খুব ভোরে আজ উঠে পড়েছেন সুহাস সেন। তিনি সাধারণত ভোরেই ওঠেন। অত্যন্ত ডিসিপ্লিনড মানুষ তিনি। সময়টাকে নিয়ম মেনে নিক্তি মেপে কাটিয়েছেন। তবে সে নিজের জীবনটুকুই। কাছের মানুষের জীবন যতই তিনি ছন্দে বাঁধতে চেষ্টা করেছেন, ততই সব কেমন যেন ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছে। রাতে তাঁর সবসময়ই সুন্দর ঘুম হয়। তাই ভোরবেলা উঠে পড়তে কোনও অসুবিধা হয় না, বরং নিজেকে বেশ ফ্রেশ লাগে। কিন্তু কাল রাতে ঘুম ভালো হয়নি তাঁর। মনের মধ্যে অজস্র অঙ্ক কাটাকুটি খেলছে, কিন্তু কোনো সমাধান আসছে না। অথচ সুহাস সেন চিরকাল অঙ্ক শিখিয়ে এলেন অসংখ্য ছাত্র ছাত্রীদের।
পার্ক স্ট্রিটের এই সরু অথচ অনেকটা লম্বা একটা ঘরের খোঁজ যখন ঋদ্ধি ফোনে তৃণাকে বলেছিল, তখন একটা দ্বন্দ্ব কাজ করেছিল মনের মধ্যে। মনে হয়েছিল সরু লম্বা ঘরের শেষ প্রান্ত তো অন্ধকার ঘুপচি হতে বাধ্য। সেটাকে কি করে একটা সুন্দর ক্যাফে হিসেবে সাজানো যাবে। কিন্তু ঋদ্ধি যখন ওই সরু লম্বা ঘরটাই দেখতে দেখতে তৃণাকে বোঝাচ্ছিল কোথায় কেমন ডেকরেশন হবে, কোথায় কেমন আলো লাগানো হবে, দেওয়াল জুড়ে কোন কোন ছবি থাকবে — তৃণার চোখের সামনে আজকের 'আড্ডাখানা' জ্বলজ্বল করে উঠেছিল। বাড়ি থেকে আসার সময় দেখা বাবার গম্ভীর মুখ পলকে কোথায় ভেসে গেছিল। সেদিনই অ্যাডভান্স করে এসেছিল টাকাটা।
সারাদিন একটু দম ফেলার ফুরসত পাওয়া যায়নি আজ। একে এবার শীতটা জব্বর পড়েছে। তার উপর বড়দিন। পার্কস্ট্রিটের রাস্তায় গাড়ি আর মানুষের লম্বা লাইন যেন স্থবির হয়ে আটকে আছে। সবে ক'মাস আগে গড়ে তোলা 'আড্ডাখানা'য় তিল ধারণের জায়গা নেই। তৃণা আর ঋদ্ধি এখন বুঝতে পারছে বেশি ভীড় হলে সরু জায়গায় বেশ অসুবিধে হচ্ছে। তার উপর দেওয়ালে সাজানো পুরোনো ছবির সঙ্গে ফটো তোলার হিড়িকে আরও অসুবিধা ঘটছে। কিন্তু কাস্টমার ইজ অলওয়েজ রাইট। আর খদ্দের হচ্ছে লক্ষ্মী। সুতরাং যতই সেলফি তুলুক, তাদের কিচ্ছু বলার উপায় নেই। ঋদ্ধি তৃণাকে বলল, "আরে রাগ করছিস কেন? যত আমাদের আড্ডাখানার ছবি তুলবে আর ফেসবুকে দেবে, তত আমাদের ভীড় বাড়বে, প্রফিটও বাড়বে।"
রাত সাড়ে দশটার সময় আকাশ এসে মানিব্যাগটা তৃণার হাতে ধরিয়ে বলল, "কোনো কাস্টমার ফেলে গেছে ম্যাডাম। ওয়াশ বেসিনের নীচে পড়েছিল।" তৃণার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে সবটা দেখে ঋদ্ধি বলল, "এ কি রে? কিছুই তো নেই। কোনও ভিজিটিং কার্ড বা অ্যাড্রেস, এটিএম কার্ড কিচ্ছু নেই। দেড়শ টাকা আর একটা পুরোনো ফটো, ব্যস।" তৃণা ঋদ্ধির হাত থেকে ব্যাগটা টেনে প্রত্যেকটা খাপ চেক করল। আর তখনই হাতে এল ছবিটা। পুরোনো, আবছা হয়ে যাওয়া জাগরী সেন, শাড়ি পরা, কপালে বড় একটা টিপ। তৃণার রগদুটো টিপটিপ করে উঠল।
