতি বা ‘ইনটুইশন’-এর সঙ্গে যুক্ত হলো না। আবার এই দূরত্বের সাপেক্ষে পৃথিবী কত বড়, সূর্যই বা কত বড়, তাও মনের মধ্যে ছবি হয়ে রইল না!

 “এই ধরনের নতুন তথ্যকে আমাদের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করা যায় অনেকভাবে। যেমন, একটা উড়োজাহাজ, যার কলকাতা থেকে দিল্লি যেতে এক-দেড় ঘণ্টা লাগে, তার কতক্ষণ লাগবে একই বেগে পৃথিবী থেকে সূর্যে যেতে? উত্তরটা সহজেই দূরত্বকে গতিবেগ দিয়ে ভাগ করে পাওয়া যাবে — প্রায় সতেরো বছর! আবার ব্যাপারটাকে অন্যভাবেও ভাবা যায়। ধরা যাক, পৃথিবীর সাইজ একখানা পাঁচ সেন্টিমিটার ব্যাসের রাজভোগ কি রসগোল্লার মতো। তাহলে এই স্কেলে সূর্য কত বড় আর কত দূরে হবে?”

অমর বলল, “অঙ্কটা চট করে কষতে পারব ঐকিক নিয়ম লাগিয়ে।”
স্যার বললেন, “হ্যাঁ, পৃথিবীর ব্যাস মোটামুটি ১২,৮০০ কিলোমিটার, সেটাকে ছোটো করে ৫ সেন্টিমিটার করে নাও। তাহলে পনেরো কোটি কিলোমিটার হবে ‘৫ সেন্টিমিটার × ১৫ কোটি / ১২,৮০০’, সমান প্রায় ৬০০ মিটার। এবার কিন্তু সৌরজগৎ সম্বন্ধে আমাদের একটা ধারণা তৈরি হলো। মনে মনে একটা ছবি বানিয়ে নিলাম যে আমার টেবিলের ওপরের রসগোল্লাটা পৃথিবী, আর মিনিট পাঁচ-ছয় হেঁটে গেলে সূর্যকে পাব। কিন্তু সূর্য তো বিন্দু নয়! তার ব্যাস প্রায় চোদ্দো লাখ কিলোমিটার। তাহলে আবার ঐকিক নিয়মে দেখে নেব যে আমাদের উদাহরণে সূর্য হবে প্রায় সাড়ে পাঁচ মিটার, মানে মোটামুটি একখানা বড়সড় ঘরের মতো। ঘরের মতো চৌকো নয় অবশ্য, মোটামুটি গোলাকার।”

এইভাবে তিনি বিজ্ঞান বোঝাতেন সহজ করে। তারপর যখন বারো ক্লাসে পড়ি, তখন স্যার একবার স্কুল ল্যাবরেটরিতে ক্লাস নিলেন। স্যার সিরিয়াস হয়ে পড়াচ্ছেন। প্রায় কুড়ি মিনিট পরে ক্লাসে সকলেই হাসতে শুরু করেছে। সৈকত ও তার বন্ধুরা তো হাসছেই। তাদের সঙ্গে হাসছেন পাই স্যার। আমরা অবাক হয়ে হাসছি।

হাসির কলরব পৌঁছে গেল হেডমাস্টারমশাইয়ের ঘরে। তিনি একটি শক্ত লাঠি নিয়ে এলেন মারার জন্য। তিনি চিৎকার করছেন আর বলছেন, “বাঁদরামি হচ্ছে। এটা স্কুল। স্কুলে হাসি!”

