Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
আত্মজা
ঝড়ের রাতে ডাস্টবিন থেকে পাওয়া শিশুকে তাঁরা নিজের করে নিয়েছিলেন। ভালোবাসায় মানুষ করেছিলেন, শিক্ষায় বড় করেছিলেন। কিন্তু বড় হয়ে মোহিনী ভালোবেসেছিল জোসেফ নামে এক খ্রিস্টান যুবককে।
আত্মজা

সালটা ছিল ১৯৫০, সবে সবে ইংরেজ আমল শেষ হয়েছে বলা চলে, কলকাতার বেশিরভাগটা জুড়েই তখনও ফিরিঙ্গিদের বসবাস। কলকাতার পার্কস্ট্রিটে ইংরেজ আমল থেকেই গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন ক্যাফেটেরিয়া, অনেক বাঙালি পরিবারও নিজেদের জীবিকা নির্বাহের রসদ হিসাবে ক্যাফেটেরিয়া খুলেছিল ওই অঞ্চলে।

আমি যে ক্যাফেটির নাম বলছি সেটা মোহিনী’স হেভেন, সুজয় বসু তার একমাত্র কন্যা সন্তানটির নামে এই ক্যাফেটি খুলেছিলেন, আর আমি? আমি সুদীর্ঘ সেন, এই পার্কস্ট্রিট চত্বরে ৬ মাস হল একটা চাকরি পেয়েছি, তখন থেকেই প্রায় নিয়মিত যাতায়াত এই ক্যাফেতে। ২০০০ সালের ২৬ শে ডিসেম্বরের সকাল, ল্যাপটপে চোখ রেখে গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে হটাৎ শুনি,

"সুজয় বাবু, সুজয় বাবু এই চেয়ারে একটা মানিব্যাগ পড়ে আছে।"

ক্যাফের মালিক সুজয় বাবু অত্যন্ত অমায়িক মানুষ আর হ্যাঁ একটু অন্যরকমের মানুষও বটে, ক্যাফের কর্মচারীদের থেকে সুজয় স্যার নয়, সুজয় বাবু শুনতেই তিনি পছন্দ করেন। তেমনই সবাইকে সমান সম্মানও দিতে জানেন। তবে হ্যাঁ খুব কম কথা বলেন আর মনের ভেতর অজানা কোন গভীর ব্যথা লুকিয়ে রেখেছেন সেটা ওনার চোখ দেখলে ভালোই আন্দাজ করা যায়। সম্ভবত ওনার পারিবারিক জীবনের কোন কারনেই ওনার এত দুঃখ সেটার কানাঘুসি চলতে থাকে।

যাই হোক সেদিনের কথায় ফিরে আসি, সুজয় বাবু খুব সাবলীল ভাবে উত্তর দিলেন, "আচ্ছা, মানিব্যাগটা আমার টেবিলের ড্রয়ারে রাখো, যে ফেলে গেছে সে ঠিকই আসবে খুঁজতে খুঁজতে।"

কর্মচারী বলল, "কিন্তু ২৫শে ডিসেম্বরের রাত ছিল কাল, অত ভিড় ছিল, যদি সে মনেই না করতে পারে যে সে এখানেই তার মানিব্যাগটা ফেলে গেছে? একবার এটা খুলে দেখলে হয়না? যদি কোন ফোন নং বা ঠিকানা…" সাথে সাথে উত্তর এলো,

"একদম না, কারো মানিব্যাগ খোলা উচিত নয়, এখানে রেখে দাও।"

আমি মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছি আর শুনছি। কিছুক্ষণ পরেই একজন দুজন করে লোক বাড়তে লাগলো ক্যাফেতে। কিছু দিনেই অনেক মুখ চেনা হয়ে গেছে যেমন রাজ, জয় দা, সুমন দা কিন্তু আজ কেউ আসেনি। প্রথমে অনমুতি না দিলেও কিছুক্ষণের মধ্যে বয়স্ক মানুষটি ডাক দিলেন, "আচ্ছা শোনো হরি, এদিকে এসো একবার খুলেই দেখা যাক ফোন নং পাওয়া যায় কিনা।" হরি সুজয় বাবুর হাতে মানিব্যাগটা তুলে দিলো, আর তারপর যা হল তা সাধারণত কোন ক্যাফে তে বসে অভিজ্ঞতা করার কথা নয়, মানিব্যাগটা খুলতেই পাথরের মতন স্তব্ধ হয়ে গেলেন সুজয় বাবু, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সত্তর বছর বয়সের ভদ্রলোকটি নার্সারির বাচ্চাদের মতন হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলেন। আমিও ছুটে গেলাম, ওনাকে জড়িয়ে ধরলাম। টানা যেতে যেতে উনি আমার কাছে যেন আপন লোকই হয়ে গেছিলেন।