কিচেনে গিয়ে ইলেকট্রিক কেটলে জল গরম করে তাঁর নিজস্ব বড় কাপে একটা টিব্যাগ নিয়ে গরম জল ঢেলে নিলেন সুহাস সেন। তারপর কাপ নিয়ে বারান্দায় গাছেদের সান্নিধ্যে গিয়ে বসলেন। তৃণা কাল রাতে এসে একটা মানিব্যাগ দিয়ে যখন জিজ্ঞেস করল, "কাল কি তুমি আমার ক্যাফেতে এসেছিলে?" সুহাস স্বাভাবিক গম্ভীর স্বরে উত্তর দিয়েছিলেন, "কেন? কোনো প্রয়োজন ছিল যাবার?" স্বভাবতই তৃণার ইগো হার্ট হয়েছিল এই উত্তরে। চিৎকার করে বলেছিল, "জানি, তুমি আমার এই দোকান করাতে খুশি নও। তোমার মতে আমার কোনো মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে চাকরি করা উচিত। কিন্তু তুমি তো জানো, আমি জেদি। আমি যা চাই সেটাই করে থাকি।" সুহাস সেন বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, "তুমি কি রাত্রিবেলা আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে এসেছো? যদি কিছু বলার থাকে বলো, না হলে অনেক রাত হয়েছে, শুতে যাও।" ঠিক তখনই তৃণা একটা ছবি সুহাস সেনের চোখের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল, "জাগরী সেনের ছবি তো এটা? দেখো বাবা, আমাদের গোটা বাড়িতে জাগরী সেনের একটাও ছবি তুমি রাখোনি। কিন্তু অন্য কারোর ফেলে যাওয়া মানিব্যাগ থেকে আমি আজ এই ছবি পেলাম এবং চিনতেও পারলাম। তুমি সব ছবি সরিয়ে দিলেও তোমার আমার দুজনের মনের মধ্যেই কিন্তু মুখটা আঁকা হয়ে আছে বাবা, পার্মানেন্টলি।" তারপর মানিব্যাগটা নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেছিল মেয়েটা। চা খেতে খেতে সুহাস দেখলেন গ্যারাজ থেকে গাড়িটা হুশ করে বেরিয়ে গেল। মেয়েটা ঠিক মায়ের মতই জেদি হয়েছে।
পাগলটা যেভাবে রাস্তা পেরোচ্ছে, যে কোন সময় গাড়ির ধাক্কায় মরবে। আচমকা ব্রেক কষে থামাতে গিয়ে ভাবল তৃণা। তৃণা সেন। বয়স চৌত্রিশ। সাধারণ মেয়েদের থেকে বেশ খানিকটা লম্বা। গম রঙা গায়ের রং। হাতের আঙুল খুব লম্বা। আগে যেটাকে চাঁপার কলির সঙ্গে তুলনা করা হত। ফ্লার্ট করার সময় অনেকেই তৃণার আঙুল নিয়ে কথা বলে, বলে, "নিশ্চয়ই তুমি খুব ভাল আঁকো। এ তো শিল্পীর আঙুল না হয়েই যায় না।"
তৃণা সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিরাশ করে বলে, "না, আমি জীবনে আঁকিটাকি নি। আঁকা আমার পছন্দের নয়। আঁকতে হত বলে আমি লাইফ সায়েন্সে কম নম্বর পেতাম।"
"তবে নিশ্চয়ই সেতার বাজাও বা বীণা?"
