Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
ভোলাদার মর্মান্তিক পরিণতি
"ডাক্তার মল্লিক, আমার রোগটা কী হয়েছে বলবেন? ওদের জিজ্ঞাসা করলে ওরা কিছু বলে না। সামনে দুর্গা পূজা, এরকম বাড়িতে বসে থাকলে চলে বলুন? ওরা আমাকে বাজার-দোকান করতে দেবে না। কি সব ছাইভস্ম ওষুধ খাওয়াচ্ছে!"
ভোলাদার মর্মান্তিক পরিণতি


ভদ্রলোককে দেখে জগা চমকে উঠেছিল। ভোলাদা না? একি চেহারা হয়েছে? ঘরের পোশাক পরেই বাজারে এসেছেন! এরকম তো কখনও দেখেনি ওনাকে।

"দাদা, আমাকে একটা চা দেবেন? সকাল থেকে চা খাইনি, বুঝলেন না।" উনি করুণস্বরে দোকানের বাইরের জানলা থেকে জগার উদ্দেশ্যে বললেন।

"আপনি ওই চেয়ারে বসুন, ভোলাদা। আমি এক্ষুনি চা দিচ্ছি। কিছু খাবেন?" এই বলে জগা দোকানে ওর হেল্পারকে ভোলাদাকে চায়ের ভারটা এগিয়ে দিতে বলল।

চিন্ময় স্যারকে ফোন করবে কিনা ভাবছে যখন, বেঞ্চের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জগা দেখল যে বেঞ্চ খালি!

"কিরে, ভোলাদা কোথায় গেল? ওকে চা দিয়েছিলি?"
হেল্পারকে ঘাড় নাড়াতে দেখে জগা বাজারের তড়িঘড়ি করে রাস্তায় নেমে পড়ল। এদিক-ওদিক খোঁজ করে, একে-ওকে জিজ্ঞাসা করে যখন হাল ছেড়ে দিচ্ছে, তখনই শীতলা মন্দিরের কাছে কেউ জানালো যে ভোলাদাকে রেললাইনের ঐদিকে যেতে দেখেছে।

শুনে তো জগার মাথায় হাত! এই রেললাইনে প্রতি এক-দু দিন অন্তর লোকেরা কাটা পড়ে। ভোলাদার কি আর বোধশক্তি আছে যে উনি কি করছেন, কোথায় যাচ্ছেন? জগা তখন ভোলাদার কথা ভেবে এমন একটা দৌড় দিয়েছিল যা সাধারণত রক্তের সম্পর্কের লোকেরা একসময় একে অপরের জন্য করে থাকত।

খুব বেশি দূর যেতে হয়নি। অরবিন্দ মাঠ ছেড়ে রেললাইনের দিকে এগোতেই জনতার ভিড় দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল জগা। এক অব্যক্ত ভীতি গ্রাস করেছিল ওকে।

"কি হয়েছে, দাদা? ওখানে কিসের এত ভিড়?"

"আর কি হবে? এখানে যা হয়, তাই হয়েছে। ড্রাইভারের দোষ নেই। আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল ব্রেক করে, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেনি। ভদ্রলোককে উড়িয়ে নিয়ে লাইনের পাশে ছুড়ে ফেলল ট্রেন। মাথার গণ্ডগোল ছিল বোধহয়…!"

জগা রাস্তার পাশের বাড়ির রকে বসে পড়েছিল। পকেট থেকে মোবাইল বের করে চিন্ময় স্যারকে ফোন করতে করতে ভোলাদার সঙ্গে প্রথম আলাপের কথা মনে করে চোখের জল আর ধরে রাখতে পারেনি জগা...

