শহরের প্রাচীনতম লাইব্রেরি — মল্লিক মেমোরিয়াল রিডিং রুম — তার একটা আলাদা গন্ধ আছে। অল্প ধুলো, চুন, পুরোনো পাতার হলদে রং, আর জানলার পাশে পানের দোকান থেকে আসা সুপুরির গন্ধ। একেবারে অন্য জগৎ। আর এই জগতের অধিষ্ঠাত্রী লাইব্রেরিয়ান নয়নী বাগচী — ভীষণ শান্ত স্বভাবের, চোখে স্থিরতা, আর কথায় অদম্য সৌজন্য।
একদিন দুপুরে, আর পাঁচটা দিনের মতোই, নয়নী লাইব্রেরির রেজিস্টারে নাম লিখতে থাকা কলেজের ছেলেমেয়েদের একবার তাকিয়ে দেখে আবার নিজের কাজের দিকে মন দিলেন। আজ তাঁকে একটা পুরোনো দান করা বই — "দ্য গোল্ডেন রুটস অফ বেঙ্গল" — ক্যাটালগ করে তাকে সাজাতে হবে। বইটা বহুদিন কারো হাতে না পড়ায় পাতাগুলো খুব ভেঙে যাচ্ছিল। শেষ পাতা উল্টানোর সঙ্গে সঙ্গেই নয়নীর চোখ আটকে গেল।
পাতার কোণ বরাবর আঁকা অদ্ভুত নকশা — ধনুকের মতো বাঁকা লাইন, তার মাঝে কিছু বৃত্ত, আর দুই পাশে ছোট ছোট বিন্দুমালা। নকশার ঠিক নীচে লেখা — "যে দেখিতে পায় সে-ই পাইবে; মাটি ফুঁড়ে সমস্ত রহস্য মুখ দেখাইবে।" নয়নী ভেবেছিল হয়তো কোনো পাঠক অবসর সময়ে আঁকিবুকি করেছে। কিন্তু অফ-হোয়াইট পাতার কোণটা একটু টেনে ধরতেই দেখা গেল আরেকটি ভাঁজ করা কাগজ লুকোনো আছে। তিনি সাবধানে খুলতেই স্পষ্ট বোঝা গেল — এটা কোনো সাধারণ চিরকুট নয়। মনে হলো যেন এক পুরোনো শিকল কেটে মুক্ত করা হলো কিছু দমবন্ধ ইতিহাস।
কাগজে হাতে লেখা — "মল্লিক বাড়ির পেছনের জমি। ছায়া যখন পশ্চিমে লম্বা হয়ে পড়ে, ঠিক মাঝখান দাঁড়ালে ছয় ফিট নিচে অপেক্ষা করে আছে বাক্স — গুপ্তধনের দোরগোড়া। সাবধান: বাক্সের ভিতর যা আছে, সেটা শুরু — শেষ নয়।" নয়নীর বুক ধড়ফড় করে উঠল। বইয়ের শেষ পাতায় গুপ্তধনের ইঙ্গিত। সত্যি কি এমন কিছু হতে পারে?