ঘরে ঢুকে পড়ে হেডমাস্টারমশাইও হাসতে লাগলেন। সৈকতরা অবাক। কী ব্যাপার হলো! এদিকে পাই স্যার হাসতে হাসতে এগিয়ে চলেছেন একটা মোটা কাচের বোতলের দিকে। তিনি দেখলেন বোতলের মুখ খোলা। বোতলের গায়ে লেখা আছে ‘নাইট্রাস অক্সাইড’। স্যার ঢাকনা বন্ধ করলেন। তারপর দশ মিনিট পরে হেডস্যারকে বললেন, “স্যার, লাফিং গ্যাসের বোতল খুলে ফেলেছে কেউ। তার ফলে এই হাসি।”

অমর বলল, “স্যার, হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেছে।”

কে যে বোতলটা খুলেছিলেন, তা আজ পর্যন্ত জানা যায়নি…

পাই স্যারের বাড়ি গেলেই তিনি পরাণের পান্তুয়া খাওয়াতেন। তিনি আমাদের বাড়িতেও পড়াতেন। তিনি আমাকে বলতেন, “তোর কি পাখির পেট নাকি? খা পরাণের পান্তুয়া। আরও দুটো নে।”

আমি বলতাম, “না না, আর নেব না।”

প্রত্যেক দিন তিনি আমাদের পান্তুয়া খাওয়াতেন। মনে পড়ে আজও লিলুয়ার কথা। এটা শহর নয়। গ্রামের মতোই। জায়গাটার নাম পটুয়াপাড়া। এই পাড়ায় মাটির পুতুল বিখ্যাত ছিল। দুটো পুতুল কিনলেই মাসি বলতেন, “নে নে, আরও একটা নে। এটার দাম লাগবে না।”

মাটির পুতুল নিয়ে আনন্দে ঝুলন সাজাতাম। পুজো দিতাম। পরাণদার পান্তুয়া ছিল প্রসাদ। তার লোভেই আমরা ঝুলন সাজাতাম প্রতিবার। আমরা ছোটোবেলায় মোবাইল পাইনি। কিন্তু আমরা যেসব আনন্দের অংশীদার ছিলাম, সেসব আনন্দ এখনকার ছেলেরা আর পায় বলে মনে হয় না।

ইতিহাসের বাইরে চলে গেছে ভুলোলাগা বামুন। তিনি ঝোলা হাতে মাথায় গামছা জড়িয়ে আসতেন শিল্পকর্ম দেখিয়ে রোজগার করতে। তিনি আমাদের বাড়িতে এসে শুরু করতেন নিজের কথা বা শিল্পকর্ম। নাটকের অভিনয়ের ভঙ্গিমায় বলতেন, “আর বলো না বাবা। তোমাদের গ্রামে আসতে গিয়ে চলে গেলাম ভুলকুড়ি ভুল করে। তারপর মেলে, কোপা, বিল্বেশ্বর, চুরপুনি, সুড্ডো ঘুরে কোমডাঙ্গা।

তারপর কেতুগ্রাম, কেউগুঁড়ি হয়ে গুঁড়ি গুঁড়ি পায়ে হেঁটে পোশলা, নঁগা, খাটুন্দি, পাঁচুন্দি হয়ে তৈপুর, পাড়গাঁ, বাকলসা, পাঁচুন্দি, মুরুন্দি, সেরান্দি, খাটুন্দি পার করে কাঁদরের গাবায় গাবায় হেঁটে এই তোমাদের গ্রামে।”

আমরা জিজ্ঞেস করতাম, “এতটা পথ হাঁটলে কী করে, দাদু?”
তিনি বলতেন, “সব ভূতের কারসাজি। তেনারা ভুলো লাগিয়ে দেন। ভর করে দেহে। তাই এতটা পথ হাঁটতে পারি।”

তারপর আমার মা বা পিসি তাঁর ঝোলায় চালটা, কলাটা, মুলোটা দিতেন। ভুলোলাগা বামুন এলেই সেই দিনটা আমাদের খুব ভালো লাগত। তাঁর পিছু পিছু মন্ত্রমুগ্ধের মতো ঘুরে বেড়াতাম ভুলোলাগা বালক হয়ে।