ভারিক্কি চেহারা, গালে কাঁচা-পাকা দাড়ি, গলায় মোটা পৈতা, ভোলাদাকে দেখলে লোকেরা সমীহ না করে পারত না। মজার মানুষ ছিলেন ভদ্রলোক। কে না চিনত মানুষটাকে। ভীষণ রসিক আর গল্প করতে ভালবাসতেন ভদ্রলোক।

"আরে ভাই, তিনটে ভারে চা দিন তো। না, না, ওই তিন টাকা দামের বিস্কুটের দরকার নেই।" তারপর ঘুরে পাশের গালকাটা লোকটাকে বললেন, "দিনকাল যা পড়েছে। আর বেশি দিন টানা যাবে না। শালার সব চুরি করে। ওই তোর মতন যাদের রেপুটেশন, তাদের কে ঠকাবে না, নয়তো দিনদুপুরে দাও মারছে বেটারা। এই সেদিনই তো আমার মাছআলা বসেনি। একটা নতুন ছেলের কাছ থেকে মাছ নিয়েই মনে হলো ব্যাটা ওজনে মেরেছে। সামনের দোকানে নিতাইকে একটু ওজন করে দেখতে বললাম। সাতশো মাছ কিনেছি, শালা তাতেই ওজনে একশো মেরেছে! বাচ্চা ছেলে বলে ছেড়ে দিলাম। শেষে একটা ল্যাজা ফাউও দিয়েছিল। আমাদের সাথেই চুরি করছে, তো আর বাকিদের কথা কি বলবি?"

তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে জগাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আমার চাগুলো হয়েছে, জগা? আজ রবিবার, বেশিক্ষণ বসা যাবে না...।"

সেই শুরু। তারপর থেকে জগার চায়ের নিয়মিত ক্রেতা হয়ে উঠেছিলেন ভোলাদা। প্রতিদিন বাজার সেরে ঘরে ফেরার সময়, জগার দোকানে না আসলে ওনার দিন কাটত না। সঙ্গে বাল্যবন্ধু স্কুলের শিক্ষক চিন্ময় আর গালকাটা তপন, সেকালের পটারি রোডের অন্যতম নামকরা মাস্তান।

কোনো এক অবসরে কখন যেন ভোলাদা আপন হয়ে গিয়েছিলেন। একথা-ওকথার মাঝে নিজের মামার কথাও বলেছিলেন ভোলাদা। সেদিন দোকানে ভিড় ছিল না। চায়ের অর্ডার দিয়ে একা ম্রিয়মাণ হয়ে বসে ছিলেন বেঞ্চে।

"আজ এত চুপচাপ যে, ভোলাদা?" জগা স্টোভে কেটলি বসাতে বসাতে জিজ্ঞাসা করল।

"বুঝলে জগা (সম্পর্ক তখন আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছে), আমার এক মামা ছিল। ভালো মামা। লেখাপড়ায় জুটি নেই। সারাদিন পূজা-আচ্চা নিয়ে থাকতেন মামা। একদিন সকালবেলা ওর ঘর ফাঁকা! বিছানাতেও শুয়ে ছিলেন বলে মনে হবে না। খোঁজ খোঁজ। পুলিশে ডায়েরি পর্যন্ত করা হয়েছিল। মামাকে আর কোথাও পাওয়া যায়নি। হারিয়ে গেল মামা! কত লোকের কত মন্তব্য। কেউ কেউ তো মামার উধাও হওয়া ঘটনাটি কোনো মেয়েঘটিত ব্যাপার বলতেও ছাড়েনি। হায়রে কপাল!"

পরে একদিন।

"বুঝলে না, জগা। গতকাল ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের কাছে তিন গোলে হেরেছে। আমি আর খেলা দেখি না। কি হবে? পঁচাত্তরে শিল্ডের খেলা দেখেছিলাম। তখন মাঠের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে দাঁড়ানো, মাউন্টেন পুলিশের তাড়া খাওয়া, ভিড়ের সুযোগ নিয়ে মাঝেমধ্যেই টিকিট না কেটে মাঠে ঢোকা — কী জীবনটাই না ছিল! ভৌমিক ওদের ডেকে ডেকে গোল দিয়েছিল। একটা-দুটো নয়, পাঁচ পাঁচটা। কোথায় গেল সেই সব দিন! আর আজ ইস্টবেঙ্গলকে বলে বলে এরা হারায়, ওরা হারায়! বিশ্বাস করতে পারো? আর কখন চা দেবে, ভারে?"

