ভোর চারটা। ডিসেম্বরের কলকাতা তখন নিঃশব্দের এক গোপন অধ্যায়। রাস্তাঘাট, গাছপালা, ল্যাম্পপোস্ট — সবকিছুই যেন এক অদৃশ্য শ্বাসের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। শহরের ওপর চাপা কুয়াশা নরম নয়, বরং মনে হয় সেটাই শহরের প্রকৃত বয়স — অবুঝ, ঝিম ধরা, নিঃসাড়।
শ্যামবাজারের পুরনো শিশু উদ্যানের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নাইট গার্ড জহর চক্রবর্তী। বয়স সাতষট্টি। কপালে বয়সের দাগ, শীতে লাল হয়ে যাওয়া হাত, আর চোখে এক ধরনের ক্লান্তি — যেন রাতের পাহারা নয়, অতীতের পাহারাই তার আসল কাজ। জহরের জীবনের মানে এখন ডিউটি আর একঘেয়ে রুটিন। স্ত্রী করোনা রোগে মারা গেছেন। ছেলে বিকাশ ছয় মাসে একবার দেখা করতে আসে, কারণ অজুহাতে ভরা ব্যস্ততা। "অফিসের চাপ বাবা... প্রোজেক্টের চাপ বাবা... পরে আসব।" এসেও জহরের চোখে চোখ রাখে না ঠিকমতো। ছেলের বিশ্বস্ততা শুধু চাকরির প্রতি, তার প্রতি নয় — এটা জহর নিজের থেকেই অনেক বছর ধরে বুঝে গেছে।
কিন্তু সেদিনের ভোর একদম অন্যরকম। আজ কুয়াশা যেন আরও নুয়ে পড়েছে শহরের ওপর। আর সেই কুয়াশা ভেদ করেই জহর প্রথম দেখলো — পার্কের পুরনো পাথরের বেঞ্চে বসে আছেন এক বৃদ্ধা। পাতলা ফিকে শাল, সাদা চুল, এক হাতে কাঠের লাঠি, আর মুখে অদ্ভুত শান্তি, কিন্তু ভিতর-ফাটা এক অভিব্যক্তি। যেন কুয়াশার ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো অদৃশ্য কাহিনি জীবন্ত হয়ে বসে আছে।
জহরের গলা শুকিয়ে গেল। "এই ভোরে... কে আছেন ওখানে?" তিনি টর্চের আলো ফেলতেই বৃদ্ধা ধীরে মাথা তুললেন এবং এমন একটি হাসি দিলেন, যা শীতের সকালেও তাপ দেয়, আবার শীতের ভেতরেও কাঁপিয়ে তোলে।
"আমি অপেক্ষা করছি, বাবা," তিনি বললেন।
জহরের বুকের ভেতর যেন কিছু নড়লো। "কার জন্য অপেক্ষা করছেন?"
"আমার ছেলে আসবে।"
"এখন?"
"হয়তো আজই।"
বাকিটা আর জহর কিছু বললো না।
প্রথম দিন ভেবেছিলেন, হারিয়ে যাওয়া কোনো বৃদ্ধা হবেন। কিন্তু দ্বিতীয় দিন ভোরেও তিনি একই বেঞ্চে। তৃতীয় দিনও… চতুর্থ দিনও… সেই কুয়াশা যেন বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরে রাখতে জানে, যেন শান্ত করে রাখে তার প্রতীক্ষার হৃদয়কে। বৃদ্ধা নাম বললেন অচিন্ত্যমালা দাস। বয়স তিরাশি। তিনি শুধু বলেন, "আমার ছেলে আসবে।" প্রতিদিন গেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
জহর একদিন পুলিশে ফোন করলেন। উত্তর এল — "উনি মানসিক রোগী। বৃদ্ধাশ্রম থেকে একদিন বেরিয়ে পড়েছিল। ছেলে নাকি খোঁজ নেয় না।" কিন্তু জহরের অনুভূতি অন্য কথা বলল। বৃদ্ধার চোখে মানসিক রোগীর মতো কোনো লক্ষণ নেই। আছে ব্যথা। আছে এমন একটি অপেক্ষা, যা কোনো চিকিৎসা বোঝে না।
বৃদ্ধাকে দেখলেই জহরের মনে পড়ে তার নিজের মা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বলেছিলেন, "একটু হাতটা ধরবি, জহর?" জহর তখন বলতে পারেননি, "ধরছি, মা।" কারণ তখন কাজের চাপে তাড়াহুড়োতে ছিলেন। কাজ থেকে ফিরে দেখেন মা নেই... এখনও সেই না বলা শব্দের ব্যথা তার বুকে রয়ে গেছে।
পঞ্চম দিনের ভোরে জহর বৃদ্ধার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। "মাসিমা... আপনার ছেলেকে ফোন করা যায়?"