বৃষ্টির পরেই রামধনু দেখা যায়। দুঃখ শেষে আনন্দ। আমার পাগলামি যে ভালোবাসে, সেই শোভন। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে মানুষকে ভালোবাসার নামই জীবন। নরজীবনে নারী ছাড়া জীবন অচল। তবু কেন এত অন্যায়-অত্যাচার নারীর ওপর? সাধুবেশে নারীদের বিশ্বাস অর্জন করে ন্যায়-অন্যায় জলাঞ্জলি দিয়ে কেন তাঁদের বিশ্বাস হত্যা করা হয়? তাঁরা যে মায়ের, মাসির আদরের আঁচল। তাঁদের রক্ষা করার জন্য তৈরি হোক সমস্ত মানবহৃদয়।

তারপর যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, তখন কাকাবাবু মরে গেলেন অকালে। বাবা হতাশ হয়ে পড়লেন। ভাই-অন্তপ্রাণ। বাবা বললেন, “আর লিলুয়ায় থাকব না। গ্রামে গিয়ে জমিজমা দেখভাল করব। চাষ করব।” বাবারা দুই ভাই, দুই বোন। পিসিদের বিয়ে হয়ে গেছে অনেকদিন। তারপর চলে এলাম গ্রামে।

গ্রামে এসে নতুন পরিবেশে মিশতে সময় লাগল। কিন্তু টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার। সময়ের প্রলেপে খাপ খাইয়ে নিলাম নিজেকে। তারপর অজয়ের বন্যায় মাটির বাড়ি ভেঙে গেল। ভেসে যাচ্ছিলাম বন্যার জলে। চিৎকার করলাম, “আমাকে বাঁচাও…”

যতবার আমি বিপদে পড়েছি, রক্ষা পেয়েছি নারীহৃদয়ের কমনীয়তার গুণে। ভীষণ বন্যায় ভেসে চলেছিলাম স্রোতের তোড়ে। রক্ষা পেয়েছি সর্দারদিদির বলিষ্ঠ হাতের আশ্রয়ে। জীবনে জ্বর হয় বারে বারে। সেবা পেয়েছি স্বপ্না বোনের শাসনে। বারে বারে জীবনযুদ্ধে যখন হেরে যাই, ভালোবাসার আড়ালে মায়াচাদর জড়িয়ে রাখেন আমার বড় সাধের সহধর্মিণী। আর আমার মা সুখে-দুখে, শোকে নিত্যদিনের সঙ্গী। পুরো জীবনটাই ঘিরে থাকে নারীরূপী দেবীর রক্ষাকবচ।

সমগ্র পুরুষসমাজ আমার মতোই নারীর কাছে ঋণী। তবে কোন লজ্জায় পুরুষ কেড়ে নেয় নারীর লজ্জাভূষণ? পুরুষদের মধ্যেই অনেকে আছেন, যাঁরা তাঁদের শ্রদ্ধা করেন। তাঁদের রক্ষায় জীবনদান করেন। তাঁরা অবশ্যই প্রণম্য। তাঁদের জীবন সার্থক। এই পৃথিবী সকলের স্বাধীনভাবে বিচরণের স্থান হোক। হিংসা ভুলে পৃথিবীর বাতাস দুর্বল মানসিকতায় ভালোবাসা ভরুক।

বিল্বেশ্বর স্কুলের হেড টিচার অম্বুজাক্ষবাবু বলতেন, “যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ জীবনের ক্ষেত্রেও মেনে চলবি। যত দুঃখ, ব্যথা বিয়োগ করবি। আনন্দ যোগ করে খুশি গুণ করবি। আর খাবার ভাগ করে খাবি। একা খেলে, বেশি খেলে রোগ বেড়ে যাবে।”

“মজার মধ্যেও কত বড় শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়েছিলেন, আজ বুঝতে পারি। আদর্শ শিক্ষক বোধহয় এইরকম হন,” ফোচন বলল।