জগা স্টোভের পেছন থেকে এক কেটলি থেকে চা নামিয়ে আর এক কেটলিতে ছেঁকে, দরজায় দাঁড়ানো ছেলেটাকে ভোলাদাদের তিনটে ভারের চা এগিয়ে দিতে বলল। ভোলাদা তখনও গল্পে মত্ত।

"আরে কান্ননের কী অবস্থা করেছিল ফটোদা। কান্নন খেপ খেলত। একবার অরবিন্দ মাঠে খেলতে এসেছিল। ময়দানে তখন ওর আকাশছোঁয়া নাম। পাড়ার ফটোদা বাচ্চা করে দিয়েছিল ওকে। বক্সের ধারেকাছে আসতে দেয়নি। ফটোদারা দুই-একে জিতেছিল। চৌষট্টি থেকে সত্তর দশকের শেষেও ভারত ফুটবল খেলতে জানত। আমাদের ফাইটিং স্পিরিট বলে কিছু ছিল, আর আজ? এই ফুটবলারদের কোনো লজ্জা আছে? জগা, আজ খুচরো পয়সা নেই। কাল নিয়ে নিয়ো।"

ভোলাদা মাছের আর সবজির ব্যাগদুটো হাতে নিয়ে উঠতে উঠতে বললেন।


"বাবাই, কাল বাবা টিভি দেখতে দেখতে, নিজের মনে বিড়বিড় করে কি বলছিল। ভাবলাম চায়ের জন্য ইয়ার্কি মারছে। বললাম, 'আর পারি না বাবা। আমার এখনও ভাত হজম হয়নি, আর তোমার এখনই আবার সন্ধ্যেকালীন চা চাই! এবার কাজের লোক ঠিক করো বাপু। আজ তিরিশ বছর ধরে এই ঝিয়ের কাজ করে চলেছি!' তোর বাবা আমার দিকে কিরকম ভাবে যেন তাকিয়েছিল। ভালো লাগেনি। ওকে এরকম বিড়বিড় করে কথা বলতে কখনও শুনিনি। তাছাড়া চেহারাটা কত খারাপ হয়ে গেছে, দেখেছিস? পাগুলো কিরকম সরু সরু হয়ে গেছে! ডাক্তারবাবুকে একটা খবর দিস না। তোকে আর কি বলবো? তুই তো নিজের জগৎ নিয়েই ব্যস্ত। বাবার দিকে তাকাবার আর সময় আছে কি তোর? তোর জন্য কি করতে বাকি রেখেছে বাবা? আর কোনো বাড়িতে যেন ম্যানেজারের কাজ কেউ করে না…..।"

"বলুন তো আমি কে, ভোলাবাবু।"

"আপনাকে চিনব না, যতক্ষণ ডাক্তার, ততক্ষণ শ্বাস আর আশ আমার। জহুরী চিনতে আমি কখনও ভুল করিনি। আমার গিন্নিকেই দেখুন। এত বড় ঘরের মেয়ে। শুধু আমাকে ভালোবেসে বাপের বাড়ির পাঠ উঠিয়ে দিল। ও ডাক্তার বোস, ভালো কথা। আমার বাল্য বন্ধু। মানসের সঙ্গে গতকাল বাজারে দেখা হলো। মানসকে বুঝতে পেরেছেন তো? আরে, মানস, মানস ভট্টাচার্য। কলকাতার নব্বই দশকের (ততদিনে ভুল বলতে শুরু করেছিলেন উনি) এক দুর্ধর্ষ খেলোয়াড়। মানস রাইটে আর বিদেশ বোস লেফট উইংয়ে। তখনকার ডিফেন্ডারদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল ওরা। তা মানস বলছিল যে ছেলেরা এখন বড় হয়ে গেছে। দায়-দায়িত্বও অনেক কমে গেছে আমাদের। তো একটা বাইরে ট্রিপ মারলে কেমন হয়? আমি অবশ্য ওকে বললাম যে শরীরের যে অবস্থা আমার এখন, তাতে খুব দূরে কোথাও যেতে পারব না আমি। তবে কাছাকাছি কোথাও, যেমন দিঘা, পুরী হলে ভেবে দেখতে পারি। গেলে কোনো ক্ষতি কিছু হবে না তো, ডাক্তার বোস?"