সুজয় বাবু একটু সামলে ওঠার পর জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা সুজয় বাবু অন্যের ব্যাপারে এভাবে কিছু জানতে চাওয়া আমার স্বভাব নয় তবু কেন জানিনা খুব জানতে ইচ্ছা করছে আপনার সম্মন্ধে। একটা সত্তর বছর বয়সী গুরুগম্ভীর মানুষটা আজ কি কারনে শিশুসুলভ আচরণ করছে, আমাকে কি বলা যায়? মানুষটি যেন এই কয়েক মিনিটেই পাল্টে গেছেন। হাসি কান্না মাখা গলাতে তিনি বললেন, "হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমার একটা উপকার করবে? কাল ঠিক এইসময়ে এসো, তোমার বাইক আছে না? কিছুটা সময় হাতে নিয়ে এসো কেমন?"

"হ্যাঁ নিশ্চয়ই, আমি আজই অফিসে বলে কাল হাফ ডে নিয়ে নেব, আজ তাহলে আসি।" বলে অফিসের জন্য বেরলাম।

পরের দিন কথা মতো পৌঁছে গেলাম ক্যাফে তে, সুজয় বাবু হরি সিং কে বললেন বাইরে "closed" প্ল্যাকার্ড টা টানিয়ে দিতে। উনি মানিব্যাগটা খুলে একটা নং ডায়াল করতে করতে বললেন, "কেউ রিসিভ করলে বলবেন তার মানি ব্যাগটা নিয়ে যেতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।" ফোনটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে উনি অপেক্ষা করতে থাকলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি মিষ্টি কণ্ঠ ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো, "হ্যালো!"

"হ্যালো, আপনার নম্বরটা একটা মানিব্যাগ থেকে পেলাম, এটা এই মোহিনী ক্যাফে তে আছে, এসে প্লীজ নিয়ে যান।" ওপাশ থেকে এবার থমথমে গলায় কথা এলো, "আচ্ছা! শুনুন না, ক্যাফের মালিক সুজয় বাবুকে ব্যাপারটা জানাবেন না প্লীজ, আমি একজনকে পাঠাচ্ছি সে আপনাকে প্রমান দেবে যে মানিব্যাগটা আমার স্বামীর, ওকে ওটা দিয়ে দেবেন প্লীজ।" আমি বললাম, ঠিক আছে তবে দেড় ঘণ্টার মধ্যে কিন্তু। উত্তর এলো, "হ্যাঁ হ্যাঁ।"

ফোন রেখে সুজয় বাবুর দিকে তাকিয়ে দেখি, ওনার চোখ থেকে ঝরছে আনন্দের অশ্রু।

সুজয় বাবু এবার বললেন আসুন এদিকে, দুজনে বসলাম। চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে রেখে সুজয় বাবু বলতে শুরু করলেন, "১৯৫০ এ এই ক্যাফে আমার মেয়ের নামে খুলেছিলাম, তখন ওর বয়স মাত্র ১ বছর। আমার আর সুহাসিনীর প্রাণের টুকরো ফুটফুটে মোহিনীকে ভালো করে বড় করে তুলবো, মানুষের মতন মানুষ করবো এটাই আমাদের প্রধান চিন্তা হয়ে উঠেছিল, সব মা বাবার মতনই। তবে হ্যাঁ মোহিনী আমাদের আত্মজা ছিল, আমরা ওর বায়োলজিক্যাল মা বাবা ছিলাম না। এক ভয়ঙ্কর বৃষ্টির রাতে আমরা দুইজন বিয়েবাড়ি থেকে ফেরার পথে গড়িয়ার দিকের এক ডাস্টবিন থেকে কান্নার আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে যাই এবং সদ্যজাত মোহিনীকে দেখতে পাই, আইনতভাবে ওকে দত্তক নি, নিজেদের আর সন্তানও নিয়নি, পাছে আমাদের মোহিনীর প্রতি ভালোবাসার টান কমে যায়!"