"না। ওসব কিছুই বাজাতে জানি না", সামনের পুরুষকে নিরাশ করে দিয়ে সে বলে, "তবে একটা জিনিস পারি।"
সামনের পুরুষের চোখ উজ্জ্বল হয়। "কি? কি?"
"শ্যুটিং। নির্ভুল ভাবে। 'বুলস্ আই'তে হিট করতে পারি দশ মিটার দূর থেকে। আর পারি গাড়ি চালিয়ে হারিয়ে যেতে দূর থেকে দূরে।"
বলা বাহুল্য এ দুটোই বাঙালি ঘরের পুরুষের কাছে ভীষণ ভাবে কাম্য নয়। তাই তৃণা সেন এখনও একা। বিশেষ করে শৈশবে তার মায়ের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে একা থাকতেই সে পছন্দ করে। খুব মাথা গরম হলে বা বোর ফিল করলে নিজের গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে কোনো অনির্দিষ্টের উদ্দেশ্যে। আজও যেমন বেরিয়েছে। সাধারণত ঘুরতে ঘুরতে গঙ্গার ধার ধরে পাক দিয়ে প্রিন্সেপ ঘাট হয়ে আবার ফিরে আসে।
আজকাল নিজের মনে বকবক করতে করতে কেউ হেঁটে গেলে কোন ধন্দ লাগে না কারোর মনে। আগে, অর্থাৎ মোবাইল জমানার পূর্বে এরকম ভাবে কেউ নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে হেঁটে গেলে নির্ঘাত সে পাগল, বোঝাই যেত। কিন্তু এখন পাগল বুঝতে গেলে তার হাবভাব, তার পোশাক আশাক, সর্বোপরি তার হাতে কোন মোবাইল আছে কিনা সেটা দেখাও আবশ্যক। তৃণার ধারণা এ পাগল।
হাতে কোন মোবাইল নেই। কানে কিছু গোঁজা নেই। চুল এলোমেলো, জামা কাপড় অবিন্যস্ত। তবে যতটা নোংরা হওয়া উচিত ছিল ততোটা নয়। বরং পরিষ্কার জামা কাপড় বলা যেতে পারে। তৃণার গাড়িতে মরতে মরতে বেঁচে গেছে পাগলটা। গাড়ি থামিয়ে ছেলেটার সামনে গিয়ে অনেকগুলো গালাগালি দিয়েছিল তৃণা। রাস্তায় লোকজন কম। মজা দেখার মুডে খুব একটা কেউ নেই। তাই একটু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে সবাই পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। এক আধজন দাঁড়িয়ে মজা দেখছিল।
"আর একটু হলেই তো মায়ের ভোগে চলে যাচ্ছিলেন।"
তৃণার গরগরে রাগের উত্তরে পাগলটা অদ্ভুত একটা হাসি হাসল। যার মানে গেলেই বা কি এসে যেত হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। আর তাতেই তৃণা আরও রেগে গেছিল। আরও অনেকগুলো গালাগালি দিয়েছিল সে, কিছু ইংরাজিতেও দিতে হয়েছিল। কারণ সব রাগ বাংলা দিয়ে কুলোয় না। আর পাগলটা ঠিক এই কথাই বলেছিল।
"বাংলাতে কুলোতে পারছেন না দিদিমণি?" বলে আবার হেসেছিল। তৃণার মাথাটা ধাঁ করে গরম হয়ে গেছিল আরও। তবে আর কিছু না বলে সে গাড়ির সিটে উঠে বসল। পাগলটা গঙ্গার দিকে নিশ্চিন্তে চলে যাচ্ছে দেখতে পেল। কাচ তোলার আগে একটা ছোট ছেলে বলল, "উ তো পাগল আছে।"
তৃণা জিজ্ঞেস করল, "তুই জানিস ওকে?"