পরে বাইরে বেরিয়ে ডাক্তার বোস ভোলাদার স্ত্রী দেবস্মি আর ওদের একমাত্র পুত্র অনিকে বলেছিলেন, "ভোলাবাবুর যা অবস্থা, তাতে বাজার-ঠাজার আর পাঠাবেন না ওনাকে।"

"না, না। ও তো বাজার-ঠাজার করা কবেই ছেড়ে দিয়েছে। অনিই এখন সব করে। ওর ব্যামো তো এটাই ডাক্তারবাবু। ভুলভাল কথা বলে।" দেবস্মি প্রতিবাদ করে, পরে জিজ্ঞাসা করেছিল, "ওর খাবার-দাবার কি নরমাল ডায়েটই থাকবে, ডাক্তারবাবু? ওর খাওয়া কিন্তু অনেক কমে গেছে।"

"না, না। উনি যা খেতে চাইবেন, তাই খেতে দেবেন। খাওয়া-দাওয়ার কোনো রেস্ট্রিকশন নেই। খালি ওষুধগুলো যেগুলো লিখে দিলাম, ওগুলো সময়মতো খাওয়াবেন। আমি ওনাকে আমার এক বন্ধুর কাছে রেফার করে দিচ্ছি। এই এলাকার খুব নাম করা ডাক্তার — ডাক্তার চিত্তব্রত সেন। ওকে দেখিয়ে আমাকে রিপোর্টগুলো পাঠিয়ে দেবেন…।"

"ডাক্তারবাবু চিন্তার কিছু নেই তো? ও যে আমাদের একমাত্র ভরসা….. ছেলে এখনও ছেলেমানুষ। ও শুয়ে পড়লে আমাদের সংসার যে বেটামাল হয়ে পড়বে!"

"দেখুন, এই মুহূর্তে চিন্তার কিছু তো দেখছি না। উনি নিজের মনে কথা বলেন। অনেক কিছু মনে রাখতে পারছেন না। এগুলো বয়সকালে হয়েই থাকে। তবে একটু নজর রাখবেন। একা যেন বাইরে বেরিয়ে না যান। আর বাথরুমে গেলে খেয়াল রাখবেন যাতে পড়ে না যান।" তারপর অনির দিকে তাকিয়ে ডাক্তার বোস বলে উঠলেন, "ওষুধ সব আজ থেকে শুরু হলেই ভালো হয়। ডাক্তার সেনের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্টটা তাড়াতাড়ি করে নিয়ো। ওকে আবার সব সময় পাওয়া যায় না।"

ডাক্তার বোস ওর গাড়িতে উঠে বসলে, অনি সরাসরি ওষুধ আনতে গিয়েছিল।

ভোলাদার অসুখ সম্পর্কে ওর একমাত্র বোন মৌসুমী পরের দিন বৌদি দেবস্মির কাছ থেকে জানতে পেরেছিল।

"আর বোলো না। একে তো নিজের হাজার সমস্যা। তার মধ্যে গোদের ওপর বিষ ফোড়া। তোমার ভাই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। সারাদিন জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, বলে — 'ওরা আমাকে মারতে এসেছে, সোনা, জানলার পর্দাগুলো সব ফেলে দাও।' কারা এসেছে? কেন শুধু শুধু ওরা তোমার দাদাকে মারবে, এসব বলে কোন লাভ নেই। নিজের মাথাটা তো গেছেই, এবার আমার মাথা খারাপ করে তবে শান্তি। অবস্থাটা একবার ভাবো! একে বলে কপাল। ডাক্তার বোসের পরামর্শ মতো তোমার দাদাকে নিয়ে এক স্পেশালিস্টের কাছে গেছিলাম। উনি তো আমাকে আলাদা ডেকে একদম পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন যে দাদার কন্ডিশন মোটেই ভালো নয়। ওনার পরামর্শ অনুযায়ী চললে, দাদা আর কিছু দিন ভালো থাকবে। তবে ছ’ মাস পরে কি হবে, তার কোনো গ্যারান্টি কিছু নেই। তখন তোমার দাদা হয়তো আমাকেও চিনতে নাও পারে! 'এই সব রোগীদের যেটা সবচেয়ে প্রয়োজন তা হলো অ্যাটেনশন আর কেয়ার। ঠিকমতো দেখাশোনা হলে এরা অনেকদিন বাঁচতেও পারে…।'"


"মৌসুমী, বৌদি বলছি গো। দাদার শরীর ভীষণ খারাপ। সারাদিন বমি করছে। রাতে তো কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। ডাক্তার বোস তো জোর করে খাওয়াতে বারণ করেছেন। বুঝতে পারছি না কি করবো। রাতে যদি শরীর আরো খারাপ হয়। অনি অফিসের কাজে হায়দরাবাদ গেছে। আমি একা মানুষ কি করি বলো তো?"

