২০২০ সালের শীতের সেই রাত ছিল হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, আর সঙ্গে ছিল দুধ-সাদা কুয়াশা। অর্জুন দাস, বছর পঞ্চাশের এক নাইট গার্ড, ব্যারাকপুরের "পক্ষীরাজ পার্ক"-এর একমাত্র প্রহরী। বহু বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন। তাঁর কাছে পার্কের প্রতিটি কোণ যেন মুখস্থ। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে এই কুয়াশা যেন তাঁর চেনা জগৎটাকে অচেনা করে তুলেছে। সেদিন ভোররাত তখন ঠিক ৪টে ৩০ মিনিট। পার্কের ভেতরের আলোগুলো কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে মিটমিট করছে। অর্জুন দাস প্রতিদিনের মতো মেইন গেট থেকে ভেতরের দিকে টহল দিতে শুরু করলেন। কুয়াশা এত ঘন যে দশ হাত দূরেও কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।
হঠাৎ একেবারে পার্কের কেন্দ্রে, যেখানে ছোট কৃত্রিম ঝর্ণাটা আছে, সেখান থেকে একটা আশ্চর্যজনক শব্দ অর্জুন দাসের কানে এলো। শব্দটা ঠিক মানুষের গলার নয়, আবার কোনো পশুরও মনে হলো না। অনেকটা নূপুরের মৃদু ঝঙ্কার, আর তার সঙ্গে মৃদু কান্নার মতো। অর্জুন দাস থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর অভিজ্ঞতায় এমন শব্দ আগে কখনো শোনেননি। কৌতূহল আর এক চিমটি ভয় নিয়ে তিনি সাবধানে ঝর্ণার দিকে পা বাড়ালেন। যত কাছে গেলেন, শব্দটা তত স্পষ্ট হতে লাগল।
ওই ঝর্ণার দুই পাশে ছিল বহু বছর আগে তৈরি দুইটি অদ্ভুত সুন্দর মূর্তি — একটি পুরুষ ও একটি নারী। মানবাকৃতি দেহের সঙ্গে পাখির ঠোঁট ও দেবদূতীয় ডানা যুক্ত করে বানানো সেই মূর্তিদুটি পার্কের প্রতীক হিসেবেই পরিচিত ছিল। কিন্তু ইতিহাসের ভারে সেই যুগল আর সম্পূর্ণ ছিল না। কয়েক মাস আগের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে পুরুষ মূর্তিটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে পার্ক কর্তৃপক্ষ সেটিকে আর পুনর্নির্মাণের উপযুক্ত মনে করেনি। কয়েকদিন আগেই ভাঙা মূর্তির ধ্বংসাবশেষ ট্রাকে তুলে পার্কের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নারী মূর্তিটি রয়ে গেছে তার জায়গায়, এক ডানা ভাঙা অবস্থায় — অসম্পূর্ণ, যেন বহুদিন ধরে কারোর অপেক্ষা করে আছে।
কাছাকাছি গিয়ে কুয়াশার পর্দা ভেদ করে অর্জুন দাস যা দেখলেন, তাতে তাঁর হৃদস্পন্দন প্রায় থেমে যাওয়ার জোগাড়। ঝর্ণার ভাঙা বেদিটার ওপর আবছা আলোর মধ্যে একটি অবয়ব নড়ছে। সম্পূর্ণ সাদা পোশাকে আবৃত, লম্বা কালো চুল কুয়াশার জলীয় বাষ্পে ভিজে পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। সেটি হাঁটু মুড়ে বসে, দু'হাত দিয়ে মুখ ঢেকে মৃদু স্বরে কাঁদছে।
তিনি গলা পরিষ্কার করে ডাকলেন, "কে ওখানে? কে তুমি মা?" শব্দ শুনেও অবয়বটি নড়ল না। কান্নার স্বর যেন আরও বেড়ে গেল। আরও কাছে গিয়ে তিনি স্পষ্ট বুঝলেন — সেই অবয়বটি আশ্চর্যভাবে নারী পাখির মূর্তির মতোই। একই ভঙ্গি, একই বাঁকানো ঘাড়, আর কাঁধের কাছে ভাঙা ডানার জায়গায় জ্বলছে-নিভছে মৃদু নীল আলো। পায়ের কাছে ছড়িয়ে আছে সাদা পালক — যেন কোনো ভাঙনের চিহ্ন।
অর্জুন দাস বুঝে গেলেন, এটি কোনো সাধারণ মানুষ নয়। লোকমুখে শোনা পুরোনো গল্প মনে পড়ল তাঁর। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো। তিনি টর্চ তুলে আলো ফেললেন অবয়বটির ওপর। আলো পড়তেই — সব শূন্য। ঝর্ণার বেদি ফাঁকা। নূপুরের শব্দ থেমে গেছে। শুধু কুয়াশার সাদা ঢেউ পাক খেয়ে সরে যাচ্ছে।
কাঁপতে কাঁপতে তিনি সেখান থেকে সরে এলেন। টহল সেরে লজঘরে বসে রইলেন। সকালবেলা সূর্যের আলোয় কুয়াশা কাটলে আবার ঝর্ণার কাছে গেলেন। নারী পাখির মূর্তিটি নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল — ভাঙা ডানা, নীরব চোখ। কিন্তু ঝর্ণার বেদির পাশে পড়ে আছে একটি বিশাল সাদা পালক।
অর্জুন দাস পালকটি হাতে নিলেন। তিনি জানেন না, সত্যিই কিছু দেখেছিলেন কিনা। শুধু জানেন, কুয়াশা যখন নামে, তখন সত্য আর কল্পনার সীমারেখাটা খুব আবছা হয়ে যায়। আর সেই আবছার ভেতর লুকিয়ে থাকে কিছু ভাঙা অপেক্ষা, কিছু অপূর্ণ বিদায় — যা শুধু কুয়াশার রাতেই একবার করে ফিরে আসে।
লেখিকার জন্ম কলকাতায়। ছোটবেলায় দাদুর অনুপ্রেরণায় কবিতা ও গল্প লেখার শুরু। পাশাপাশি একা বসে ছবি আঁকা ও হাতের কাজ তৈরি করাও ছিল তাঁর নেশা। বিয়ের পর লেখালেখিতে সাময়িক বিরতি এলেও, ছেলের স্কুলের জন্য একটি কবিতা লেখার পর আবার ফিরে পান শৈশবের সাহিত্যপ্রেম। বর্তমানে তাঁর পাঁচটি একক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখা ছাপা হচ্ছে। একটি ইরেজারের তিনটি পাশে তিনটি ভিন্ন ভাষায় কবিতা লিখে তিনি একটি বিশ্বরেকর্ডও গড়েছেন।