ফোচনের বোন ফোড়োনকে মাস্টারমশাই মশলা বলে ডাকতেন। ফোড়োন খুব রেগে যেত। কারণ বন্ধুরাও তাকে মশলা বলেই ডাকত। একদিন স্যারের কাছে ফোড়োন বলল, “আপনি মশলা নামে ডাকেন বলে সবাই ডাকে।”

মাস্টারমশাই বলেছিলেন, “আদর করে দেওয়া নাম কোনোদিন ফেলবি না। রাগ করবি না। দেখবি, একদিন যখন তোর বন্ধু-বান্ধবীরা দূরে চলে যাবে, তখন এই নাম তোর মুখে হাসি ফোটাবে। সংসারের সমস্ত দুঃখ ভুলিয়ে দেবে আদরের পরশে।”

ফোড়োনের জীবনে সত্য হয়েছিল এই কথা। একদিন বিয়ের পরে রমেশের সঙ্গে দেখা হলো তার। রমেশ বলল, “কেমন আছিস, ফোড়োন?”
ফোড়োন বলল, “একবার মশলা বলে ডাক। তা না হলে আমি তোর প্রশ্নের উত্তর দেব না।”

রমেশ তারপর ওকে মশলা বলে ডেকেছিল। মশলা সেবার খুশি হয়ে রমেশকে ফুচকা খাইয়েছিল। তারপর বিয়ে হলো বন্ধু রমেশের। প্রায় কুড়ি বছর পরে, ২০২০ সালে করোনা রোগ এল বিশ্বজুড়ে। রমেশের ছেলের জ্বর হলো। কোনোমতেই ছাড়ে না। ছেলে চোদ্দো দিন পরে বলে, “আমাকে হাসপাতালে নিয়ে চলো, বাবা। টোল ফ্রি নম্বরে ফোন করো। তোমাকে যেতে হবে না।”

রমেশ বলল, “তুই আমার একমাত্র ছেলে। তোকে যদি করোনাভাইরাস অ্যাটাক করে, আমি হাসপাতালে পাঠাব না। আইসোলেশনে রাখার পরে তুই যদি আর ঘরে না ফিরিস?”
— তাহলে কী হবে? আমি একা মরে যাব। আর হাসপাতালে না পাঠালে তুমি আর মাও মরে যাবে। আমার শরীরে অসুবিধা হচ্ছে। তুমি আমাকে হাসপাতালে পাঠাও।
— তা হোক, শরীর খারাপ হলে কাউকে বলার দরকার নেই। ওষুধ খেলেই ভালো হয়ে যাবি।
— না বাবা। তা হয় না। আমি যদি পজিটিভ হই, আমাকে হাসপাতালে দেওয়াই ভালো।

বাবা ভাবেন, ছেলেটা সমাজের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠিক বলছে। সমাজে এ রোগ ছড়িয়ে গেলে আরও অনেক লোক মরে যাবে। কিন্তু ছেলেটা তো বাবা হয়নি। ও কী করে জানবে বাবার দৃষ্টিকোণ? আমি কি ওর মায়ের অন্তর দেখতে পাচ্ছি? মেয়েদের বুক ফাটে, মুখ ফোটে না। ছেলে হারাবার ভয়ে বা স্বামীকে হারাবার ভয়ে সে করোনা রোগের নাম করে না।

ওর মা বলে, “বড্ড অপয়া রোগ। একজনকে গ্রাস করলে সারা বলয় গিলতে চায়।” বাবা ভাবেন, এখনও এই উন্নত যুগে মানুষ কত অসহায়। মিথ্যে ক্ষমতা আর টাকার বড়াই। কোনো কিছুই মৃত্যুকে আটকাতে পারে না।

ছেলে আইসোলেশন ক্যাম্পে চলে গেল। করোনা পজিটিভ। চিকিৎসায় কোনো ফল হলো না। ছেলেটা চলে গেল…