মোহিনীকে আদরে মানুষ করতে থাকি, সেন্ট জেভিয়ার’স কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশুনা করাই। খুব ভালো মেধাবী ছাত্রী ছিল জানো। নাচ, গান, আঁকা সবেতেই কৌতূহল ছিল ওর। সবেতেই ভর্তি করে দিয়েছিলাম। দেখতে দেখতে কখন আমাদের মোহিনী বড় হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। সঠিক সময়ে ওকে আমরা জানিয়ে ছিলাম যে আমরা ওর বায়োলজিক্যাল বাবা মা নই। মেয়েটা সেদিন কান্নায় ফেটে পড়লো না বরং আনন্দে আপ্লুত হয়ে আমাদের জড়িয়ে ধরে বলল, "আমি তোমাদের আত্মজা নই, এই কথা আর কোনদিনও বোলো না বাবা, আমি শুধু তোমাদেরই মোহিনী।"

মোহিনীর জন্য নানান সুপাত্রের সম্বন্ধ আসতে শুরু করলো। সুন্দরী গুণী আমার মেয়েটাকে ভালো পরিবারে বিয়ে দেবো, ওকে সুখী দেখব তখন এটাই আমাদের একমাত্র ইচ্ছা ছিল। কিন্তু যতই ভালো সমন্ধ আসুক মোহিনী কিছুতেই রাজী হচ্ছিল না। প্রথমে ভাবলাম হয়তো ও নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় আগে, তারপর বিয়ে করতে চায়। আমরা তাতেও রাজী ছিলাম, তাও একবার খোলাখুলি ওর সাথে বসলাম।

ওর মা ওকে জিজ্ঞেস করলো, "মণি তোর কাউকে পছন্দ হচ্ছে নারে? তুই বিয়ের পরেও যাতে পড়তে বা চাকরি করতে পারিস সেরকম পরিবারেই তোকে আমরা বিয়ে দেবো রে মা, আর কি কোন অন্য কারন আছে খুলে বল মণি?" মোহিনী লজ্জা মাখা মুখে ওর মায়ের হাত ধরে ভিতর ঘরে নিয়ে গিয়ে কিছু একটা বলল, তখন তো এখনকার দিনের মতো বাবার সাথে মেয়েদের ফ্রাঙ্কলি কথা হতো না বুঝলে, "একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে থামলেন উনি।"

"সুজয় বাবু একটু জল খেয়ে নিন।" এগিয়ে দিলাম জলটা ওনার দিকে। গলা ভিজিয়ে সুজয় বাবু আবারও শুরু করলেন তার অতীতের কথা, "সুহাসিনী ঘর থেকে বেরিয়ে এলো থমথমে মুখে, আমি বুঝলাম মোহিনীর হয়তো কাউকে মনে ধরেছে, আমি তার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম। বললাম হাসি মুখেই, "হুম, তা মণির মা ছেলেটির নাম কি? কোথায় বাড়ি? পরের সপ্তাহেই যাবো আমরা তাদের বাড়ি কেমন? আমাদের মোহিনী যাকে মন দিয়েছে সে নিশ্চয় খুব ভালো মানুষ হবে। তা নামটা বলো?" সুহাসিনী কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "জোসেফ।"

আমার পায়ের নীচের মাটি যেন কেঁপে গেলো, বসে পড়লাম পিছনের চেয়ারে। বসু পরিবারের মেয়ে কিনা শেষে খ্রিষ্টান পরিবারের ছেলেকে ভালবাসল। মোহিনী আমাদের অবস্থা দেখে আমার হাঁটুর কাছে মেঝেতে বসে চোখে জল নিয়ে বলতে লাগলো, "ও বাবা শোনো না জোসেফ খুব ভালো ছেলে, ওর বাড়ির সবাই ও খুব ভালো, বাবা মা ও সেই স্কুল থেকে খুব ভালো বন্ধু আমার। ইংরেজ পরিবার হলেও ওরা আমাদেরই মতন বাবা, ওরা এই দেশের মাটিকে ভালোবেসে এখানেই থেকে গেছে। বাবা মা ওরা আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেবে, ওরা আমাদের ধর্মকেও ততটাই সম্মান করে যতটা ওদের ধর্মকে, একবার ওদের সাথে দেখা করে কথা বোলো না বাবা, দেখবে তোমাদেরও ভালো লাগবে।"

আর পারলাম না নিজেকে আটকাতে, সেই যেন প্রথমবার মনে হল সত্যিই মোহিনী আমাদের মেয়ে না ও আমাদের দত্তক নেওয়া মেয়ে। রাগে লজ্জায় অপমানে পাথর হয়ে গেলাম, বললাম, "এ বিয়ে সম্ভব নয় মোহিনী, এর অনুমতি আমি আর তোমার মা কোনদিনই দেবো না। তাকালাম সুহাসিনীর দিকে, সুহাসিনীর নিশ্চুপ থাকাটা সম্মতি দিলো আমার কথাকে।" মোহিনী চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "বাবা মা আমি জোসেফ কে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে পারব না।"