"দাদা বমি করছে কেন? খাওয়ার কোনো অনিয়ম হয়েছে নাকি?"

"না, যেরকম খায়, সেইরকমই দিয়েছি। সকালবেলা উঠে বলল চা খাবে, তাই দিয়েছি। পরে কমলার মাকে দিয়ে কচুরি আনিয়েছিলাম। ও খেতে চাইলো, তো ওকে দুটো না দিয়ে পারলাম না। বলো, পারা যায়? আমরা খাবো আর ও দেখবে! খেতে পারেনি। তারপরেই বমি করতে শুরু করল। আমার ভীষণ ভয় লাগছে। যদি রাতবিরেতে বাড়াবাড়ি কিছু হয়? আমি যে কি করবো?"

"তোমাকে দাদাকে কচুরি দিতে কে বলেছিল। অসুস্থ মানুষ, ওর পেটে কচুরি সহ্য হয়? তোমরা কি যে করো না।"

পরের দিন ভোরবেলাতেই মৌসুমী দাদার বাড়িতে গেছিল। গোপলেনের মেইন রাস্তা পেরিয়ে বাঁদিকে ঘুরেই ডানহাতে যে গলিটা, সেখানেই থাকত ভোলারা। মৌসুমী যখন বাড়িতে পৌঁছল, তখন ভোলা বেঁহুশ। গায়ে সামান্য জ্বরও ছিল।

"দাদা, দাদা। কেমন আছিস?"

ভোলা মুহূর্তের জন্য ঘোলাটে দৃষ্টি নিয়ে মৌসুমীর দিকে তাকিয়ে, স্বল্প মাথা নাড়িয়ে, চোখ বন্ধ করল।

"না, বৌদি। ভালো বুঝছি না। তুমি বরং দাদাকে চিত্তরঞ্জনে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করো। কিন্তু ওকে তুলবে কীভাবে? আমি আর তুমি মিলে তো ওকে তুলতে পারবো না। তার চেয়ে চলো, এক কাজ করা যাক। আমার কাছে চেনা-শোনা এক এম্বুলেন্সের নম্বর আছে। ওদেরকে কল করবো? ওরা বাড়িতে এসে দাদাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে দেবে।"

পাশের বাড়ির মিলি পিসি ভোলাকে এম্বুলেন্সে তোলার সময় এসে দাঁড়িয়েছিল। নিজের থেকেই এসেছিলেন। যেহেতু দেবস্মিকে বাড়িতে থাকতে হয়েছিল, মৌসুমী গাড়িতে ওঠার সময় মিলি পিসি কাউকে ডেকে উঠলেন।

"বাবা, ভোলা কাকুর সাথে একটু চিত্তরঞ্জনে যা না। ওদের লোকজনের বড় অভাব।"

মৌসুমী গাড়িতে উঠলে, মিলি পিসির ছেলে টোটন ও পাশের বেঞ্চে উঠে এসে বসেছিল। হাসপাতালে এমারজেন্সি থেকে আইসিসিতে ভর্তি করা পর্যন্ত টোটন প্রচুর দৌড়ঝাঁপ করেছিল। আত্মীয়-স্বজনরা সবাই ব্যস্ত, তবুও কেউ কেউ খবর পেয়ে হাসপাতালে এসেছিল।


"ভোলাদার কি খবর গো, চিন্ময়দা! আমার দোকানের পথ ভুলে গেল নাকি? কবে যে ওনাকে শেষ দেখেছি, মনে করতে পারছি না।" জগা চায়ের দোকানের বাইরে বেঞ্চেতে বসা চিন্ময়কে জিজ্ঞাসা করল।

"ঠিক জানি না। ভোলাদার নাকি ডিমেনশিয়া হয়েছে। দিন কয়েক আগে উনি নাকি মাঝরাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। ভাগ্য ভালো যে কোনো এক্সিডেন্ট-টেন্ট হয়নি। পাড়ার এক ছেলে সঠিক সময়ে ওনাকে সি আই টি রোডে ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার সিঁড়িতে বসে থাকতে দেখে, বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়…..।"

"ডিমেনশিয়া রোগটা কী, চিন্ময়দা?"