রমেশ আর তার বউ কেমন যেন হয়ে গেল। কারও সঙ্গে আর কথা বলে না। তারপর পৃথিবীর সব রোগ সেরে গেল দু’মাস পরে। সংসার সহজভাবে চলতে থাকল। সে তো থামতে জানে না।

আমি সুরেন্দ্রনাথ কলেজে আইন পড়তে ভর্তি হলাম। বড়দা বাবার মতো ঘরভাড়া নিয়ে থাকেন চাকরিসূত্রেই। লিলুয়ায় বড়দার বাসায় থাকতাম। ফিরে ফিরে দেখতাম ছোটোবেলার পুকুরটাকে। বন্ধুরা সব বড় হয়ে গেছে। কেউ আর পাত্তা দেয় না। সেই পাই স্যার, সৈকত, বিশ্বকর্মাপুজো আমার মনে বিষাদের বাজনা বাজায়।

পরাণদার বাড়ির সামনে মিষ্টির দোকানে গেলাম। সেখানে পান্তুয়ার দোকানের বদলে মোমোর দোকান দিয়েছে পরাণদার ছেলে। পরাণদা বুড়ো হয়েছেন এখন। আমাকে দেখে বললেন, “কে তুমি? চিনতে পারলাম না তো।”

আমি পরিচয় দিলে তিনি আমাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরলেন। আমাকে বললেন, “পাই স্যার নেই তো কী হয়েছে, আমি তোমাকে পান্তুয়া খাওয়াব।”
আমি বললাম, “না, তুমি এখন বুড়ো হয়েছ। আর তোমাকে কাজ করতে হবে না।”

পরাণদাকে প্রাণভরা ভালোবাসা জানিয়ে চোখে জল নিয়ে বাইরে এলাম। এখনকার ছেলেরা কেউ আমাকে চেনে না। পরের দিন বিকেলবেলা পরাণদা তাঁর বাড়িতে আমাকে ডাকলেন। থালায় চারটে পান্তুয়া। খেলাম তৃপ্তি করে। শেষে তিনি কাগজের ঠোঙায় অনেকগুলো পান্তুয়া হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এটা তুমি বাসায় গিয়ে খেয়ো। আমার আনন্দ হবে।”

ইতস্তত করে আমি ঠোঙা হাতে ধরে একশো টাকার নোট বের করলাম। পরাণদা বললেন, “ভালোবাসায় টাকাপয়সার স্থান নেই। আমার এখন টাকার অভাব নেই। তোমাকে পান্তুয়া খাইয়ে আমি যে কতটা আনন্দ পেলাম, তা আমি ছাড়া কেউ বুঝবে না।”

পরাণদার এই কথা শুনে আমি আর কথা বলতে পারলাম না। ধরা গলায় বললাম, “আসছি।”

এখনও পটুয়াপাড়ায় আমি সময় পেলেই চলে যাই পুকুরের পাড়ে। বসে থাকি শটিবনের ধারে। জঙ্গলের এক বুনো গন্ধে পরাণদার কথা মনে পড়ে। এই পুকুরে খেলার সঙ্গীদের মনে পড়ে। বুকটা চিনচিন করে ওঠে। মন উদাস হয়। অতীতের এই পুকুরপাড়ে আমার বয়স, আমার স্মৃতি থমকে রয়েছে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের চিরন্তন খেলায়। আমি পুকুরের পাড়ে বসে আমার ছোটোবেলার খেলা খেলি আপনমনে।




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের কার্তিক ১৪৩৩ সংখ্যাটি ১ নভেম্বর ২০২৬ (১৪ই কার্তিক) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২০ অক্টোবরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
গঠনমূলক পরামর্শ দিন
মন্তব্যে আপনার মতামত জানান
0 0 ভোট
স্টার
guest
1 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
Scroll to Top

‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।