মল্লিক বাড়ি শহরের প্রান্তে, পুরোনো এক জমিদার বাড়ি। এখনো ভগ্নদশা হলেও তার আভিজাত্যের চিহ্ন মুছে যায়নি। চারদিকে লোহার জংধরা গ্রিল, মাঝখানে বিশাল বাগান, আর তার পেছন দিকের পাঁচিলের ওপারে বিশাল ফাঁকা জমি। কথিত আছে জমিদার কালীপ্রসন্ন মল্লিক স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বহু দুর্লভ সম্পদ গোপনে লুকিয়ে রাখেন, ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে এড়াতে। কিন্তু স্বাধীনতার পরও সেই সম্পদ আর বের করা হয়নি — কারণ জমিদার ও তাঁর পরিবার রহস্যজনক আগুনে মারা যান। নয়নী এসব শুনেছিল, কিন্তু কখনো পাত্তা দেয়নি। আজ কেন যেন মনে হলো — কাগজে লেখা "মল্লিক বাড়ির পেছনের জমি" কথাটা যেন তাঁকে ডেকে বলছে, "এসো।"
নয়নী একা যাবে না ঠিক করলেন। তিনি ফোন করলেন তাঁর কলেজবন্ধু রুদ্র সোমকে, এখন সাংবাদিক। ফোন ধরতেই রুদ্র বলে উঠল, "তোর লাইব্রেরিতে আবার ভূত দেখা দিয়েছে নাকি?" নয়নী বলল, "ভূত না — তার থেকেও রহস্যময় কিছু। আজই আসিস।" বিকেলেই রুদ্র লাইব্রেরিতে এসে পৌঁছাল। কাগজটা দেখাতেই সে কপাল কুঁচকে বলল, "এটা নেহাত কারো রসিকতা নয়। এই হস্তাক্ষর দেখ — পুরোনো কালী-কালমের দাগ। আর নকশাটা? মনে হচ্ছে পুরোনো survey diagram এর মতো।"
বিকেলের শেষ আলোয় তারা মল্লিক বাড়ির পেছনের জমিতে পৌঁছাল। শ্যাওলা জমা ভাঙা পথ, নিঃস্তব্ধতা, আর বিশাল আমগাছের ছায়া ঠিক জমির মাঝখানে এসে পড়েছে। রুদ্র বলল, "এখনই ঠিক সময়।" খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হলো। আধঘণ্টা পর কোদালের ঠোক্করে ধাতব শব্দ। ঠিক ছয় ফিট নিচে উঠে এল এক জংধরা লোহার বাক্স। বহু চেষ্টার পর তালা ভাঙতেই ঢাকনা খুলে গেল — ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। ভেতরে ছিল এক মানুষের কঙ্কাল। বুক-খাঁচা ভাঙা, গলায় ঝুলছে তাবিজ। রুদ্র বলল, "দেখ — হাড়ের ভেতরে ফাঁপা জায়গা। মনে হচ্ছে ভেতরে কিছু লুকোনো আছে।"
মেরুদণ্ডের ফাঁক থেকে বের হলো ছোট কাঠের বাক্স। খুলতেই সাদা কাপড়ে মোড়া এক দুর্মূল্য হীরা। তার সঙ্গে আরেকটি কাগজ — "যে আমার এই ধন খুঁজে পাবে, সে জানতে পারবে আমার মৃত্যুর সত্য। আমি বিশ্বাসঘাতক নই। আমি রক্ষা করেছি বাংলার মুক্তির উপহার। আমার নাম — অমর মল্লিক।" নয়নী ফিসফিস করে বলল, "অমর মল্লিক! কালীপ্রসন্নর ছোট ভাই!"
ঠিক তখনই পিছনে কেয়ারটেকার রঘুপতি। সে বলল, "আমি জানতাম, তোমরা আজ ওটা খুঁজে পাবে।" কথার এক পর্যায়ে সে ছুরি বের করল। রুদ্র ভাঙা লোহার পাইপ ছুড়ে মারতেই ছুরিটা পড়ে গেল। দুজন দৌড়ে পালাল।
পরদিন ইতিহাসবিদ জানালেন, অমর মল্লিক ছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী। হীরেটা ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের তহবিল। বিশ্বাসঘাতকতার বলি হয়েছিলেন তিনি। নয়নী আর রুদ্র সিদ্ধান্ত নিলেন হীরেটা সরকারের হাতে তুলে দেবেন। লাইব্রেরিতে ফিরে বইটা তাকের উপর রাখতে রাখতে নয়নী আস্তে বললেন, "অমর বাবু, এতদিনে আপনার লড়াই ইতিহাসে জায়গা পেল।" বাতাসে যেন ভেসে এল একটি শান্ত নিশ্বাস।