বৃদ্ধা অভিনব শান্তিতে মাথা নেড়ে বললেন, "ছেলের ফোন নাম্বার তো আমার কাছে নেই, বাবা। সে আমাকে অনেক আগে রেখে গেছে। সে ভাবে... আমায় 'ভালো রাখার' জায়গায় দিয়েছে। তারপর... আর আসেনি।"
জহরের বুক ধীরে ধীরে ভারী হয়ে গেল। নিজের ছেলের কথাও মনে হলো। তার ছেলেরও হয়তো সেই একই অজুহাত — ব্যস্ততা...।
একদিন চায়ের দোকানে তাপসদা বলল, "জহর, কুয়াশায় অনেক সময় মৃতেরাও এসে দাঁড়ায়। অসমাপ্ত কাজ থাকে।" জহর কেঁপে উঠলেন। "না, উনি বেঁচে আছেন।"
তাপসদা ধীরে বলল, "বেঁচে থাকাটা কখনও কখনও দেহে নয়... মনে দেখা যায়।"
জহরের মন ভয়ের ঠাণ্ডায় কাঁপল।
ষষ্ঠ দিনে বৃদ্ধা এক অদ্ভুত ভাবে বললেন, "আজ আমার ছেলে আসবে, বাবা।"
জহর চারপাশ তাকালেন। কেউ নেই। শুধুই কুয়াশা। কিন্তু বৃদ্ধা গেটের দিকে তাকিয়ে বলছেন, "ও তো দাঁড়িয়ে আছে।" জহর দেখলেন — শুধু কুয়াশার নীরব ঢেউ। তবু বৃদ্ধার চোখে আলো। সেই আলো জহর ভাঙতে পারলেন না। তিনি বৃদ্ধাকে চা এনে দিলেন। বৃদ্ধা কাপ ধরতেই হাত কাঁপল, কিন্তু এক শান্তির রেখা মুখে ফুটল।
বৃদ্ধা বললেন, "বাবা, জানিস... আমার ছেলে হয়তো এখন বড় হয়ে গেছে। আমার কাছে সে যে বয়সে ছিল... সেই বয়সেই থেকে গেছে। আমি কখনো তার বয়স বাড়তে দেখিনি।"
জহর বললেন, "আপনি কি তার ওপর রাগ করেন?"
বৃদ্ধা ধীর হাসলেন। "মা কি রাগ করতে পারে? মা তো সব ভুলেও যায়… শুধু অপেক্ষা মনে রাখে।"
জহরের ভেতরে পুরনো একটা কান্না জমে উঠল। যা তিনি বহু বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন।
সপ্তম ভোর। পার্কে বৃদ্ধা নেই। জহরের বুক ধড়ফড় করতে লাগল। চারদিকে হাঁটলেন। কিছুই নেই। জহর ফোন করলেন বৃদ্ধাশ্রমে। "অচিন্ত্যমালা দাস... আছেন?"
উত্তর এলো — "উনি মারা গেছেন, দাদা। দুই সপ্তাহ আগে হার্ট অ্যাটাকে।"
জহর টেলিফোন আঁকড়ে ধরলেন। "মা...রা...গেছেন?"
"হ্যাঁ দাদা। ছেলে সময় নেই বলে ফর্মে সই করে চলে গেছে, শ্মশানেও আসেনি।"
জহর পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তার ভেতর যেন হাজার কুয়াশা ঢুকে গেল।
তিনি সন্ধ্যার ডিউটিতে গিয়ে বেঞ্চের পাশে দাঁড়ালেন। কিছুই নেই। শুধু হাওয়া। হঠাৎ বেঞ্চের নিচে একটা পুরনো কাপড়ের থলি পেলেন। ভেতরে একটি শিশুর আঁকা ছবি। একটা ছেলে মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। নিচে ছোট্ট হাতের লেখা, "মা, আমি ফিরব।"
জহরের চোখে জল জমলো। তিনি ছবি বুকের কাছে চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন — বহু বছরের ধরে চেপে রাখা, অথচ না বলা সব কান্না একসাথে বেরিয়ে এলো।
পরদিন চায়ের দোকানে তাপসদা অবাক হয়ে বলল, "কী হলো তোর?" জহর বললেন, "বৃদ্ধা ছিলেন... আবার ছিলেন না। কিন্তু যা দেখেছি... সেটা সত্য।"
"সত্য-মিথ্যের মাঝখানে কুয়াশা থাকে, জহর," তাপসদা বলল।
জহর ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, "না... কুয়াশা কিছু লুকোয় না। কুয়াশা শুধু আমাদের সেই মানুষটার মুখ দেখায়, যার জন্য আমরা আজও অপেক্ষা করি।"
তাপসদা চুপ।
জহর ফিসফিস করে বললেন, "মাসিমা অপেক্ষা করছিলেন ছেলের জন্য। আমি... আমার মায়ের জন্য। আর আমার ছেলের জন্য। ছেলে হয়তো কোনোদিন বুঝবে, কী ভীষণ ভুল করছে সে।"
আকাশের দিকে তাকিয়ে জহর ধীরে বললেন, "অপেক্ষা কখনো মৃত্যুতে শেষ হয় না। অপেক্ষা মানুষের ভিতরে বেঁচে থাকে।"
পার্কের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো ফুটল। বেঞ্চটা আজও খালি। তবু জহর জানেন — খালি বেঞ্চ মানে কেউ নেই নয়। খালি বেঞ্চ মানে কেউ এখনও অপেক্ষা করে।
লেখিকা একাধারে বিজ্ঞানমনস্ক ও হৃদয়বান সৃষ্টিশীল মানুষ। অবসর সময়ে লেখাই তাঁর আত্মপ্রকাশের পথ — যেখানে দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, নিঃশব্দ ভয়, অজানা রহস্য ও মানুষের লুকানো ব্যথা বাস্তব ও অতিপ্রাকৃতের সীমারেখা মুছে এক অনন্য জগত গড়ে তোলে। গৃহবধূ হয়েও তিনি কলমে ধরেন মহাবিশ্বের বিস্ময় — নক্ষত্রের গল্প, বিজ্ঞানের রহস্য ও জীবনের সূক্ষ্ম অনুভব। তাঁর লেখায় কঠিন বৈজ্ঞানিক ভাবনা রূপ নেয় হৃদয়স্পর্শী ভাষায়, জাগায় অনুপ্রেরণা ও মানবতার আলো।