"খুব ভয়ানক রোগ। মনে নেই, আমার জামাইবাবু তো এই রোগেই শেষ হয়ে গেছিলেন। তখন অবশ্য লোকেরা এই নাম-টাম জানত না। রোগের সিম্পটম হলো — অতীত ভুলে যাওয়া। মেমোরি লস। তবে বর্তমানের সবকিছু কিন্তু এরা মনে রাখতে পারে! জামাইবাবু তো শেষে দিদিকেও চিনতে পারত না। প্যাথেটিক!"

"কোথা থেকে যে এই সব রোগ আসছে!"

"ঠিক বলেছ। বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিবিদ্যা যত উন্নতি করছে, তত নতুন নতুন রোগের উদ্ভব হচ্ছে। আমাদের পরিণতি যে কী আছে! যাই হোক, জগা একটা লাল চা দিয়ে দাও। স্কুলের দেরি হয়ে যাবে।"


"ভোলা বাবু, আপনি কিন্তু হাঁটাচলা চালিয়ে যাবেন। প্রতিদিন অন্তত বাড়ির সামনের গলিতে সঙ্গে কাউকে নিয়ে আট-নবার চক্কর মারবেন।"

"ডাক্তার মল্লিক, আমার রোগটা কী হয়েছে বলবেন? ওদের জিজ্ঞাসা করলে ওরা কিছু বলে না। সামনে দুর্গা পূজা, এরকম বাড়িতে বসে থাকলে চলে বলুন? ওরা আমাকে বাজার-দোকান করতে দেবে না। কি সব ছাইভস্ম ওষুধ খাওয়াচ্ছে! কি ভীষণ তেতো! ওরা ওই ওষুধ খাইয়ে আমাকে সারাদিন ঘুম পাড়িয়ে রাখে, জানেন। এতে ওদের সুবিধে। বউ সারাদিন লোকের কাছে আমার নিন্দে করে বেড়াবে। আর ছেলে তো মহারাজ এখন থেকে প্ল্যান করছে, বাবা মারা গেলে এই বাড়ি বিক্রি করে নতুন বাড়ি কিনবে!"

"আপনি এইসব নিয়ে মাথা ঘামাবেন না। শরীর সুস্থ হয়ে যাক, তখন দেখা যাবে।"

ডাক্তার সেনের চেম্বারের বাইরে গাড়ি খুঁজতে ব্যস্ত ঠান্ডা-মাথার-ছেলে ভাইপো অনিকে ট্যাক্সিড্রাইভারকে "এই মারে কি সেই মারে" দেখে, মৌসুমী ওর ওপর কতটা চাপ, বুঝতে পেরেছিল। বাবার শিক্ষায় মানুষ অনি একদিন মৌসুমীকে মনের কথা বলেও ফেলেছিল।

"বুঝলে পিসি, সারা জীবন বাবাকে রাজার মতন হাঁটাচলা করতে দেখেছি। সেই বাবার শেষটা যদি খারাপ হয়, খুব খারাপ লাগবে। তুমি বাবার কাছে গিয়ে বসো, আমি কিছু খাবার নিয়ে আসি…।"

স্বল্পভাষী অনিকে এর আগে এত কথা বলতে শোনেনি মৌসুমী।

এর কিছু সপ্তাহ পরেই ভোলা দুপুরবেলায় যখন দেবস্মি ভেতরের ঘরে গা এলিয়েছিল, বন্ধ করা দরজা চাবি খুলে (চাবি ও কী করে পেয়েছিল, ভগবানই জানেন!) বাইরে বেরিয়ে যায়….

চিন্ময়কে দেখে জগা শিশুর মতন কেঁদে উঠেছিল।

"ভোলাদার যে এতটা খারাপ অবস্থা, বুঝতেও পারিনি, চিন্ময়দা। আমাদের খুব বড় ক্ষতি হয়ে গেল…।"




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top