"হাঁ। সব্বাই জানে ইখানে। উ তো রোজ আসে গঙ্গার ঘাটে। আবার চলে যায়। কখুনো রাত মে ভি থাকে। কিসব পেন্টিং করে। পাগল আদমি আছে।"
ছেলেবয়সে দরকচা মেরে যাওয়া শৈশব নিয়ে ছেলেটা চলে গেল। গায়ে এদিকে ওদিকে রং চটে যাওয়া যাওয়া ঝলঝলে একটা সোয়েটার।
তারপর থেকে এই নিয়ে তিনদিন পরপর এই পথে এল তৃণা। প্রতিবারই পাগলটাকে দেখতে পেয়েছে সে। তবে আজ রাস্তায় দেখতে না পেয়ে গাড়ি থামিয়ে এদিকে ওদিকে খুঁজে ফিরছিল চোখ। তখনই সেই এঁচোড়ে পাকা বাচ্চাটা একটা চায়ের গ্লাস হাতে হাজির হয়ে ওর কুর্তি ধরে টান দিল।
"পাগলাটাকে ঢুন্ডতে এসেচেন? আমি চা লিয়ে যাচ্ছি, আসুন।"
তৃণার বিরক্ত লাগলেও বাচ্চাটার পিছু নিতে হয়। একটু দূরত্ব বজায় রেখে সে হাঁটতে থাকে। বাচ্চাটা কি একটা হিন্দি গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে চলেছে। সিঁড়ি নেমে গেছে গঙ্গার দিকে। তারই একপাশে মগ্ন হয়ে আঁকছে পাগলটা। ছেলেটা পাগলটার কাছে গিয়ে চায়ের গ্লাস দিয়ে তৃণার দিকে তাকিয়ে কি বলল। পাগলটা ফিরে একবার দেখল, তারপর হাড় জ্বালানি হাসিটা হাসল আবার। পিত্তি জ্বলে গেল তৃণার। তবে আঁকার হাত পাগলটার সত্যিই ভাল। যদিও তৃণা আঁকার কিচ্ছু তেমন বোঝে না, তবু দেখে ভাল লাগার বোধটা তো আছে।
এর কি বাড়িঘর কিছু নেই? আছে নিশ্চয়ই। কারণ রাতে তো ফিরে যায় বলল ওই বাচ্চাটা। রোজ কি আঁকতে আসে? আসলে ওই হাড় জ্বালানি হাসিটা তৃণাকে বারবার পাগলটার কথা ভুলতে দিচ্ছে না। পুরোনো সিনেমায় সুচিত্রা সেন খুব রেগে গেলে উত্তমকুমার যেরকম হাসি হাসে ঠিক সেইরকম হাসি। অমলিন, ঝকঝকে, বোকাটে, আবার কোথায় যেন তীব্র হীরের দ্যুতি ছড়িয়ে দেওয়া হাসি। আর সেই হাসি হাসছে কিনা একটা পাগল! যে ভাল করে রাস্তা পার হতে পারে না। পাগলটা চা-টা খুব মন দিয়ে খেয়ে ছেলেটার হাতে পয়সা দিয়ে ওর চুলগুলো ঘেঁটে আদর করল। ছেলেটার মুখে তখন বাচ্চাদের মতোই নির্মল হাসি। পাগলটা তারপর আবার গঙ্গার দিকে তাকিয়ে অন্য কোথাও হারিয়ে গেল। তৃণা আস্তে আস্তে ফিরে চলল।
সামনেই নতুন বছর আসছে। শীতে গোটা কলকাতা কেমন মাখোমাখো হয়ে আছে। তৃণা একা থাকতেই পছন্দ করে, তবে সময় পেলেই ও এবার আসবে গঙ্গার ধারে। নতুন বছরের কিছু উপহার নিয়ে আসবে দরকচা শৈশব পাওয়া ছেলেটার জন্য। ওর গায়ে একটা ছেঁড়া সোয়েটার ঝলঝল করে দেখেছে তৃণা। একটা প্যান্ট আর একটা সোয়েটার আনবে ওর জন্যে। আর একটা কেক। গাড়িটা সাইড করে সেও বসবে গঙ্গার ধারে ওই পাগলটার পাশে। কারণ আজ তৃণা দেখেছে পাগলটা আঁকছে একটা মুখ। তাতে বড় একটা টিপ জ্বলজ্বলে। ঠিক জাগরী সেনের মতো।