আমার রাগের বাঁধন ছিঁড়ে গেলো, উথাল পাথাল হৃদয়ে বলে ফেললাম, "তোমাকে নিজের বলতে লজ্জা হচ্ছে! সত্যিই তোমাকে দত্তক নিয়ে, তোমার জন্য নিজেদের সন্তানকেও আসতে না দিয়ে, আমরা জীবনের মস্ত বড় ভুলটা করেছি। ছিঃ মোহিনী ছিঃ! তুমি না কথা দিয়েছিলে আমাদের লাঠি হবে, আমাদের ভালোবাসার এই মূল্য দিলে! মাথা নত করে দিলে আজ আমাদের গোটা সমাজে। সমাজের কথা যদি ছেড়েও দি তবু আমাদের ভালোবাসা হেরে গেলো ইংরেজ ছেলেটার কাছে, ওই ইংরেজ ছেলেটাকে ভুলতে না পারলে আমাদের ভুলে যাও। তোমার মুখ আর দেখিয়ো না আমাদের। আজ থেকে তুমি আবারও অনাথ হলে আর আমরা নিঃসন্তান।" চলে গেলাম নিজের ঘরে, মোহিনী স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকলো একা সর্বহারার মতন। আর আমরাও যেন সব হারালাম, খাওয়া দাওয়া বন্ধ হল।

মোহিনীকে সকালে আর বাড়িতে দেখা গেলো না। ওর ঘরের টেবিল থেকে একটা চিঠি পেলাম, "প্রিয় মা ও বাবা, তোমাদের কথা মতন আর তোমাদের মুখ দেখাবো না। তোমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছি পারলে ক্ষমা করো। আমার গোপাল কে সাথে নিয়ে যাচ্ছি, ইতি তোমাদের আত্মজা মোহিনী।"

সেই ১৯৭০-এ ঘর ছাড়ল মেয়েটা, আর কোন খোঁজ পায়নি, কোন খোঁজ পায়নি। আবারও কান্নায় ভেঙ্গে পরলেন বয়স্ক মানুষটি। ওনাকে শান্ত হতে বলতে বলতে দেখলাম ক্যাফের বাইরে একটা স্কুটি এসে থামল, সুন্দর একটি স্মার্ট মেয়ে দরজা তে এসে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে, এই বছর ১৭ মতন বয়স হবে তার। হরি সিং দরজা খুলতেই সে এক ছুটে ভেতরে ঢুকে বলল,

"আমি মানিব্যাগটা নিতে এসেছি, ব্রাউন রঙের আর..." আমি এগিয়ে দিতে দিতে বললাম, "থাক থাক বুঝেছি এই নাও।" মেয়েটি এদিক ওদিক দেখতে দেখতে বলল, "থাঙ্ক ইউ সো মাচ।" তারপর আবারও ছুটে বেরিয়ে গেলো।

সুজয় বাবুও চোখ মুছতে মুছতে এসে বললেন,

"চলো সাহায্যের সময় এসেছে, বাইকে স্টার্ট দাও ওই মেয়েটার পিছনে যেতে হবে, পরে সব বলবো।" দুজনে চলতে শুরু করলাম দূরত্ব বজায় রেখে। প্রায় আধ ঘণ্টা মতন গিয়ে গড়িয়ার কাছে একটা মস্ত বড় বাড়ির সামনে থামল স্কুটিটা। মেয়েটি এক ছুটে বাড়ির ভেতর ঢুকেই চিৎকার করে বলে উঠলো,

"মা মা এসো এই নাও, উফ!"

বন্ধ না করা গেটটা দিয়ে আমরাও ঢুকে পড়লাম। সদর দরজার দুই পাশে দুটো ছোট্ট মন্দিরের মতন রয়েছে, উঁকি দিয়ে দেখলাম একটাতে আমাদের বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণ আর অন্য দিকে আমাদের যিশু। সত্যি এই বাড়ি যাদের তাদের প্রতি একটা আলাদা শ্রদ্ধা জন্মে গেলো।

