ডিসেম্বর মাসের শীতের গভীর রাত। কলকাতা শহর তখন ঘুমে আচ্ছন্ন। শীতটাও পড়েছে বেশ জাঁকিয়ে। শিয়ালদহ স্টেশন চত্বরে একাই দাঁড়িয়ে ছিল সুকুমার। আশেপাশে কয়েকটা কুকুর ঘুমিয়ে আছে গুটিসুটি মেরে। তাছাড়া কোনো জনমানুষের দেখা নেই। সুকুমার পেশায় হলুদ ট্যাক্সির চালক। তার দিনকাল ভালো যাচ্ছিল না, পকেটের অবস্থাও শোচনীয়। শেষ একটা ট্রিপের আশায় সে স্টেশনের বাইরে অপেক্ষা করছিল তীর্থের কাকের মতো।
হঠাৎ এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক, হাতে একটি পুরনো চামড়ার ব্যাগ, সুকুমারের গাড়ির দিকে এগিয়ে এলেন। তাঁর পোশাক বেশ পুরনো হলেও সুন্দরভাবে পরা খদ্দরের পাঞ্জাবি আর সাদা মখমলি ধুতি। পাঞ্জাবির ওপর হাতে বানানো হাফহাতা উলের সোয়েটার আর গলায় জড়ানো মাফলার। মাথায় কাঁচা-পাকা পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল আর চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা।
"কোথায় যাবেন দাদা?" সুকুমার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল। এত রাতে যদি একটা বড় ভাড়া পাওয়া যায়, তাহলে মন্দ কি!
ভদ্রলোক বললেন, "যাদবপুর, ঠিক আমার বাড়িটার সামনে।" তাঁর গলায় এক অদ্ভুত শান্ত অথচ ভারিক্কি ভাব।
সুকুমার মনে মনে খুশি হল। যাদবপুর বেশ খানিকটা দূর, ভালো ভাড়া পাওয়া যাবে। সে ইঞ্জিন চালু করল।
গাড়ি শহরের ফাঁকা রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করল। সুকুমার খেয়াল করল, লোকটি অদ্ভুতভাবে চুপচাপ বসে আছেন এবং মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কী যেন হিসেব করছেন। তিনি তাঁর চামড়ার ব্যাগ থেকে পুরনো কিছু কাগজপত্র বের করে দেখছিলেন।
সুকুমার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, "দাদা, কীসের হিসেব করছেন এত রাতে?"
লোকটি সুকুমারের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই, সম্পূর্ণ অনুভূতিহীন ও ভাবলেশহীন। তিনি শান্ত অথচ মার্জিত গলায় বললেন, "আমার জীবনের শেষ হিসেব করছি। সময় ফুরিয়ে আসছে।"
সুকুমার এই কথা শুনে একটু ভয় পেল। যাত্রীর মানসিক অবস্থা নিয়ে তার সন্দেহ হল। গাড়ি যত দক্ষিণ কলকাতার দিকে এগোচ্ছে, কুয়াশা তত ঘন হচ্ছে। শীতের কনকনে বাতাস যেন আরও বেশি ঠান্ডা হয়ে গাড়ির ভেতরে ঢুকছে।
যাদবপুর পৌঁছানোর পর, লোকটি সুকুমারকে একটি পুরনো, জরাজীর্ণ দোতলা বাড়ির সামনে গাড়ি থামাতে বললেন। বাড়িটা দেখে মনে হল বহুদিন ধরে কেউ থাকে না। স্ট্রিট লাইটের হালকা আলোয় যতটুকু দেখা যাচ্ছিল, তাতে সুকুমার দেখল বাড়ির বাইরেটা ভগ্নপ্রায়, বট-অশ্বত্থের শিকড় মাথা উঁচিয়ে উঠেছে দেওয়াল বেয়ে।
লোকটি গাড়ি থেকে নামলেন। সুকুমার ভাড়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। লোকটি তাঁর ব্যাগ থেকে একটি একশো টাকার নোট বের করে সুকুমারের দিকে এগিয়ে দিলেন।
সুকুমার অবাক হয়ে বলল, "এ কী দাদা! ভাড়া তো মিটার অনুযায়ী অনেক বেশি হয়েছে, এই একশো টাকায় কী হবে?"
লোকটি সুকুমারের দিকে এক অদ্ভুত ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকালেন। সেই দৃষ্টিতে ভয় ছিল না, ছিল এক গভীর শূন্যতা আর অনেক কিছু না-পাওয়ার আক্ষেপ। তিনি বললেন, "আমার হিসেব তো দশ বছর আগেই চুকে গেছে। এই বাড়ির সামনেই সেদিন রাতে আমার ট্যাক্সিতে ফেরার পথে এক্সিডেন্ট হয়েছিল। তখন ট্যাক্সি ভাড়া একশো টাকাই ছিল।"
এই কথা বলেই লোকটি ধীরে ধীরে ওই বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন এবং মনে হলো যেন তিনি কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেলেন। সুকুমার হতবাক হয়ে সেই বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। বাড়ির গেটে একটি ছোট ধূলাবৃত নামফলক ছিল, সেখানে লেখা — "শ্রী বিমলেন্দু মিত্র, মৃত্যু: ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৫"।