সুজয় বাবুকেও যথেষ্ট আবেগপ্রবণ লাগছে, কান্না চেপে বয়স্ক মানুষটি খোলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কান পেতেছেন, ব্যাপারটা আদর্শের বিরুদ্ধে হলেও আমিও পাশে দাঁড়িয়ে পরলাম। কারণ এত দিনে সুজয় বাবুকে এইটুকু তো চিনেছি কোন অনৈতিক কাজ উনি করবেন না। বাচ্চা মেয়েটির ডাকে সিঁড়ি দিয়ে কারো নামার শব্দ পেলাম। তখনই সুজয় বাবুর হাতের আলগা মুঠো থেকে দুটো ছোট কাগজের টুকরো নীচে পড়লো। শুনতে পেলাম এক মাঝবয়সি মহিলার মিষ্টি গলার স্বর, "দিশা উনি কিছু বোঝেন নি তো? সামনে ছিলেন? তোর বাবা এইবার সাঙ্ঘাতিক ভুল করে ফেলেছিল, সত্যি আর পারিনা।" সাথে যোগ হল এক পুরুষ কণ্ঠস্বর, "আরে ২৫শে ডিসেম্বরের রাত, বোঝো না কত ভিড় হয়, খেয়াল ছিল না মণি, সরি সরি।"

"মণি?" নীচের কাগজ দুটো তুলে চোখ বোলাতে বোলাতে উঁকি দিয়ে দেখি দুটো ফটোর মধ্যে একটাতে এই মহিলাটির অল্প বয়সের একটা ফ্যামিলি ফটো তাতে ইনি, এনার স্বামী আর সাথে একটি মিষ্টি মেয়ে আর অন্যটা দেখে আমি হতবাক, "একি এটা তো অল্প বয়সের সস্ত্রীক সুজয় বাবু, বুঝতে দেরী হলনা ইনিই মোহিনী দেবী।" পিছন থেকে ফিসফিসিয়ে বলতে লাগলাম, "সুজয় বাবু... সুজয় বাবু..." কিন্তু উনি তখন অন্য জগতে। বয়স্ক মানুষটি আর ভারসাম্য রাখতে পারলেন না, দরজাটি প্রায় অর্ধেক খুলে গেলো, মোহিনী দেবী আর সুজয় বাবু এখন সামনা সামনি।

"বাবা, তুমি..!"

সুজয় বাবুর পা ধরে কাঁদতে লাগলেন মোহিনী দেবী। আর আমি? বাবা আর তার আত্মজার এত বছর পর মিলনের দৃশ্য দেখে আপ্লুত। মেয়েকে উঠিয়ে জড়িয়ে ধরলেন সুজয় বাবু, পাশের ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে বললেন, "জোসেফ ওরফে জয় এদিকে এসো, দিশা মা আয় দাদুর কাছে আয়।"

মিলন পর্ব শেষে সবাই সোফাতে বসলে সুজয় বাবু বললেন,

"জয় নাম নিয়ে এত বছর ধরে খেয়াল রেখে আসছ বাবা, কোনদিনও বুঝতে দিলে না। সব সমস্যার সমাধান তোমার হাতেই হয়ে আসছে, নিয়মিত গ্রাহকদের সাথে হৃদ্যতা তো হয়েই যায়, একবারের জন্য বুঝতে পারলাম না। আমার আর সহার নানা প্রয়োজনে পাশে থেকেছ। আমি ভুল ছিলাম রে মা, আমি ভুল ছিলাম। তুই সত্যিই হীরের টুকরো ছেলেকে মন দিয়েছিলি।" জোসেফ এগিয়ে গিয়ে সুজয় বাবুর হাত ধরে বলল, "আমি তো জানতাম আপনি আমাদের বাবা, কিন্তু আপনাকে জানতে দেওয়া যেত না যে। প্রতিটা খ্রিস্টমাসে ২৫ শে ডিসেম্বর আপনার মেয়ে, নাতনী, আমি আপনার ক্যাফেতে ভিড়ের মাঝে মিশে গিয়ে আপনাকে দেখে আসতাম। মণি শুধু ওই দিনটিতেই যেতে পারতো, যদিও আমার যাওয়া তো অবাধ ছিল।"

সুজয় বাবু মোহিনীর দেবীর দিকে তাকিয়ে বললেন, "চল মা, ঘরে চল সবাই মিলে, তোর মা আজও তোর পথ চেয়ে বসে আছে।" আমি মুগ্ধ দর্শক হয়ে সবটা দেখলাম ও শুনলাম। মোহিনী দেবী তার কথা রেখে এসেছেন, তার সমস্তটুকুর মধ্যে তার মা-বাবাকে স্থান দিয়েছেন। ভুলে যাওয়া তো দূরের কথা উনি প্রমান করে দিয়েছেন উনি সত্যিই সুজয় বাবুদের আত্মজা। দিশা এদিকে খুব আনন্দে তার বাবা জোসেফকে জড়িয়ে ধরে বলল, "বাপি ভাগ্যিস তুমি মানিব্যাগটা ফেলে এসেছিলে!"

ভালো করে লক্ষ্য করলাম জোসেফের ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু মিষ্টি হাসি।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
5 2 ভোট
স্টার
guest
3 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top